ওরা মরে না

লাবলু কাজী :

আমাদের গ্রামের মুরব্বিরা অনেকে হয়তো নেই। দিন যায় কথা থাকে, স্মৃতিরা দোয়েল পাখির মতো ঘোরে, নেচে নেচে মনের বাসায় জায়গা করে। ধলা ভাইয়ের ছেলে এসি মানিক আমায় ফোন করেছিল। ওর বাবা ধলা ভাইয়ের চোখ, হাসি আমার এখনো মনে পড়ে। চোখের সামনে যেন পক্ষী নাচে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, ওনিও তার ব্যত্যয় নন। এই সরল-সোজা মানুষগুলো কত সরল-সোজা, কথা না বললে বোঝা যাবে না।

গ্রামের আদু ভাই আজ আর নেই। কিন্তু তার কথা, তার জীবন-সংগ্রাম, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সহনীয়তা আমায় আজও আকৃষ্ট করে এই খেটে খাওয়া মানুষটির প্রতি।
আবুল, কাসেম কাকা যমজ এই ভাইদ্বয়ের ব্যবহার, ভালোবাসায় কে না সিক্ত হয়েছেন। আমার ফিরু ফুপু আর নেই। কিন্তু কোনো দিন বাবা ছাড়া ডাকেননি। এক আত্মীয়ের বিয়েতে তার গায়ে হলুদের পরিবর্তে ধানাই মরিচ মেখে দেওয়ার পর এত জ্বলনের পরও টুঁ শব্দটি করেননি। উপরন্তু মা বকলে তাকে বারণ করেছেন এই বলে, ও বাচ্চামানুষ, এখনো বোঝে না। ভাবুন, এখন হলে কেমন হতো?

ডা. ঈমান আলী খন্দকার আমার আত্মীয়। বাজার থেকে আসার পথে বেশির ভাগ সময় খালুইতে দেখতাম শাক। বেশি মুলা শাক। এত শাক কেন পছন্দ করেন? উত্তরে বলতেন, মুলা শাক মল বৃদ্ধি করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি কত সত্য তার ধারণা।

ওলি কাকা রেলে চাকরি করতেন। গ্রামের মায়ায়, ভালোবাসার টানে চাকরি ছেড়ে মুদি দোকান খুলে বসলেন। ভালো চলেছে কি না জানা নেই। তবে অনেক বছর ব্যবসা করতে দেখেছি। গ্রামের মানুষের আরো কাছে যেতে ইউনিয়নের মেম্বার পদপ্রার্থী হয়ে পাস করে অনেক দিন জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তার অকালপ্রয়াণ সবাইকে কাঁদিয়েছে।

ভোরে ফজরের নামাজ ওয়াক্তমতো পড়া বড়ই কষ্টের। অনেকে আলস্য দোষে উঠতে পারেন না। খোরশেদ দেওয়ান দাদার মাইকে ঘোষণা, ‘তোমরা ওঠো, জাগোÑঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।’ তার কথা ও আল্লাহর জন্য ডাক দেওয়া-এর চেয়ে ভালো কাজ আর কী হতে পারে। তাই মনে পড়ে বারবার স্মরিয়া স্মরিয়া।

এই সব দিনরাত্রির আপনজনেরা আর নেই। কিন্তু তাদের জীবন-ছন্দ, জীবন-আজ্ঞা, জীবন-ভরসা আমায় সামনে চলার ভরসা জোগায়। ট্রেনের হুইসেলের মতো আমার কর্ণকুহরে বলে যায়, তুমি ভালো থেকো, আমাদের স্মরিও ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা…!’

কাছারিঘাট বাজারের পাকা ব্রিজ পার হলে ল্যান্ডিং স্টেপ আউলিয়াবাদ গ্রাম, বারো আউলিয়ার নিবাস। হালটের দুই পাশে বাহির বাড়ির নজর কাড়ে পাকা কবর। আগে গ্রামের গোরস্তান না থাকায় বাড়িতেই কবরস্থ করা হতো। এখন গোরস্তান হয়েছে, সেখানেই মাটি দেওয়া হয়। এই হালটেরই তিনটা বাড়ির পর কাজীবাড়ি, যেখানে আমার বাবা, মা ও হেনাবুবুর কবর। আমার বাবা কাজী আবদুল মোতালেব।

মানুষ বলে, খুবই নিরীহ ও ফাইন জেন্টেলম্যান ছিলেন। মুখে সব সময় বাঁকা চাঁদের হাসি লেগেই থাকত। কেউ তার থেকে মনে কষ্ট পেয়েছেন বলে শুনিনি। আমার বড় ভাই কাজী বাবুলের বড়ই ইচ্ছে ছিল তার কবর যেন বাবা-মায়ের পাশে হয়। করোনার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। আমার মা সব সময় বলতেন, ‘বাবা, যেদিন যায় ভালো যায়, এই দিন দিন না আরো দিন আছে।’ মা, আমি তোমাদের হারিয়ে সেই ভরসায় বেঁচে আছি। দেখি আমার রব আমার লা’মাফুজে আমার রিজিক কোথায় রেখেছেন।

-নিউইয়র্ক, ২২ অক্টোবর ২০২২