এবার বিজয় দিবসের চেতনায় দেশগড়ার শপথ নিই

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের দিন। এই বিজয় অর্জন করতে গিয়ে বাঙালি জাতিকে কতটা ত্যাগ করতে হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। গল্প-কবিতা, সিনেমা-নাটকে কতভাবে তা বিরত হয়েছে, তা বলে শেষ করার নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-এই স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য ৩০ লাখ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছেন, দুই লক্ষাধিক মা-বোন হানাদার পাকবাহিনীর লালসার শিকার হয়ে সম্ভ্রম হারিয়েছেন। হাজার হাজার বিঘা মাঠের ফসল ধ্বংস হয়েছে। লাখ লাখ বাড়ি জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়েছে। অসংখ্য মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। সেই যুদ্ধদিনের স্মৃতি এখনো বাঙালির স্মৃতিকে আগুনের মতো পোড়ায়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে গিয়ে বাঙালিদের কতটা বিসর্জন দিতে হয়েছে, তার কিঞ্চিৎ ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের কবিতা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য স্বাধীনতা’ কবিতায়। কবি বলছেন, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য। স্বাধীনতা/ সকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/ সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর/…তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা/ অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের উপর।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনতে বাঙালি জাতিকে যত বিসর্জন, যত উৎসর্গ করতে হয়েছে, জীবন ও রক্ত দিতে হয়েছে, তা কবির কবিতার ভাষার চেয়েও অনেক অনেক কঠিন। স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য বাঙালিকে যা হারাতে হয়েছে, যতটুকু দিতে হয়েছে, ইতিহাস তার সম্পূর্ণটা ধারণ করতে পারবে কি না-তা নিয়ে ইতিহাসবিদদেরও সংশয় রয়েছে।

বিশ্বের সব দেশকেই দখলদার শক্তিকে বিতাড়িত করেই মুক্ত এবং স্বাধীন হতে হয়েছে। কোনো দেশের জন্যই স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি। ‘চাহিবামাত্র গ্রাহককে দিতে বাধ্য থাকিব’র মতো কেউ স্বাধীনতা চাওয়া মাত্রই পেয়ে যায়নি। আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রাম-সবই করতে হয়েছে। জীবন দিতে হয়েছে। ত্যাগ, উৎসর্গ সব করতে হয়েছে। জেল-জুলুম সইতে হয়েছে। নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে। কেননা বিশ্বের কোনো জাতিই স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায় না। স্বাধীনতার চেয়ে কাক্সিক্ষত আর কিছু, বড় কোনো স্বপ্ন মানুষের আর কিছু হতে পারে না। পরাধীন কোনো জাতি স্বাধীন হতে চায় না-বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত মিলবে না। ব্যক্তিগতভাবে সুখী হোক, দুঃখী হোক-সবাই স্বাধীনতা চায়। স্বাধীনতার জন্য মানুষ জীবন দিতেও পিছপা হয় না। স্বাধীনতার বেদিমূলে মানুষ জীবন-সম্ভ্রম-সম্পদ সব বিলিয়ে দিতে পারে। তাই স্বাধীনতা পাওয়া যেমন সবচেয়ে বড় অর্জন, বড় আনন্দের; তেমনি অবর্ণনীয় বেদনা ও বিষাদের।

তা সত্ত্বেও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র নয় মাসে বিশ্বের অন্যতম চৌকস সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন যেমন অনন্য ইতিহাস, তেমনি নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের জীবনদান, দুই লাখের অধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানির ঘটনাও স্বাধীনতার ইতিহাসে দ্বিতীয় নজির মিলবে না। এর বাইরেও ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এই সময়টাতে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনকালে পাকিস্তানি শাসকদের হাতে বাঙালি পীড়নের ইতিহাসও ব্যতিক্রম। বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী এবং কমিউনিস্ট নেতাদের জীবন কেটেছে হয় জেলে, নইলে আত্মগোপনে। এ ছাড়া অধিকার নিয়ে, দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে বাঙালি ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক-উকিল, সাধারণ মানুষ, শ্রমিক-কৃষক, খেটে খাওয়া মুটে-মজুরকেও প্রতিনিয়ত অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জীবনও দিতে হয়েছে।

পাকিস্তানি শাসকেরা ১৯৪৭ সাল থেকেই বাঙালিদের বিমাতাসুলভ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। সামরিক-অসামরিক সব সরকারের হাতে পাকিস্তানের বাঙালিরা সব রকম নিপীড়নের শিকার হতে থাকে। আয় বৈষম্য থেকে জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের নির্মম শিকার হয়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক-সব দিক থেকেই বাঙালিরা বঞ্চনা-বৈষম্যে পতিত হয়। এখানে একটি কথা বলতেই হয়, ধর্মকে ভিত্তি করে দ্বিজাতিতত্ত্বের যে দাবিতে পাকিস্তানের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত করেন, সেই তত্ত্ব অচিরেই অসাড় প্রমাণিত হয়। কেননা ধর্ম কখনো নিজের ধর্মের লোক তো নয়ই, অন্য কোনো ধর্মের মানুষকেও বঞ্চিত করার কথা বলে না। কাউকে অন্যায়ভাবে পীড়ন করতেও শিক্ষা দেয় না। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা অনুমোদন করে না। অধিকার হরণ করতে দেয় না। পাকিস্তানি শাসকেরা শুরু থেকেই বাঙালিদের সব ক্ষেত্রে বৈষম্য করতে থাকে।

