এরশাদকে নিয়ে চরম অবিশ্বাস

নিজস্ব প্রতিনিধি : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সন্দেহের মধ্যে রেখেই জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকার সম্পর্ক রেখে চলেছে। নির্বাচনের পর ক্ষমতার লোভে এরশাদ বিএনপির সঙ্গে হাত মেলাতেও পারেন এমন সংশয়-শঙ্কা রয়েছে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে। এরশাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রওশন এরশাদের মাধ্যমে বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়াও কিছু কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
এরশাদকে ঘিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই প্রচ- রকম অবিশ্বাস রয়েছে। রাজনীতির এক চরম অবিশ্বস্ত পুরুষ হিসেবে পরিচিতি এরশাদ। তারপরও বড় দুই দলকেই অনন্যোপায় হয়ে এরশাদকে নানা কৌশলে হাতে রাখতে হচ্ছে। মঞ্জুর হত্যা মামলার নির্দেশদাতা হিসেবে আসামি হওয়ার পরও বিএনপি ও এরশাদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা রয়েছে উভয় পক্ষ থেকেই। যে কারণে গত এক বছর যাবৎ বিএনপির কোনো নেতাই এরশাদ ও জাতীয় পার্টির সমালোচনা করে কোনো রকম আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাখছেন না। বিষয়টি সরকারি দলের মধ্যে সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়েছে। এরশাদ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে থাকলেও সরকারের ওপর মহলের শতভাগ বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারেননি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদ যে চরম অবিশ্বস্ততার পরিচয় দেন, ভারত সরকার হস্তক্ষেপ না করলে এরশাদ ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন খাতে বইয়ে দিতেন। আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলের পর এরশাদ শেষ পর্যন্ত কী ভূমিকা নেন, বিশেষ করে তার নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থান নিয়ে সন্দিহান সরকারের নীতিনির্ধারকরা। ক্ষমতালিপ্সু সাবেক এই সামরিক শাসক নিজের স্বার্থে যেকোনো সময়ই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন মর্মেই বিশ্বাস তাদের।
ভারত শেখ হাসিনা ও তার দলের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যদিও প্রকাশ্যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার দেখিয়ে তারা বলছে, বাংলাদেশের জনগণ যাদেরই নির্বাচিত করবে তারা তাদেরই স্বাগত জানাবে এবং দুই দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করবে। নিজেদের স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় দেখতে চায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে অভাবনীয় অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিকসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধাই পেয়েছে। ভারত বাংলাদেশে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান যে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার নিম্নমুখী, সে সম্পর্কে তথ্য রয়েছে নয়াদিল্লির হাতে। কূটনৈতিক মহল মনে করেন, এরশাদের ক্ষমতায় আসা ও ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পেছনেও ভারতের হাত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল সুদূরপ্রসারী। বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করতে এরশাদকে সরকারি দলের পক্ষে রাখার জন্য নয়াদিল্লি বিশেষ উদ্যোগ নেয়। এরশাদকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। মূলত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ‘র’ প্রধানের সঙ্গে সবিস্তারে বর্তমান ও আগামী দিনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও এরশাদকে নির্দেশনা দেওয়াই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। নয়াদিল্লি থেকে ফিরে এরশাদ দলীয় ফোরামে, বাইরেও এ সম্পর্কে মুখ খোলেননি।
বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচন করায় সরকার ১৪ দলের বাইরেও মহাজোটগত নির্বাচন করছে। মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করলেও এরশাদের নির্বাচন-পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত নয় সরকারি মহল। তাদের এ সন্দেহ আরো বেড়েছে ২৭ নভেম্বর অসুস্থতার ‘ভান’ করে এরশাদ সিএমএইচে ভর্তি হওয়ায়। এছাড়া ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করলেও এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা নিজ দলীয় প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এটাও সরকারের চিন্তার কারণ। এর ফলে শেখ হাসিনা ও তার দলের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না জাতীয় পার্টির নির্বাচিত এমপিদের ওপর। নির্বাচনে সরকারি দল তাদের সহযোগীদের নিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী না হলে সরকার গঠনে তারা সমস্যায় পড়বে। বিএনপি যদি ১০০ আসনও পায়, তাহলেও এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ অপর কয়েকটি পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনে বিএনপিরও সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। দুই ক্ষেত্রেই নিয়ামক হবেন এরশাদ। এরশাদ প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হতে আগ্রহী। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে লালিত এই বাসনা পূরণ করা সম্ভব নয় জেনেই তিনি তার দলের সাতজনকে মন্ত্রী করা ও উপপ্রধানমন্ত্রী পদ পেতে চান। অত্যন্ত সম্মানজনক স্পিকার পদে আসীন হওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে এরশাদের। অন্যদিকে বিএনপি এরশাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতেও কুণ্ঠিত হবে না। সরকার গঠন করে নিজে আইনগত সমস্যা থেকে বাঁচা ও নেতা-কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া মামলা, হামলা থেকে রক্ষা পাওয়াই তাদের মুখ্য উদ্দেশ। অন্তত দুই বছরের জন্য সরকারপ্রধানের দায়িত্বে থেকে তিনি উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কিছু দৃষ্টান্ত রেখে যেতে চান। এরশাদ বিএনপির সঙ্গেও হাত মিলাতে পারেন এই সন্দেহে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্যপদে মনোনয়নে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে সরকারি দল সতর্ক থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরশাদ ৭০টি আসন চাইলেও সর্বশেষ খবর অনুযায়ী তাদের ৪৪টি আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব আসনেও একতরফা এরশাদের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এরশাদের পাশাপাশি রওশন এরশাদের কাছ থেকেও পৃথক তালিকা নেওয়া হয়েছে। দুই তালিকা থেকে সমসংখ্যককে ছাড় দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পর এরশাদ যাতে সরকারবিরোধী কোনো অবস্থান নিতে না পারেন, বিএনপির সঙ্গে হাত মিলাতে না পারেন, সে জন্য তার ওপর চাপ রাখতেই এমনি সব কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জীবনসায়াহ্নে এসেও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাজনীতিতে বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে রয়েছেন। আগামীতে সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনায় এরশাদ ও তার জাতীয় পার্টি নিয়ামক হয়ে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এরশাদ ও জাতীয় পার্টির এই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে এরশাদ সমর্থকদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেমনি রয়েছে এরশাদকে ঘিরে যারা ভবিষ্যতের আশায় আছেন, বোঝাপড়াও করেছেন, তাদের মধ্যে আশাভঙ্গের আশঙ্কাও সমভাবে রয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগের কাছে প্রথমে ৮০, পরে ৭০টি আসনে ছাড় চেয়েছেন। সর্বশেষ ৬০টি আসন নিয়ে দর-কষাকষি করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের ৪৪টি আসনে ছাড় দেয়। জাতীয় পার্টি আরো ৪-৫টি আসন পেতে চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে শরিক হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট ১৭টি আসন চেয়েছিল। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী আওয়ামী লীগ পাঁচটি আসনে তাদের ছাড় দিয়েছে। বিকল্পধারার নির্বাচনী প্রতীক কুলা। তারা বৃহত্তর স্বার্থে নৌকা প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করতে রাজি হওয়ায় তাদের এই ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। গত ২৭ নভেম্বর সকালে মহাজোট ও যুক্তফ্রন্ট নেতারা আসন বণ্টন নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেই জাপাকে ৪৪টি আর বিকল্পধারাকে ৫টি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা গেছে।
দশম সংসদ নির্বাচনের আগে এরশাদের নাটকীয় আচরণ সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল। প্রতিবেশী ভারতের হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় রক্ষা হলেও দেশে-বিদেশে এরশাদকে নিয়ে সংশয়, সন্দেহ কাটেনি। এবারও একই আলামত স্পষ্ট। ২৭ নভেম্বর অসুস্থ হয়ে সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গুঞ্জন রয়েছে চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে যেতে পারেন। এরশাদের এমন কাণ্ডে তার ওপর সরকারের সন্দেহ আরো বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত এরশাদ কী করবেন, সেটা দেখার বিষয়।
১৪ দলের শরিকরা রাজনৈতিক কিছু আদর্শিক কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি-নির্বাচন করছে। এরশাদের ক্ষেত্রে তা নয়। তিনি ক্ষমতায় যেতে, ক্ষমতার অংশীদার হতে চান। আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও ১৪ দলের কয়েক শরিককে সরকারে নিয়ে এবং অন্যদের অন্যভাবে ক্ষমতার অংশীদারত্ব দেবে। এরশাদের চাওয়া বেশি-কমপক্ষে সাতটি মন্ত্রিত্বের পদ। এরশাদ সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পেতেও আগ্রহী। তার এই একান্ত আগ্রহের কথা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এরশাদের শেষ বয়সে স্পিকারের পদটি যথার্থ সম্মানজনক বলে সরকারি মহলের অনেকে মনে করেন। এরশাদের চাওয়া-পাওয়া এতে সীমিত থাকবে কি না তা নিয়েও সন্দিহান অনেকেই।
এদিকে বিএনপিও এরশাদকে হাতে রাখার কৌশল নিয়ে চলছে। গত এক বছরে তারা ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, আইনগত কোনো বিষয়ে এরশাদকে বিব্রত, অসন্তুষ্ট করতে পারে এমন কোনো বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্টরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার যোগাযোগ, কথাবার্তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। নির্বাচনী ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে এরশাদের গুরুত্ব। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে এরশাদের ওপর নির্ভরতা, তাকে নিয়ে তাদের সংশয় অনেকটা কেটে যাবে। সরকারে তাদের নেওয়া হলেও এরশাদ দর-কষাকষির অবস্থায় থাকবেন না। ফলাফল এর বিপরীত হলে অর্থাৎ একদিকে আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও মহাজোট অপরদিকে বিএনপি তার ঐক্যজোট সরকার গঠনের মতো আসন না পেলে এরশাদই হবেন নিয়ামক। স্পিকার অথবা দুই বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদটি হবে তার প্রধান লক্ষ্য।