কর্ম ব্যস্ততায় বজ্রহতাহতদের সংখ্যা হ্রাসের সাম্ভাব্য উপায়

ড. মিঞা মোহাম্মদ আদেল : দেশের এক অনলাইন পত্রিকা পুলিশ রিপোর্ট, ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, চিকিৎসাকেন্দ্রের বরাত দিয়ে বজ্রহতাহতের খবর পরিবেশন করে থাকে। বিগত সাড়ে তেরো বছরের-২০০৭ থেকে ২০২০-এর জুন মাস অবধি-প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা যায়, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হচ্ছে সুনামগঞ্জ (১ নং চিত্র)। মাসের মধ্যে মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়ে থাকে (২ নং চিত্র)। বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা ২০১৮ সালে ছিল সর্বাধিক ছিল (৩ নং চিত্র)। হতাহতের অধিকাংশই মাঠে-ঘাটে কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকাদের মধ্যেই হয়ে থাকে। বজ্রপাতের ধর্ম অনুযায়ী হতাহতের সঙ্গে ধাতব পদার্থের জিনিসপত্র বজ্রাঘাতের অনুকূলে কাজ করে থাকে। বজ্রপাতের শিকাররা ঘরে-বাইরে অনেক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন।ধাতব পদার্থ বজ্রের প্রিয় বস্তু। পরিষ্কার আবহাওয়ায় বায়ুমণ্ডল থেকে ভূপৃষ্ঠগামী প্রাকৃতিক বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র স্থাপিত হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্র তৈরি হয়ে থাকে বাতাসে উপস্থিত বৈদ্যুতিক চার্জ দ্বারা। এই চার্জের উৎস হচ্ছে কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মি, মাটির র‌্যাডন গ্যাস ও বজ্রপাত। সমতল বা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যত উপরে ওঠা যায়, বায়ুমণ্ডলের ভোল্টেজের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ধাতব পদার্থ বিদ্যুৎ পরিবাহী বিধায় এর চারদিকে বিদ্যুৎক্ষেত্র ধাতব পদার্থের অনুপস্থিতির অবস্থার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর পরিষ্কার আবহাওয়ার প্রাকৃতিক বিদ্যুৎক্ষেত্র প্রায় ২০ গুণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে বজ্রবিদ্যুৎময় আবহাওয়ায়।
বাতাসে পজিটিভ ও নিগেটিভ দুই জাতের চার্জই বিদ্যমান থাকে। মেঘের নিচের দিকে নিগেটিভ চার্জ থাকে। এই নিগেটিভ চার্জের বিকর্ষণে লক্ষ্যবস্তু উপরের বাতাসের স্তম্ভের নিগেটিভ চার্জ মাটির দিকে ধাবমান হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় পজিটিভ চার্জের স্তম্ভ ঊর্ধগামী হয়ে থাকে। বজ্রের লক্ষ্যবস্তু হতে পজিটিভ চার্জের স্তম্ভ উপরে উঠতে থাকে। ভূপৃষ্ঠের ২০ থেকে ১১০ মিটার উচ্চতায় নিম্নগামী আঘাত ও ঊর্ধ্বগামী প্রত্যাঘাতের মিলন ঘটে থাকে আর মাটি ও মেঘের মধ্যে শর্টসার্কিট হয়ে থাকে। নিগেটিভ চার্জের মেঘ থেকে ইলেকট্রনের ঢল নামে।

বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতাসম্পন্ন বস্তু উত্তম লক্ষ্যবস্তু। এর উপর ভর করে ঊর্ধ্বগামী পজিটিভ চার্জের স্রোত সৃষ্টি করা অতি সহজ। কোনো পথচারীর সঙ্গে যদি ধাতব পদার্থের জিনিস থাকে, মাঠে কর্মরত যদি কোনো ব্যক্তির নিকট লোহার তৈরি হাঁসুয়া বা দা-কুড়াল থাকে, রাখালের চরানো গরুর গলায় যদি ধাতব ঘণ্টা বাঁধা থাকে, কোনো জেলে যদি ধাতব পদার্থের তৈরি গুটিসংযুক্ত জাল দিয়ে মাছ ধরতে থাকে, মাঠে বসে যদি মজুরেরা ধাতব বাসন-কোসনে খাওয়াদাওয়া করে, বাড়িতে মা-বোনেরা যদি লোহার তৈরি হাঁসুয়া-বঁটি দিয়ে তরিতরকারি কাটে বা ধাতব গহনা পরে বাইরে কাজ করে, কোনো ছাত্রী বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে যদি ধাতব কিছু সঙ্গে রাখে, তবে এই সবাই বজ্রমেঘের সহজ শিকার হবে মেঘলা দিনে বা বৃষ্টির মধ্যে। সঙ্গে ধাতব পদার্থের অনুপস্থিতিতেও এই সবাই বজ্রমেঘের সম্ভাব্য শিকার। জলীয় বাষ্পপূর্ণ বা বৃষ্টিতে ভেজা বাতাস শুষ্ক বাতাসের চেয়ে অধিক বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা রাখে। জলাশয়ের উপরের বাতাস জলীয় বাষ্পপূর্ণ। তাই এর বিদ্যুৎ পরিবহনক্ষমতা স্থলভাগের উপরের বাতাসের চেয়ে অধিক। বৃক্ষাদি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী থেকে অনেক উঁচু। প্রস্বেদনের দরুন তাদের মাথার উপরের বাতাসে বৃক্ষহীন স্থলভাগের বাতাস থেকে অধিক জলীয় বাষ্প থাকে। বজ্রের নিকট চতুর্দিকে ডালপালাবহুল বৃক্ষাদি থেকে ছোটখাটো ডালপালাযুক্ত লম্বা বৃক্ষাদি অধিক প্রিয়। মেঘাচ্ছন্ন দিনে তাপমাত্রার উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না ঘটলে বাতাসের আর্দ্রতার মান অনেক উঁচু হয়ে থাকে। বৃষ্টিতে ভেজা শরীর বা গোসলের পর ভেজা শরীরে বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
সম্ভাব্য কারণ ও বিকল্প ব্যবস্থা
আমাদের দেশের সব বয়সী মেয়েদের শরীরে সর্বদা কোনো না কোনো অঙ্গে অন্তত একটা ধাতব অলংকার থাকে। তা ছাড়া রান্নাঘরে বাসনকোসন, চামচ, কাটা-ছেঁড়ার যন্ত্রপাতি সবকিছুই ধাতব পদার্থের তৈরি। ছাত্রীরা যখন স্কুলে যায়, তারাও শরীরে কিছু ধাতব অলংকার ব্যবহার করে থাকে। হাতে ঘড়ি থাকতে পারে। মোবাইল ফোন থাকতে পারে। এক খবরে প্রকাশ ছিল যে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলায় বিদ্যালয়ের ছুটির পর ছাত্রীরা বারান্দায় অপেক্ষা করছিল। বৃষ্টির দরুন তাদের মধ্যে ২০ জন ছাত্রী বজ্রাহত হয়। বৃষ্টিভেজা বাতাসের বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার ফলে নিকটবর্তী কোনো বজ্রাঘাতের স্থান থেকে পার্শ্বঝলক এসে ছাত্রীদের ধরেছিল। তাদের নিকট ধাতব কিছু না থাকলেও সবাই বজ্রপাতের সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল। লেখকের নিজেরই এই অভিজ্ঞতা রয়েছে। বজ্রপাতের লক্ষ্য থাকে ধাতব পদর্থের বস্তু ও তার বহনকারীকে। ভিন্ন লক্ষ্যবস্তু থেকে লাফ দিয়ে বজ্রের ঝলক ধাতব পদর্থের বস্তু ও তার বহনকারীকে ধরতে পারে। রান্নাবান্নার জন্য মাটির বাসনকোসন ও কাঠের চামচ ব্যবহার করলে, শরীরে পুঁতির গহনা পরলে, আর মোবাইল ফোন ও চাবির রাবার কিংবা প্লাস্টিকের মোড়ক রাখলে বজ্রাঘাতের আশঙ্কা হ্রাস পেতে পারে। যারা মাঠেঘাটে কাজ করে থাকে, তারা লোহার তৈরি কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থাকে। কয়লা-ইস্পাতের (carbon-steel) তৈরি যন্ত্রপাতির বিদ্যুৎ পরিবাহী ক্ষমতা লোহার তৈরি যন্ত্রপাতি থেকে প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন গুণ কম। কয়লা-ইস্পাত বা কার্বন স্টিল নিষ্কলুষ ইস্পাত থেকে অধিক (২% থেকে ২.৫%) কার্বন ধারণ করে থাকে। তাই বসতবাটিতে কাটাকাটির জিনিসপত্র থেকে শুরু করে কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি যদি কয়লা-ইস্পাতের তৈরি করা হয়, তাহলে বজ্রাঘাতের আশঙ্কা কম হতে পারে। বাড়িঘর তৈরিতে কয়লা-ইস্পাতের পেরেক ব্যবহার করতে হবে। টিনের চালের পরিবর্তে মাটির তৈরি খোলার চাল ব্যবহার করতে হবে। মাটির বিদ্যুৎ পরিবহনক্ষমতা সিলভারের বাসনকোসন থেকে এক ট্রিলিয়ন গুণ কম।
