করোনাকালে কোরবানি এবং আমাদের করণীয়

মাহমুদ আহমদ: ঈদুল আজহায় কোরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এ বছর মহামারি করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় সমগ্র বিশ্ব বিপর্যস্ত এবং ওলট-পালট করে দিয়েছে সব পরিকল্পনা। এমনই পরিস্থিতিতে দরজায় কড়া নাড়ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো মহামারির সময় একজন মুমিন তার ইবাদতে দুর্বলতা দেখায় না বরং আরো গতির সাথে ইবাদতে রত হয়। করোনা পরিস্থিতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পশু কোরবানি থেকে বিরত থাকার কোনো বিধান ইসলামে পাওয়া যায় না। তাই করোনার অজুহাতে পশু কোরবানি করায় শিথিলতা দেখানো যাবে না। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কোরবানি আদায় করতে হবে। তবে পাশ্চাত্যে যারা বসবাস করছেন, তারা ইচ্ছা করলে নিজ দেশে কোরবানি দিয়ে গরিবদের মাঝে সেই মাংস বিতরণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।
কেননা কেবল গোশত খাওয়াই এ কোরবানির উদ্দেশ্য নয়, বরং কোরবানির পশুর মতো নিজেদের পশুত্বকে বলি দেওয়ার শিক্ষাও আমরা এ থেকেই পেয়ে থাকি। আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘এগুলোর মাংস বা এদের রক্ত কখনো আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে তোমাদের পক্ষ থেকে তাকওয়া পৌঁছায়।’ (সুরা হাজ, আয়াত : ৩৭)
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নত অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে কোরবানি পালনের মাধ্যমে প্রতিবছর একজন মুসলমান নিজের মাঝে তাকওয়াকে আরেকবার ঝালিয়ে নেন, যেন প্রয়োজনের দিনে আল্লাহর পথে কোরবানির পশুর ন্যায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানির অনুসরণে মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছরের ১০ জিলহাজ তারিখে পশু কোরবানি করে থাকে। ইসলামে এই যে কোরবানির শিক্ষা, তা কি কেবল একটি পশু কোরবানির মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়ে যায়? আসলে পশু কোরবানি করাটা হচ্ছে একটা প্রতীকীমাত্র। আল্লাহ তায়ালা চান মানুষ যেন তার পশুসুলভ হৃদয়কে কোরবানি করে, তার আমিত্বকে কোরবানি করে আর সেই সাথে তার নিজের সমস্ত চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহর খাতিরে কোরবানি করে দেয়। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তার পুরো পরিবারের কোরবানি এমনই ছিল। তারা ব্যক্তিস্বার্থকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করেছিলেন। আল্লাহর সাথে প্রেমবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তিনি কোরবানি চান, আর এ কোরবানির অর্থ কেবল পশু জবেহ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ কোরবানি কারো জন্য নিজ প্রাণের কোরবানিও হতে পারে আবার কারো নিজ পশুত্বের কোরবানিও হতে পারে। আমরা যদি মনের পশুকে কোরবানি করতে পারি, তাহলেই আমরা আল্লাহ তায়ালার প্রিয়দের অন্তর্ভুক্ত হতে পারব।
প্রতিবছরই কোরবানি করা আবশ্যক
কোরবানির গুরুত্ব তুলে ধরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সময় তার উম্মতকে নসিহত করেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হে লোকসকল! জেনে রাখো, প্রতি পরিবারের পক্ষে প্রতিবছরই কোরবানি করা আবশ্যক।’ (আবু দাউদ ও নাসাঈ)। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য লাভ করে অথচ কোরবানির আয়োজন করেনি, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ)। হজরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় ১০ বছর অবস্থানকালে প্রতিবছর পশু কোরবানি করেছেন।’ (তিরমিজি)
অথচ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদিনা-জীবনের প্রারম্ভের কয়েকটি বছর অত্যন্ত কষ্ট ও দারিদ্র্যের মাঝে মুসলমানদের অতিবাহিত করতে হয়েছে।
তাই কেউ যদি মনে করে, করোনা পরিস্থিতিতে এ বছর কোরবানি না দিলে কী এমন ক্ষতি, তা মোটেও ঠিক হবে না। এমনটি মনে করা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শের বিরুদ্ধে হবে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবিরা কত কষ্টই না সহ্য করেছেন, কিন্তু কখনোই তার পবিত্র সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুগণ একবারের জন্যও বলেননি যে, হে আল্লাহর রাসুল! এ বছর আমাদের জন্য কোরবানি করাকে মাফ করে দিন। এমন প্রশ্ন কখনো উত্থাপনই করা হয়নি। তাহলে কীভাবে আমরা এ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি যে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কোরবানিতে অংশ না নিলে হয় না। তাই করোনার জন্য কোরবানি করা থেকে বিরত থাকার কোনো অনুমতি যে ইসলাম দেয় না, তা আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে।
