কামালা হ্যারিস ইতিহাসের এক অধ্যায়

এম আর ফারজানা : বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনে অনেক কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ডেমোক্র্যাট দল থেকে আনুষ্ঠানিক চূড়ান্তভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন কামালা হ্যারিস। অনেকের মধ্য থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন কামালা হ্যারিসকেই বেছে নেন। এখন শুধু জো বাইডেন নয়, ডেমোক্র্যাট দলের সবার পছন্দের তালিকায় আছেন স্পষ্টভাষী কামালা হ্যারিস।
কামালা হ্যারিসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হলেও তার মা ছিলেন একজন ভারতীয় আর বাবা জ্যামাইকান। হ্যারিসের মা শ্যামলা গোপালন দক্ষিণ ভারতের, তার জন্ম চেন্নাইতে। দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা, উচ্চতর শিক্ষা নিতেই এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়সে ব্রেস্ট ক্যানসার রিসার্চার হিসেবে যোগদান করে। একজন ক্যানসার গবেষক হিসেবেই তাকে চেনেন সবাই।
তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ২০০৯ সালে। তবে মা হিসেবে কামালার মাঝে যে স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন, তা আজ প্রকাশিত। বহুমুখী প্রতিভাধর, স্পষ্টবাদী, কামালা প্রতিকূলতাকে লড়াই করার অদম্য সাহস তিনি পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকেই। কামালা বলেন, তার মা তার বড় অনুপ্রেরণা। ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন কামালা।
বাবা প্রফেসর ডোনাল্ড হ্যারিস ও মা শ্যামলার বিচ্ছেদ হলে মা ছিলেন মূলত ছায়াসঙ্গী। কন্টক পথে চলার জন্য যে আদর্শ, সাহস দরকার তা কামালা মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন। স্রোতের প্রতিকূলে বা বাস্তবতার নিরিখে আজকের পর্যায়ে আসা কামালার জন্য সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কমলা হ্যারিসের আগে মাত্র দুজন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত হয়েছিলেন-২০০৮ সালে রিপাবলিকান পার্টি থেকে সারাহ পেলিন এবং ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেটদের থেকে জেরালডিন ফেরারো।

কামালা হ্যারিসই প্রথম সাউথ এশিয়ান-আমেরিকান, যিনি ডেমোক্রেট রাজনৈতিক দল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার একেবারে গ্রাসরুট থেকে উঠে এসেছেন তিনি। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনেটর হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।
আমেরিকার ২০২০ সালের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই দল এখন ব্যস্ত নির্বাচনী প্রচারণায়। দল অনেক থাকলেও মূলত লড়াই হয় ডেমোক্রেট আর রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে। কনজারভেটিভ রিপাবলিকানরা কামালা হ্যারিসের বংশোদ্ভূতের বিষয়টা সামনে এনে ফায়দা নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কামালা তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেই তা ব্যাখ্যা করেন। কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই কামালা বলেন তার বাবা-মায়ের কথা। তাদের শিক্ষা, রাজপথের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা। তিনি নিজেকে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পরিচয় দিলেও তার যে শিকড় সেখান থেকেও সরে আসেননি। বরং মায়ের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত।
আমেরিকানদের কাছে বংশোদ্ভূতের ইস্যুটা পাত্তা পায়নি। অনেকে ধারণা করছেন, বিষয়টা উল্টো হতে পারে। অর্থাৎ এশিয়ানদের ভোটের পাল্লাটা কামালার দিকেই যাবে।
কামালাকে একজন আমেরিকান বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক, দক্ষ ও সফল আইনজীবী হিসেবেই দেখছে সবাই। আর দেখবেই-বা না কেন, যার রাজনৈতিক ভিত এত মজবুত তাকে সহজেই শুধু বংশের দোহাই দিয়ে ছিটকে দেবে, তা কী করে হয়। সূত্র থেকে জানা যায়, ২০০৩-২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি সান ফ্রান্সিসকোর ২৭তম ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১০ ও ২০১৪ সালে তিনি পরপর দুবার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নির্বাচিত হন। ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ার পরই ২০১৬ সালের নভেম্বরে কামালা হ্যারিস ক্যালিফোর্নিয়ায় সিনেটর পদে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন।
সিঁড়ির ধাপে ধাপে পা রেখে আজ এ পর্যায়ে এসেছেন তিনি। আসলে জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা কামালা চেনেন সংগ্রামের পথটা। তার বক্তব্যে বলেন, লড়াকু মানুষের সংগ্রাম তার জানা। ন্যায়বিচারের সংগ্রাম কারো একার নয়, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান।
আমেরিকায় অলিখিতভাবে সাদা-কালোর বৈষম্য আজও বিরাজমান। কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার ঘটনা। কীভাবে গর্জে উঠেছিল পুরো আমেরিকা। প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিল সব অঙ্গরাজ্যে। কামালা বলেন, ‘বর্ণবৈষম্যের কোনো টিকা নেই, এর অবসানে সবাইকে মিলে একসাথে কাজ করতে হবে। সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একযোগে কাজ করতে হবে। সমষ্টির মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো একক ব্যক্তির মুক্তি হয় না।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। কালোদের ভোটব্যাংক যাবে কামালার ঝুলিতে। অনেক রিপাবলিকানও ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত তার কর্মকাণ্ডের জন্য। ফলে তারা এবার বেছে নিতে পারেন রাজনৈতিক দূরদর্শী কামালাকে। কামালা স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কার, অবৈধ অভিবাসীদের নাগরিকত্বের জন্য ড্রিম অ্যাক্ট সমর্থন করেছেন, তা সবার জানা।
রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে নিয়ে অনেকের মাঝে হতাশা কাজ করছে। বিশেষ করে, করোনা পরিস্থিতিতে চেক থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যপারে ট্রাম্পের অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের পছন্দ নয়। করোনা মহামারিতে লাখো মানুষের প্রাণ হারানো, বেকারত্ব সবকিছুর জন্য ট্রাম্প অনেকখানি দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন। তা ছাড়া করোনার কারণে এবার নির্বাচনে ডাকভোটের তোড়জোড় শুরু হয়েছে এখন থেকেই। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে আগামী মাস থেকেই ডাকযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হবে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এবার ১০ গুণ ভোট ডাকযোগে হবে।
বাইডেন-কামালা এরই মধ্যে আমেরিকাকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন। আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন এক মাত্রাও যুক্ত হয়েছে তাদের ঘিরে। বিশেষ করে, কামালা হ্যারিসকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত এশিয়ান কমিউনিটি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কামালা কালো এবং এশিয়ানদের ভোট নিজের ঝুলিতে নিতে সক্ষম হবেন। চলছে জরিপ। যদি নির্বাচনে কামালা-বাইডেন জয়লাভ করেন, তবে কামালার জন্য হবে এক নতুন ইতিহাস।
কামালা নির্বাচিত হলে তিনি এ দেশের প্রথম আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসের অংশ হবেন। সেই সাথে প্রথম এশিয়ান আমেরিকান বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে রচিত হবে ইতিহাস। নিজেকে নিয়ে যাবেন এক অন্যন্য উচ্চতায়। সৃষ্টি হবে ইতিহাসের আরেক অধ্যায়। লেখক : কলামিস্ট, নিউ জার্সি।