করোনাকালের দুঃস্বপ্ন

মাহমুদুল চৌধুরী
এপ্রিলের প্রথম দিকের হাড়কাঁপানো শীতের নিস্তব্ধ রাত। বাসার কাছে গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হাইওয়েতে ট্রাফিক শূন্যের কোঠায়। ইস্ট রিভারের বিশাল ঝুলন্ত ব্রিজটির নীরবতা এক ভুতুড়ে পরিবেশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি ঘণ্টায় হাজারো গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে যেত। সেই ব্রিজটিতে পিনপতন নীরবতা। আচমকা দু-একটি যন্ত্রযান বিকট শব্দে দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাতে একটানা অ্যাম্বুলেন্সের তীক্ষ্ন সাইরেনে আতঙ্কে ঘুম ভেঙে যেত। সভ্যতার আকাশচুম্বী দম্ভ এবং ঔদ্ধত্য তুচ্ছ করোনা নামক আণুবীক্ষণিক জীবাণুর কাছে ম্লান হয়ে গেছে।
একটানা ফেসবুকে কমিউনিটির তাজা প্রাণগুলো ঝরে পড়তে দেখে নিজেকে সংযত রাখা কঠিন। প্রতি পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে এক-একটা প্রাণের দেহাবসান মুহূর্তে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বিলীন করে দিচ্ছে। লাশের মিছিলে চেনা মুখগুলোর ভয়বিহ্বল অবয়ব বোবা কান্নায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সচ্ছল পরিবারগুলো হঠাৎ করেই উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে দিশেহারা। ইচ্ছে থাকলেও কারো বাইরে গিয়ে কেনাকাটার সাহস হয়নি।
ফেব্রæয়ারির মাঝামাঝি ফ্লু নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক প্রচুর দখল গেছে। ভোরে ঘুম ভাঙত জীবন-মরণের দুঃস্বপ্ন নিয়ে। করোনাভাইরাসের ভয়ার্ত ছোবল চীনের উহান শহরকে সে সময় মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত করেছে।
আমেরিকায় থাকি। সামান্য ফ্লু-জাতীয় ভাইরাস! কিচ্ছু হবে না। মেয়েকে আপস্টেটে তার ইউনিভার্সিটিতে কল দিয়ে বলি-সাবধানে থেকো, ‘আম্মু’।
সারা পৃথিবীতে ঝড়ের বেগে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়ে পড়ছে। লাক্সারি ক্রুজ শিপ ডায়মন্ড প্রিন্সেস ৩ হাজার ৭১১ জন যাত্রীসহ প্রশান্ত মহাসাগরে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ভাইরাসের ভয়ে কোনো বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হচ্ছে না। অবশেষে ফেব্রæয়ারির ৪ তারিখে জাপানের ইয়াকোহামা বন্দরে ভিড়ল। প্রাথমিকভাবে জাহাজে ৩৩৪ জন সংক্রমিত রোগী ছিল। আমেরিকা জাহাজ থেকে তার নাগরিকদের উড়োজাহাজে করে প্রথমে হাওয়াই, পরে লস অ্যাঞ্জেলেসের অদূরে সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে আসে। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রেখে যারা ভালো তাদের ছেড়ে দেয়।
মনটা মুচড়ে উঠল। যদি লস অ্যাঞ্জেলেসে সংক্রমিত হয়। ছোট ছেলে তানজিদ লস অ্যাঞ্জেলেস ডাউনটাউনে থাকে। একটা আর্কিটেকচার ফার্মের আর্কিটেক। অফিস থেকে তাকে মাঝেমধ্যে সাইটে যেতে হয়।
ভয়ে শিউরে উঠলাম। একাকী বাসায় থাকে। কত করে বললাম আরেকজনকে সাথে নাও। বিপদ-আপদ বলা যায় না। কিছুতেই শুনল না। উল্টো বলে দিল, ‘তুমি কি জানো বাবা? আরেকজনের পারসোনালিটি কেমন হবে?
