ওয়ান প্ল্যানেট সামিট

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ওয়ান প্ল্যানেট সামিটে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অভিন্ন প্রচেষ্টা নির্ধারণের লক্ষ্য এগিয়ে নিতে সরকারী-বেসরকারী অর্থায়নের কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য অনুষ্ঠিত হয় এই সম্মেলন। ২০১৫ সালে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ঐকমত্যে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছরের মাথায় বৈশ্বিক তহবিলের বর্তমান অবস্থা এবং তা বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্যে উন্নত দেশগুলোর দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের তাগিদ দিয়ে শেষ হয় এই সম্মেলন। অবশ্য এ বিষয়ে খুবই কম আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া গেছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছেন। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশও কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে অবলম্বন করছে ধীরগতি। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এতে যোগ করছে বাড়তি ঝুঁকি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের অনেক পাহাড়-টিলা-বনাঞ্চল ইতোমধ্যেই প্রায় সাফ ও সমতলে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামে গত কয়েক বছর ধরে অতিবৃষ্টি ও অস্বাভাবিক জোয়ারের সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব ব্যাংকের ৪৫০ কোটি ডলারের তহবিল গঠনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। উল্লেখ্য, নগর ও স্থানীয় সরকারের একটি বৈশ্বিক জোটের সঙ্গে মিলে সর্ববৃহৎ এই ঋণদাতা সংস্থাটি সাগর পৃষ্ঠের বাড়ন্ত উচ্চতা থেকে সুরক্ষায় ১৫০টি উন্নয়নশীল শহরের যথাযথ অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা দেবে। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামও। এটি একটি আশাব্যঞ্জক খবর বৈকি।
গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ নানাভাবে নানা উপায়ে ক্রমাগত ধ্বংস করে চলেছে প্রকৃতিকে। সেটা বর্তমানে এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, প্রকৃতিও বিরূপ হয়ে ফুঁসে উঠেছে। দেখা দিয়েছে রুদ্ররূপে। আশার কথা এই যে, বিলম্বে হলেও বোধোদয় ঘটেছে মানুষের। অতঃপর ধরিত্রীকে রক্ষার অনিবার্য প্রয়োজনে সর্বস্তরে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক ধরিত্রী সম্মেলন।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০১৫ সালের ৩০ নবেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। এতে যোগ দেন ১৯৫টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এবং জলবায়ু ও আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও দর কষাকষির পর শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তিতে উপনীত হতে সক্ষম হয় যোগদানকৃত চুক্তি অনুসারে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখতে সম্মত হয়েছে দেশগুলো। এও বলা হয়েছে যে, সবার চেষ্টা থাকবে যাতে এটি দেড় শতাংশের নিচে রাখা যায়। তবে এ বিষয়ে উন্নত দেশগুলোর সুস্পষ্ট কোন অঙ্গীকার নেই। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই এই চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের মতে প্যারিস চুক্তিতে নানা ধরনের ঘাটতি রয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জলবায়ু অর্থায়নের জন্য ১০ হাজার কোটি ডলারের যে তহবিলের কথা বলা হয়েছে তা খুবই কম। কেননা, এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হলে প্রতিবছর রাষ্ট্রগুলোকে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান হবে কোথা থেকে? যুক্তরাষ্ট্র এতে না থাকায় অর্থ সঙ্কট আরও বাড়বে।
প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং একটি সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য ইতিবাচক। সার্বিকভাবে চুক্তিটিতে জলবায়ু তহবিলে অর্থায়নের বিষয়টি অস্পষ্ট থাকলেও এবং কিছু বিষয় দুর্বলভাবে উপস্থাপিত হলেও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনমত ও সচেতনতা সৃষ্টিতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে বিশ্বের ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানদের বোধোদয়সহ দায়িত্বশীল ভূমিকা এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রত্যাশিত