পানির নিচে ডোবানোর জন্য মাছধরার জালে ধাতব ওজনের গুটি ব্যবহার করা হয়। ধাতবের পরিবর্তে চিনামাটির গুটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
গরু-বাছুরের গলায় যে ধাতব ঘণ্টা ঝোলানো হয়ে থাকে তা যেন কয়লা-ইস্পাতের হয়ে থাকে। গাছের নিচের আশ্রয় কোনোমতে নিরাপদ হয়ে থাকে না। পৃথিবীর নদ-নদী দিয়ে যে পরিমাণ পানি পড়ে থাকে তা ত্থেকে অধিক পানি পৃথিবীর গাছপালা বায়ুমণ্ডলে ছাড়ে। এ থেকে বোঝা যায়, বৃক্ষাদির ওপর বৃক্ষহীন স্থানের তুলনায় জলীয় বাষ্পের আধিক্য থাকে। আর জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ুর শুষ্ক বায়ু অপেক্ষা বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা অধিক। গাছপালা দীর্ঘকায় হওয়ার দরুন এরা সহজেই বজ্রের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সব জাতের বৃক্ষই বজ্রবান্ধব নয়। সরস লম্বাটে গাছপালা সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। লেখকের বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোনায় অনতিদূরে চতুর্দিকে ডালপালা ছড়ানো ওকগাছ রয়েছে। ওটাকে লক্ষ্যবস্তু না করে বজ্র তার বাড়িতে আঘাত হেনে সে আমলের কয়েক হাজার ডলারে তৈরি কাসমস মেড কম্পিউটার পুড়িয়ে ফেলেছিল। অথচ তার সহকর্মীর বাড়ির একই দূরত্বে অবস্থিত পাইনগাছের বাকলে ফাটা লক্ষ করেছিলেন, যা বজ্রাঘাতের দরুন হয়েছিল। ছোট ছোট ডালপালা সংবলিত পাইনগাছটা সোজা ঊর্ধ্বগামী ছিল। ইদানীং জনগণের মধ্যে বজ্রাঘাত থেকে পরিত্রাণ পেতে তালগাছ লাগানোর হিড়িক পড়েছে। কিন্তু পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে যে খেজুরগাছ অতি বজ্রবান্ধব। ষাটের দশকের মাঝামঝির ঘটনা। রাজশাহীর পুঠিয়ায় বড় বড় অনেক নারিকেলগাছ ও সুউচ্চ রয়েল পামগাছ ছিল জমিদারের খনন করা দিঘির প্রায় চার পাড়ে। এক দিঘির এক পাশে ছিল নারিকেলগাছগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দীর্ঘ উঠতি বয়সের একটা খেজুরগাছ। বজ্রধ্বনি শোনা যায়নি, কিন্তু বজ্র ওই খেজুরগাছকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তা ছাড়া BD24.NEWS.COM-এ প্রকাশিত (11 Sep 2018 05:39 PM BdST Updated: 11 Sep 2018 06:00 PM BdST) ৪ জন কৃষকের প্রাণহানির খবরে দেখা যায়, নিকটবর্তী স্থানে তিনটি তালগাছ ও ডালপালা সংবলিত কয়েকটি অন্য গাছও ছিল (৪ নং চিত্র)। কিন্তু বজ্র কৃষকদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। খেজুরগাছ এ জাতীয় অন্যান্য গাছের চেয়ে অধিক সরস, বর্ধিষ্ণু ও অর্থকরী।
