করোনা যুদ্ধে সেনাপতি শেখ হাসিনার প্রশংসা করতেই হয়

মুহম্মদ ফজলুর রহমান
প্রতি বছর মার্চ মাসে আমরা বাংলাদেশের বাঙালিরা, সে স্বদেশে থাকি আর প্রবাসে, স্বাধীনতা দিবস নিয়ে যে রকম মেতে থাকি, এবার সে রকমটা ঘটেনি। করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দি জীবনে বুকে গভীর বেদনা নিয়ে আমরা সেই মহৎ বীরমুক্তিযোদ্ধাদের এবার সেই ধারায় স্মরণ করতে, শ্রদ্ধা জানাতে পারিনি। ঘরবন্দি কাটাতে হয়েছে বিশ্ববাসীর সঙ্গে বাঙালিদেরকেও।
মার্চ মাস আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাস। যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি বিপুল রক্ত, অগণন জীবনদানের বিনিময়ে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, সে সময়ের ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে, স্বাধীনতা উত্তরকালে যার পরিবর্তিত নাম সোহরাওয়ার্দি উদ্যান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরাধীনতার জিঞ্জির ভেঙে বাঙালিদের স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণে জগৎ সেরা সেই কালজয়ী ডাক- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এ সাড়া দিয়ে বাংলার কৃষক-মজুর-জেলে-তাঁতী-কামার-কুমোর, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে খেটে খাওয়া মানুষ জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনেন ৩০ লাখ মানুষের জীবন এবং দু’লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে। আমরা সেই বীরদের প্রতি গভীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি মার্চ মাসে। স্মরণ করি গভীর ঋণবোধে। এবার অতীতের ধারায় স্মরণ করা হয়নি মহাঘাতক করোনাভাইরাসের কারণে। এমন কি জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের সব আয়োজনকেও উৎসর্গ করতে হয়েছে মানুষের জীবনরক্ষার খাতিরে। তাই বলে আমরা যাঁদের অবদান আর আত্মত্যাগে স্বাধীন, তাঁদের বিস্মৃত হইনি। প্রতিবারের মতো এবার বাইরে সাড়ম্বর অনুষ্ঠান করা যায়নি, তবে অন্তরগত আয়োজনে মোটেও রঙ ও সাড়ম্বরের কমতি ছিল না।
আমরা ইতিহাসবিমুখ জাতি নই। এর স্বপক্ষে ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়। কেন হয়নি, কেন সম্ভব করা যায়নি- আগামীর ইতিহাস সে সাক্ষ্যও দেবে। আমরা এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি। করোনাকাল। বৈশ্বিক মহামারী। দেশ-কাল, বর্ণ-ধর্ম, ধনি-নির্ধন ভেদ নেই। করোনাভাইরাস জনপদের পর জনপদ বিরান করে চলেছে। মানব সভ্যতা আজ তার কঠিন অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। এক অদৃশ্য ঘাতকের সঙ্গে মানুষের এক অসম যুদ্ধ। এখন পর্যন্ত মানুষের অস্ত্র ভাণ্ডারের সব অস্ত্রই কোভিড-১৯-কে পরাস্ত করতে ভোঁতা বলে প্রমাণিত হয়েছে। কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের চেয়ে মানব-হন্তারক কোন অদৃশ্য শক্তি মানবশক্তিকে, মানুষের মেধা, প্রজ্ঞা এবং প্রকৃতিকে শাসন করার ক্ষমতাকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। বিশ্বযুদ্ধও বুঝি সমগ্র বিশ্বটাকে করোনার মতো এভাবে ঝাঁকুনি দিতে পারেনি।
