কাটা পড়ছে শতবর্ষীসহ দুই হাজার

পাবনা : ঝরে পড়া পাতা আর শুকনো ডাল কুড়ান হতদরিদ্র সমীরণ দাস। ৩০ বছর ধরে এভাবেই জীবন চলছে তার। ঈশ্বরদীর পাকশীর রাস্তার দুধারে লাগানো শতবর্ষী গাছগুলোর ঝরা পাতা আর শুকনো ডালগুলোই সবুজ-সতেজ রেখেছে তার জীবনকে।কিন্তু গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সমীরণ দাসের জীবন যেন পাল্টে গেছে। শুকিয়ে গেছে চোখমুখ আর চেহারা। শতবর্ষী গাছগুলোর গায়ে লাল রঙের চিহ্ন দেখে উদ্বিগ্ন তিনি। উদ্বিগ্ন তার মতো আরও অসংখ্য হতদরিদ্র ডালপালা আর পাতা কুড়ানো মানুষ। উদ্বিগ্ন এ পথ দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ। কারণ লাল রঙের ওই চিহ্নের অর্থÑ গাছগুলো কেটে ফেলা হবে। দীর্ঘ পথে শতবর্ষী গাছগুলো যে ছায়ার মাদুর বিছিয়ে দেয় রোদের সময়, উধাও হয়ে যাবে সেই দীর্ঘ মাদুর।

কেবল হতদরিদ্র জনগণ নয়Ñ পাকশীর প্রায় এক লাখ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষই এখন উদ্বিগ্ন। শুধু বৃক্ষ নয়, আবাসন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল হারানোর শঙ্কা তাড়িয়ে ফিরছে তাদের। কারণ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শুধু বৃক্ষের গায়ে লাল রঙের ক্রস চিহ্ন আঁকেনি, পাশাপাশি ঘোষণা করেছে পাকশী রেলওয়ে বাজার ও হাসপাতালের সামনের এলাকাসহ প্রায় ৭০৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য এই অধিগ্রহণ পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গত ২৪ জানুয়ারি স্থানীয়ভাবে এই অধিগ্রহণ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানাজানি হয়েছে।

একটি-দুটি নয়Ñ প্রায় এক হাজার বিশালাকৃতির বৃক্ষ রয়েছে শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যময় রেলশহর ঈশ্বরদীর পাকশীতে। পুরো একটি শতকের স্মৃতির স্মারক এসব গাছ। এ ছাড়া রয়েছে আরও হাজার খানেক নানা প্রজাতির গাছ, যেগুলো লাগানো হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। গত ৩ ফেব্রæয়ারি বিশাল এসব গাছে লাল রঙের ক্রস চিহ্ন এঁকে দিয়েছে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। শুধু ঐতিহ্য-ইতিহাস নয়, শুধু পরিবেশ নয়Ñ পাকশীর জনবসতিও বিপন্ন হবে এতে।

পাকশীর অস্তিত্ব রক্ষা কমিটির নেতাসহ শত শত এলাকাবাসী সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও পাবনা-৪ আসনের সাংসদ শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর কাছে তার বাসভবনে গিয়ে গত ৪ ফেব্রæয়ারি এ স্থানের শত বছরের ঐতিহ্য ও শতবর্ষী এসব গাছ রক্ষার দাবি করেছেন। এ সময় তিনি বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করা হবে।

পাকশীর প্রবীণ অধ্যাপক ও গবেষক আবুল কালাম আজাদ জানান, পাকশীর হাজার হাজার মানুষ এ ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে অনুরোধ জানিয়ে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন।

অধ্যাপক আজাদ জানান, ১৯০৮ সালে পাকশী শহরের গোড়াপত্তনের সময় ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন রাস্তার পাশে রেইনট্রি, কড়ই ছাড়াও মৌসুমি ফুলের স্থায়ী গাছ কাঞ্চন, রাধাচ‚ড়া, কৃষ্ণচ‚ড়া, জারুলসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়। এ গাছগুলো শত বছর ধরে পাকশীর রাস্তার দুপাশের শোভা বাড়িয়ে আসছে। রাস্তাগুলোকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করছে। মানুষজনকেও ছায়া দিচ্ছে। গাছচোরদের অব্যাহত অত্যাচারের পরও এক হাজারের মতো শতবর্ষী বিশালাকৃতির বৃক্ষ এখনও টিকে আছে। টিকে আছে জারুলগাছ।

মুক্তিযোদ্ধা, পাকশী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা হবিবুল ইসলাম হব্বুল জানান, এসব গাছ কেটে ফেলা হলে পাকশী তার শত বছরের ঐতিহ্য হারাবে।

ঈশ্বরদীর ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা লেখক কামাল আহমেদ তার ঈশ্বরদীর ইতিহাস গ্রন্থের ৫৮নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, শতবর্ষী এসব গাছ এখন এক একটি মহীরুহ, এক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ব্রিটিশ যুগে পাকশীর সবকিছুই ছিল ছিমছাম, সুবিন্যস্ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। পাকশীতে বিলেতি সাহেব, হিন্দু বাবু বা মুসলমান মুন্সি মৌলভী সবাই ছিলেন ফিটফাট। ইংরেজ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছাড়াও নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ যেমন বিহারি, উত্তর প্রদেশি, পাঞ্জাবি, মাদ্রাজি, শিখ বাঙালিসহ অনেকে বসবাস করতেন এই পাকশীতে। পথের ধারের এসব গাছের পাতা ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করা হতো। গত ৪ ফেব্রæয়ারি তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, এত বছর ধরে বেড়ে ওঠা এ গাছগুলো না কেটে বিকল্প চিন্তা করলেই ভালো হয়।শিক্ষক রেজাউল করিম বাবু বলেন, শত বছরের গাছগুলো কেটে ফেলার জন্য দেওয়া লাল ক্রস চিহ্ন দেখে অনেক মানুষ কান্নাকাটি পর্যন্ত করেছেন। পাকশীর অস্তিত্ব রক্ষা করার দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।

পাকশী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক, তা দেশবাসীর মতো পাকশীবাসীও চান। কিন্তু এ প্রকল্পের জন্য যারা ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়েছেন, তাদের জন্য বিশেষ করে রূপপুর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হোক।

কেটে ফেলার জন্য গাছ চিহ্নিত করার কাজে নিয়োজিত পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে অফিসের আইডবিøউ (ইন্সপেক্টর অব ওয়ার্ড) সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার তৌহিদ সুমন বলেন, রেলের জায়গার ওপর রোপিত শতবর্ষী এসব গাছ কেটে ফেলার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০০ বছরের বেশি পুরনো এক হাজার এবং ছোট-বড় আরও এক হাজার গাছে লাল ক্রস চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গণনায় যেন ভুল না হয়, সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী গাছ চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভাগীয় রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য চাওয়া এসব জমির মধ্যে প্রায় এক হাজার শতবর্ষী বিশালাকৃতির গাছ, অন্যান্য ছোট-বড় আরও এক হাজারসহ প্রায় দুই হাজার গাছ রয়েছে। পাকশী পদ্মা নদীতে দ্বিতীয় রেলসেতুর জন্য প্রয়োজনীয় ১১৪ দশমিক ৪৮ একর জমি ছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে ডিআরএম পাকশীর দপ্তর, ১৫টি বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তার কার্যালয়, বিভাগীয় ট্রেন কন্ট্রোল অফিস, রেলওয়ে জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়, রেলওয়ে পুলিশ লাইন্স, রেলওয়ে হাসপাতাল, পোস্ট অফিস, স্কুল-কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা গড়ে তোলা হবে পাকশীর রেললাইন থেকে ইপিজেডসহ প্রায় ৭০৬ একর জমির ওপর। সে কারণে এসব জমির সব স্থাপনাও উচ্ছেদ হবে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পাকশী রেলওয়ে কলেজ, পাকশী বাজার, বাবুপাড়া, ব্যারাকপাড়া, মেরিনপাড়া, পাকশী এমএস কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিপিএড কলেজ, পাকশী রেলওয়ে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, পাকশী রিসোর্ট, পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালের সামনের জায়গাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রেলওয়ে অফিসের কিছু অংশ।