‘কারবেলার মর্মকথা’

শামীম আরা ডোরা : মহররম মাস। বিষন্নতার একটি মাস। প্রতিটি মুসলমান অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে সেই ঐতিহাসিক নারকীয় কাহিনী মনে করতে চেষ্টা করে। যে যেভাবেই এই ঘটনা উপলব্ধি করার চেষ্টা করুক না কেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (স.) এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের সদস্যরা যেভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন মানবতার বিরুদ্ধে এটা শ্রেষ্ঠ চরম অপরাধ, কোনো সন্দেহ নেই।
কারবালার নৃশংস ঘটনায় ছোট্ট শিশু, নারী কেউই রেহাই পায়নি। একজন মুসলমান হিসেবে আমি যখন সেই হিংস্র তাণ্ডবলীলা মনের চোখ দিয়ে অবলোকন করি তখন সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলতে বসি। আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন বাংলা বিষয়ে কারবালার অবর্ণনীয় ঘটনা আরো ভালো করে জানি। আমাদের শিক্ষিকা রোখসানা আপা নীরবে, নিশ্চুপে সেই ঘটনা বুঝিয়ে দেন, আমি বুঝতে পারি প্রতিটি সহপাঠীর দুটি চোখে অশ্রুকণা বয়ে যাচ্ছিল।
আমি আমার দুর্বল মস্তিষ্কে আজো স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে পারিনি, নিজেকেই প্রশ্ন করি কেন নারী-শিশুদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হয়েছে? কেন ছোট্ট শিশু পানির পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছিল? কেন এই অমানবিক আচরণ প্রদর্শন করা হয়েছিল?
কারবালার নিষ্ঠুরতা শেষ হয়েছে। হাসান ও হোসাইন শহীদ হয়েছেন। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘন আজও অব্যাহত আছে। আজও আমরা টিভির পর্দায় সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, আফ্রিকার দেশগুলোতে নারী ও শিশুর ওপর বর্বোরোচিত হামলা দেখতে পাই। বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার প্রতিফলন দেখতে পাই। এর কারণ হিসেবে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকার সুযোগ রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক পরিবর্তন ঘটে এবং যা স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তার লক্ষ্যে আজও গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
পৃথিবীতে যেমন যুদ্ধ ছিল, যুদ্ধ আছে, যুদ্ধ থাকবে। তবে প্রতিটি যুদ্ধেই নারী, শিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও শক্তি প্রদর্শণে বিরত থাকার আহ্বান থাকতে হবে। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার আন্দোলন ত্বরান্বিত হওয়ার যৌক্তিকতা আজও রয়েছে।
পৃথিবীর আর কোনো যুদ্ধেই যেন নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ওপর বিরূপ আচরণ প্রদর্শন করা না হয় এই মানবিক ইচ্ছার মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের আপস থাকা প্রয়োজন। প্রগতিশীল মানবিক বিকাশের গুরুত্ব আজ সর্বাধিক। সামাজিক মানদণ্ড ও মূল্যবোধে যেকোনো যুদ্ধেই নারী-শিশুর নিরাপত্তা সংরক্ষণ করে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকার বলিষ্ঠ আহ্বান থাকতে হবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ কারবালার ঐতিহাসিক কাহিনী। বিশ্বব্যাপী মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্যই যেকোনো যুদ্ধকেই আর সমর্থন নয়, স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যেই প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রয়াস ও সহযোগিতার সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। কারণ কারবালার ঐতিহাসিক কাহিনীর মর্মকথা এ প্রচেষ্টারই বাস্তব রূপায়ণ।
ব্যথিত মানবের ধ্যানের ছবি প্রিয় নবী (স.) সত্যের জন্য, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যে নিদর্শন রেখে গেছেন, সেই সূত্র ধরেই আমরা বলব যুদ্ধ কারোই কাম্য হতে পারে না। আমরা শান্তি খুঁজছি। করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায় সাত শ কোটি মানুষ আজ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। চাইলেই যুদ্ধ নামক এই শব্দটির বিপক্ষে অবস্থান করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা।
কারবালার সেই বর্বরোচিত আক্রমণ পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নিন্দনীয় অপরাধ। কারবালার সেই দানবীয় হিংস্র খেলার বীভৎস চিত্র প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে যন্ত্রণা দিচ্ছে। আজও সেই হৃদয় বিদারক কাহিনী মানুষ ভুলতে পারেনি। কেউ কেউ যন্ত্রণায় নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে। এজিদ, সীমারের সহযোগিতায় প্রিয় নবী (স.) এর দৌহিত্র ও তার পরিবারের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়ে যায়, তাতে সারা জাহানের মুসলমানের হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যায়। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন এই শোক মানবজাতি বয়ে বেড়াবে। যতদিন চন্দ্র-সূর্য থাকবে ততদিন আমরা বিষন্ন নয়নে প্রিয় নবী (স.) এর দৌহিত্র তার পরিবারের কারবালার মর্মকথা স্মরণ করব।
কাঁদছে মানুষ
ভাসছে জীবন
ভাসছে প্রাণের প্রাণ
এজিদ সীমার বর্বরতার
শ্রেষ্ঠ উদাহরণ!
লেখিকা : অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা, বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নিউইয়র্ক প্রবাসী।