কঠোর মনোভাবই অভিবাসী মৃত্যুর মূল কারণ

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

চলতি গ্রীষ্মে হাজার হাজার অভিবাসী ও শরণার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে। যাঁরা মনে করেন, এ ধরনের বিষয় মনে করিয়ে দেয়ার দরকার আছে, তাঁদের সেটিই স্মরণ করিয়ে দিল চ্যানেলটির ফরাসি অংশ ক্যালেইসের সৈকতে পড়ে থাকা সুদানি যুবকের লাশ। কী বেদনায়ক ঘটনা! সম্প্রতি একটি ডিঙি নৌকায় চড়ে এবং তাতে বৈঠার পরিবর্তে বেলচা ব্যবহার করে ইংল্যান্ডে পৌঁছার চেষ্টা করতে গিয়ে আব্দুল ফাতাহ হামদাল্লাহ নামের ওই যুবকের মৃত্যু হয়।
যখন জানা গেল, এই ঘটনায় কোনো মানবপাচারকারীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি, তখন বিয়োগান্ত ঘটনাটি আরেকটি দিক প্রকাশ করে দিল। সেটি হচ্ছে মন্ত্রীদের নেয়া পদক্ষেপগুলো কতটা অপর্যাপ্ত এবং মিথ্যায় ভরা। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নিজেদের পরিবর্তে অন্যদের দোষারোপের যে বেপরোয়া মনোভাব, পাচারকারীদের ভূমিকা এবং ফ্রান্সের ব্যর্থতা (আশ্রয় দিতে অস্বীকার) নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপের মধ্য দিয়ে সেটিই খুঁজে পাওয়া গেল।
ভূমধ্যসাগারের লিবিয়া উপকূলে পাঁচ শিশুসহ ৪৫ জনের মৃত্যুর খবরে সম্প্রতি জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে এটিই চলতি বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এ ছাড়া ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে আরেকটি নৌকায় ১০ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, ওই সব মানুষ কী ভয়ানক বিপদ মোকাবেলা করছে যে তারা নিজের ও সন্তানদের উন্নত জীবনের জন্য নিজেদের বাড়িঘর ও দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। নিজ দেশে বিপদের শিকার এসব মানুষের দেশের তালিকা দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই সংকট নির্দিষ্ট কিছু দেশের নয়, বরং এর মাত্রা বৈশ্বিক। লিবিয়া উপকূলে বেঁচে যাওয়া লোকদের কাছ থেকে জানা গেছে, তারা সেনেগাল, মালি, চাদ ও ঘানা থেকে এসেছে। আবার সম্প্রতি ইংল্যান্ডের কেন্ট কাউন্টিতে আসা অভিবাসীদের পরিচয় থেকে জানা গেছে, তারা ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, মিসর ও সিরিয়া থেকে এসেছে।
এটি সুস্পষ্ট যে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলা এই বহুমুখী সংকটের কোনো একক সমাধান নেই। এই বহুমুখী সংকটের একটিমাত্র অংশ হচ্ছে, লাখ লাখ মানুষ নিজেদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এখন এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে এমন একটি কৌশল বের করা দরকার, যাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একযোগে কাজ করে। আরো স্পষ্ট করে বললে, অভিবাসন সমস্যার সমাধান করতে হলে জনগণের জীবনমান উন্নত করার, দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করার দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং দেশগুলোতে চলমান সংঘাত দূর করতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসন এবং শরণার্থীদের অধিকারের প্রতি একটি সম্মিলিত মনোভাবও গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য সরকারকে যা অবশ্যই করতে হবে, সেটি হচ্ছে জরুরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশ্রয়প্রার্থীদের (অ্যাসাইলাম সিকার) থাকার জন্য একটি নিরাপদ ও বৈধ উপায় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যখন ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের চলমান ঢেউকে ‘বিপজ্জনক ও অপরাধ তৎপরতা’ বলে নিন্দা জানান কোনো ধরনের বিকল্প প্রস্তাব না দিয়েই, তখন এটি সব দিক থেকেই ভুল বলে পর্যবসিত হয়।
একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৪৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশ ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া অভিবাসীদের প্রতি খুব সামান্যই সহানুভূতি পোষণ করে কিংবা একেবারেই করে না। এই ফলাফল এক উদ্বেগজনক আভাস দিচ্ছে যে মানুষের হৃদয় কত শক্ত হয়ে গেছে। তবে একটি জরিপকে কখনোই অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া ঠিক হবে না। কারণ অভিবাসীদের নিয়ে ছড়ানো কল্পকাহিনি বদ্ধমূল ধারণা, সেটিও মনে রাখতে হবে। অভিবাসীদের প্রতি এই কঠোর মনোভাব অংশত, বেপরোয়া অভিবাসনবিরোধী উসকানিমূলক রাজনীতিরই ফল। কারণ কয়েক বছর ধরে ভোটার টানার কৌশল হিসেবে এই রাজনীতিই করা হচ্ছে। কিন্তু এতে অনেক মানুষের মধ্যে যুক্তরাজ্যের একটি বিভ্রান্তিমূলক ভাবমূর্তি জট পাকিয়ে যাচ্ছে। অথচ ভুলে গেলে চলবে না যে একটি ছোট্ট দ্বীপদেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য একটি বৈশ্বিক শক্তিও।
গত বছর যুক্তরাজ্য যখন ৪৪ হাজার ২৫০টি শরণার্থী আবেদন নিবন্ধন করেছে, তখন জার্মানি এর প্রায় তিন গুণ, এক লাখ ৪২ হাজার ৪৫০টি আবেদন গ্রহণ করেছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে শরণার্থীদের আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করা আমাদের প্রতিবেশীরা (ফ্রান্স) ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে। সর্বোপরি একটি আশঙ্কা আরো উদ্বেগজনক ঠেকছে যে, ব্রেক্সিটের জাতীয়তাবাদী হুংকারের কারণে যুক্তরাজ্য সরকার তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার দৃষ্টি এবং মানবিক শিষ্টাচার হারিয়ে ফেলেছে।
সূত্র : সম্পাদকীয়, গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)।