কেউ কথা রাখেনি : বৃথাই গেলো বুঝি সব আত্মদান

সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-২৪)

শামসুল আরেফিন খান

তিন বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে। ইতোমধ্যে কম করে ১৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে সেভ দ্য চিল্ড্রেন বলেছে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও নানা রোগে যুদ্ধকালে ৮৪ হাজার ৭০০ অনুর্ধ ৫ বছরের শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। যত শিশু বোমা ও গুলিতে মরছে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু মরছে ক্ষুধায়। দেশটা প্রায় ধ্বংসস্তুপ পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে যে , দেড় কোটি মানুষ স্মরণকালের ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ ও বন্দর অবরোধের কারণে খাদ্যসামগ্রির দাম বেড়ে গেছে। মুদ্রা মূল্য হ্রাস পেয়েছে। সাধারণ মানুষ খাদ্যসংগ্রহ করতে পারছে না। দু’কোটির উপর মানুষের জন্য জরুরী ভিত্তিতে খাদ্য সরবরাহের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আন্তির্জাতিক জোট হুতি বিদ্রোহীদের উপর বিমান হামলা চালালে এই যুদ্ধ শুরু হয় ।
বহুকাল ধরে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন বিভক্ত ছিল। তখন দু’টি দেশের মধ্যে সম্পর্ক ছিল কখনও সম্প্রীতির আবার কখনো বৈরিতার। ১৯৯০ সালের দিকে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একীভূত হয়। জার্মানির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেই ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একদেশে পরিণত হয় এবং ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। শুরু হয় নতুন ইয়েমেনের অগ্রযাত্রা। তবে সহিংস গৃহযুদ্ধে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল আরব দুনিয়ার জনসংখ্যাবহুল এই দেশটিতে। সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ছিল সৌদি আরব সীমান্তবর্তী দেশটির উত্তরাঞ্চলে। শিয়া ধর্মাবলম্বী জাইদি সম্প্রদায়ের লোকজন সেই অঞ্চলে বসবাস করে। জাইদি সম্প্রদায় হুতি নামেও পরিচিত। তাদের এই পরিচিতি হয়েছে এই আন্দোলনের প্রবক্তা হোসেইন বদরুদ্দিন আল হুতির নাম থেকে।
দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্বোধন করেছে ইয়েমেন। বাদ্র-পি ওয়ান নামের ক্ষেপণাস্ত্র আরো বেশি দূরের অবস্থানে হামলা করতে পারবে। সৌদি আরব যখন সব ধরনের মতামত উপেক্ষা করে ইয়েমেনের ওপর বর্বর বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে তখন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উদ্বোধন করলো ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধা সমর্থিত সেনারা। জাতিসংঘের চলমান শান্তি প্রচেষ্টা সফল না হলে এ যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলতে পারে। সৌদি আরবের সব চেয়ে বড় মিত্র সর্বাধুনিক অস্ত্র বিক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় খদ্দের। ইয়েমেনে যুদ্ধ চলতে থাকলে সেখানকার রণাঙ্গনে শুধু মার্কিন অস্ত্রই নয়, রুশ অস্ত্রেরও প্রদর্শনী চলবে। ইরানও বসে থাকবে না। শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব বলে কথা। যারা অস্ত্র তৈরি করে তারা সে সব নতুন সর্বাধুনিক অস্ত্রের সক্ষমতা দেখানোর জন্যে রণক্ষেত্র চায়। দরিদ্র দেশ ইয়েমেন সেই কূট চালে পড়লো কিনা কে বলতে পারে। তবে অস্ত্রোৎপাদনকারী ধনী দেশগুলোই যে পৃথিবীতে নানা অজুহাতে যুদ্ধ জারি রেখেছে তাতে কারও সন্দেহ নেই।
