ওবায়দুল কাদেরের দিল্লি সফর এবং বিএনপির শ্লোগান?

শিতাংশু গুহ

তসলিমা নাসরীন, উইমেন চ্যাপ্টারের সুপ্রীতি ধর, সুচিস্মিতা সীমন্তি ও লিনা হকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। অভিযোগ, ইসলামের অবমাননা। আদালত পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের মন্ত্রী রাজ্ সিংহাসনে বসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কয়েকজন কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ছবিটি দেখে ভালো লাগলো। মনে হচ্ছিলো, রাজাধিরাজ সুলতান কামাল সুলেমান। কিছুদিন আগে একজন চেয়ারম্যান জনতাকে শুইয়ে দিয়ে ব্রিজ বানিয়ে এর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন দেখে মানুষ অযথা হৈচৈ করেছিলো? তবে ৫৭ ধারা পুলিশের কাজ বাড়িয়েছে এবং এটি এখন ব্লাসফেমির মত ব্যবহৃত হচ্ছে? শুনেছিলাম ৫৭ ধারা থাকছে না, ৫৭ নাকি ২৮ হচ্ছে? সাংবাদিকরা একটু হৈচৈ করেছিলো, তারপর কি হলো কে জানে? তবে ৫৭ ধারা বহাল আছে তা বোঝা যায়, যদিও হৈচৈ নাই?
এখন বরং হৈচৈ চলছে ধর্ষণ নিয়ে। বাংলাদেশ ও ভারত দু দেশে এখন ধর্ষণ আলোচিত বিষয়। আলোচনা হওয়া ভালো। সর্বত্র ঝড় উঠলে প্রতিকারের রাস্তাটা উন্মুক্ত হয়। জম্মুতে শিশু আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে ভারত তোলপাড় হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ত্বরিত আইন সংস্কার। ভারতে ১২ বছর পর্যন্ত শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড আইন পাশ হয়েছে। তাও একটু ফাঁক রয়ে গেলো। ধর্ষণের শান্তি মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত ছিলো। তসলিমা নাসরিন এক টুইট লিখেছেন, “পৃথিবীতে ধর্ষকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ধর্ষকের সমর্থকের সংখ্যাও নগণ্য। বেশিরভাগ মানুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে। এটি আশার কথা”।
নিরাশার কথা হচ্ছে, যখন একজন ধর্ষককে তার সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়? ধর্ষকের পরিচয় শুধু ধর্ষক, তার অন্য পরিচয় থাকতে পারেনা? আমরা খুব বড় গলায় বলে থাকি, সন্ত্রাসের কোন ধর্ম নাই, কিন্তু সেই আমরাই আবার ধর্ষক বা ধর্ষিতার ধর্ম খুঁজে বেড়াই এবং সেই মোতাবেক তৎপর হই। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই তৎপরতায় কখনো-সখনো আমরা ধর্ষকের পক্ষ নেই এবং এর ফলে শারীরিকভাবে ধর্ষিতা আর একবার সামাজিকভাবে ধর্ষিত বা লাঞ্চিত হন? ধর্ষিতাকে নয়, ধর্ষক-কে ঘৃণা করুন, বয়কট করুন। ধর্ষক কারো, ভাই, বন্ধু হতে পারেনা। ধর্ষকের একমাত্র পরিচয়, ‘তুই ধর্ষক’। নরকের কীট।
২০০১-এ বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার হয়, একথা সবার জানা। তখন প্রচুর ধর্ষণ হয়। দৈনিক জনকণ্ঠ তখন হেডিং করেছিলো, এক রাতে এক জায়গায় দুইশ’ রমণী ধর্ষিতা। নিউইয়র্কে তখন একাধিক প্রতিবাদ সভা হয়। এক সভায় একজন বক্তা যথেষ্ট জোরালো ভাষণ দিচ্ছিলেন। রাগত কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, দাঁতের বদলে দাঁত, খুনের বদলে খুন, ধর্ষণের বদলে ধর্ষণ? ঠিক এই জায়গায় বক্তা থেমে যান এবং বলেন, ‘না, ওটা পারবো না’? বিষয়টি সেখানেই, ধর্ষণ সবাই করতে পারেনা। ধর্ষণ যারা করে, তারা মানুষের মত দেখতে হলেও, আসলে ‘জানোয়ার’। আর জানোয়ারের জায়গা জেলখানা। ধর্ষক লোকালয়ে থাকতে পারেনা। বাংলাদেশেও ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড হউক।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সদলবলে দিল্লি­ গেছেন। মোদির সাথে তার হাস্যোজ্জ্বল ছবি মিডিয়ায় এসেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ওবায়দুল কাদেরের সফর সফল। এর আগে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মোদির সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়েছে। লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনের ওই বৈঠক সফল ও অর্থবহ। নির্বাচনী বছরে এর প্রভাব ব্যাপক। এর মধ্যে অযথা তারেক রহমানকে নিয়ে টানাটানি দৃষ্টিকটু। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সময় তারেক-কে এতটা গুরুত্ব না দিলেও চলতো? তিনি পাসপোর্ট জমা দিলেই কি বা না দিলেই কি? তবে লন্ডনে তার অবস্থান নড়বড়ে হলে তিনি তুরস্ক চলে যাবেন। এদরগান তো তাকে আগেভাগে আমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছেন। সামাজিক মাধ্যমে একজন প্রশ্ন করেছেন, সরকার যখন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশ থেকে ফেরত আনতে পারছেন না, তখন তারেককে ফিরিয়ে আনবেন এর নিশ্চিয়তা কোথায়?
শেখ হাসিনা যখন লন্ডনে তখন ইউকে বিএনপি একটি বিক্ষোভ মিছিল করে। এটা সংবাদ নয়, কারণ আমাদের এই ঘুণেধরা ট্র্যাডিশন বহুদিন ধরে চলছে। আমেরিকাতেও তাই হয়? খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেও হয়েছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলেও হচ্ছে। মনে হয় আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্ম বিদায় না হওয়া পর্যন্ত এটি চলতে থাকবে। এদেশে জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম হয়তো এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। লন্ডনে বিএনপির বিক্ষোভ আমার লেখার বিষয় নয়, বিক্ষোভে একটি শ্লোগান সামাজিক মাধ্যমে বেশ সমালোচিত হচ্ছে। শ্লোগানটি হচ্ছে, “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ হাসিনার বাপের নাম”। বিএনপি কাজটি ভালো করেনি। এনিয়ে এখনো বিএনপি দুঃখ প্রকাশ করেনি। করা উচিত। বিএনপির উচিত দেয়ালের লেখা পড়া।
নিউইয়র্ক।