করোনা সংক্রমণের বিষয়ে ডা. ফাউসির অভিনব তথ্য

এম.এস.হক : করোনাভাইরাসের লাগামহীন প্রলয় নৃত্য সমগ্র বিশ্বে বর্ণনাতীত ত্রাস সৃষ্টি করেছে। আমেরিকানরাসহ গোটা বিশ্ববাসী করোনার সর্বগ্রাসী ত্রাসের মুখে বর্ণনাতীত ভীতি-বিহ্বল জীবন কাটাচ্ছেন। শারীরিক সমস্যাগ্রস্ত এবং বর্ষীয়ানরা মৃত্যুর হাতছানির মুখে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। এমনতর বাস্তবতায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের নতুন অধিকতর ভীতিপ্রদ তথ্য পরিবেশন করেছেন ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক এবং ইউএস সায়েন্টিফিকের প্রধান মুখপাত্র ড. অ্যান্থনী ফাউসি। দ্য জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনকে ৩ মার্চ দেয়ার সাক্ষাৎকারে ড. ফাউসি বলেন : কোভিড-১৯ যে একটি বায়ুবাহিত রোগ তা বিশ্বাস করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ড. ফাউসি বলেন, করোনাভাইরাস শুধু পারস্পরিক সংস্পর্শ এবং সর্দি-কাশির ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায় না। বায়ুর মাধ্যমে এটি বাতাসের গতিতেই সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সর্দি-কাশির মাইক্রোড্রপলেটস করোনা সংক্রমণে কি ধরনের ভূমিকা রাখে তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। ড. ফাউসি বলেন, আমার বিশ্বাস করোনাভাইরাসে নিশ্চিতভাবে এরোসোলাইজেশনের মাত্রা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শুধু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটে তা সঠিক নয়। ড. ফাউসি বলেন, এখন আমাদের রিসার্কুলেশন অব এয়ার উইন্ডোজ (অভ্যন্তরীণ বায়ুপ্রবাহ) সম্পর্কেও নজর দিতে হবে। এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে ৭ জুলাই বলা হয়েছে বায়ুবাহিত গতিতে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা করোনাভাইরাসের রয়েছে।
পরিশেষে ড. ফাউসি বলেন, ঘরের বাইরে গমনের সময় করোনা সংক্রমণের ভয়ে আমরা মাস্ক পরিধান করি এবং ভিড়-ভাট্ট এড়িয়ে চলাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি। এখন প্রয়োজনে নিজেদের গৃহের অভ্যন্তরেও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আমেরিকায় করোনা গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আঁচ করা অসম্ভব
কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বর্ণনাকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি স্বাস্থ্য কর্মসূচির (হেলথ ইমার্জেন্সি প্রোগ্রামের) পরিচালক ড. মাইক রায়ান বলেছেন, সমগ্র বিশ্বের হেলথ সিস্টেমের উপর সরাসরি এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর আমেরিকায় নতুন করে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এলার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক এবং ইউএস সায়েন্টিফিকের প্রধান মুখপাত্র ড. অ্যান্থনী ফাউসি ২ আগস্ট বলেন : আমেরিকায় কোভিড-১৯ সম্পর্কে সঠিক ধারণা বা অনুমান করা পুরোপুরি কষ্টসাধ্য। আমেরিকাতে কোভিড-১৯ সূচনা পর্বে না-কি বিদায় নেয়ার পর্যায়ে রয়েছে তাও অনুমান করা পুরোপুরি অসম্ভব। মূলত আমেরিকাতে করোনার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা আমেরিকা থেকে করোনার বিদায় নেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে আমেরিকানদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণের ওপর। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণনানুসারে গত ৩১ জুলাই সমগ্র আমেরিকায় নতুন করে ৬৭ হাজার ২৩ জন আক্রান্ত এবং এক হাজার ২৫৯ জন করোনায় মারা গেছেন।
জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে : গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত সারা বিশ্বে আক্রান্ত এক কোটি ৮৪ লাখ এবং ৭ লাখ করোনায় মারা গেছেন। আমেরিকায় ৪৮ লাখ ৪০ হাজার আক্রান্ত এবং এক লাখ ৫৯ হাজার মারা গেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় : ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৯১৩; ফ্লোরিডায় ৪ লাখ ৫১ হাজার ৪২৩; টেক্সাসে ৪ লাখ ২০ হাজার ৯৪৬, নিউইয়র্কে : ৪ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৩ মারা গেছেন। আর মেক্সিকোতে ৪৯ হাজার লোক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া স্টেট স্টেট অব ডিজেস্টার জারি করেছে এবং মেলবোর্নের লাখ লাখ লোককে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
আমেরিকার মায়া ক্লিনিকের পরিচালক ড. মলি জেফেরী এবং তার সহকর্মীগণ কলোরাডো, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, নিউইয়র্ক এবং কানেকটিকাট থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছেন যে মার্চের শেষ ভাগ থেকে সমগ্র আমেরিকার হাসপাতালগুলোর ইমার্জেন্সি বিভাগের রোগীর সংখ্যা ৬৩.৫% হ্রাস পেয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তির হার ১৪৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকার অনেকগুলো স্টেট ভ্রমণকারীদের জন্য স্বাস্থ্য ফরম পূরণ এবং ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে। এ দিকে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের পক্ষ থেকে ১ আগস্ট বলা হয়েছে যে ২২ আগস্ট পর্যন্ত আমেরিকাতে ১ লাখ ৭৫ হাজার এবং নভেম্বর পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজার করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জর্জিয়ার ৮৭% ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ব্যবহৃত হয়ে গেছে স্বাস্থ্য বিভাগ ৩১ জুলাই দাবি করেছে। আবার জর্জিয়া সামার ক্যাম্পের কিডদের ৪০% এর করোনাপজিটিভ ধরা পড়েছে।
