কাজ যখন নেশা

জান্নাতুল ফেরদৌসী মেহমুদ :

একটা সময় ছিল আমার বরকে অনেক লম্বা সময় কাজ করতে হতো। সে সময়টা আমি বাসার সবকিছু দেখাশোনা করতাম। তখন আমার দুই বাচ্চা ছোট ছিল। আমি নিজেও কিন্তু তখন ব্যাংকে জব করতাম। আমার বরের ক্যারিয়ার তখন তুঙ্গে। যথেষ্ট পরিশ্রমের প্রতিফলন হিসেবে সে কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটা প্রমোশন পেয়ে গেল। সেই সঙ্গে স্যালারি ইনক্রিজ এবং বোনাস তো আছেই।
বর যদি এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজে থাকে, অন্য কেউ হলে হয়তো এটা নিয়ে অনেক অভিযোগ করত। অভিযোগ করা তো দূরের কথা, বরং সে সময় আমি তাকে বোঝার চেষ্টা করেছি, ফুল সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে সে তার জবে উন্নতি করছে। পরিবার ও সংসারের অন্য কোনো ঝামেলায় যেন তার মাথা ঘামাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতাম।

একটা পর্যায়ে এসে সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে ছুটতে সে ক্লান্ত হয়ে যায়। সে পরিবারের মূল্য বুঝতে শুরু করে এবং পরিবারকে সময় দিতে থাকে। কিন্তু তত দিনে আমাদের জীবন থেকে পাঁচটা বছর চলে যায়। শুধু তা-ই নয়, ওকে ছাড়া একা একা সবকিছু সামাল দিতে দিতে, যেমন বাজার করা, রান্না করা, বাচ্চাদের আফটার স্কুল অ্যাক্টিভিটিস আনা-নেওয়া করা, বাচ্চাদের ডাক্তারের কাছে নেওনা, বাচ্চাদের খাওয়ানো গোসল করানো, তাদের যত্ন করা, বাসায় মেহমান এলে তাদের খেয়াল রাখা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কে কোথায় আছে সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করাÑএসব তত দিনে আমি এক হাতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। পরিবারের অনেক কাজেই তাকে এখন আর তেমন দরকার হয় না।
তারপর আমি আইটি সেক্টরে জব শুরু করি। এবার আমার ব্যস্ততা শুরু হতে থাকে। অফিসে প্রচুর সময় দিতে হয়। এমনও হয়েছে, অফিস থেকে বাসায় আসার পর কম্পিউটারে লগইন করে অনেক রাত অবধি কাজ করতে হয়েছে। অনেক উইকেন্ডে কাজ করতে হয়েছে। সে সময়টা আমার বর অবশ্য আমাকে সাপোর্ট করেছে। এদিকে কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার বরের মতো আমিও বেশ কয়েকটা প্রমোশন পেয়েছি, সঙ্গে স্যালারি ইনক্রিজ পেয়েছি। বোনাস পেয়েছি। পেয়েছি এমপ্লয়ি অব দ্য মান্থও। সেই সঙ্গে এমপ্লয়ি অব দ্য ইয়ার, সঙ্গে অনেক সনদ, ক্রেস্টÑআরও অনেক কিছু। ব্যস, আমাদের জীবন থেকে আরও পাঁচটি বছর চলে গেল। এই ব্যস্ততার জাঁতাকলে আমরা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এ সংঘর্ষে যা সবচেয়ে বেশি সাফার করেছে, সেটা হচ্ছে পরিবারকে যথাযথ সময় দেওয়া, পরিবারের সবাই একসঙ্গে মিলে সুন্দর সময় কাটানো।

আমেরিকায় আসার পর থেকেই আমার সব সময় ইচ্ছা ছিল এমন কোনো জব করব, যাতে বাচ্চাদের স্কুলে টাইমে সঙ্গে মিলে করা যায়। বাচ্চাদের কোনো প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যেন কোনো ছাড় না দেওয়া হয়। বাচ্চাদের স্কুলের টাইমের সঙ্গে মিলিয়ে জব করার জন্য যে জবগুলো আছে, তার মধ্যে ব্যাংকে জব, টিচিং কিংবা যেকোনো অফিসে জব। আমি এসব ফিল্ডেও কাজ করেছি। কিন্তু কাজের প্রয়োজনের তাগিদে ওভারটাইম করতে হয়েছে। এমনটা ছিল না যে ওভারটাইমে আমি এক্সট্রা ডলার আর্ন করতে পারছি। হ্যাঁ এটা ঠিক, ওভারটাইম করলে একটা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ থাকে। সেটা কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মুখ্য ছিল না।