২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১ম মহাযুদ্ধাবসানের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের জন্য ৭০টি সবল দেশের বলবান কর্ণধারগণ উপস্থিত হয়েছিলেন শান্তি সম্মেলনে। ১৯১৮ সলের এই দিনে ১ম মহাযুদ্ধের কামান দাগা বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। সিরিয়া -ইয়েমেনসহ নানা দেশে আজও যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। এই নিরেট সত্যটাকে উৎকটভাবে তুলে ধরেছিলেন শান্তিকামী ফরাসী নারীরা অভিনব কায়দায়। আমাদের শহীদ নূর হোসেন নগ্ন বুকে পিঠে লিখেছিল -“স্বৈরাচার নিপাত যাক , গণতন্ত্র মুক্তি পাক”। প্রতিবাদী ফরাসী নারীরা একই কায়দায় তাদের বুকে পিঠে লিখেছিল -“ভূয়া শান্তির ভন্ড ফেরিওয়ালারা নিপাত যাক”। কেউ কেউ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়কের মোটর শোভাযাত্রার আশপাশ থেকে গ্রেফতারও হয়েছে।
সর্বহারা নূর হোসেন জীবন দিয়ে আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে খানিকটা এগিয়ে দিয়েছিল। ফরাসী নারীরাও বিশ্বশান্তি আন্দেলনের পক্ষে অসামান্য অবদান রেখেছেন । ফরাসী বিপ্লবের সময় না খাওয়া সাধারণ মানুষ যখন একসাথে গর্জে উঠে বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটিয়েছিল , সে সময় সংস্কৃতিমনা ফরাসী নারীরাও পথে নেমে এসেছিলেন ম্যাকমিলান রবেসপিয়ারির নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লবের সমর্থনে। বিপ্লব তাতে এগিয়েছিল বটে । কিন্তু দীর্ঘজীবী হয়নি। ২০১৮ সালে ফরাসী রমণীদের অভিনব বিক্ষোভে অচল বিশ্বশান্তি একচুলও নড়লো কিনা সেটা বলতে পারবো না।
নূর হোসেন প্রাণ দিলেন। তারপর ডা. মিলন প্রাণ দিলেন। তাতে স্বৈরাচার কৌশল পাল্টালো। ‘৮৮সালে প্যাডসর্বস্ব ৫০ দলের নেতা আ স ম রবকে গৃহপালিত নেতা বানিয়ে এরশাদ বিরোধী দল সাজালেন ভোটার বিহীন প্রহসনের নির্বাচনে গড়া জাতীয় সংসদে। সেই সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অবৈধ সামরিক শাসনকে সাংবিধানিক বৈধতা দিলো। অবৈধ দুঃশাসনের জন্যে আর্জেনটিনার সামরিক শাসকরা যাবজ্জীবন খেটেছিল এই রেটিফিকেশন না পেয়ে। সেই থেকে সামরিক শাসনের কুশীলবরা বাঘের পিঠ থেকে নামার আগে আইনের অনুমোদনটা আদায় করে নেয়। জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট একতরফাভাবে ভেঙ্গে দিয়ে তড়িঘড়ি বিএনপি গঠন করেছিলেন একই কারণে। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের ইনডেমনিটির চাদরে জড়িয়ে জিয়া বিদেশে পাচার করে দিলেন। এভাবে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু করেছিলেন জিয়াউর রহমান এবং ৫ম সংশোধনী পাশ করে সংবিধানের উপর যে ব্যভিচার করা হয়েছিল তার জন্যেও ভোট জালিয়াতি ও ভোটার বিহীন নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট তৈরির প্রয়োজন হয়েছিল। স্বৈরাচার এরশাদ সেই পথ অনুসরণ করে “ তিন জোটের রূপরেখায়” মওদুদ আহমদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শুধু ক্ষমতার ঘেরাটোপ থেকেই নিষ্ক্রান্ত হননি, ফিনিস পাখির মত নিজের পুনর্জন্ম ঘটিয়েছেন এবং গণতন্ত্রের খোজা প্রহরী হয়ে বরের পিসি কনের মাসির মত দিব্যি চর্বচোষ্য খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গণতন্ত্রের কান্ডারি সেজে বলছেন , আমি যদি এরশাদের প্রধানমন্ত্রী না হতাম তাহলে উপরাষ্ট্রপতি হতে পারতাম না । আর উপরাষ্ট্রপতি না হতে পারলে এরশাদ পালানোর পথ পেতো না। তার রক্তাক্ত পতন না ঘটালে গণতন্ত্র ফিরে আসতো না।
