করোনা আক্রান্ত আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাই

করোনার অভিঘাত কমতে না কমতেই শুরু জীবন ও জীবিকার দ্বন্দ্ব। জীবন যদি না থাকে, তবে জীবিকা অর্থহীন। আর জীবন থাকলে জীবিকা অপরিহার্য। এছাড়া মানুষ বাঁচাতে, রাষ্ট্র বাঁচাতে, অর্থনীতি ও শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষায় লকডাউন নিয়েই-বা আর কত দিন চলা যায়। তাই তো জীবন-জীবিকার দ্বন্দ্ব মেটাতে, আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে স্তরে স্তরে লকডাউন

করোনার মৃত্যু ডানায় ভর করে এল ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। প্রতিবছর ৪ জুলাই আসে। মহা সমারোহে, মহা গৌরবে আমেরিকানরা প্রতিবছর ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস উদ্্যাপন করেন। সরকারি ছুটি ভোগ করেন। প্যারেড করে। জাতীয় পতাকা ওড়ায়। আতশবাজির উৎসব হয়। তার আগে বড় বড় শপিংমলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জিনিসপত্রের দামে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়।
এবার অতীতের সেই সমারোহ থাকবে না। অতীতের নিয়মিত আয়োজনের অনেক কিছুই অনুপস্থিত থাকছে। মানুষের মনে আনন্দ নেই, তাই উদ্্যাপনও নয় বর্ণাঢ্য। অথচ এই আমেরিকায় যতগুলো উদ্্যাপনে সমগ্র দেশ, সমগ্র জনগোষ্ঠী মেতে ওঠে, তার মধ্যে অন্যতম ৪ জুলাই, স্বাধীনতা দিবস।
১৩টি মূল রাজ্য নিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন, রুজভেল্ট, থমাস জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন, জন অ্যাডামসদের নেতৃত্বে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ইউনিয়নের পতাকা যেদিন থেকে উড়ছে, সেদিন থেকে নানা বর্ণে, নানা বৈচিত্র্যে স্বাধীন দিবস উদ্্যাপিত হয়ে আসছে। এরপর আরও ৩৭টি রাজ্য ইউনিয়নে যুক্ত হয়েছে এবং ১৩টি ডোরা দাগের সঙ্গে আরও ৩৭টি তার মিলে ইউনিয়ন পতাকার সৌন্দর্য ও তাৎপর্য বৃদ্ধি করেছে। সেই সঙ্গে আটলান্টিক, প্যাসিফিকে কত কত জলরাশি, কত স্রোত প্রবাহিত হয়েছে, ঝড়-ঝঞ্ঝায় কত জনপদ ওলট-পালট হয়েছে, কত যুদ্ধবিগ্রহ-মন্দা পার হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের রং একটুও ফিকে হয়নি। নাগরিক জীবনে স্বাধীনতার চেয়ে বড় কিছু নেই।
এবারই প্রথম করোনাভাইরাস মহাঘাতকরূপে আবিভর্‚ত হয়ে সবকিছু বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে সব উদযাপনের রং। শুধু আমেরিকা নয়, সমগ্র বিশ্বটাকে থামিয়ে দিয়েছে, করে অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে। লাখ লাখ জীবন কেড়ে নিয়ে ঘরে ঘরে হাহাকার তুলেছে। দুনিয়াজুড়ে একটি বিবর্ণ অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সমগ্র বিশ্বের মানুষ যে ভাবনায় আতঙ্কিত। বিত্তশালী, বলশালী, সমরশক্তিতে বলীয়ান, যাদের অস্ত্রভান্ডার মানুষ মারার, সভ্যতা ধ্বংসের ভয়ংকর ভয়ংকর মারণাস্ত্রে পূর্ণ, তারাও করোনার মতো বিশ্ব মহামারির সামনে অসহায়, দিশেহারা।
কোনো কোনো মহলের অভিমত, করোনা কোনো অনুমাননির্ভর কিংবা কারো প্রত্যাশিত সময়ে বিদায় নেবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং আশঙ্কার চেয়েও বেশি দিন মানুষকে ভুগিয়ে যাবে। তবে মানুষের কাছে যেমন প্রকৃতি ও রোগব্যাধি বশ মেনেছে, করোনাও শেষ পর্যন্ত বশ মানবে। মানুষ যত ধ্বংস করেছে, তার চেয়েও বেশি সৃষ্টি করেছে মানব জাতি। সভ্যতার বিনাশ ঘটেছে যেমন মানুষের হাতে, নানা চড়াই-উতরাই, সংকট-শঙ্কা পেরিয়ে সভ্যতা অগ্রসরও হয়েছে মানুষের হাত ধরে মানুষের মেধা ও প্রজ্ঞায়।