এখানে যেকোনো কোম্পানিতে যেকোনো কাজের একটা ডিউ ডেট বা ডেডলাইন থাকে। সেই সময়ের মধ্যে অনেক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। আর করপোরেট ওয়ার্ল্ডে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয় শুধু নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। একপর্যায়ে অতিরিক্ত কাজ করতে করতে এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়, যেটা কিনা একটা নেশা বলা যায়। এভাবে দিনের পর দিন, তারপর মাসের পর মাস এবং বছর চলে যায়। আর একপর্যায়ে পরিবারের ওপর তার প্রভাব পড়ে।
আমেরিকায় দুটি বহুল প্রচলিত কথা আছে।

একটা হচ্ছে ওয়ার্কাহলিক আর আরেকটা হচ্ছে ব্যালেন্স ওয়ার্ক লাইফ অ্যান্ড ফ্যামিলি লাইফ। সেটা হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করলে দিনের পর দিন তারপর মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর এটা অনেক খারাপ প্রভাব ফেলে স্বাস্থ্যের ওপর। আমি জানি, প্রবাসে নিজেদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয় নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। কিন্তু আমার পরিচিত এক ডাইরেক্টর আমেরিকান মহিলা সকালে অফিসে আসেন একটা কফি নিয়ে এবং সারা দিন কাজ করে থাকেন। তারপর তিনি বাসায় গিয়ে কম্পিউটার লগইন করে অনেক রাত অবধি কাজ করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি উইথএন্ডও কাজ করেন। তিনি খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করেন না। আমার আরেক পরিচিত আমেরিকান ম্যানেজার আছে। তিনিও অনেক লম্বা সময় ধরে অফিসে থাকেন। আবার বাসায় গিয়েও কাজ করেন। কাজ করতে তারা এত ভালোবাসেন, খাওয়াদাওয়ার প্রতি তাদের কোনো সময়ই আগ্রহ দেখি না। তারা হচ্ছেন সত্যিকারের ওয়ার্কাহলিক।

তো যেটা বলছিলাম, আমি একজন মহিলা হয়ে অফিসের দায়িত্ব পালন করার পর বাসায় এসে আবার ঘর-সংসারের দায়িত্ব পালন করি। বাচ্চারা আমার প্রায়োরিটি ছিল সব সময়ই। তাদের সবকিছু আমি দেখাশোনা করতাম। আমি বাচ্চাদের সব প্রয়োজনকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিই এবং তাদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সেদিকে আমি বরাবরই লক্ষ রাখি। সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলছে, অফিসে প্রমোশন। আমার বরের মতো আমারও রেকোগ্নিশন এবং রিওয়ার্ড অ্যাওয়ার্ড, বাচ্চারাও বড় হয়ে যাচ্ছিল। জীবন চলতে থাকে, সময় কারও জন্য বসে থাকে না। একপর্যায়ে দেখা গেল, এত কিছু সামাল দিতে দিতে আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছি। যার ফলে পরবর্তী সময়ে আমাকে হসপিটালে ভর্তি হতে হয়েছে।

এত বড় একটা ধকল আসার পর আমি অনেকটা শিক্ষা পেয়েছি। পরিবারের মূল খুঁটি কোনো না কোনো নারী আর সে নিজেই ভালো না থাকলে কখনো তার পরিবারকে ভালো রাখতে পারে না। সে জন্য সেই নারীকে সুস্থ থাকা খুব বেশি জরুরি।

তাই এখন ওয়ার্ক লাইফ অ্যান্ড ফ্যামিলি লাইফ ব্যালেন্স করে চলতে হয়। সংসারের সব কাজ ভাগাভাগি করে করতে হয়। একজন রান্না করলে আরেকজনকে থালা-বাসন ধুয়ে দিতে হয়। একজন ঘর গোছালে আরেকজনকে ঘর ভ্যাকিউম করতে হয়। যেহেতু এখানে কোনো অতিরিক্ত হেল্পিং হ্যান্ড নেই, ঘরে-বাইরে মিলেমিশে একসঙ্গে ভাগাভাগি করে কাজ না করলে এখানে লাইফস্টাইল মেনটেইন করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।

বাচ্চাদের ছোটখাটো কাজগুলো শিখিয়ে দেওয়া যায়। যেমন লন্ড্রি করা, তারপর কাপড়চোপড় ফোল্ড করে গুছিয়ে রাখা। যার যার রুম, তাকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব দেওয়া। খিদে পেলে নিজে নিজে একটা স্যান্ডউইচ বানিয়ে খাওয়া। এসব ছোটখাটো কাজ করে করে বাচ্চারা দায়িত্বশীল হতে শেখে এবং নিজের একটা আত্মসম্মানবোধ জন্ম হয়। এভাবে প্ল্যানিং করে পরিবারের সবাই মিলে কাজগুলো ভাগ করে নিলে একজনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।

যেহেতু এখানে অফিস, বাসা, সংসার সবকিছু সামলাতে হয়। একটু প্ল্যানিং করে করলে কিন্তু সবকিছুই করা সম্ভব। তাতে করে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যাবে। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো যাবে। অফিসও মেনটেইন করা যাবে এবং নিজেরাও সুস্থ থাকা যাবে।