নূর হোসেনের রক্ত ছুঁয়ে যারা শপথ করেছিলেন, “স্বৈরাচারকে প্রশ্রয় দেবেন না এবং মৌলবাদকে লালন করবেন না”, তারা কথা রাখেন নি। মৌলবাদ বেগম জিয়ার হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতার মোয়া খেয়েছে। ২৮ বছর এঘর সেঘর করে , “শ্রী আংটি’’ স্বৈরাচার এখন ক্ষমতার ট্রামকার্ড বলে বিবেচিত হচ্ছে।
৮৭ সালের কথা । একদিন অপরাহ্নে পুরানো পল্টন ন্যাপ অফিসে তিনজোটের বৈঠক শুরুর অপেক্ষায় চুপচাপ বসে স্মৃতির জাবর কাটছি। অন্য সবাই চা সিগারেট ধ্বংস করে কথার তুবড়ি ছুটাচ্ছেন । ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ সেদিনের নির্ধারিত সভাপতি। তিনি আমার দিকে নজর তুলে বললেন, “ফুলের সভায় নীরব কেন কবি?” আমি বললাম , “কাটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুঃখ বিনে সুখ লাভ হয়কী মহিতে?” প্রফেসার সাহেব সভার কাজ শুরু করালেন আমাকে দিয়েই । পাঁচ দল আগে থেকেই হাজির ছিল। আমি আছি তো সাতদল আছে। আটদলের দুএকজন ইতোমধ্যে এসে পড়েছেন। আমি বললাম , গুণীজনদের সামনে আমি অভাজন আর কী বলি? একটা পুরনো বহুশ্রুত গল্প মনে পড়ছে। সেটাই বলি, -সুন্দরবনের তিন তুখোড় শিকারি চাঁদনী রাতে বসে গল্পগুজব করছে। বলছে নিজেদের কীর্তিকলাপ ও অভিজ্ঞতার কথা। প্রথমে একজন বললো, সেদিনও এমন জোছনা রাত ছিল । আমি একা একা হাঁটছি গহীন বনে। হঠাৎ দেখি সামনে ১৮ ফুট এক রয়েল বেঙ্গল রাজার মত হাঁটছে । আমি বন্দুক তুললাম। কিন্তু কোমরে হাত দিয়ে দেখি বেল্ট আছে , গুলি নাই। তখন কী করি ? বন্দুক তাক করে মুখ দিয়েই ‘ধুম’ করলাম। অমনি বাঘটা কাত হয়ে পটল তুললো। দ্বিতীয় জন বললো, আরে আমার সাথেও তো ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। মাঝরাতে প্রকৃতির ডাকে বাইরে বের হয়েছি। হঠাৎ দেখি একজোড়া হেডলাইট আমার দিকে ফোকাস মারছে। আমি তো বন্দুক আনিনি। কী করি? কপাল গুণে কোমরে ছিল বেল্ট ভর্তি গুলি । সেটা খুলেই আমি বাঘের দিকে তাক করে মুখ দিয়ে ধুম করলাম । অমনি ধপাস করে পড়ে বনের রাজা অক্কা পেলো। সেই চামড়া বেচেই তো বৌকে ১ লা বৈশাখে সাত নরি হারটা গড়িয়ে দিলাম। তিন নম্বর গুলবাজ এতক্ষণ কান চুলকাচ্ছিল। সে বললো , তবে শোন আমার গল্পটা। তোমরা তো জানো আমি অন্ধকার রাতে বনের মধ্যে হাঁটতে ভালোবাসি। সে রাতেও আমি বাসি হাঁটতে বেরিয়েছি। নদীর ধারে যাওয়ার ইচ্ছা। হঠাৎ রণভঙ্গ। পথ আটকে বিশ ফুট লম্বা বাঘের বিবি কাত হয়ে নিজের লেজ দিয়ে কান চুলকাচ্ছে। তাই না দেখে আমার পশম খাড়া হয়ে গেলো। কিন্তু কী করি ? ঘাড়ে নেই বন্দুক , কোমরে নেই গুলি । তবে পকেটে হাত দিয়ে দেখি , কপাল ভালো , লাইসেন্সটা ঠিকই আছে। সেটা উঁচু করে ওস্তাদের কথামত মুখ দিয়ে দু/ তিনবার ধুম ধাম করলাম। তাতেই সেই বাঘিনী লেজ তুলে দিলো দৌড়। আমার গল্পটি ফুরালো নটে গাছটি মুড়ালো। এখন দেখুন , আওয়ামি লীগ তথা আট দলের আছে বন্দুক, ৫ দলের আছে বুলি ও গুলি ; সাত দলের বড় নেতার আছে লাইসেন্স । তিনটা যদি এক সাথে মিশে বন্দুকের নল দিয়ে ‘গুড়ুম’ করতে শুরু করে তাহলে কাগুজে বাঘের উপায় থাকবে না পগার পার না হয়ে। ঠিক কিনা? সভাপতি হাতুড়ি ঠুকে বললেন, ঠিক ! ঠিক ! সেদিনই তিন জোটের যুগপৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হ’ল।
এতবড় জাতীয় ঐক্য আর কখনও হয়নি। একাত্তরেও বিএনপির পূর্ব পুরুষ শাহ আজীজ-খান এ সবুর -ফজলুল কাদের চৌধুরীদের প্রাণপ্রিয় মুসলিম লীগ ও গোলাম আজমের জামাতে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত মেরুতে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছিল। আজ আমাদের লড়াই সংগ্রামের শরীক বিএনপির মধ্যে তার পূর্বপুরুষদের আত্মা তো বিরাজ করছেই , তদুপরি কাঁচপুর ব্রিজের অতন্দ্র প্রহরী বিএনপি নেতা মতিন চৌধুরীর পাঞ্জাবির ঝুল পকেটের ভিতর বসে জামাতও “ম্যাও” করছ। এই ঐক্য ব্যর্থ হতে পারেনা। আমার রাজপথের সহকর্মী বিএনপি নেতা মতিন চৌধুরী আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ক্রোধ ঢাকতে ফিক করে হেসে দিলেন। তার গোপন প্রয়াসেই জামাত-ই ইসলাম ঘৃণার পাহাড় সরিয়ে রাজনীতির মূলধারায় উঠে এসেছিল। জিয়া আগেই তাদের লাইসেন্স দিয়েছিলেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় হতে। বেগম জিয়া আমাকে কথা দিয়েছিলেন ,জামাতকে সাত দলীয় ঐক্য জোটে ঢুকতে দেবেন না। তিনি ওয়াদাভঙ্গ করেন নি। বিকল্প কাজটি করছিলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিন চৌধুরী। তিনজোটের যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত হতেই তিনি উঠে যেতেন। জামাতের আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফোনে সেটা তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করাকে ফরজ মনে করতেন। এতে তার কোন রাখঢাক ছিল না। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিএনপি-জামাতের মধ্যে ভিতরে ভিতরে “একাত্তরের ঐক্য” গড়ে উঠেছিল । তাঁর মতিঝিল অফিসে প্রকাশ্যেই জামাত-বিএনপির নিয়মিত ‘লিয়াঁজো’ বৈঠক হতে দেখেছি। তিনি একাই বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করতেন। জামাতের প্রচন্ড খায়েশ ছিল সাত দলে ঢুকে তিন জোটের সাথে লিয়াঁজো করার। একাত্তরের রক্তের দাগ মুছে ফেলার এই প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়ায় আমি তাদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নব্বইর নির্বাচনে কঠিন মূল্য দিতে বাধ্য হয়েছি। জামাতের একাত্তরের জঙ্গী নেতা মুজাহিদ, কামরুজ্জামান , কাদের মোল্লা এবং আবুল কাশেম অনাহূতভাবে নির্বাচনের কয়েকমাস আগে আমার ইন্দিরা রোডের বাসায় এসেছিলেনন এক সকালে। তারা পরবর্তী নির্বাচনে আমার সাংসদ পদ পাইয়ে দেয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে এসেছিল শবেবরাতের হালুয়ারুটির মত খাঞ্চায় ঢেকে। তাতে একটা বিষ মাখানো খঞ্জরও ছিল। আমি দ্বিতীয়টা বেছে নিতে মুহূর্ত দেরি করিনি। পরিণামে নির্বাচনের দেনা শোধ করতে ৮ ভাইবোন ও নিজের ৪ সন্তানের কপাল খেয়েছি ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার এক বিঘা জমির উপর সাড়ে তিন হাজার স্কয়ারফুটের একতালা পৈতৃক বাড়ি , পানির দরে বেচে। সেই সম্পত্তির বর্তমান মূল্য শতকোটি টাকার বেশি। আমার আব্বা ৪৯৯৯ টাকায় একবিঘা জমির বরাদ্দ পেয়েছিলেন ১৯৪৯ সালে। ১৯৬১ সালে বন্ধুবর কারাসঙ্গী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ সেই বাড়ির মাসিক ১২০০ টাকার প্রথম ভাড়ার দলিলটা করে দিয়েছিলেন বিনা খরচে। ১৯৯২ সালে প্রয়াত প্রিয় সহপাঠী বন্ধু বিচারপতি এ কে বদরুল হক আমাকে বহুভাবে নিরুৎসাহিত করে , ধিক্কার দিয়ে, অবশেষে বাড়ি বিক্রির দলিল তৈরি করে দিয়েছিল আমার অনন্যোপায় অবস্থা দেখে। আমার স্বজনরা সবাই আমাকে একজন অযোগ্য , বেকুব ও ব্যর্থ মানুষ মনে করে। কিন্তু আমি আমার বিবেকের কাছে লজ্জা পাইনি। সেটাই আমার নিজের সন্তুষ্টি ও শ্লাঘার বিষয় । আমি পেশাদার রাজনীতিবিদদের মত হতে পারিনি।
তিন জোটের সিদ্ধান্তে ১০ নভেম্বর ৮৭ ঢাকা অবরোধের যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণা করা হল। সাত দলের পক্ষ থেকে একটা প্রেস রিলিজ দেয়ার দায়িত্ব পড়লো আমার উপর । ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তি পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে, ২৮ ধানমন্ডির কার্যালয় থেকে রাত ৯ টার দিকে বাসায় আসতেই একটা ফোন কল পেলাম কোন এক অচেনা মানুষের কাছ থেকে। সরাসরি অনুরোধ , “শিঘ্রি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন”। তার পরেই লাইন কেটে গেলো। কোন হিতৈষি বন্ধু আমাকে সতর্ক করলেন সেটা বুঝতে পেরে অজ্ঞাতবাসে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। বাসার সবাইকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলে সামান্য গোছগাছ করে বের হতে যাবো এমন সময় আমার এক মাতৃতুল্য পরমাত্মীয়া বহুকাল পরে আসলেন আমার বাসায়। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে খানিকটা সময় পার হয়ে গেলো। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো। তিন তালা থেকে বিরক্ত বাড়িওয়ালা ফোন করে বললেন পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। দরজা খুলে অচেনা দুজন মেহমানকে ঘরে আসতে বললাম। একজন তেজগাঁ থানার ওসি। অন্যজন সাদা পোষাকে এস-বি ইন্সপেকটর। তারা চা খেয়ে আমাকে শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে তুললেন যে ঘরে সেখানে আগে থেকেই বসে ছিলেন আওয়ামি লীগ নেতা আব্দুল মান্নান, বিএনপির কর্ণেল অলি আহমদ বীর বিক্রম এবং জামাতের আবুল আহসান মো. মুজাহিদ। তারা আমাকে স্বাগত জানালেন। হাতল ওয়ালা কাঠের চেয়ারের বেতবুনা আসনে বসে রাত কাটলো। ভোরে যখন জেলে পৌঁছালাম তখন আমার দুই হাত, কনুই থেকে কব্জি অবধি এবং দুই পা, কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত চিতোই পিঠার মত ফুলে উঠেছে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। জেলের ডাক্তার অ্যান্টি বায়োটিক ইনজেকশন দিয়ে বললেন , ছারপোকার কামড়ে ইনফেকশন হয়েছে। জেল কর্তৃপক্ষ নিজ ক্ষমতায় ‘ডিভিশন’ দিয়েছে। আমার বিছানা পড়েছে বারান্দা থেকে ঠিক ঢোকার পথে দরজার পাশে। সেখানে আলো বাতাসের সঙ্কট ছিল না। কিন্তু শীতকালের কপি ক্ষেতে সার হিসাবে ব্যবহার করা মানব বর্জের উৎকট দুর্গন্ধের প্রকোপ তীব্র। তাছাড়া এই ঘরেই , ৩ নভেম্বর ‘৭৫ জাতীয় বীর মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে গুলি করার পর আবার বেয়নেট খুচিয়ে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছিল। বিশাল জানালার মোটা শিকে বুলেটের চিহ্ন গুলো যেন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকেই । জ্বর গায়ে সে রাতে ঘুম না আসাই ছিল স্বাভাবিক। মাঝরাতে হঠাৎ শুনলাম ঘরের ভিতর কেউ যেন কাতরাচ্ছে। জ্বর ছাড়েনি । তবুও ভয়ে ভয়ে উঠে, আধো আলো আধো অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম একটা শয্যার পাশে। সেখানে