তবে বিশ্ববাসীর মনে এ রকম একটা আশঙ্কা কাজ করছে যে, করোনা গেলেও দুর্ভোগ কি যাবে? এ পর্যন্ত ৫ লাখের মতো মানুষের প্রাণ কেড়েছে, আর কত নেবে তাইবা কে জানে! কী চেহারাই-বা দাঁড়াবে করোনাত্তোর মানুষের, সমাজের। আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক, গ্লোবাল ভিলেজের দর্শনের অবস্থাই-বা কী হবে! করোনা-উত্তরকালে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক লেনদেন, সামাজিকতা, সংস্কৃতি কী রূপ গ্রহণ করবে, সেটাও এখনই কারও পক্ষে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সমাজ বিশ্লেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষকদের ধারণা, করোনা-পূর্ব পৃথিবীর অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে করোনাত্তোর কালে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটবে। হয়তো ক্ষমতার রদবদলও ঘটে যাবে অনেক দেশে।
এসব এমন একটা সময়ে মানুষের ভাবনায় নাড়া দিচ্ছে, যে সময় করোনা তার শক্তি একটুও হারায়নি। নিত্যনতুন অঞ্চলকে আক্রান্ত করছে। ইতিমধ্যে আমেরিকায় সোয়া লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এখনো প্রতিদিনই মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অনেক স্টেটে করোনার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হচ্ছে জনপদ। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, কেউ বলতে পারছে না। করোনা সংকটের সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে মিনিয়াপোলিশে জর্জ ফ্লয়েড এবং আটলান্টায় রেশার্ড ব্রুকসের নির্মম হত্যাকাণ্ড। এতে আমেরিকাজুড়ে জ্বলে উঠেছে পুলিশি নিপীড়ন ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতোই দেশজুড়ে আরেকটা তোলপাড়-তোলা ঢেউ।
করোনার অভিঘাত কমতে না কমতেই শুরু জীবন ও জীবিকার দ্ব›দ্ব। জীবন যদি না থাকে, তবে জীবিকা অর্থহীন। আর জীবন থাকলে জীবিকা অপরিহার্য। এছাড়া মানুষ বাঁচাতে, রাষ্ট্র বাঁচাতে, অর্থনীতি ও শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষায় লকডাউন নিয়েই-বা আর কত দিন চলা যায়। তাই তো জীবন-জীবিকার দ্ব›দ্ব মেটাতে, আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে স্তরে স্তরে লকডাউন তুলে দেশকে স্বাভাবিক পথে চালিত করার উদ্যোগ নিতে হয়। এতে নতুন আরেকটা বাস্তবতা জন্ম নেয়। এর সঙ্গে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু বাড়াবাড়ি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাকে উপেক্ষা করে, দেশের চলমান প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে অবজ্ঞা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে পরিস্থিতিকে করে তোলেন আরও ঘোলাটে। নির্বাচনী বছরে এসে আমেরিকার মানুষ হাড়ে হাড়ে অনুভব করতে পারছে ২০১৬ সালের নির্বাচনে কী মারাত্মক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছেন। তাই তো তাদের দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না। করোনা নিয়ে ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধিকে উপহাস করে বিভিন্ন রাজ্যে তার বড় বড় নির্বাচনী সমাবেশ করোনাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে নতুন করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দম্ভ ও অহংকারের প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে করোনা। করোনা তো আর কোনো পাগলা রাজার দেশের প্রজা নয়। অনেকেই মনে করেন, আজকের সময়ে আমেরিকার মূল আদর্শ, মূল্যবোধ, অভিবাসীদের স্বপ্ন, সাধ ও সুরক্ষা আর নাগরিকদের অধিকার, ভবিষ্যৎ সবই বিবর্ণ হতে চলেছে এই একজনের কারণে।
