কথায় কথা বাড়ে, সম্পর্কে ধরে চিড়

মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের : ‘ভারতের সঙ্গে রক্তের, চীনের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক’….‘কোনোভাবেই এ সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার নয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা রক্তের সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। আমাদের বিজয়, ভারতের বিজয়। আমাদের উন্নয়ন, ভারতের উন্নয়ন।’ বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগস্ট ০৮, ২০২০ তারিখে।
এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক।’
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে, তাই ভারত-বাংলাদেশে সম্পর্কে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার এই উক্তি গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিককালে এ সম্পর্ক নিয়ে মিডিয়ায় রিপোর্ট লেখালেখি হয়েছিল, সে কারণে আরো এক ধাপ এগিয়ে তিনি বললেন এমন চিরস্থায়ী রক্তের সম্পর্কের কথা।
বাংলাদেশের পারিবারিক সম্পর্ক এত অটুট যে পাশ্চাত্য দেশগুলোর মানুষের মতো বারবার প্রতিদিন বলতে হয় না যে, ‘I love you and in reply other side people say me too’.
বাংলাদেশে ভালোবাসার কথা বেশিবার বললে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সমর্থনদান এবং মিত্র শক্তি হিসেবে যুদ্ধে রক্ত ঝরানো যদি সম্পর্ক নির্ণয়ের মাপকাঠি হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা প্রশ্নের মধ্যে পড়ে।
প্রতিটি দেশের মানুষ দেশের স্বাধীনতা পাওয়ার পরে সুখ আশা করে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ (পৃষ্ঠা ৮২) শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে আর চিন্তা কী? এখন ঢাকায় যেয়ে ল’ ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে।’
পাকিস্তান স্বাধীনতার পর রাজধানী লন্ডন থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে এল, কিন্তু শাসন-শোষণের পদ্ধতি আগের মতোই রয়ে গেল।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই তো সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল। কেমন পরিস্থিতি ছিল ঢাকায় তখন? সবার প্রার্থনা ছিল বঙ্গবন্ধু কখন ফিরে আসবেন, আর যদি কোনো কারণে না আসতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের কী হবে?
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন ছিল খবরের কাগজের পাতাই তা বলে দেবে।
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ফিরে আসাটা এমন আকাক্সিক্ষত ছিল যে, ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া ভাষণের পরে ‘দি বাংলাদেশ অবজারভার’ প্রথম পাতায় ব্যানার হেডিং দিয়েছিল :
‘Home they Brought her Warrior Dead.’
স্বাধীন বাংলাদেশের ভেতর থেকে অন্য দেশের সামরিক বাহিনী কখন বিদায় নেবে, হোক না তা মিত্র বাহিনী-এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রধান চিন্তা তখন। সঙ্গে একই দাবি তুললেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।
প্রথম স্বাধীনতা দিবসের আগেই বিদায় নিল ভারতীয় সামরিক বাহিনী।
এর পর থেকে বঙ্গবন্ধু একদিনও শান্তিতে বাংলাদেশ শাসন করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ ভেঙে ‘জাসদ’ তৈরি করে সমগ্র বাংলাদেশকে অশান্ত করতে কোন বিদেশি শক্তি মদদ দিয়েছিল, তা জাসদ যারা তৈরি করেছিল, তারাই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং বই আকারে প্রকাশ করেছেন।
ক্ষিতিমোহন সেন ‘অখণ্ড ভারতের সাধনা’ শিরোনামে ‘দেশ’ পত্রিকায় ৬ নভেম্বর, ১৯৪৮ তারিখে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যার শুরুতে একটি গল্পের অবতারণা করেছিলেন, যা নিম্নরূপ :
“এক এক জন মানুষ সারা জন্মই অন্য লোককে জ্বালাইয়া যায়, ছেলেবেলায় এইরকম এক ‘গ্রাম জ্বালানিয়া’র কথা শুনিয়াছিলাম। মরিবার সময় উপস্থিত হইলে তাহার মনে হইল, ‘এখন তো আমি চলিলাম, ইহার পরে গ্রামের লোককে জ্বালাইয়া অতিষ্ঠ করিবে কে? এই ভাবিয়া সেই দুষ্ট মরিবার পূর্বে কোন মতে গ্রামের নিকটবর্তী বনে গেল। তখন বনের বাঘেরা মানুষ খাইতে জানিত না। তাহারা অন্য জীবজন্তু ধরিয়া খাইত। সেই দুর্বৃত্ত গিয়া বাঘদের বলিল, তোমরা আমাকে খাও।”