নিউইয়র্ক সময় রাত ১০টায় কল দিলাম। মেসেজে চলে গেল। আমাদের সাথে সময়ের ব্যবধান তিন ঘণ্টা। ভয়ানক অস্থিরতা পেয়ে বসে। বাসায় এসে কল না দিয়েই কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি, খেয়াল করিনি।
কান্তা ভাবির আপন বড় মামা লস অ্যাঞ্জেলেসে। খুব অতিথিপরায়ণ। আট-নয় বছর আগে তানজিদ যখন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় পড়তে গেল, খুব দুশ্চিন্তায় পড়লাম। এত দূরে! নিউইয়র্ক থেকেও অনেক বড় শহর। যাব যাব বলে তখনো আমাদের লস অ্যাঞ্জেলেসে যাওয়া হয়নি। হলিউডের মুভিতে লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশালতা দেখেছি। এই বিশাল শহরে একটুখানি ছেলে কীভাবে থাকবে! নিউইয়র্ক মেগাসিটিতে বেড়ে ওঠা ছেলে লস অ্যাঞ্জেলেসকে অল্প দিনেই অ্যাডজাস্ট করে নিল।
কান্তা ভাবি বললেন, চিন্তা করবেন না। মামাকে বলে রাখব। মামার একমাত্র মেধাবী মেয়েটি টঈখঅ যায়। নিউজে দেখেছি UCLA এবং USC-এর মধ্যে ভীষণ রেষারেষি। মামার সাথে পরিচয় হওয়ার সুবাদে ইতিমধ্যে তানজিদের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে ডরম থেকে তাদের বাসায় বেড়াতে যায়।
এই বিদেশ বিভুঁইয়ে আমরা কত আনন্দ-বেদনা নিয়ে দিনগুলো পার করি। জেরিনা শারমিন কান্তা প্রখ্যাত গীতিকার মরহুম মুকুল চৌধুরীর বড় মেয়ে। তিন বছর আগে মারণব্যাধি ক্যানসার তাকে পৃথিবী থেকে অসময়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাদের অল্পবয়সী দুই সন্তানের দিকে তাকালে বেদনায় হাহাকার করে ওঠে। ছেলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বস্টনে থাকে। মেয়েটি কলেজে। ভাবির স্বপ্ন ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন। পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর। নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া যেন বিকল্প নেই। বেঁচে থাকলে এই বিপদে তানজিদের খোঁজ নিতেন।
দুপুরে টিভিতে নিউজ দেখতে গিয়ে আবারও আতঙ্কে ভড়কে গেলাম। ওয়াশিংটন স্টেটে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ১০ জনের মতো রোগী মারা গেছে একটি হোমকেয়ারে। ওয়াশিংটনের গভর্নর দিশেহারা। স্টেট ইমার্জেন্সি, লকডাউন এবং নানা বিধিনিষেধ জারি করেছেন।
মার্চের মাঝামাঝি। নিউইয়র্কে তখনো আমরা নিশ্চিন্তে সময় পার করছি। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ হবে কি না তাই নিয়ে বিতর্ক চলছে।
গিন্নিকে বললাম, বড় ছেলে কি কল করেছিল?
না, কদিন আগে কথা হয়েছে।
আমাদের যখন দুপুর বারোটা, সিয়াটলে সকাল নয়টা। পুরোদমে অফিস শুরু। মাইক্রোসফটের মেইন অফিস। প্রায় ৪৫ হাজার এমপ্লয়ি। ১০ জন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে একেকটা দল গঠিত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে হবে। এই বিশাল হেডকোয়ার্টারটি খুব ঘনবসতিপূর্ণ। তামিমকে কল করে মেসেজ রাখলাম যেন সাবধানে থাকে।
নিউইয়র্কের স্টাইভ্যাসেন্ট হাইস্কুলে ছেলে দুটিকে দিয়ে যেন ভুল করেছিলাম। এই স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী অনেক স্বাধীনচেতা ও ঘরবিমুখী। সেই যে হাইস্কুলের পাট চুকিয়ে দুজন নিউইয়র্ক ছাড়ল আর তাদেরকে ফেরানো গেল না। বন্ধুদের মতো বাইরের স্টেটই তাদের পছন্দের। সংকট মুহূর্তে বিচ্ছিন্নভাবে থাকলে মা-বাবার অস্থিরতা কী রকম চরমে পৌঁছায়, এ দেশে বড় হওয়া সন্তানদের ধারণা আছে বলে মনে হলো না।
কদিন ব্যক্তিগত ঘোরাঘুরি একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। এখন ভাবলে শিউরে উঠি। চট্টগ্রামের প্রাক্তন সাংসদ লিয়াকত আলী ভাই জানুয়ারিতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রিয় কয়েকজনকে নিয়ে লিয়াকত ভাইয়ের জ্যামাইকার বাসায় যাই। সেদিন কেউ এই ভয়ংকর সংক্রমণকারী করোনাভাইরাসকে গুরুত্বই দিইনি। এটাই আমাদের শেষ সোশ্যাল গেদারিং।
ফিরতি পথে জ্যামাইকার মান্নান গ্রোসারিতে ঢুকে দেখি এলাহি কাণ্ড। বাংলাদেশিদের ভিড়ে গিজগিজ করছে। মাংস নেই, চাল নেই। সবজিও নেই। যে যা পারে নিয়ে যাচ্ছে। এস্টোরিয়ায় থাকি। জ্যামাইকায় শপিং করতে আসি না। সামান্য বাজার সেরে বাসায় ফিরলাম। পরের দিন ওয়ার্ল্ডের লার্জেস্ট রিট্যাল স্টোর কসকোতেও দরকারি কিছুই পেলাম না। দৌড়াদৌড়ি করে সামান্য কিছু কেনাকাটা করলাম। সেই যে বাসায় ঢুকলাম আর বের হইনি।