এ রকম এক ভয়ংকর পরিবেশের মধ্যে এবার আমেরিকার ২৪৪তম মহান স্বাধীনতা দিবস উদ্্যাপিত হতে যাচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস বলে কথা। লাখো জীবন উৎসর্গ করে, বছরের পর বছর নিপীড়ন-নির্যাতন সয়ে, নদী নদী সাগর সাগর রক্ত বিসর্জন দিয়ে, দখলদারদের বিতাড়িত করে একটি দেশকে স্বাধীন করতে হয়। স্বাধীনতা অর্জনের যন্ত্রণা, নেতৃত্বের ত্যাগ-তিতীক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই অনুভব করতে পারে না। পৃথিবীর সব দেশেই এ রকম দৃষ্টান্ত থাকলেও আমেরিকার বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বর্তমান সময়ে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তা সত্ত্বেও আমেরিকার গরিষ্ঠ মানুষ আজও অকৃতজ্ঞ হয়নি। তারা প্রায় আড়াই শ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষ যারা স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে আজ বিশ্বের এক নম্বর দেশের নাগরিক হওয়ার অহংকার এনে দিয়েছেন স্বাধীনতা দিবসের এই দিনে তাদের পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। পরিস্থিতি যত প্রতিক‚লই হোক আর প্রাণসংহারী হোক, মানুষ গভীর আবেগে প্রয়াস রাখে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের। বহিরাঙ্গণে হয়তো অন্যান্য বছরের মতো সমারোহ থাকবে না, উৎসবের আমেজ থাকবে না, আতশবাজির চমক থাকবে না, আরও অনেক কিছুই দেখা যাবে না, তবে প্রত্যেক দেশপ্রেমিক আমেরিকানের হৃদয়ে অনুভূত হবে তাদের স্বাধীনতার মহান নেতাদের ত্যাগ। মনে করবেন তাদের মহান নেতাদের। যতটা সম্ভব বহিরাঙ্গণে আয়োজন হবে আর সবটাই হবে অন্তরের অনুভবে। মনে মনে উচ্চারণ করবেন আমেরিকার সংবিধান, অঙ্গীকার, লক্ষ্য-আদর্শ রক্ষার প্রতিশ্রুতি। আমেরিকার অভিবাসী নীতি অম্লান রাখার এবং সর্বোপরি আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করার শপথ।
এই প্রার্থনা নিয়ে এবারের এ সম্পাদকীয় শেষ করতে চাই যে, করোনার অভিশাপ থেকে বিশ্ব, বিশেষ করে আমাদের মহান আমেরিকা পরিত্রাণ পাক। স্বাধীনতা দিবসসহ আগামী দিনের সকল উৎসব করোনামুক্ত পরিবেশে উদ্্যাপিত হবে। অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। দুর্ভোগ-দুর্গতি থেকে মানুষ পরিত্রাণ পাবে। সেই সঙ্গে আন্তরিক প্রত্যাশা, করোনা-উত্তরকালে মানুষ মানুষ হয়ে উঠুক। মানবিকতা ও ভালোবাসায় মানুষের অন্তর পূর্ণ হোক। সকল অস্ত্রভাণ্ডর ফুলে ও ফসলে ভরে উঠুক।
শেষ প্রার্থনা, অন্ধকারের আড়ালে যে আলো লুকিয়ে থাকে, এবার সেই আলো ফুটুক। আলোকিত হোক পৃথিবী এবং পৃথিবীর মানুষ। মনে রাখতে পারি যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই পঙক্তিমালা :
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে \
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে \’
আমরা যেন মৃত্যু দুঃখ বিরহ যন্ত্রণা শেষে সকল অন্ধকার পায়ে ঠেলে আলোকিত ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়ে নতুন করে জেগে উঠতে পারি- এই হোক এবার আমাদের ৪ জুলাইয়ের মিলিত প্রার্থনা।