বাঘরা বলিল, সে আবার কী কথা? বাঘে মানুষ খায় নাকি? সেই ‘গ্রাম-জ্বালানিয়া’ বলিল, ‘কখনো তো খাও নাই, একবার খাইয়া দেখো।’ বিস্মিত বাঘের দল মুমূর্ষু লোকের কথায় তাহাকে খাইয়া দেখিল, অপূর্ব স্বাদ মানুষের মাংসের। তখন তাহারা বলিল, ‘চমৎকার মাংস তো, ইহার পরে পাইলে আর মানুষকে ছাড়িব না।’
বঙ্গবন্ধু ‘গ্রাম জ্বালানিয়াদের’ মতো লোকদের সম্পর্কে জানতেন আর তাই তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পরে সরকার কর্তৃক ৯২(ক) ধারা জারি হওয়ার পর লিখেছেন, ‘এই দিন থেকে বাঙালিদের দুঃখের দিন শুরু হল। অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোন কাজে নামতে নাই।’
নীতিহীন নেতাদের কারণে বঙ্গবন্ধুর কী হয়েছিল, সবাই তা জানেন।
বাঘকে মানুষের মাংস খাওয়ানোর লোভ তারাই দেখিয়েছিলেন আর দেখিয়েছিলেন বাঙালির রক্তের রং, যা দেখে বাঘ সম্পর্ক তৈরি করতে আগ্রহী হয়েছিল।
ফলে ঘরে-বাইরে চারদিকের মনের মধ্যেও ভাঙন তৈরি হলো। তাদের দীক্ষামন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যেসব অল্পমতি বাংলাদেশের মধ্যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে জাতীয় একতার স্বপ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে এবং রক্তের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তারা তো আর জীবিত নেই, কিন্তু বনের বাঘের মতো মানুষ-রক্তের আস্বাদ দিয়ে যেসব দুর্বৃত্ত বিদায় নিয়েছে দোষ তাদেরই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে। সকল মুক্তিযুদ্ধেই কোনো না কোনো বড় শক্তি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে থাকে। কেউ তা করে মানবিকতা, নৈতিকতা এবং বিবেকবোধ থেকে আর কেউ করে থাকে তার নিজস্ব সুবিধা অর্জনের জন্য।
কেমন ছিল ১৯৭১ সালে বিশ্ব পরিস্থিতি?
১৯৫২ সাল থেকে বাঙালি ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখতে থাকে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারান্তরীণ থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা।
এই সময়কালে ভারতবর্ষে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (এম এল) চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, অসীম চ্যাটার্জি, সুশীতল রায় চৌধুরীদের নেতৃত্বে।
‘দেশব্রতী’ পত্রিকা পড়ে হাজার হাজার মেধাবী তরুণ যোগ দেন বিপ্লবে এবং চারু মজুমদার ডাক দেন ১৯৭১ সালে দিল্লি দখলের। ভারত সরকার অসহায়ের মতো শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে পরিস্থিতি দেখতে থাকে।
১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে দেয়নি ভুট্টো। ভুট্টোর সঙ্গে রাশিয়ার ছিল গোপন আঁতাত, যাতে পাকিস্তান ভেঙে যায়। কারণ পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করেছিল চুক্তি, যাতে রুশ-ভারত বলয় দক্ষিণ এশিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে।
ভুট্টোর মদদে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ এবং লুণ্ঠন চালায়। বিশ্ববিবেক বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়। ব্যাপক জনগণ যদি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে, সেখানে স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। বাংলাদেশের আশপাশের ভূখণ্ডই তার প্রমাণ।
ভারত এই সুযোগে ১৯৭১ সালে এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মেরেছে : ১) ভারতে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের আন্দোলন নস্যাৎ করেছে, ২) ক্ষমতাসীনগণ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করেছে, ৩) সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে, ৪) চিরবৈরী পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পেরেছে, ৫) পাকিস্তানকে ভাঙতে পেরেছে, ৬) আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে এবং সোভিয়েত রাশিয়াকে বিশ্বে এক নম্বর পরাশক্তি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের বীর জনতা এবং মুক্তিযোদ্ধারা এই সুযোগে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। কারও দয়ায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের কারণেই ভারত এতগুলো সুবিধা পেয়েছে। তাই ভারতেরও কৃতজ্ঞ থাকা উচিত বাংলাদেশের কাছে।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার দায় এবং গরজ কার? বাংলাদেশ না ভারতের?
বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণে এমন এক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, যেখানে সে কারও মুখাপেক্ষী নয়। এর রয়েছে তিনটি সামুদ্রিক বন্দর, জলপথ এবং নিরঙ্কুশ আকাশপথ। রয়েছে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা।
অপরদিকে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্য বা সেভেন সিস্টার রয়েছে সার্বক্ষণিকভাবে চীনের চাপের মুখে। ওখানে ভারতকে যেতে হলে মাত্র ১৪ মাইলেরও কম ‘চিকেন নেক’ অঞ্চল দিয়ে যেতে হবে নইলে বাংলাদেশের শরণাপন্ন হতে হবে। আধিপত্যবাদ, সাবজুগেশন, গ্রাম জ্বালানিয়া বা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বনের সুযোগ বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতে নেই। ১৯৭১ সালে পরিস্থিতি ছিল ভারতের অনুকূলে, এবারের পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে।
‘রক্তের সম্পর্ক’ নিয়ে পরিবারই টিকে না। ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদ, পিতা-সন্তানের বিভেদ, সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়া-মারামারি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। রাজনীতি তো আরও কঠিন বিষয়।
উপমহাদেশে পিতা বাদশাহ শাহজাহানকে বন্দী করে রক্তের সম্পর্কের পুত্র আওরঙ্গজেব দেশ শাসন করেছেন।
লাদাখ সীমান্ত সব সম্পর্ক বিষয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। সীমান্ত সংঘর্ষ না হলে ভারতীয় হাইকমিশনার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছেন না বলে আক্ষেপ করতেন কি না সন্দেহ আছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অর্থনৈতিক নয়, আত্মিক। ১৯৫২ সালের ১ অক্টেবরের তৃতীয় স্বাধীনতা দিবসে শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি সম্মেলনের ডেলিগেট হয়ে গিয়েছিলেন মাও সে তুংয়ের চীনে। তাঁর অপ্রকাশিত আত্মজীবনীর ২৩৪ পাতায় তিনি লিখেছেন,
‘আমরা স্বাধীন হয়েছি ১৯৪৭ সালে আর চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে। যে মনোভাব পাকিস্তানের জনগণের ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে আজ যেন তা ঝিমিয়ে গেছে। সরকার তা ব্যবহার না করে তাকে চেপে মারার চেষ্টা করছে। আর চীনের সরকার জনগণকে ব্যবহার করছে তাদের দেশের উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ এবং এ দেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউ নন। ফলে দেশের জনগণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। একটা মাত্র পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল সাদা চামড়ার জায়গায় কালা চামড়ার আমদানি হয়েছে।’
সেই থেকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালে চীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ১৯৭৫ সালে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আবার শুরু হয় এবং অত্যন্ত দৃঢ় হয়, জেনারেল এরশাদ এ সম্পর্ক ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যান।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা চীনের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ‘তাইওয়ানিজ ভিসা অফিস’ চালু করার কারণে বিএনপির সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ (শেখ হাসিনা) ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে এমন গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে মাঝেমধ্যেই এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বন্ধুত্বের নতুন নতুন ডেফিনেশন নিয়ে হাজির হতে হয়।
চীন যে দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনীতির চালে ভারতকে একা করে দিয়েছে, তা বুঝতে অখণ্ড ভারতীয় মতাদর্শধারীদের অনেক সময় লেগেছে। ‘গ্রাম-জ্বালানিয়া’ থিওরি দিয়ে আর কোনো কাজ হবে না। সময় বদলে গেছে।
অরাজনৈতক ‘রক্তের সম্পর্ক’ দিয়ে অর্থনীতির কাজ হবে না, ভারতও সেটি জানে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটুকু মন্তব্য ঠিক আছে, কারণ অর্থই হলো শক্তি। চীনের অর্থনীতি সুদৃঢ় এবং ২০২৪ সালে চীন ১ নং মানি-পাওয়ার হতে চলেছে।
কিন্তু এর সঙ্গে তিনি একটু লেজ লাগিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের বিজয় ভারতের বিজয়, ভারতের উন্নয়ন আমাদের উন্নয়ন’-এ বিষয়ে কথা বললে কথা বাড়বে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরবে।
বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণি উন্নত দেশগুলোর শ্রমিকশ্রেণির মতো সমৃদ্ধসম্পন্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তারা মনে করে, এগিয়ে যাওয়ার এই তো সময়, সুখী হওয়ার এই তো সময়।
রক্তের বাঁধনে পরিবারের গণ্ডি দেখা যায়, কিন্তু দিগন্ত দেখা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ দিগন্ত দেখা এবং মহাকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখছে, এটি নষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই।
বাংলাদেশিদের এই মনোভাব এখন অনেক উঁচুতে এবং বাঁচার তীব্র আকাক্সক্ষা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু যা দেখা গিয়েছিল।
কবি শামসুর রাহমানের ‘বন্দীশিবির থেকে’ কবিতার ভাষায় :
‘স্বাধীনতা নামক শব্দটি
ভরাট গলায় দীপ্র উচ্চারণ করে বারবার
তৃপ্তি পেতে চাই। শহরের আনাচ-কানাচে
প্রতিটি রাস্তায়
অলিতে গলিতে
রঙিন সাইনবোর্ডে, প্রত্যেক বাড়িতে
স্বাধীনতা নামক শব্দটি
লিখে দিতে চাই
বিশাল অক্ষরে।’
-সাবেক মন্ত্রী ও এমপি।