এ রকম এক সংকটকালেও বাংলাদেশে কিছু কিছু ব্যক্তি-মানুষের কর্মতৎপরতা এবং কথাবার্তা কেবল পরিস্থিতিকেই ঘোলাটে করে তোলে না, অবস্থানগতভাবে মানুষের মধ্যে বিভক্তির রেখা টেনে দেয়ার প্রচেষ্টাও লক্ষ করা যায়। পাশাপাশি আবার কিছু কিছু মানুষের কর্তব্যবোধ, দায়িত্ব পালন, সহমর্মিতা সাধারণ মানুষকে সংকট মোকাবিলায় সাহস যোগায় এবং সমাধানের সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করে। প্রবাসীরা দেশের যে কোন সংকটকালে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তারা তাদের সামর্থ উজাড় করে দেন। কেন না তাদের বুকের মধ্যে সব সময় দেশের পতাকা ওড়ে, জাতীয় সংগীত গীত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দায়িত্বশীল কেউ কেউ এই সম্প্রীতির সম্পর্ক ভালো চোখে দেখতে চান না। তারা প্রবাসীদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যেনো আনন্দ পান। এই দু-একজনের মধ্যে এমনও আছেন, যারা প্রবাস ফেরৎ এবং প্রবাসীদের আবেগ-ভালবাসা পুঁজি করেই বর্তমান অবস্থানে।
করোনার এই মহাসংকটকালে যেখানে সবার মধ্যে ঐক্য, সহমর্মিতা, সহযোগিতা জরুরি এই শত্রু মোকাবিলা করতে, সে সময় এসব ব্যক্তি স্বদেশী এবং প্রবাসীদের মধ্যে বিভক্তির দেয়াল তুলে দিতে তৎপর। তাদের কথাবার্তায় এ কথাই মনে হয় যে, প্রবাসীরা দেশে না গেলে করোনাভাইরাস বাংলাদেশের পথ চিনতো না! বিষয়টি খুবই অসুন্দর, অপ্রত্যাশিত, অনাকাক্সিক্ষত এবং দুঃখজনকও। এ কথা সবাই-ই মনে রাখলে ভালো লাগবে যে, প্রবাসীরা বিপদে-আপদে আরো বেশি করে স্বদেশের পাশে দাঁড়ান। দেশের মানুষকে আরো নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নেন। দেশের একজন সাধারণ মানুষ যে কথা কখনও মুখে উচ্চারণ করেন না, সেই কথা যখন লেখাপড়া জানা বিশিষ্টজনদের মুখে অনায়াসে উচ্চারিত হয়, তখন যেমন হতাশ হন, তেমনি কষ্টও পান। তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও সন্দিহান হয়ে উঠেন।
দোষ, ভুল বা অসচেতনতা যদি কিছু প্রবাসীর থেকেই থাকে, সেক্ষেত্রে কি দায় আর কারো উপর কিছু বর্তায় না? ‘কার নিন্দা কর তুমি, এ তোমার এ আমার পাপ।’ এটুকু স্বীকার করে নিলে বোধ করি কেউই ছোট হয়ে যায় না। আশা করি প্রবাসীদের নিয়ে কেউ কোন মন্তব্য করার আগে তাদের অবদান এবং আবেগের বিষয়টির প্রতি নজর রাখবেন।
মনে রাখবেন, প্রবাসে থাকলেও প্রবাসীরা বিপদের সময়ে স্বদেশ এবং স্বজনের কাছে ফিরে যেতে চান। মৃত্যুর সময় সবাই প্রিয়জনের হাতে মুখে একটু পানি পড়ুক, কামনা করেন। প্রার্থনা করেন পিতা-মাতার পাশে তার শেষ জায়গা হোক। আমরা কি ১৯৭১-এ দেখিনি- মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৫ মার্চ পাকহানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে সবাইকে জীবিকার জায়গা ছেড়ে স্বজনের মাঝে আশ্রয় খুঁজতে গ্রামে ফিরে যেতে? যে নির্মমতার সঙ্গে যারা আজ বাংলাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রবাসীদের দায়ী করতে চাচ্ছেন, তারা কি আরো কঠোরতার সঙ্গে প্রবাসীদের দেশে ফিরতে বাধা দিতেন বা দেশে গিয়ে কঠোরভাবে কোয়ারেন্টিনে থাকতে বাধ্য করতেন? সেটাই অনেক ভালো হতো? তাই আসুন, কাউকে দোষ না দিয়ে আমরা একে অপরের সহযোগী হই। একে অপরের পরিপূরক হই। ত্রুটি যদি আরো থাকেও, সে ত্রুটি আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবেই কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করি।
এ প্রসঙ্গে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতির ভয়াবহতা। তিনি আজকের সময়ে রাজনীতিবিদদের করণীয় কী, সেটাও অনুভব করতে পারছেন একজন যথার্থ রাষ্ট্রনায়কের মত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সংকটময় মুহূর্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শাস্তি স্থগিত রেখে ৬ মাসের জন্য কারামুক্তি দিয়েছেন। এ রকম সময়ে শেখ হাসিনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এদিকে নজর না দিলেও পারতেন। কিন্তু তিনি সময়ের গুরুত্ব ঠিকই বুঝতে পেরেছেন