কারা আসছেন মন্ত্রিসভায়?

ঢাকা অফিস : করোনা পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্ব থেকেই সহসা যাচ্ছে না। আর দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখানে হৃদ্্রোগ, ক্যানসার, লিভার সিরোসিসের মতো বিশাল ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার জন্য ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীরা একে চরম নিষ্ঠুরতা, নির্মম রসিকতা বলেই মনে করছেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজকল্যাণ পরিষদ ও সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে অসহায়, দরিদ্র, দুস্থদের নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে আর্থিক সাহায্য করা হয়। ক্যানসার, হৃদ্্রোগ, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতাসহ বিভিন্ন জটিল ও বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ রোগের চিকিৎসার অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সমাজকল্যাণ পরিষদকে ৩৭ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আবেদন করা হয় ৬৫ হাজার। বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ৬ হাজার আবেদনকারীকে। তাও কেবল মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা, আত্মীয়স্বজন ও পছন্দের লোকদের মাথাপিছু ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। মারাত্মক, জটিল রোগে আক্রান্তদের সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য রোগ, সন্তানদের বিয়ে, পড়াশোনাসহ জরুরি প্রয়োজনে অর্থ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবেদনও করা হয় হাজারে হাজার। কিন্তু অনুমোদন দেওয়া হয় নগণ্য সংখ্যক আবেদনকারীর আবেদন। বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণও অতি সামান্য, যা রোগীর চিকিৎসা, কন্যার বিয়ের নামে কন্যাদায়গ্রস্ত, দুস্থ পিতার সাথে মন্ত্রণালয়ের নিষ্ঠুর রসিকতা বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অর্থ বরাদ্দ করে থাকেন সরাসরি মন্ত্রী। অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অন্যান্য মন্ত্রী, এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির সুপারিশও বিবেচনায় নেন না।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর ও সমাজকল্যাণ পরিষদ দেশের অসহায়, দুস্থ, দরিদ্র মানুষের সাহায্যের অন্যতম মাধ্যম হলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দলীয়, গোষ্ঠীস্বার্থে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয় স্বার্থে এখানকার সব অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে বিগত জোট সরকারের সময়। বিএনপি-জামায়াতের ওই সরকারে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন জামায়াতের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। শতকরা ৯৫ ভাগ অর্থই প্রদান করা হয় জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের এবং তাদের অধিভুক্ত ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে। ইসলামি সংগঠনগুলোকে ধর্মীয় পুস্তক ক্রয় এবং ইসলামি জলসা, আলোচনা সভা, জামায়াত নেতাদের দিয়ে ওয়াজ-মাহফিল অনুষ্ঠান, ধর্মীয় প্রচারকাজের নামে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। প্রতিটি সংগঠনকে বছরে একাধিকবার ৫০ হাজার টাকা করে অর্থ দেওয়া হয়। অথচ বছরে একবারের বেশি অর্থ প্রদানের বিধান নেই। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের চিকিৎসা, শিক্ষা, পুস্তক ক্রয়সহ বিভিন্ন অজুহাতে ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়। জোট সরকারের সময় বিএনপির অনেক কর্মী মন্ত্রীর সুপারিশসহ আবেদন করেও অর্থ বরাদ্দ পাননি। সরকারের পরিবর্তন হওয়ার পর এ চরম অব্যবস্থা, অনিয়ম, দুর্নীতিরও অবসান হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। বিগত সরকারে স্বল্প সময়ের জন্য সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন রাশেদ খান মেনন। তার সময়েও অনিয়ম হয়েছে। বরিশাল জেলার মধ্যেই প্রতিষ্ঠান দুটির বরাদ্দ কেন্দ্রীভ‚ত ছিল। তবে মেনন মন্ত্রী থাকাকালে তার দলীয় নেতাকর্মী, বরিশালের দলীয় লোক ও স্বজনদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল সংগঠন, প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের নেতাকর্মীদের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। কিন্তু পরে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় নুরুজ্জামান আহমেদ নামের একজনকে। লালমনিরহাট জেলার এই এমপি জাতীয় পর্যায়ে, এমনকি জেলা পর্যায়েও ব্যাপকভাবে পরিচিত নন। দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরে মন্ত্রণালয়ের সমাজকল্যাণ কোনো একটি প্রকল্পও সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্প নিজের পছন্দের লোকজনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। বরাদ্দ করা অর্থ নিয়েও ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে মারাত্মক পাঁচটি রোগের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দের বিধান রয়েছে। ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস প্রভৃতি মারাত্মক রোগের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকাও সামান্য। কিন্তু এই অর্থও দেওয়া হয় না। সকল ক্ষেত্রেই সমাজকল্যাণ পরিষদ ও অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রীর দফতরে প্রস্তাব পাঠানো হয়। সমাজকল্যাণমন্ত্রী নিজে অর্থ বরাদ্দ দেন। উল্লিখিত রোগের চিকিৎসার জন্য দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছেন। বরাদ্দ প্রাপক অনেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই অর্থ প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ লালমনিরহাট, বৃহত্তর রংপুরসহ মন্ত্রী তার নিজস্ব লোকদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। গত অর্থবছরে এভাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং অর্থ নয়ছয় হয়েছে। মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব, মন্ত্রীর ভাইপো এবং অধিদপ্তর ও পরিষদের বিপুল অঙ্কের অর্থ অবৈধভাবে সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ভুয়া নামে অনুমোদন করিয়ে সেই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রতিষ্ঠান দুটিতে বিশাল অঙ্কের অর্থ হরিলুটের ঘটনা উদ্্ঘাটিত হবে।