পুরান ঢাকার কারাগারে খালেদা জিয়ার দিনগুলো

রাজনৈতিক ডেস্ক : পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে বন্দী হিসেবে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৩ দিন পার করেছেন। কারাগারে ইবাদত-বন্দেগিতেও সময় পার করছেন তিনবারের এ সাবেক প্রধানমন্ত্রী। স্বাভাবিক খাবার খাচ্ছেন। ১৩ দিনে মাত্র একবার স্বজনদের দেখা পেয়েছেন তিনি। আরেক দফায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ কয়েকজন আইনজীবী। তবে ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যক্তিগত গৃহকর্মী মোছাম্মৎ ফাতেমাকে পেয়েছেন খালেদা জিয়া। তার কারামুক্তি নির্ভর করছে উচ্চ আদালতে আপিলের ওপর।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সাজা দেন বিচারিক আদালত। রায়ের পর বিকাল সোয়া ৩টায় রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে। সেখানে প্রশাসনিক ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে রাখা হয় তাকে। সেটি একসময় সিনিয়র জেল সুপারের অফিস কক্ষ ছিল।
কারাগারের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চেহারায় কোনো আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা কিংবা তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। সময়মতো নাশতা, দুপুর-রাতের খাওয়া এবং নামাজ আদায় করছেন তিনি। ডিভিশনের জেলকোড অনুসারে তাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে অজু করে প্রথমে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন এবং দোয়া-দরুদ পড়ার পর ফজরের নামাজ আদায় করেন। নির্জন এ কারাগারে দিনের বেলায় মাঝেমধ্যে শুয়ে-বসে ও গল্প করে সময় কাটছে তার। নিয়মিত সংবাদপত্রও পড়ছেন। তিনটি সংবাদপত্র তাকে দেওয়া হচ্ছে। খাবারও ঠিকমতো খাচ্ছেন এবং রাতে নিয়মিত ঘুমাচ্ছেন বলে তারা জানান।
৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৩টায় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান তার ভাইবোনসহ চার স্বজন। তাদের সঙ্গে ছিল কিছু খাবার ও ফল। তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা স্বজনরা কারাগারে সময় কাটিয়ে বিকাল সোয়া ৫টায় বেরিয়ে আসেন। ওই দিন গিয়েছিলেন তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাদের ছেলে ফায়েক ইস্কান্দার এবং মেজো বোন সেলিনা ইসলাম।
একই দিন সকালে স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতার স্ত্রী ফল নিয়ে কারাগারের সামনে গেলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ওই দিন দুপুরে গিয়েছিলেন বিএনপির তিন নেত্রী অ্যাডভোকেট আরিফা জেসমিন, নেত্রকোনা জেলা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেহানা তালুকদার ও সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি উম্মে কুলসুম রেখা। তাদেরও ফিরিয়ে দেয় পুলিশ।
৯ ফেব্রুয়ারি বিকালে সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার পর ডিভিশন সুবিধা দেওয়া হয়নি। তাকে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা হয়েছে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানকে এভাবে কারাগারে সাধারণ কয়েদির মতো রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল।
১০ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে সরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারের ভেতরে নারী সেল এলাকারডে কেয়ার সেন্টার ভবনের দ্বিতীয় তলায়। যেখানে একসময় নারী বন্দীদের শিশুসন্তানরা থাকত। ওই দিন খালেদা জিয়ার সময় কাটে নারী কারারক্ষীদের সঙ্গে। বিকাল সাড়ে ৪টায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান পাঁচ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, আবদুর রেজ্জাক খান, এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব হোসেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আইনি ও দলীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে কারাফটকে সাংবাদিকদের জানান তারা।
১১ ফেব্রুয়ারি সকালে খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। বেলা ১১টার পর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ শুনানি শেষে বিচারক আখতারুজ্জামান জেল কোড অনুযায়ী কারাগারে ডিভিশন দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে খালেদার ব্যক্তিগত গৃহকর্মী ফাতেমাকেও রাখার নির্দেশনা দেন আদালত। সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া। বিকালে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে ডিভিশন ও গৃহকর্মী রাখার আদেশ পৌঁছে দেন আইনজীবীরা। এরপর গৃহকর্মী ফাতেমাকে খালেদার সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে খালেদার সঙ্গেই ফাতেমা আছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এর পরের দিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আর কাউকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। অন্যান্য দিনের মতো কারাগারে নারী কারারক্ষী ও ব্যক্তিগত গৃহকর্মী ফাতেমার সঙ্গে, টিভি দেখে ও পত্রিকা পড়ে তিনি সময় কাটাচ্ছেন বলে জানায় কারা সূত্র। ওকালতনামাসহ কিছু কাগজপত্রে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর আনতে ১৩ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান সানাউল্লাহ মিয়াসহ কয়েকজন আইনজীবী। কিন্তু তাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তাই তারা কাগজপত্রগুলো কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন।
১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টার দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অনুমতি চাইতে কারাফটকে যান ড্যাব-সমর্থিত সাত চিকিৎসক। কিন্তু অনুমতি না পেয়ে দুপুর আড়াইটায় তারা কারাফটক ত্যাগ করেন। একই দিন কোস্টগার্ড বাহিনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ কারাগার থেকে অন্য কোনো স্থানে খালেদা জিয়াকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেই। তাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েই সুন্দর পরিবেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় (সাবেক) কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি সেখানে ভালো আছেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টায় ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হকের নেতৃত্বে ড্যাব নেতারা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান। পরে তারা কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজন) কার্যালয়ে একটি আবেদনপত্র জমা দেন। কারাফটকের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ডা. আজিজুল হক জানান, কিছুদিন আগেই খালেদা জিয়ার দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এই পরিবেশে তিনি কীভাবে চলাফেরা করবেন, সেই পরামর্শ দিতেই তারা এসেছিলেন।
এদিকে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সারা দেশে জেলা প্রশাসকদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে বিএনপি। এটি বিএনপির তৃতীয় দফা কর্মসূচি। এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি, ১০ ফেব্রুয়ারি থানা, উপজেলা, জেলা মহানগরে প্রতিবাদ সমাবেশ, ১২ ফেব্রুয়ারি মানববন্ধন, ১৩ ফেব্রুয়ারি অবস্থান কর্মসূচি ও ১৪ ফেব্রুয়ারি অনশন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির এ পাঁচ দিনের কর্মসূচি পালন ছাড়াও বিদেশি কূটনীতিক, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধি, পেশাজীবী, আইনজীবী, ২০ দলীয় জোটসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের সিনিয়র নেতারা।