করোনা দিনের গল্প

ওয়াহেদ হোসাইনী: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২০। করোনার দিনে একটা লাভ- গত ফেব্রুয়ারি মাসের পর আর গাড়ির তেল কিনিনি। কারণ মাত্র কয়েকবার ডাক্তারের অফিস যাওয়া ছাড়া গাড়ি ব্যবহার হয়নি। বাড়িতেই আছি। মাঝে মাঝে চেষ্টা করি আগের কেনা এবং এখনো না পড়া বইগুলো খুলে দেখার। পুরোনো অ্যালবাম দেখি। একদিন অ্যালবাম দেখতে দেখতে একটা পাতায় এসে দেখি নয় জনের এক গ্রুপ ছবির পাঁচ জনই আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে গেছেন। যে চারজন আছি, তারাও যাই যাই করছি। ঐ পাতাটা উল্টাতেই একটা ছাপা কাগজ পড়ে গেল। অতি ছোট একটা গল্প। কোনো একটা সাময়িকী থেকে কেটে রেখেছিলাম। তারিখ নেই, গল্পের নাম নেই, তবে লেখকের নাম আছে। আদিত্য অণীক। ছদ্মনাম হলেও আশ্চর্য্য হব না। মাত্র কয়েক লাইনের অতি ছোট গল্প। পড়া গল্পটা আবার পড়লাম। আবার পড়লাম। ভালো লাগল। হঠাৎ মনে হলো আমার মতোতো আরো অনেকে করোনায় গৃহবন্দী হয়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কোনো রসিক জনের এ অতি ছোট্ট গল্পটা ভালো লাগতেও পারে। তাই গল্পটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি। গল্পটার নাম আমিই দিয়ে দিলাম :
লবণ চা খুব মিষ্টি
বই মেলা, ক্যাফেটেরিয়া, ভ্যালেন্টাইন উৎসব। মেয়েটার চোখে পড়ার দুঃসহ চেষ্টা ছাড়া ছেলেটা পুরাদস্তুর সাধারণ। মেয়েটা রূপে ও লাবণ্যে, ফ্যাশন ও বসনে আগাগোড়া বিশেষণ। এক ঝাঁক প্রজাপতি উচ্ছ্বল তরুণের ভিড়ে ছেলেটা একেবারেই অপাংক্তেয়। তবু অতি বড় সাহস করে ছেলেটা বলেই ফেলল, আমার সাথে চা খাবে? ছেলেটার দুঃসাহসী অফারে অবাক মেয়েটা কী জানি মনে করে বলল, চল। মেয়েটার মুখোমুখি বসা ছেলেটার বুক ধড়ফড়, আড়ষ্ট জিহ্বা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ওয়েটার আমাকে লবণ দাও। মেয়েটা অবাক হয়ে বলল, তুমি চায়ে লবণ খাবে নাকি? ছেলেটা বলল, হ্যাঁ। আমার জন্ম নোনা জলের সাগর পাড়ে। নোনা চায়ে চুমুক দিলে আমার চোখে ভেসে ওঠে আমার গ্রাম, নোনা জলে ভেসে ওঠে আমার বাবা-মায়ের মুখ। মেয়েটা অবাক হয়ে শুনল ছেলেটার কথা। তারপর বলল, আমি কোনোদিন সাগর দেখিনি, আমার বাড়ি পাহাড়ে। ওখানে গা ছুঁয়ে উড়ে যায় কোমল মেঘ, পাখির মতো। সাগর আর পাহাড়ের গল্প ক্রমেই নিবিড় হলো দিনে দিনে। তারপর বিয়ে, সংসার এবং শেষে বুড়োবুড়ি। বুড়ো মরার আগে বুড়ির হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল, আমার মরার পর খুলবে। বুড়ো মারা যাওয়ার পর বুড়ি চিঠিটা খুলল। তাতে লেখা, লবণ দিয়ে চা আমি কখনই খেতাম না। তোমার সামনে থতমত খেয়ে চিনি বলতে লবণ বলে ফেলেছিলাম। আর বোকামি ঢাকতে অমন গল্প ফেঁদেছিলাম। তাই চল্লিশ বছর তোমার হাতে লবণ চা খেয়ে গেলাম। তোমার হাতের লবণ চা খুব মিষ্টি।
বুড়ি একদিন প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে গেল। তাকে চা দেওয়া হলো। বুড়ি বলল, একটু লবণ দিন। অবাক হয়ে প্রতিবেশী বলল, আপনি লবণ দিয়ে চা খাবেন নাকি? বুড়ি বলল, হ্যাঁ, লবণ চা খুব মিষ্টি।
-ভার্জিনিয়া।