করোনায় কমেছে কোনো কুকাম?

মোস্তফা কামাল
অনেকের ধারণা হয়েছিল, করোনার কারণে মানুষের মধ্যে স্রষ্টার ভয় জাগবে। পাপে-তাপে কিছুটা মানবিকতার তাড়না জাগবে। টান পড়বে অপকর্মের লাগামে। ধারণা কি বাস্তব হয়েছে? বা আছে কি সেই অলামত? চুরি, ছেচরামি, ঠকবাজি, কালোবাজারি কোনোটাতে কমতি?
করোনা চিকিৎসায় এমন কি পজেটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে বাণিজ্যেও বুক কাঁপেনি ঠকবাজদের। সুস্থ হওয়া করোনা রোগীর প্লাজমা নিয়ে কুব্যবসাও বাদ গেছে? করোনাকালীন ত্রাণ চুরি-স্বজনপ্রীতিতে একটুও কমতি দিয়েছেন তৃণমূলের নেতা-জনপ্রতিনিধিরা? বরং করোনাকে পুঁজি করে প্রচলিত চুরি, দুর্নীতির সঙ্গে দুর্গতদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নগদ টাকাও ফ্রিস্টাইলে মেরে খেয়েছেন। ওএমএসের চাল নয়ছয়, চালের কার্ড দেবেন বলে টাকা নেয়া, খাদ্য সাহায্য চাইতে আসা মানুষদের মারপিট-কোনোটাই বাদ দেননি।
চারদিকে উল্টা যতো ক্রিয়াকর্ম। মহামারি বরং অনেককে আরো বেপরোয়া করছে। মওকা করে দিচ্ছে কোটি-কোটি টাকা হাতানোর। এমন নাহালত বা আজাবের মধ্যেও কিভাবে সম্ভব হচ্ছে এসব চুরি, দুর্নীতিসহ এতো অনৈতিকতা? অবিচার-অনাচার, দুর্নীতি কি মজ্জাগত হয়ে গেছে? নইলে এমন মহাদুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে কিভাবে পুকুর চুরির বদলে সাগর চুরি? একদিকে আশঙ্কাজনক হারে করোনার বিস্তার ঘটছে, আরেকদিকে দুর্নীতি-চুরি-চামারিতে টাকা হাতানোর প্রতিযোগিতা। প্রণোদনা হাসিলের চাতুরি। ভাইরাসের চাষাবাদ করে অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা।
এই দুর্যোগের মাঝেও বোরোর বাম্পার ফলন ফলিয়েছে কারা? কৃষকেরা। তাদের কল্যাণে কারো মন গলেছে? ধান-চালের বাজারে নতুন মজুতদার যোগ হয়েছে। তাদের একেকটা প্রতারণাবিশারদ। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ মৌসুমি ফলের বাজারেও কুকর্মের শিরোমনিদের দাপট। সঙ্গে আদর কদর। ক্যামিকেলের ছড়াছড়ি। এমন মহামারিতেও সব সেক্টরেই তাদের জন্য সুসংবাদ।
গত কয়েক মাসের অপকর্মের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও স্পষ্ট তাদের অ্যাচিভমেন্ট। দেশে করোনাকালে ৬৭টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) আড়াই হাজারের বেশি শিশু নির্যাতন, প্রায় আড়াই শ ধর্ষণ এবং প্রায় ৭৫টি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে শতাধিক অপহরণ ঘটেছে। চোপায় পাহাড় ঠেলায় দক্ষ টকশো সেলিব্রেটি গজিয়েছেন। চাটারু ব্রান্ডের প্রসেসর এদের। মাদারবোর্ডেও ননস্টপ চাটামি। এই মোটিভেশনাল স্পিকারদের দত্তক নিচ্ছে ক্ষমতাধররা। চাপার মজবুত কন্ডিশনে তারা লাগলে ইংরেজিতে হর্ন দিতেও পারেন।
মহামারি-অতিমারি কি আমাদের বিবেককে আর্দ্রতাসিক্ত করবে না? সারা বিশ্ব করোনা সংক্রমণে বিপর্যস্ত হলেও দেশে দেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জাতি ও গোষ্ঠিগত নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা সম্প্রসারণে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ কমেছে? বিশ্বে অনেক রাষ্ট্র করোনা মোকাবিলা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সমান বা বেশি গুরুত্ব দিয়ে অস্ত্র কেনায় কমতি করছে? মধ্যপ্রাচ্য, সন্নিহিত আফ্রিকা অঞ্চল, পারস্য, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং চীনসহ অনেক দেশে জাতিগত ও গোষ্ঠিগত নিপীড়নের লাগামে কি টান পড়েছে?
কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক, মহামারি-অতিমারি কি আমাদের বিবেককে আর্দ্রতাসিক্ত করবে না? আমরা ‘জীবন যেখানে যেমন’ এ রকম একধরনের আত্মস্বার্থ মগ্নতায় ডুবে থাকবো? পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের মানুষ এতো দীর্ঘ সময় ধরে স্বজাতি ও স্বধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিল? পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য হত্যা, সুদীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ, গুম, খুন, নিপীড়ন থেকে বের হতে পেরেছে? পৃথিবীর ইতিহাসে এতো দীর্ঘ সময় ধরে পবিত্র কাবাসহ সব মসজিদে জামাত বন্ধ থাকার ইতিহাস আছে?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।