উইসকনসিন : জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে উইসকনসিনে করোনা সংক্রমণের হার ৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই নতুন সংক্রমণ প্রতিহতের লক্ষ্যে গভর্নর টনি এভারস ১ আগস্ট পাবলিক হেলথ আদেশ জারি করেছেন এবং প্রাইভেট রেসিডেন্স ছাড়া সকল অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মুখোশ পরা বাধ্যতামূলক করেন। ফ্লোরিডাতে গত কয়েক দিন ধরে প্রত্যহ আড়াই থেকে ৩০০ লোক করোনায় মারা যাচ্ছে এবং প্রত্যহ ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার নতুন করে আক্রান্ত। ফ্লোরিডাতে মোট আক্রান্তের সংখ্য ৪ লাখ ৭০ হাজার এবং মৃতের সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফ্লোরিডাতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার এবং মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজারে পৌঁছেছে। সম্প্রতি হাসপতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৯ হাজার লোক।
ভ্রমণকারীদের জন্য কোয়ারেন্টিন এবং স্বাস্থ্য ফরম পূরণ বাধ্যতামূলক করেছে আলাস্কা। পূর্ববর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেটধারী ভ্রমণকারীরা আলাস্কায় ৭২ ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করতে চাইলে তাদেরকে আলাস্কা অবস্থানকালে ১৪ দিনের জন্য সেলফ-কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। তা ছাড়া স্টেটের স্বাস্থ্য বিভাগ ফরমও পূরণ করতে হবে। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের পক্ষ থেকে ভ্রমণকারীদের বলা হয়েছে : গৃহে অবস্থান করার জন্য, অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা রাখার জন্য, নিজেদের স্বাস্থ্য মনিটর করা এবং স্টেট ও স্থানীয় সরকার প্রণিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য।
কানেকটিকাট : কানেকটিকাটে ২৪ ঘণ্টা অবস্থানকারী ৩৪টি স্টেটের ভ্রমণকারীদের জন্য ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে। পোর্টো রিকো কিংবা ওয়াশিংটন থেকে কানেকটিকাটে আগত বাসিন্দা এবং ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রেও আরোপিত বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য হবে। আইন অমান্যের ক্ষেত্রে ১ হাজার ডলার জরিমানা করা হবে। ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়াও ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে। তবে মেরীল্যান্ড ও ভার্জিনিয়া থেকে আগত এবং ২৪ ঘণ্টার কম অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে আইনটি প্রযোজ্য হবে না।
জর্জিয়া : নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি এবং কানেকটিকাট থেকে জর্জিয়ায় আগতদের জন্য ১৪ দিনের সেলফ-কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অমান্যের ক্ষেত্রে ৫০০ ডলার জরিমানা এবং ৬০ দিনের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
হাওয়াই : হাওয়াইও ১৪ দিনের সেলফ-কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে। আইন অমান্যের ক্ষেত্রে ৫০০ ডলার জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। তবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর থাকবে না।
আইডাহো : বয়েস এবং আডা কাউন্টির অন্যান্য সিটির ভ্রমণকারীদের জন্য ১৪ দিনের সেলফ-কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ইলিনয় : ইলিনয়ও ১৪ দিনের সেলফ-কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে।
শিকাগো : আলাবামা থেকে শিকাগোতে প্রত্যাবর্তনকারী এবং আগমনকারীদের জন্য ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আরকানসাস : সব ভ্রমণকারীর জন্য ১৪ দিনের সেফল-কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে। আইন অমান্যের ক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ৭০০ ডলার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
কেন্টাকী : কেন্টাকীতে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস : ১ আগস্ট থেকে অনলাইন হেলথ ফরম পূরণ এবং ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিউ হেম্পশায়ার : নিউ হেম্পশায়ারে ১৪ দিনের সেলফ কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক : নিউইয়র্ক আগেই ৩৪টি স্টেটের ভ্রমণকারীদের জন্য স্বাস্থ্য ফরম পূরণ এবং ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করেছে। নিউ জার্সি : নিউ জার্সিতেও ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিউ মেক্সিকো : নিউ মেস্কিকোতেও ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ওহাইও, পেনসিলভেনিয়া, রোড আইল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলিনা, ভারমন্ট এবং উইসকনসিনেও ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।