ছোট ছেলেকে ফোনে বলে দিলাম বাসা থেকে যেন কাজ করে। সিনিয়র আর্কিটেকের পরামর্শ নিয়ে অসমাপ্ত ডিজাইনগুলো ফাইনাল করা লাগে। তাই তাকে অফিসে যেতেই হয়।
ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, ছেলেকে যেন নিরাপদে রাখেন। মেয়ের জন্যও ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম কদিন। কলেজে টেস্ট শেষ না হলে আপস্টেট থেকে আসবে না। বড় ছেলে অবশ্য রেডমন্ড, সিয়াটলে বাসা থেকে অফিস করছে।
সময় যেন এক জায়গায় থেমে গেছে। নিউইয়র্কের অবস্থা ইতিমধ্যে মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। ইতালি আর স্পেন মৃত্যুপুরী। দুটি আধুনিক নগর পুরোপুরি বিপর্যস্ত। উন্নত চিকিৎসায় তাদের কোনো ঘাটতি নেই। তবু প্রতিদিন শত শত মানুষ মৃত্যুর মিছিলে। নিউইয়র্ক তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। শুধু এক-দেড় সপ্তাহের পেছনে। অদৃশ্য ভয়ংকর জীবাণুর সাথে সহাবস্থান করছি। যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন হতে পারে।
ইতিমধ্যে মেয়ে তার বান্ধবীর গাড়িতে ড্রাইভ করে নিউইয়র্কে ফিরে এলে কিছুটা স্বস্তি পাই। ছেলে দুটি তিন হাজার মাইল দূরে করোনায় আক্রান্ত দুটি বড় শহরে। অজানা আতঙ্কে মনকে প্রবোধ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মাঝেমধ্যে সন্ধ্যায় ওরা ভাইবোনেরা ভিডিও কনফারেন্সে থাকত। লস অ্যাঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্ক থেকে ছোটবেলার মতো প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে অতীতের স্মৃতিতে তারা ফিরে যায়। বস্টন ও নিউইয়র্ক থেকে অন্য কাজিনরাও ভিডিও কনফারেন্সে শামিল হয়। তাদের কলকাকলিতে অতীতের স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে। এই তো মাত্র কিছুদিন আগে ওরা কত ছোট ছিল। এখন নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে। ভিন্ন রাজ্যে। হঠাৎ মেয়ে আমাকে বলল, ‘বাবা, তানজিদ ভাইয়া এখন ঘর থেকে কাজ করতে পারবে।’ আমার বুকের ওপর থেকে একটা ভারী পাথর সরে যায়। এই কদিনে নিউইয়র্কের অবস্থা আরও অবনতি ঘটে।
হসপিটালগুলোতে অবশিষ্ট কোনো বেড আর নেই। এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট নেভির বিশাল জাহাজ ‘কমফোর্ট ওয়েস্ট সাইড শিপ টার্মিনালে এসে নোঙর করেছে। বৃহদায়তনের জাবেদ কনভেনশন সেন্টারকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় হসপিটালে রূপান্তর করা হয়েছে। খেলার মাঠ, পার্ক, অডিটরিয়াম, হোটেল-যেখানে সম্ভব অস্থায়ী হসপিটাল বানানো হয়েছে। মর্গে মৃতদেহ রাখার জায়গা না থাকায় হসপিটালের পাশে সারিবদ্ধ রেফ্রিজারেটেড ট্রেইলার দাঁড়িয়ে আছে। নিউইয়র্কবাসীর কোনো দিন এই পরিণতি হবে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
গভর্নর প্রতিদিন সকালে প্রেস ব্রিফিং করে সঠিক খবরাখবর দিয়ে আশ্বস্ত করেন। কোনো রাখঢাক নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তুলাধোনা করতে সামান্যতম দ্বিধা নেই। নিউইয়র্কার টাফ হিসেবে গর্ব করেন। মেয়রও প্রেস ব্রিফিংয়ে নিয়মিত আসেন। এদের সত্য বলা এবং জবাবদিহি অকল্পনীয়।
তবু ভয়ে, আতঙ্কে সবাই জমে আছি। প্রতি মুহূর্তে ভয়ংকর অদৃশ্য জীবাণুর বিরুদ্ধে ডাক্তার, নার্স, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য, ন্যাশনাল গার্ড এবং বিজ্ঞানীরা সম্মুখসমরে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংক্রমিত হয়ে তাদের অনেকের অসময়ে জীবনের প্রদীপ নিভে গেছে। শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে আসে। পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষ ভয়াবহ এক অসমযুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষায় মুখোমুখি।
এ যেন কোনো দুঃস্বপ্ন। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। অনেকক্ষণ পার্কে বসা ছিলাম। ছোট্ট সাদা বোটটি ইস্ট রিভারের অন্য প্রান্তে মিলিয়ে যেতেই বাস্তবতায় ফিরে আসি। কদিন থেকে পার্কে আসছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েও স্বাভাবিক হচ্ছে না। অনেক দুর্বল হয়ে গেছি। কয়েক মাসে জীবন তছনছ করে দিল এই তুচ্ছ ভাইরাসটি। এখনো করোনা জড়, না প্রাণী, তাও সঠিকভাবে জানতে পারিনি।
লেখক : প্রাক্তন কর্মকর্তা, বিআইডব্লিউটিএ
-নিউইয়র্ক