কোরআন-হাদিস এবং বুজুর্গানে দ্বীনের ভাষ্য থেকে যতটুকু জানা যায়, কোরবানির পেছনে যে উদ্দেশ্যটি কাজ করা আবশ্যক, তা হলো তাকওয়া বা আল্লাহর সন্তুষ্টি। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তার একমাত্র পুত্র হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জবেহ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। যে কোরবানির পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি কাজ করে না, সে কোরবানি কোরবানির আওতায় পড়ে না।
পরিশেষে এটাই বলব, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই কোরবানি দিতে হবে। এছাড়া যাদেরকে আল্লাহ সচ্ছলতা দান করেছেন, তারা বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গরিব এলাকায় নিজেদের পক্ষ থেকে কোরবানির ব্যবস্থা করে অশেষ কল্যাণের ভাগী হতে পারেন। এতে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক উভয় আদায় হবে।
কোরবানির নিয়ম
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং উট সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যেতে পারে।’ (মুসলিম, আবু দাউদ)। কোরবানির জন্য উট, গরু, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা থেকে যেকোনো পশু জবাই করা যেতে পারে। উট ও গরু সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে এবং ভেড়া, ছাগল প্রভৃতি এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে দিতে হয়। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা একাই কোরবানি দিতে পারেন। যদি এমনও হয়, ভাগে কোরবানি দেওয়ার নিয়ত ঠিকই রয়েছে কিন্তু তিনি কারো সাথে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন না আর একা একটি গরু কেনারও তার সামর্থ্য নেই, সে ক্ষেত্রে তিনি একটি ছাগল কিনে হলেও কোরবানি দেবেন। কারণ আল্লাহ বান্দার হৃদয় দেখে থাকেন। কোরবানির আমল থেকে যেন কেউ বাদ না পড়েন, এর দিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে।
কেমন হবে কোরবানির পশু
হজরত আলি (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আমরা যেন কোরবানির পশুর চোখ, কান ভালোভাবে দেখে নিই। যে পশুর কানের শেষ ভাগ কাটা গিয়েছে অথবা যার কান গোলাকার ছিদ্র করা হয়েছে বা যার কান পেছনের দিক থেকে ফেড়ে গিয়েছে, তা দিয়ে আমরা যেন কোরবানি না করি।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, নিসাই)। অপর এক হাদিসে এসেছে, হজরত আলি (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) শিং ভাঙা ও কান কাটা পশু দিয়ে আমাদেরকে কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন।’ (ইবনে মাজাহ)। তাই এ বিষয়টির ওপর খুব গুরুত্ব দিতে হবে যে পশুটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দেব, তা যেন নিখুঁত হয়। কোনোভাবেই কোরবানির পশু দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত, ল্যাংড়া, কান কাটা, শিং ভাঙা এবং অন্ধ পশু কোরবানি করা বৈধ নয়।
কোরবানির প্রতিদান
হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, একদিন মহানবীর (সা.) সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ কোরবানি কী? হুজুর (সা.) উত্তর দিলেন, তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কী পুণ্য আছে, হে আল্লাহর রাসুল? হুজুর (সা.) বললেন, কোরবানির পশুর প্রতিটি লোমের জন্য একটি করে পুণ্য আছে। তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! পশমওয়ালা পশুর পরিবর্তে কী হবে? অর্থাৎ এদের পশম তো অনেক বেশি। হুজুর (সা.) বললেন, পশমওয়ালা পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি পুণ্য রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ)।
করোনা পরিস্থিতিতে আমাদেরকে কোরবানির পশু ক্রয় করা থেকে নিয়ে অন্যান্য সব কাজে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে অংশ নিতে হবে। আমরা যেন সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখি। দয়াময় প্রভুর দরবারে সকাতর প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর বিশেষ কৃপায় বিশ্ববাসীকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ কোরবানি ও তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান গ্রহণ করুন, আমিন।