কঠোর অবস্থানে শেখ হাসিনা

ফরিদপুর মডেলে শুদ্ধি অভিযান সারাদেশে!

ঢাকা অফিস : বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে রাহুমুক্ত করতে দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ব্যাপারে তিনি একেবারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ফরিদপুর শহরে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা একটি বার্তা স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, যারা দলের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করছে, দলের বদনাম করছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক না হোক, আইনগত ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং তারা যে অপরাধগুলো করেছে, সেসবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফরিদপুর মডেলের মাধ্যমে তিনি এই নতুন শুদ্ধি অভিযান পদ্ধতি চালু করলেন। এই পদ্ধতি সারা দেশে প্রয়োগ করতে চান প্রধানমন্ত্রী। ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের যে নেতৃবৃন্দ, যারা প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন যাবৎ দাপিয়ে বেড়িয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
জানা গেছে, এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে যথাযথভাবে আইন প্রয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে যারা বিতর্কিত ছিল, যারা দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ফরিদপুরে অ্যাকশনের ব্যাপারে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা কেউ কিছু জানতেন না, শেখ হাসিনা এককভাবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে তিনি এই শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ফরিদপুর মডেল সারা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছে যে সব অপরাধীর বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফরিদপুরের মানুষ এই অ্যাকশনে অত্যন্ত খুশি এবং তারা মনে করছেন, শেখ হাসিনার দৃষ্টি সবদিকেই নিবদ্ধ আছে। আর এ কারণেই ফরিদপুরের মডেলের আদলে সারা দেশে শুদ্ধি অভিযান করা হবে। কারণ দুই বছর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় আট হাজার অপকর্মকারী এবং দলের ভেতর অনুপ্রবেশকারীর তালিকা তুলে দিয়েছিলেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের হাতে। কিন্তু দলের সাংগঠনিক সম্পাদকেরা এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি, বরং এদের মধ্যে অনেকেই এই সময়ে আরো প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। এই সময়ে পাপিয়া-সাহেদরা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে আওয়ামী লীগকে সমালোচিত করেছে এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন সাংগঠনিক পথে যাচ্ছেন না, তিনি যাচ্ছেন আইনের পথে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের তথাকথিত গডফাদার বা সন্ত্রাসীরা প্রশাসনকে কবজা করে সবকিছু করছেন-সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কঠিন বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে। ফরিদপুরের মতো অন্তত ১২টি জেলায় এমন কিছু মুষ্টিমেয় ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী রয়েছে, যারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতায় নানান ধরনের অপকর্ম করছে এবং তারা কখনোই আওয়ামী লীগে ছিলেন না। ফরিদপুরের আদলে খুব শিগগিরই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি জেলায় একই রকম অ্যাকশন শুরু হবে এবং সেখানেও সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের একজন নেতা, যিনি সম্প্রতি বিদেশে আছেন, তার জেলাতে পরবর্তী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সেখানেও ওই নেতার নাম ভাঙিয়ে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি শহরে রাজত্ব কায়েম করেছে। তারা টেন্ডার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের একটি জেলাতেও একই রকম অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সেখানেও কয়েকজন নেতার ছত্রচ্ছায়ায় দলে হাইব্রিডদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। জামায়াত-শিবির ঢুকে দলের বদনাম করছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, শেখ হাসিনার অ্যাকশনের ব্যাপারটি সুস্পষ্ট। যারা অপরাধী, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, প্রশাসনকে সঠিকভাবে কাজ করতে দিচ্ছে না, টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত-তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তারা যেন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে কোনো সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে না পারে, দলীয় নেতারা তাদের প্রতি কোনোরকম অনুকম্পা যেন না দেখান এবং তারা যেন পালিয়ে যেতে না পারে এ জন্য এসব অভিযান পরিচালিত করা হবে খুবই গোপনে। যেমনটা ফরিদপুরে করা হয়েছিল।
ফরিদপুরে অভিযান শুরুর আগে সেখানকার স্থানীয় নেতারাও এ সম্পর্কে জানতেন না। ঠিক তেমনিভাবে অন্যান্য জেলায় তালিকা অনুযায়ী যারা টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি করছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং আইনের আওতায় এলে তারা সাংগঠনিকভাবে এমনিতেই বাদ পড়ে যাবে। এতে দলের ইমেজ বাড়বে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকেরা।