কাঠগড়ায় চেহারা শনাক্তকারী প্রযুক্তি

ঠিকানা ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশ কর্তৃক আটককৃত অবস্থায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন জর্জ ফ্লয়েড নামক এক কৃষ্ণাঙ্গ। এই মৃত্যুর জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। মর্মান্তিক এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঘুরেফিরে আবারও বর্ণবৈষম্যের বিষয়টি সকলের সামনে আলোচিত হতে থাকে। বর্ণবৈষম্য নিয়ে ক্ষোভের মুখেই কাঠগড়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখচ্ছবি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো জনগণের চলাচল এবং সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। মুখচ্ছবি যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে প্রযুক্তিটি সাদাদের তুলনায় কালোদের চিহ্নিতকরণে ভুল করে বেশি। এতে করে প্রযুক্তির ভুলে প্রকৃত কৃষ্ণাঙ্গ অপরাধীর পরিবর্তে অন্য কেউ শনাক্ত হচ্ছে। আর এজন্য অনেক সময় নিরপরাধ মানুষকে হেনস্তা হতে হচ্ছে। কৃষ্ণাঙ্গ নারী এবং এশীয়দের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। অথচ শ্বেতকায়দের বেলায় প্রায় শতভাগ ঠিকঠাক ফলাফল দেয় প্রযুক্তিটি। বছরখানেক আগেই ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ উঠছিল। তবে এটি এতদিন পর্যন্ত শুধু আলোচনাতেই সীমিত ছিল। কিন্তু এবার এ প্রযুক্তি যে সচেতনভাবেই বর্ণবৈষম্যকে উস্কে দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে মার্কিনিরা, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গরা।
বিপজ্জনক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের কাজ সহজ করার জন্য একাধিক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তবে মুখের বিশ্নেষণ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক প্রযুক্তি। তথাকথিত ‘ফেসিয়াল অ্যানালাইসিস’ সিস্টেমগুলো আপনার আইফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনলক করা, কোনো ব্যক্তিকে একটি ভবনে প্রবেশাধিকার দেওয়া, কোনো ব্যক্তির বর্ণ চিহ্নিতকরণ বা মুখের কোনো স্পট মিলছে কিনা তা নির্ধারণসহ নানাভাবে ব্যবহার করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী চেহারা শনাক্তকারী প্রযুক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার করে থাকে। যেখানে তাদের সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। সমস্যাটি হচ্ছে মুখের বিশ্নেষণ সিস্টেমটি শতভাগ নির্ভুল নয়।
সফ্টওয়্যারটি ব্যর্থ হওয়ার বড় উদাহরণ হতে পারে অ্যামাজনের ফেস-আইডি সিস্টেম একবার ওপরাহ উইনফ্রেকে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল! আরেকটি মুখের শনাক্তকরণ প্রযুক্তি গত বছরের শ্রীলঙ্কা বোমা বিস্টেম্ফারণে সন্দেহভাজন হিসেবে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে ভুলভাবে চিহ্নিত করেছিল। এতে ওই শিক্ষার্থী মৃত্যুর হুমকির মুখে পড়েছিলেন। ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি নির্মাতা শীর্ষ তিন কোম্পানির দিকে নজর দিলে দেখা যাবে তাদের কোনোটিই শতভাগ নির্ভুলভাবে মানুষ চিহ্নিত করতে পারে না। এমআইটির গবেষণা বলছে, শীর্ষ তিনটি বাণিজ্যিক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি সাদা ত্বকের মানুষের চেয়ে কালো ত্বকের মানুষের চেহারা শনাক্তে ভুলভাল বেশি করছে। ভুল করার হার এশীয়দের চিহ্নিতকরণে আরও বেশি। গবেষণায় তারা দেখেছে, কৃষাঙ্গ নারীদের চিহ্নিতকরণে ভুলের হার ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত যা শেতাঙ্গদের তুলনায় ৪৯ গুণ বেশি! একটি ফলাফলে দেখা গেছে, দু’জন পৃথক ব্যক্তিকে একই ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করছে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি। ফলে পুরুষ এবং শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি বৈষম্য তৈরি করছে। নেটিভ আমেরিকানদের ক্ষেত্রে ভুয়া পজিটিভ রিপোর্ট তৈরির হার আরও বেশি। এ সমস্যার মারাত্মক দিকটি হচ্ছে, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো জনগণের চলাচল এবং সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, ফলে প্রযুক্তির ভুল তথ্য প্রদানের কারণে ভুয়া গ্রেপ্তার এবং ভুল মানুষ হয়তো এনকাউন্টারের শিকার হতে পারেন! তবে এই ভুলটি কিন্তু শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে করছে না সংশ্নিষ্ট প্রযুক্তি। যত বৈষম্য ওই কালো মানুষদের ক্ষেত্রে। বিশ্বখ্যাত একজন নারী সেলিব্রেটিকে এই প্রযুক্তি যদি পুরুষ হিসেবে শনাক্ত করতে পারে তবে কী ধরনের ভুল সে করতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন উঠেছে কালোদের ক্ষেত্রেই কেন এই ভুল বেশি করছে প্রযুক্তিটি।
মুখচ্ছবি শনাক্ত প্রযুক্তি নিয়ে নতুন ভাবনা
অ্যালগরিদমগুলো মানুষের মুখের লাখ লাখ ছবি দেখানোর পরে একটি মুখ শনাক্ত করতে শেখে। তবে, অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহূত মুখগুলো সম্ভবত সাদা মানুষের। এজন্য অ্যালগরিদমে ব্যবহূত হয়নি এমন কৃষ্ণকায় মানুষ চিহ্নিত করতে বেগ পাচ্ছে প্রযুক্তিটি। বিশ্নেষকরা বলছেন, হয়তো সাদাদের ক্ষেত্রে যে সংখ্যক মুখচ্ছবি বিশ্নেষণ নেওয়া হয়েছে কালোদের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। সভ্যতার বিবর্তনে কালোদের নিপীড়নের হার তো পুরোনো, কাজেই এটি হয়তো সচেতনভাবেই করা হয়েছে। ফেসিয়াল রিকগনিশনের বিরুদ্ধে যখন মানুষ ফুঁসে উঠেছে তখন পিছুটান দিয়েছে শীর্ষ নির্মাতারা।
সম্প্রতি অ্যামাজন নাগরিক অধিকারের সমর্থকদের চাপের ফলে তার বিতর্কিত ফেসিয়াল রিকগনিশন স্বীকৃতি পণ্য আগামী এক বছর পুলিশকে সরবরাহ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। আইবিএম সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি মানবাধিকারের প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করায় এটি নিয়ে গবেষণা ত্যাগ করে চলেছে। নীতিনির্ধারকরাও নতুন করে ভাবছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। প্রযুক্তিটির উন্মুক্ত স্থানে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা ও ঝুঁকি রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা, পাশাপাশি এর সমাধান বের করার জন্যই আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সর্বত্র ব্যবহার প্রযুক্তিটি ব্যবহার বন্ধ হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কের রাজ্যগুলো এই প্রযুক্তির পুলিশি ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য আইন বিবেচনা করছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য উন্মুক্ত স্থানে চেহারা শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আনার কথা ভাবছে ইউরোপীয় কমিশন। মূলত নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলো প্রযুক্তিটির অপব্যবহার রোধের দিকটি খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সময় চাইছে। অপরাধ-সংক্রান্ত চেহারা শনাক্তে প্রযুক্তিটি সাময়িক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়লেও নিরাপত্তাবিষয়ক প্রকল্প, গবেষণা বা যে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।