গাছের নিচে আশ্রয় নিলে বজ্র গাছ থেকে লাফ দিয়ে আশ্রিত ব্যক্তি বা প্রাণীকে ধরবে। কারণ বজ্র খোঁজে মাটিতে প্রবেশের অপেক্ষাকৃত কম বাধাগ্রস্ত পথ। বাতাস থেকে কম বাধা দেওয়ার পথ গাছের সরস কাণ্ড, যা থেকে কম বাধা দিয়ে থাকে কোনো প্রাণীর দেহ। ধাতব পদার্থ প্রাণীর দেহের চেয়েও কম বাধা দিয়ে থাকে। যদি গাছের কাণ্ড থেকে আশ্রিত ব্যক্তি বা প্রাণী দূরে থাকে, তাহলে অসাবধানতাবশত ভূ-কারেন্টের কারণে মৃত্যু হতে পারে। গাছের কাণ্ড বয়ে বজ্রাঘাতের যে কারেন্ট মাটিতে প্রবেশ করে, তা গাছের শিকড় ও মাটির ভেতর দিয়ে চারদিকে প্রবাহিত হয়ে অর্ধগোলাকার স্থান দখল করে, যদি ওই মাটির বিদ্যুৎ পরিবাহী ক্ষমতা সর্বত্র একই রকমের হয়ে থাকে। যদি আশ্রিত ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তাকে পায়ের ওপর পা রেখে বা দুই পা পরস্পরকে স্পর্শ করে দাঁড়াতে হবে, যাতে করে দুই পায়ের একই ভোল্টেজ হবে এবং শরীরে কোনো বিদ্যুৎ প্রবাহ ঘটবে না। যেহেতু এটা একটা অস্বস্তিকর অবস্থান, তাই স্বস্তি পাওয়ার দরুন সেজদায় পড়তে হবে। কোনোমতেই পা দুটো আগে-পিছে করে দাঁড়ানো যাবে না। যদি সরে দাঁড়াতে ইচ্ছা করে, তবে তাকে লাফ দিতে হবে এমনভাবে, যেন সে অবিকল পূর্বের অবস্থায় নতুন জায়গায় এসে পৌঁছাতে পারে। আগে-পিছে পা পড়লে রেহাই পাওয়া যাবে না। তখন পা দিয়ে শরীরে কারেন্ট প্রবেশ করে বৈদ্যুতিক বর্তনী তৈরি করবে। মহিষ-গরু-ছাগল হলে তাদের চারটা পা যতদূর সম্ভব কাছাকাছি করে দাঁড়াতে হবে। নিদেনপক্ষে গাছের কাণ্ডকে কেন্দ্র করে কল্পিত দুই বৃত্তের সম্মুখের বৃত্তের ওপর দুই পা ও পেছনের বৃত্তের ওপর দুই পা থাকবে ও বৃত্তদ্বয়ের ব্যাসার্ধ যত সম্ভব কাছাকাছি হতে হবে। এ অবস্থায় অল্প কারেন্ট শরীরে ঢুকতে পারে। কোনোমতেই সম্মুখের পা দুটো আগে-পিছে করা যাবে না, পেছনের দুটোও না। অন্যথায় লেজ গুটিয়ে শরীরের ওপর রেখে ঘাড় উঁচু করে এক পাশে শুয়ে পড়বে চার পা পরস্পরকে স্পর্শ করে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের মহিষবাথানে ৭ মে ১০টি মহিষ মারা যায় (৫ নং চিত্র) (https://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/article1491890.bdne ws)। এই চতুস্পদ প্রাণীদের আত্মরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
জলাশয়ের নিকটবর্তী থাকাও নিরাপদ নয়। তাপ দিলে পানি বাষ্পীভূত হয়। আবার তাপ না দিলেও পানি বাষ্পীভূত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে চাষবাসের জন্য যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়, তার প্রায় ৪০ শতাংশ বাতাসে উড়ে যায়। এতে বোঝা যায় যে জলাশয়ের নিকট বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ জলাশয়ের দূরবর্তী স্থান অপেক্ষা বেশি। তাই বজ্রাঘাতের অনুকূলে যায়।
যন্ত্রচালিত খোলামেলা ট্রাক্টর বা ট্রলি বড়ই নিরাপত্তাহীন। খারাপ আবহাওয়ায় এগুলো না চালানোই উত্তম।
মাঠে কাজের সাবধানতা
মাঠে কর্মরত কৃষক-মজুরেরা সরাসরি বজ্রাঘাতে মারা যেতে পারেন কিংবা পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানের বজ্রাঘাতের দরুনও মারা যেতে পারেন। খারাপ আবহাওয়ায় দল বেঁধে একই সারিতে জমি নিড়ানি, ঘাসকাটা, ধানকাটা, পাটকাটা, মাটিকাটা ইত্যাদির মতো কাজ করা নিরাপদ নয়। বেশ আগে-পিছে হয়ে দুই পা পরস্পরের স্পর্শের মতো দূরত্ব রেখে ও দুই হাতও পরস্পরের মধ্যে একই রকম দূরত্বে রেখে নিড়ানির কাজ করলে