ঐক্যফ্রন্টের গণতন্ত্র ও জাতীয় নির্বাচন

ড. মিজানুর রহমান

প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাষ্ট্রের মালিক জনগণ তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন ভোটের মাধ্যমে। এই নির্বাচনের গণতান্ত্রিকতা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনেক বিতর্ক আছে- আসলেই কি জনগণের ইচ্ছার প্রতিপালন ঘটে এরূপ নির্বাচনের মাধ্যমে, নাকি লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তির মধ্যে সত্য লুকিয়ে আছে, যখন তিনি বলেন : বুর্জোয়া গণতন্ত্র হচ্ছে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর জনগণের নির্ধারণ করার সেই ক্ষমতা, যে আগামী পাঁচ বছর তারা কার দ্বারা শোষিত হবে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, আমাদের দেশে ইশতেহারনির্ভর নির্বাচন হয় না; যদিও ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে সেই দল-জোটের রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্ববীক্ষণ সম্পর্কে মোটাদাগে ধারণা পাওয়া যায়।
প্রথমেই ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার সম্পর্কে বলি। জনগণ, বিশেষ করে ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য যা যা বলা প্রয়োজন, তার কোনো ঘাটতি নেই এই দলিলে। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। উৎসাহব্যঞ্জক, তবে প্রশ্ন জাগে, কার দ্বারা কার বিচার করবে? যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়স্থল ও অভয়ারণ্য যে রাজনৈতিক দল, তাদেরকে বুকে ধারণ করে, একই ধানের শীষের আভরণে উভয়ই আচ্ছাদিত হয়ে কীভাবে সম্ভব হবে তাদের বিচার? এটি যে বাস্তবে সম্ভব নয়, তা আবার প্রমাণিত হলো বিএনপির ইশতেহারে এ প্রসঙ্গে কোনো কিছু উল্লেখ না করার মাধ্যমে। অবশ্য এর মাধ্যমে আবার একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল, শুধু নির্বাচনের খাতিরে বিএনপির দরকার ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের, নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্ট হয়ে পড়বে উদ্বৃত্ত ও অপ্রাসঙ্গিক; যা শুরু আরও বেশি ভয়ঙ্কর। ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীকে পুনর্বাসন করা হলো রাজনীতিতে। যে দলটি ইতোমধ্যেই হয়েছিল জনধিক্কৃত, প্রত্যাখ্যাত, অপরাধী হিসেবে পরিচিত, একদা মুক্তিযোদ্ধাছিলাম খ্যাত কয়েকজন ব্যক্তির সান্নিধ্যে ও সমর্থনে তারা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার একটা সুযোগ পেল- এরূপ ঘৃণ্য ঐতিহাসিক দায় ঐক্যফ্রন্টের একদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম- বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলাম গোষ্ঠী কোনোটাই এড়াতে পারে না।
ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় বটে; তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তারা কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন প্রসঙ্গগুলোকে ব্যবহার করে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। শুধু তাই নয়, তরুণ সমাজের সেøাগান ব্যবহার করে ইশতেহারে উল্লেখ করা হলো যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামত করা হবে উত্তম প্রস্তাব। তবে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবেন কি-ক. রাষ্ট্রযন্ত্র তো ভেঙে ফেলা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, জাতির পিতা ও তার স্বপ্নকে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে। এত বছর লাগল বোধোদয়ের জন্য? একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই উপলব্ধি কি কাকতালীয়, না দুরভিসন্ধিমূলক? খ. কারা করবে এই মেরামত? যারা এটি ভেঙে ফেলেছিল তারাই? সেটা কোন ধরনের মেরামত হবে? গ. চাকরির বয়সসীমা রাখা হবে না কার স্বার্থে? তরুণদের স্বার্থে নাকি জামায়াত-বিএনপির প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টের স্বার্থে? তাহলে দাঁড়াল কী? ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার কি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য নাকি বাস্তবতাবিবর্জিত, মিথ্যা অঙ্গীকারের দলিল?
পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে তা মোটা দাগে দুটি অংশে বিভক্ত করা যায়- ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত ও অর্জিত উন্নয়ন কর্মকা-ের তালিকা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কর্মকা-ের রূপরেখা। আমার কাছে এই ইশতেহারের যে দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে প্রশংসনীয় মনে হয়েছে তা হলো- ক. অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার বিকাশ ও দৃঢ় করার অঙ্গীকার। এ ক্ষেত্রে সরকার কল্যাণকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ও তার ভূমিকা অধিক বিস্তৃত করার প্রতিজ্ঞা করেছে। আমরা প্রকৃত অর্থে সন্তুষ্ট হতে পারতাম, যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধাগুলো জনগণ ভোগ করতে পারত রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত কল্যাণকর কর্মকা- হিসেবে নয় বরং জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার হিসেবে। তথাপি, ঝঃধঃব ংঢ়ড়হংড়ৎবফ পযধৎরঃু হিসেবে যদি সাধারণ মানুষ এই সুযোগ-সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারে, তাইবা কম কিসে? খ. অতীত ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ। আমার কাছে মনে হয়, ভুল-ত্রুটি যে হয়েছে, তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে শেখ হাসিনা একজন সত্যিকার মহান রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় দিয়েছেন- তিনি ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন; কিন্তু তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি তার মাহাত্ম্যের পরিচয় দিয়েছেন। যেহেতু তিনি অতীত ভুল স্বীকার করেছেন, আস্থা রাখতে পারি যে, এসব ত্রুটির পুনরাবৃত্তি হবে না- যেখানে যেখানে সুশাসনের ঘাটতি ছিল, তা শোধরাবার কার্যকর ব্যবস্থা তিনি নেবেন, যদি তিনি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারেন।
এক দিকে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত রাজনৈতিক দল ও খুনি, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের (যতই তারা একদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম গোষ্ঠীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করুক না কেন) বাস্তবতা-বিবর্জিত মিথ্যা আশ্বাস ও কল্পনাবিলাস আর অন্য দিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য প্রদানকারী পরীক্ষিত দল ও ব্যক্তিবর্গ, শুধু আশ্বাসবাণী নয়, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক, মানবসৃষ্ট অনেক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে অর্জিত উন্নয়নের দৃশ্যমান ফল ও এই প্রক্রিয়ায় ঘটে যাওয়া অতীত ভুল স্বীকার করে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানানোর মতো মানসিকতাসম্পন্ন নেতৃত্বে পরিচালিত দল ও জোট- কোনদিকে যাব আমি? আমি মনে করি না যে, প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জটিল কোনো ব্যাপার। বাংলাদেশের প্রকৃত সন্তান কি কখনও পেরেছে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে? বঙ্গসন্তান কি পারবে সহ্য করতে যে, ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তিতে মুক্তিযোদ্ধার রক্তে রাঙানো লাল-সবুজ পতাকা ধরে থাকবে একটি দেহ, যার অন্তরে বাস করে রাজাকার-মন?
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