কুরআনের প্রতি ভালোবাসার প্রয়োজনীয়তা

আল-কুরআনের প্রতি অকৃতিম ভালোবাসা এবং দৃঢ় সম্পর্কই মানুষকে সব রকম অন্ধকার ও ধ্বংস থেকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টি করে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে স্বস্তি-শান্তি। পাশ্চাত্যেও যারা আল্লাহ তাআলার রহমতে ইসলামের আলোতে ফিরে এসেছেন, তাদের অনেকের ইসলাম পূর্ববর্তী জীবনের কাহিনী জানার সুযোগ আমার হয়েছে। আল-কুরআনের অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ১: আলিফ-লাাম-রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি- যাতে তুমি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন- পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য প্রতিপালকের নিদের্শে তারই পথে দিকে [ইসলামের পথে]।{১৪-ইব্রাহীম}। যাহোক, উম্মাহর অধিকাংশই আল-কুরআনের যে দাবী সম্পর্কে উদাসীন। আসলে তারা ইসলামী মূল্যবোধের তাৎপর্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সহজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ বিধায় আল-কুরআনকেই অবজ্ঞা করেন। কারণ ইসলামী মূল্যবোধের মূল ভিত্তি হচ্ছে আল-কুরআন। আল-কুরআনের প্রতি তাদের এই আচরণ তুলনা করা যায় কিতাবীদের [ইহুদী এবং খ্রিস্টান সম্প্রপ্রদায়ের] সাথে। ইহুদী সম্প্রদায় রাসূলের (সঃ) নবুওয়ত এবং আল-কুরআনের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও হিংসাবশত ইসলামকে অস্বীকার করেছিল। তাই তারা আল্লাহ তাআলার অভিশাপ প্রাপ্ত হয়েছে। আর খ্রিস্টান সম্প্রদায় আসমানী কিতাবের দিকনিদের্শনা উপেক্ষা করে বিপথগামী হয়েছে। এদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ৭৭: যারা [মুসলিম উম্মাহ] আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গিকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে [পার্থিব স্বার্থে] বিক্রয় কওে, আখেরাতে তাদেও কোন অংশ নাই। আর তাদের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের প্রতি [করুণার] দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। বস্তুতঃ তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।{৩-ইমরান}; ১৬: যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য [আল-কুরআন] অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে [ইহুদী এবং খ্রস্টান] পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদেও অন্তকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদেও অধিকাংশই পাপাচারী। ১৭: তোমরা জেনে রাখ, আল্লাহই ভূ-ভাগকে তার মৃত্যুও পর পুনরুজ্জীবিত করেন। আমি পরিষ্কারভাবে তোমাদের জন্যে আয়াতগুলো ব্যক্ত করেছি, যাতে তোমরা বোঝ।{৫৭-হাদীদ}। {ইবনে কাসীর, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮}। মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ও আল-কুরআনে এবং রাসূলের (সঃ) উপর বিশ^াস রাখেন। অথচ তাদের অনেকের আচরণে সেটা প্রতিফলিত হয় না। আল-কুরআনের সাথে সম্পর্ক না থাকলে, অধ্যয়ন করে তাৎপর্য হৃদয়াঙ্গম না করলে হৃদয় হয়ে যায় কঠিন । অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুসলিম উম্মাহর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সুশীল সমাজকে অবশ্যই আল-কুরআনে বর্ণিত দিকনির্দেশনার গুরুত্ব মূল্যায়ন করে সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। যাতে তাদের বাহ্যিক কার্যকলাপ শুদ্ধ হয় এবং অন্তরের লুকিয়ে রাখা বিষয়ের পরিশোধন ঘটে। আল-কুরআন পাঠ ও মুখস্থ করা এবং বোঝা আল্লাহ তাআলা সহজ করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ১৭: আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?{৫৪-ক্বামার}। ইতিপূর্বে অন্য কোন ঐশীগ্রস্থ এরূপ ছিল না।
, মক্কার আরবী ভাষাভাষী কুরআইশ নেতৃবৃন্দের অনেকেই আল-কুরআনে বিশ^াস এবং সর্ম্পক সৃষ্টি করাকে অস্বীকার করায় অবিশ^াসী কাফের হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছে, হিদায়েত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আল-কুরআনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঔদ্ধত্যর্পূণ আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ৩০: তখন রাসূল বলবে, “ হে আমার প্রভু! প্রকৃতপক্ষে আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে অর্থহীন রচনা মনে করে।[২৫-ফুরকান]। এই পবিত্র আয়াতের প্রযোজ্যতা সার্বজনীন, কাজেই বর্তমান উম্মাহর জন্যও প্রযোজ্য। পরকালে আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হওয়া এবং তার সীমাহীন রহমতে স্থান পেয়ে ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য পবিত্রবাণী আল-কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে আবেগের নয় বরং জ্ঞান ও বাস্তবতা ভিত্তিক। কারণ হিদায়েত প্রাপ্তির, তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যলাভে আল-কুরআন হচ্ছে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত রশি। ১০৩: এবং আল্লাহর প্রদত্ত রজ্জু [আল-কুরআন] দ্বারা তোমরা সবাই সুদৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ থাক এবং বিভক্ত হয়ে যেও না [৩-ইমরান]। আল-কুরআনের সাথে সর্ম্পক সৃষ্টি না করলে আল্লাহ তাআলা রশিও শক্তহাতে ধরা যাবে না। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধন, ঐক্য ও সুসস্পর্ক সৃষ্টি করা একমাএ আল-কুরআনের জ্ঞান দ্বারা সম্ভব। আল-কুরআনের সাথে নির্ভেজাল নিবিড় সম্পর্কই নব দিক্ষিত মুসলমানদের সাবেক কলুষিত হৃদয়ের পরিশোধনে সাহায্য করেছিল। তাদের হৃদয়ে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের যে শক্তি সৃষ্টি হয়েছিল তাতো আল-কুরআনের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ৬৩: এবং তিনি তাদের পরস্পরের হৃদয়ের মধ্যে প্রীতির অনুভূতি সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব খরচ করেও তুমি তাদের অন্তরে প্রীতির অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারতে না, কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি দান করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, প্রজ্ঞাবান।[৮-আনফাল]। মুসলিম উম্মাহও পার্থিব জীবনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে জাহেলী বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে বিধায় মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক অবক্ষয় সর্বত্র বিরাজমান। তাই আল-কুরআনের সাথে বিশুদ্ধ সর্ম্পক সৃষ্টি করা এবং তাতে বর্ণিত দিকনিদের্শনায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছাড়া মানবিক মূল্যবোধের অধঃপতন ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে তারা মুক্তি পাবে না।
এটি অনস্বীকার্য যে, আল-কুরআনের সাথে গভীর ও কার্যকরী সম্পর্ক সৃষ্টি করতে আল-কুরআনে প্রণীত দিকনিদের্শনাকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে। আল-কুরআনে বর্ণিত হালাল-হারামের ভিত্তিতে পার্থিব জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই কাজ সঠিক পদ্ধতিতে করতে রাসূলের (সঃ) সুন্নাহ নিঃশর্তভাবে মানতে হবে। কারণ রাসূল (সঃ) আল-কুরআনের নিদের্শনাকে বাস্তবে পরিপূর্ণরূপ দিয়ে উম্মাহর জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। যাকে বলা হয় প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, ইসলামী মূল্যবোধ বা শরিয়ত। রাসূল (সঃ) সর্ম্পকে এক সাহাবা আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে রাসূলে পাক (সঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি (রাঃ) বললেন, তুমি কি কুরআন মজীদ তিলাওয়াত কর না? আল্লাহর নবীর চরিত্র ছিল তো কুরআন মজীদই। [সহীহ মুসলিম, ১৬১১]। তাই আল্লাহ তাআলা বলেছেন , রাসূলের চরিত্রে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। ২১: যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে [নিয়মিতভাবে আল-কুরআন অধ্যয়ন করে], তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ বা নমুনা রয়েছে।{৩৩-আহযাব}। ওহী প্রাপিÍর পরেই রাসূল (সঃ) সাহাবীদেরকে আল-কুরআন পাঠ করে শুনিেেছ, তাদেরকে পবিত্র করেছেন এবং ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ২: তিনিই নিরক্ষর জনসাধারণের মধ্যে পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল, তার আয়াতসমূহ তাদেরকে পড়ে শোনানোর জন্যে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করার জন্যে এবং তাদেরকে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়ার জন্যে; পূর্বে অবশ্যই তারা ছিল সুস্পষ্টরূপে পথভ্রান্থ।[৬২-জুমুআ]। একারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর প্রতি আদেশ দিয়ে বলেছেন, ৩১: বলঃ তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। ৩২: বলঃ আল্লাহ এবং তার রসূলের আদেশ পালন কর। [৩-ইমরান]। আল-কুরআনের সাথে অর্থবহ গভীর সর্ম্পক ছাড়া এরকম গুণ অর্জন করা সম্ভব হবে না।
আল-কুরআনের সাথে প্রেম-ভালোবাসায় হৃদয়ে আল্লাহ-সচেতনতায় যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব বিস্তার কওে জীবনের সর্বক্ষেত্রে। পক্ষান্তরে মানব কল্যাণে সমাজে ও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়। প্রতিদিন আল-কুআনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ন াহলে বিশ^াসীর হৃদয়ে থাকবে অস্থিরতা ও অশান্তি বিরাজ করবে, যেমনটি হয় প্রাণপ্রিয় ব্যক্তির সান্নিধ্যে থেকে দূরে থাকলে। একারণেই আল-কুরআনের দিকনিদের্শনা বুঝা, ভালোবাসায় একনিষ্ঠ অন্তরে প্রতিদিন অধ্যয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল-কুরআন হচ্ছে ইহকাল ও পরকালের জন্য আমানাত; এই আমানত প্রচার-সংরক্ষণ ও জীবনে প্রয়োগ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মুসলিম উম্মাহর উপর। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ২৯: হে বিশ^াসীগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে বিচারের মাপকাঠি তোমাদেরকে দান করবেন, তোমাদেরন সমস্ত পাপ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন; আল্লাহ অসীম মঙ্গলকর্তা।[৮-আনফাল]। আল-কুরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্যে আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফুরকান [ন্যায়-অন্যায় যাচাই করার মানদন্ড]। এসর্ম্পকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ১: পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তার বান্দার প্রতি ফুরকান [ফয়সালার গ্রন্থ] অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ^জগতের প্রতি সর্তককারী হয়।{২৫-ফুরকান}। অতএব বলা যায়, ভালো-মন্দ যাচাই ও সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করার জ্ঞান অর্জনে ও ইহকাল-পরকালে লাভবান হতে আল-কুরআনের সাথে অবশ্যই একনিষ্ঠভাবে ভালোবাসার ও আনুগত্যেও সর্ম্পক সৃষ্টি করতে হবে। তদ্ব্যতিরেকে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা ও সাহায্য থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে।