কক্সবাজারে উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্কে স্থানীয়রা

কক্সবাজার : কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উখিয়া ডিগ্রি কলেজ। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মারাত্মক ফল বিপর্যয় ঘটেছে কলেজটিতে। এই কলেজ থেকে ৫৬৩ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৫৪ জন। কেউ জিপিএ ৫ পাননি। পাসের হার মাত্র ২৭ শতাংশ। উপজেলার অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা কলেজে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৪৭৮ জন। পাস করেছেন ২১০ জন। বিপর্যয়কর এই ফলের জন্য দায়ী করা হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকটকে। কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, গত দুই বছরে কলেজে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। রোহিঙ্গা সংকটের জন্য উখিয়া কলেজে স্থাপন করা হয়েছে ত্রাণ বিতরণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। সম্প্রতি তা সরিয়ে নেওয়া হলেও ক্ষতি যা হয়েছে তা কোনোভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, উখিয়া ও টেকনাফের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বেড়েছে। শিক্ষকদের বড় একটি অংশ চাকরি নিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তিনি বলেন, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভারে বিপর্যস্ত এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অঙ্কে মেলানো যাবে না।

কক্সবাজার বন বিভাগের হিসাব মতে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য সাড়ে ছয় হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। সম্পদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা অকল্পনীয়। পাহাড় কাটায় বদলে গেছে ভূমির প্রকৃতি।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে প্রতিদিন বৃক্ষনিধন হচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে এলাকার সবুজ প্রকৃতি। ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাস ও যাবতীয় কর্মকা-ে প্রভাব পড়েছে আশপাশের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কৃষি ভূমি। এভাবে চলতে থাকলে একসময় মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এই এলাকা।

স্থানীয়দের অভিমত, রোহিঙ্গা সংকট যতই বিলম্বিত হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। রোহিঙ্গাদের কারণে বদলে যাচ্ছে স্থানীয়দের জীবনধারা; বদলে যাচ্ছে কক্সবাজার জেলার আর্থসামজিক অবস্থা। বিপুল রোহিঙ্গার ভারে উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের আগমনে কক্সবাজারের পানি, বায়ু ও শব্দদূষণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি মাসে রোহিঙ্গারা বন থেকে প্রায় সাত হাজার টন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য ঘর তৈরিতে প্রয়োজন হচ্ছে অন্তত ৬০টি বাঁশ। ক্যাম্পে হাজারো টিউবওয়েল স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। রোহিঙ্গাদের ফেলে দেওয়া পলিথিন সামগ্রী ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা বসতি : উখিয়া উপজেলার কুতুপালং থেকে দক্ষিণে থাইংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। এখানে বন বিভাগের পাহাড়-টিলা-সমতল ভূমি সব দখল করে নিয়েছে রোহিঙ্গারা। বৃক্ষহীন ন্যাড়া পাহাড়ে দেড় লাখের মতো ঘর উঠেছে। ফলে এলাকায় মারাত্মক ভূমি ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক কর্মকর্তা বলেছেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় এখানে দুই লাখ রোহিঙ্গাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শাহনাজ বেগম বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ভূমি দখল হচ্ছে। ক্যাম্প সম্প্রসারণ করে সম্প্রতি ৫০০ নতুন শেড তৈরি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেনÑ এভাবে কি পুরো এলাকা রোহিঙ্গাদের দখলে চলে যাবে?