কমনওয়েলথ গেমস ডায়েরি: হৃদমাঝারে তবুও স্মিথ-ওয়ার্নার

স্পোর্টস রিপোর্ট : স্টিভেন স্মিথের আত্মজীবনীমূলক বইয়ের পোস্টার। বল টেম্পারিংয়ের ঘটনার পর ২৪ ডলারের বইটি এখন ক্লিয়ারেন্স সেলে বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই ডলারে।
আই অ্যাম শক্ড। বেশ জোর দিয়েই কথাটা বললেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান ফারদিন। কী নিয়ে এত ব্যথিত সিটি অব গোল্ড কোস্টের অধিবাসী এই সদ্য তরুণ? তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে মাত্র কয়েক দিন আগে ঘটে যাওয়া অঘটন নিয়ে। বল টেম্পারিংয়ের ঘটনায় স্টিভেন স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার, ক্যামেরন ব্যানক্রফটের ওপর শাস্তিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে বলে মনে হয় ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের শিক্ষার্থী ফারদিনের। তার বন্ধুদেরও কি একই মত? না, সবাই এক রকম করে ভাবছেন না। কেউ কেউ মনে করেন, তারা দোষ করেছে, তাই শাস্তি পেয়েছে। এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। তবে অনেকেই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিমে স্মিথ-ওয়ার্নারদের মিস করছেন। প্রথম দিকে অবশ্য বিরূপ প্রতিক্রিয়াই ছিল প্রবল। তার একটা নমুনা দেওয়া যেতে পারে। দ্য জার্নি নামে স্টিভেন স্মিথের আত্মজীবনীমূলক যে বইটি এত দিন ২৪ ডলারে বিক্রি হতো, সেটাই এখন ক্লিয়ারেন্স সেলে মাত্র দুই ডলারে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তবুও নাকি বাজারে কাটছে না। এ যেন আকাশ থেকে উজ্জ্বল কোনো নক্ষত্রের হঠাৎই খসে পড়াÑ এ দিকে গোল্ড কোস্টে কমনওয়েলথ গেমস কাভার করতে এসে স্মিথ-ওয়ার্নারের ঘটনায় সাধারণের প্রতিক্রিয়া কেমন, সেটা জানতে গত কয়েক দিনে কথা হয়েছে অনেকের সঙ্গে। গেমসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক লেইন ক্লার্ক জানালেন, স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফট দোষ করেছেন। তাতে শাস্তি তাদের হওয়াই উচিত ছিল। তবে শাস্তির মাত্রা তার বিবেচনায় বেশি হয়ে গেছে। এমা গ্রিনউডের ভাষায়, নৈতিকতার বিচারে কাজ অবশ্যই অন্যায় হয়েছে। তবে এ ঘটনা থেকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকে শিক্ষা নিতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ আর অনৈতিক কিছু যাতে করতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখা জরুরি বলে ভাবেন তিনি। স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁর ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মী পল মেলোনির ভাষায়, এ ঘটনায় কোচ ড্যারেন লেম্যানও দায় এড়াতে পারেন না। মাঠের এত বড় একটা ব্যাপার তার অজানা থাকাটাও দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে।ক্রিকেট দুনিয়ায় ঝড় তোলা এ ঘটনা ঘটে গত মাসের শেষ সপ্তাহে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে কেপটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনের সময় কা-টা করেন ব্যানক্রফট। হলুদ টেপজাতীয় কিছু হাতে নিয়ে বল ঘষতে দেখা যায় তাকে। পুরো ব্যাপারটি ধরা পড়ে টেলিভিশন ক্যামেরায়। পরে অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ এক চাঞ্চল্যকর সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেন বল বিকৃতির পরিকল্পনার কথা। এই স্বীকারোক্তির পরের দিনই অস্ট্রেলিয়ার সরকার স্মিথকে অধিনায়কত্বের পদ থেকে সরিয়ে দিতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে চাপ দেয়। ফলে অধিনায়কত্বের পদ থেকে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়। সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারও সরে দাঁড়ান তার পদ থেকে। অন্য দিকে স্মিথ-ওয়ার্নার দুজনকেই সব ধরনের ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। ব্যানক্রফটের নিষেধাজ্ঞা নয় মাসের।
শুরুর দিকের উত্তাপ অবশ্য ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। স্মিথ ও ওয়ার্নার সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে অঝোরে কেঁদেছেন, তা ছুঁয়ে গেছে তাদের অনুরাগীদের হৃদয়। অনেকেরই সহানুভূতি পেয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলও তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, এ ঘটনায় তিনি ভীষণ দুঃখ পেয়েছেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমনওয়েলথ গেমস শুরুর আগে পর্যন্ত ক্রিকেটের বিষয়টিই সবার মুখে মুখে ছিল। গেমস শুরুর পর সেটা এখানে আপাতত থিতিয়ে এসেছে। আসলে রাগবি যতই জনপ্রিয়তার বিচারে অস্ট্রেলিয়ার এক নম্বর খেলা হোক, ক্রিকেট তাদের হৃদয়ের গভীরে একটা আলাদা জায়গাজুড়ে রয়েছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আভিজাত্য ও গৌরবের স্মারক। তার গায়ে আঁচড় লাগার কষ্টটা তাই সবার বুকেই দাগ কেটে গেছে।
ফারদিন যেমন মনে করেন, ওয়ার্নারকে নিয়ে সংশয় থাকলেও স্মিথ আবার স্বরূপে ফিরে আসবেন দলে। ফিরবেন ব্যানক্রফটও। তেমনটাই বিশ্বাস করেন ভারতীয় ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী।সম্প্রতি নিজের লেখা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটের জন্য আমার শুভ কামনা থাকবে। আশা করছি, তারা ফিরে আসবেন এবং ভালো খেলবেন। আর যে ঘটনায় তাদের শাস্তি হয়েছে, সেটাকে ঠিক প্রতারণা বলে মানতে বা বিশ্বাস করতে চান না তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিশ্বাস করেন, শাস্তি তাদের শুদ্ধ করবে এবং সব অন্ধকার পেছনে ঠেলে আবার মাঠে ফিরবেন স্মিথ-ওয়ার্নাররা।