প্রাজ্ঞতাসম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদের মত। এই মানবিক মনোভাবের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বিএনপি কতটা উপলব্ধি করে তাতে পজিটিভ সাড়া দিয়ে তাদের প্রধান নেতার মুক্তি স্থায়ী করতে পারবেন, এটা তাদের আগামীদিনের কার্যক্রমে প্রমাণিত হবে। যদি বেগম খালেদা জিয়াকে ফের জেলখানায় ফিরে যেতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে- বিএনপি নেতৃবৃন্দ সময়ের রাজনীতি সময়ে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।
জনগণের নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের জন্য কতটা উৎকণ্ঠিত-উদ্বিগ্ন করোনাকবলিত এই দুর্যোগে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২৫ মার্চ তাঁর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে। তিনি এ দুর্যোগে মানুষকে তাদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা কেবল দেননি, রাষ্ট্রের-জনগণের অভিভাবক হিসেবে তাঁর নিজের দায়িত্ব সম্পর্কেও কত সচেতন এবং আন্তরিক, তাও অনুভব করা যায় তার ভাষণে। তিনি প্রবাসী এবং দেশে বসবাসকারী সব নাগরিককে এই সংকটকালে জীবনযাপনের দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি মানুষকে গভীর মমতায় আশ্বস্ত করেছেন দেশের খাদ্য মজুদ ও পণ্য উৎপাদন নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য। সবাইকে সাবধান করেছেন মানুষের দুর্গতি নিয়ে কাউকে বাণিজ্য না করতে।
পাশাপাশি তিনি জরুরি প্রয়োজনে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন শ্রমজীবী মানুষ এবং ছোট-বড় শিল্প কারখানার করোনা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য। এছাড়া ৬ মাস অতিদরিদ্র মানুষকে খাদ্য সরবরাহের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। আজকের দুর্যোগময় মুহূর্তে জনগণের নেতা হিসেবে তাঁর কাছে আজ সর্বাধিক অগ্রাধিকার- মানুষের জীবন বাঁচানো। তিনি এখন সেই অগ্রাধিকার নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন। এর মধ্যে দু-একজনের দায়িত্বহীন কর্ম এবং মন্তব্য দুঃখজনক অবশ্যই। তবে একজনের সব সন্তান যেমন এক রকম হয় না, তেমনটা ভেবেই তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তিনি জাতির প্রতি সহমর্মী হয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সব কর্মসূচি স্থগিত করে দিয়েছেন।
করোনাভাইরাস আজ একটা যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মানুষকে জয়ী হতেই হবে। করোনার কাছে পরাজিত হয়ে মানবজাতি বিলীন হয়ে যেতে পারে না। যুদ্ধে যেমন প্রধান সেনাপতি সার্বিকভাবে সেনাবাহিনী পরিচালনা করে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক যুদ্ধকালীন সেই সেনাপতির দায়িত্বই পালন করে চলেছেন। এ যুদ্ধে আমরা অবশ্যই জয়ী হবো।
বাঙালি জাতির সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধু মুজিবের পর তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনাকে আমরা কান্ডারী হিসেবে পেয়েছি। তাই তুফান যতই ভারী হোক, সাগর যতই সংক্ষুব্ধ হোক, কান্ডারী আমাদের কূলে নিয়ে যাবেই! তাইতো জনককে স্মরণ করি আমাদের স্বাধীনতা এনে দেয়ার জন্য। আর তারই কন্যাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই সেই স্বাধীনতা সুরক্ষিত করার জন্য।
মার্চ মাসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ৩০ লাখ শহীদ, সব মুক্তিযোদ্ধাকে। করোনা নিপাত যাক। স্বাধীনতা অমর হোক।
(২০ মার্চ ২০২০, শুক্রবার। করোনার সূচনাকালে লেখা)।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, ঠিকানা।