তারা বাঙালিদের সাংস্কৃতিক দিক থেকে পঙ্গু করে দিতে প্রথমেই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানে। এক দেশের দুই শাখায় দুই ভাষা-বাংলা ও উর্দু। জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে প্রথম ঢাকা সফরে এসেই ঘোষণা করে দিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দু।’ বাংলার ছাত্রসমাজ সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ জানায় ‘নো নো’ বলে। সেই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালে, ছাত্রসমাজের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করার মধ্য দিয়ে। শহীদ হন সালাম, জব্বার, বরকত, রফিক, শফিকসহ আরো অনেকে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সেই স্মৃতিই বহন করে চলেছে। এরপর বাঙালিদের লড়াই আর রক্ত দিতে দিতেই ২৪ বছর পার করে দিতে হয়। ১৯৫৪-তে নির্বাচনে বিজয় মঞ্চ থেকে ’৫৮-তে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২-তে শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-তে ছয় দফার আন্দোলন, ’৬৯-এ গণ-আন্দোলন এবং ’৭১-এ চূড়ান্ত আন্দোলন স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ছয় দফা দাবি উত্থাপন করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তা বাঙালির মুক্তিসনদ হিসেবে ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তখন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানও বাঙালিদের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

বঙ্গবন্ধু মুজিবকে বাঙালির হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করতে গিয়ে ১৪ বছর জেল খাটতে হয়। অকথ্য নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ছয় দফা পাওয়ার পর বাঙালিদের আর বুঝতে কোনো কষ্ট হয় না-স্বাধীনতাই এবার একমাত্র লক্ষ্য। এভাবেই শুরু হয় চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি। ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক লাখ বাঙালির প্রাণহানি এবং পাকিস্তানিদের চরম অবজ্ঞা-অবহেলা বাঙালিদের মনে ঘৃণার জন্ম দেয় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে আসে ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তানিদের নতুন ষড়যন্ত্র ‘লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক’ (এলএফও)। নির্বাচনে নানা শর্ত, নানা বিধিনিষেধ। বাঙালিদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সব শর্ত মেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশ নেন এবং তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেন। ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন অর্জন করে পূর্ব পাকিস্তানে।
এর পরও পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটে না। ১৯৫৪ সালের মতো নির্বাচনের ফল নিষ্ফল করে দিতে ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে দেন ইয়াহিয়া খান। তিনি ভুট্টোর সঙ্গে জোট বেঁধে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা না দেওয়ার চক্রান্ত করে বাঙালিদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়। এর মধ্যেও তারা সংলাপের নাটক করে বাঙালি নিধনের আয়োজন সম্পন্ন করতে মারণাস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলে। বঙ্গবন্ধু মুজিবের নির্দেশনায় ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ চলতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু যে যে নির্দেশ দেন, বাঙালিরা সেই নির্দেশই পালন করে। ১ মার্চ থেকে শুরু হয়। ইতিমধ্যে ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, যা সব প্রজন্মের বাঙালিরই মুক্তিমন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ উচ্চারণ : ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সব প্রজন্মের বাঙালির জন্য উজ্জীবনী শক্তি। এই শক্তির ওপর ভর করেই ২৫ মার্চ রাতে যখন পাক হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন কালবিলম্ব না করে বাঙালিরা যা কিছু পায় তা-ই নিয়ে প্রতিরোধে নেমে পড়ে।

মুক্তিকামী মানুষেরা কখনো পরাজিত হয় না। বাঙালিও পরাজিত হয় না, হানাদার বাহিনী যত শক্তিশালীই হোক। বাঙালিরা হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বিজয় অর্জন করে। তাই ডিসেম্বর মাসে আমরা আনন্দ-বেদনায় উদ্বেলিত হই। নানা আয়োজনে স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদকে। বাঙালির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সব শহীদকে। বিভিন্ন সংগঠন এবার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বিজয় দিবস উদ্্যাপন করার প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে বিজয় অর্জনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আলবদর বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেই বেদনা নিয়েই জাতি ১৬ ডিসেম্বর বিজয় উদ্্যাপন করে আসছে সেই ’৭১ সাল থেকেই।

এবারের ডিসেম্বর মাসের শুরুটাই হয়েছে উত্তাপ ছড়িয়ে। বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজধানীতে একজনের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছে অনেক। গ্রেফতার হয়েছেন বিএনপির অনেক নেতা। গুমোট পরিস্থিতি দেশজুড়ে। দেশে অনেক উন্নয়ন সত্ত্বেও অভিযোগও অনেক সরকারের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লোপাট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। নাগরিক সমাজ ডিসেম্বরের বিজয়ের চেতনায় দেশকে ফিরে পেতে চায়। আমাদের প্রার্থনা হোক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের খেলা ছেড়ে সবাই ’৭১-এর চেতনায় দেশ গড়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করি। তবু পরিস্থিতি ঘোলাটে। ইতিমধ্যে বিএনপির ছয় সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, কে জানে! শেষ পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার হবে, গুমোট কেটে যাবে-এটাই প্রার্থনা।

এবার নিজের দিকে তাকিয়ে সবাই নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি, যারা জীবন দিয়ে, সম্ভ্রম দিয়ে আমাদের একটা স্বাধীন দেশ দিয়ে গেলেন, যিনি একটি স্বাধীন দেশের জন্য নিজের জীবনটা উৎসর্গ করে দিলেন, আমরা আমাদের কর্ম দিয়ে তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি কতটা? নাকি এভাবেই ব্লেম গেম খেলেই নিজেদের কর্তব্য সাধন করে যাব? শহীদদের কাছে কী জবাব হবে আমাদের?

ঠিকানার পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ দেশে-বিদেশে সবাইকে ৫২তম বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।