একজনকে বজ্রাঘাত করলে অন্যরা রক্ষা পেতে পারে। দলের কাউকে বজ্রাঘাত করেছে জানতে পারলে নিজেকে রক্ষার্থে তাৎক্ষণিক দুই পা পরস্পরকে স্পর্শ করে, দুই হাঁটু পরস্পরকে স্পর্শ করে ও দুই হাতের অন্তত বৃদ্ধাঙ্গুলদ্বয় স্পর্শ করে সেজদায় পড়তে হবে। কাছাকাছি কোনো স্থানে বজ্রাঘাত হলে কর্মরত সবাইকে উপরের অবস্থায় সেজদায় পড়তে হবে। সেজদায় পড়লে বজ্রের বিদ্যুতের পার্শ্বঝলক ও ভূ-কারেন্ট থেকে হৃৎপিণ্ডকে রক্ষা করা যায়। কারণ অঙ্গদ্বয়ের মধ্যে যত বেশি দূরত্ব রাখা যায়, তত বেশি কারেন্ট শরীরের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। আর সেজদায় পড়লে আমাদের আন্তঅঙ্গ দূরত্ব সবচেয়ে কম হয়ে থাকে। মাঠে যারা দল বেঁধে কাজকর্ম করেন, তাদেরকে অভ্যাস বা মহড়ার মাধ্যমে এই প্রতিরোধব্যবস্থা আয়ত্ত করতে হবে। খোলা জায়গায় আটকে পড়া অবস্থায় যদি গায়ের চামড়ায় শিহরণ জাগায় বা চুল খাড়া হয়ে উপরে ওঠে, তবে বুঝতে হবে যে বজ্রাহত হওয়ার তাৎক্ষণিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থান করা হচ্ছে। এ অবস্থায় রক্ষা পেতে সরাসরি সেজদায় পড়তে হবে। মাথার উপরের মেঘের নিগেটিভ চার্জের আবেশে শরীরে পজিটিভ তৈরি হয়ে থাকে। শরীর থেকে মেঘ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়। পজিটিভ চার্জধারী মাথার চুল পরস্পরের বিকর্ষণে আলাদা ও খাড়া হয়ে যায়।
মে মাসের বজ্রপাত
বাংলার বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ইংরেজি মে মাসের অন্তর্গত। এই মাসে তাপ অত্যধিক বিধায় বাষ্পীভবন খুব বেশি হওয়া স্বাভাবিক। কৃষিকাজে ধান উৎপাদনের জন্য আমরা অনেক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে থাকি। শুধু ধান চাষ নয়, মাছ চাষেও আমরা পুকুরে ভূগর্ভস্থ পানি উঠিয়ে থাকি। কারণ এই সময়ে পুকুরও শুকিয়ে যায়। এই পানিই বজ্রমেঘ সৃষ্টির সহায়ক। ফারাক্কা-পূর্বকালে এমনভাবে পাইকারি হারে শেষ সম্বল উজাড় করা হতো না। পরিবেশে পানিচক্রের একটা স্থায়ী অবস্থা বিদ্যমান ছিল। এখন নতুন প্যাটার্ন শুরু হয়েছে। মে মাস বজ্রপাতের আধিক্য বাতাসে অতিরিক্ত বাষ্পীভবন দানের প্রতিফলন। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতও বিরাটাকায় অসংখ্য জলাধার নির্মাণ করে কৃত্রিমভাবে জল আটকে রেখে বাষ্পীভবনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে তার মাশুল দিচ্ছে। নিজেদের কৃতকর্মের দোষ চাপায় আবহাওয়া পরিবর্তনের ওপর। প্রমাণস্বরূপ জলাধারের আকাশের মেঘপুঞ্জের নাসার তোলা ছবির কথা বলা যায় (The Uttarakhand 2013 and Jammu-Kashmir 2014 Disasters – Upstream Effects of Water Piracy, African J. of Environ. Sci. & Techno. Vol. 12(1), pp. 21-68) পানিময় পরিবেশের দরুন সুনামগঞ্জে মাছের ঘেরে বেশি করে বজ্রাঘাত হয়ে থাকে অন্য সব স্থানের তুলনায়। তবে ক্ষয়ক্ষতি নির্ভর করে কত ঘন ঘন ও কত সংখ্যক লোক আনাগোনা করবে আর আকাশে কত ঘন ঘন বজ্রমেঘের সৃষ্টি হবে।
পরিশেষে বলা যায় :
১. প্রতিটি ঘরের জন্য বজ্রদণ্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। বজ্রদণ্ড হচ্ছে ঘরের ছাদের ওপর লাগানো এক ইঞ্চি ব্যাসের একটি ধাতব দণ্ড, যার উপরের দিকে লোহার পেরেকের গোড়ার মতো সুচালো প্রান্ত থাকে, যা থেকে একটি তার মাটির মধ্যে পুঁতে রাখা হয়। ঘরের ওপর যত চার্জের আবির্ভাব ঘটে থাকে তা সব এই দণ্ডের মাধ্যমে মাটিতে পৌঁছায়। ঘরের ওপর বজ্র পতিত হলে দণ্ড ও তার বয়ে বিদ্যুৎ মাটিতে হাজির হয়ে থাকে।
২. পাকা ঘরে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ। এই ঘরের পানি সরবরাহকারী ধাতব পাইপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী তার সহযোগে চার্জ মাটিতে চলে যায়।
৩. খারাপ আবহাওয়ায় বাইরে যাওয়া বন্ধ করতে হবে।
৪. গৃহস্থালিতে কাটাকাটির কাজে কয়লা-ইস্পাতের তৈরি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতে হবে।
৫. থালা-বাটি-গ্লাস মাটির তৈরি হতে হবে।
৬. দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত গহনাদি পুঁতির হতে হবে।
৭. ধাতব জিনিসপত্র কাছে রাখা চলবে না।
৮. কৃষিকাজের সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতি কয়লা-ইস্পাতের তৈরি হতে হবে। মাঠে দল বেঁধে কাজ করতে উপরের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
৯. বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত কোনো কিছু এমনকি ভিডিও গেমের লাইন পর্যন্ত স্পর্শ করা চলবে না।
১০. তারসংযুক্ত টেলিফোনও স্পর্শ করা যাবে না। তারবিহীন ফোন ও সেলফোন ঠিক আছে।
১১. গোসলখানায় গোসল করা বা রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিল ধোয়া চলবে না।
১২. উঁচু স্থান, খোলা জায়গা বা খোলা পানি থেকে দূরে থাকতে হবে। পানির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে। উঁচু গাছপালা থেকে বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা অন্যান্য উঁচু বা লম্বা জিনিস থেকে দূরে থাকতে হবে।
১৩. নিকটে উঁচু বৃক্ষাদি থাকলে তা থেকে দূরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া শ্রেয়।
১৪. ধাতব বস্তু, যেমন তারের বেড়া, গাড়ি, বাস, ট্রাক ও ট্রেনের উপরিভাগ, গলফ ক্লাব, গলফ কার, ছাতা, ফার্মের যন্ত্রপাতি ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে।
১৫. যন্ত্রচালিত খোলামেলা ট্রাক্টর বা ট্রলি, ভ্যান বড়ই নিরাপত্তাহীন।
১৬. উঁচু বৃক্ষ ও পাহাড়-পর্বতের মতো উচ্চ স্থান থেকে দূরে থাকতে হবে। নিয়মিত মহড়া করে উপরের অভ্যাসগুলোতে অভ্যস্ত হতে হবে।
১৭. জমির আইলে খেজুরগাছ রোপণ করতে হবে, যাতে করে আবাদি জমির অংশ নষ্ট না হয়।
আরো জানতে হলে লেখকের রচিত ‘সেজদায় অবস্থান বজ্রাঘাত থেকে পরিত্রাণ’ বইটি পড়ুন। বজ্রপাত অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে ফেলতে পারে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের জীবন নাশ করতে পারে। গৃহপালিত পশুর জীবন শেষ করতে পারে। জীবিকা অর্জনের জন্য আমাদেরকে মাঠে-ঘাটে যেতেও হবে। তাই সাবধানতার অভ্যাস করে সম্ভাব্য বিপদ এড়িয়ে চলা সবারই কর্তব্য। বাংলাদেশ সরকারের নিকট আমার অনুরোধ, পরীক্ষা সাপেক্ষে হলেও জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য আমার পরামর্শগুলো আমলে নিতে।
-অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান
আরকানস বিশ্ববিদ্যালয়, পাইন ব্লাফ, যুক্তরাষ্ট্র।