শুয়ে প্রচন্ড জ্বরে ঘুমের মধ্যে গুমরে গুমরে কাঁদছেন একজন পরিচিত মানুষ। একাত্তরে যাকে নাগালে পেলে হয়ত আমার স্টেনগান গর্জে উঠে তার বুক ঝাঁঝরা করে দিতো । কিন্তু এ সময় আমরা একই কারাগারে বন্দী । সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছি। কাজেই লোকে কী বলে সেটা না ভেবে, বাথরুম থেকে বালতি করে পানি আনলাম। সাথে একটা মগ। বলতে গেলে সারারাতই মাথায় পানি ঢাললাম। ফজরের আজান হ’ল । লক আপ শেষ হ’ল। মাথায় টুপি দিয়ে একজন নামাজী, সেই শয্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন । তিনি বিএনপি নেতা মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল অলি আহমদ। রোগীর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন, “রে,জা..কার’। এরশাদসহ চারদলীয় জোটের ফায়দাভোগী ও হালে জামাতের রাজনৈতিক মিত্র কর্ণেল অলি আর একবার মওলানা ভাসানীর বড় ছেলে, এরশাদ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী, আমার সহপাঠী বন্ধু আবু নাসের খান ভাসানীর মৃত্যু সংবাদ শুনে বলেছিলেন,“স্বৈরাচার” । পেশাদার রাজনীতিক বলে কথা। বারান্দায় গিয়ে তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। রোগী তখন অনেকটা সুস্থ। তার ঘুম ভেঙ্গেছে। আমি তার লাল গামছা দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিলাম । তিনিও আমাকে দেখে অবাক হলেন। “আপনি সারা রাত এত কষ্ট করলেন আমার মত একজন নিকৃষ্ট শত্রুর জন্যে?” আমি বললাম, “আমার বিবেচনাটা ছিল একেবারেই মানবিক। আমরা একাত্তরেও মানবতা বর্জন করিনি। আপনার সাথে বিশেষ পার্থক্যটা বোধ হয় সেখানেই”। সেদিন থেকেই আলী আহসান মুজাহিদ কৃতজ্ঞতায় গদ গদ হয়ে আমাকে বন্ধু ভাবতে শুরু করেছিলেন। পাশের ঘরে তার দোসর কাদের মোল্লা বিশিষ্ট কয়েকজন রাজনীতিক , সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীর সাথে বন্দী ছিলেন । সেই ঘরে মহান মুক্তিযুদ্ধের দুই কান্ডারি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ ৩ নভেম্ববর ‘৭৫ নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন।
ইতিহাসের পালাবদলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দলটি কৌশল করে রাজনীতির মূলধারায় উঠে এসেছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ছলে । সেই সুবাদেই মুজাহিদ ও কাদের মোল্লা সংগ্রাম পত্রিকার কান্ডারি কামরুজ্জামান ও ব্রিফকেসধারী আবুল কাশেমকে সাথে নিয়ে আমার বাসায় একটা ফোন করেই চলে আসার অবকাশ পেয়েছিলেন। আমি তাদের অসম্মান করিনি। কিন্তু ঘৃণার সাথে তাদের সৌহার্দ ও প্রীতি উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করেছি । প্রিয় স্বজনদের কারও কারও ভাষায় অমৃত ছেড়ে গরলপাত্র বেছে নিয়েছি। তখন কোনভাবে সাতদলে জামাত-ই- ইসলাম শরীক হলে জোট ভেঙ্গে যেত। আমার সাথে ডিএল (রউফ) , এডভোকেট আবু জাফরের ভাসানী ন্যাপ এবং টিপু বিশ্বাসদের কম্যুনিস্ট লীগ জোট ত্যাগ করতো। তিন জোটের ঐক্য অটুট থাকতো না। এরশাদের প্রস্থান বিলম্বিত হ’ত।
জামাত প্রশ্নে আমার শক্ত অবস্থানের কথা আন্তর্জাতিক মহলেও জানাজানি হয়েছিল। ভারতীয় কূটনীতিক পঙ্কজ শারণ একদিন আমার ইন্দিরা রোডের ছোট্ট বাসায় চলে আসলেন টেলিফোন করে।“লং টাইম নো সী নো টক” বলে আবারও একাধিকবার আসলেন। কয়েকদিন পরে আসলেন চীনা দূতাবাসের সামরিক কাউন্সিলার ব্রিগ. জেনারেল গ্যাঙটাও। তিনিও যোগাযোগ ও আপ্যায়ন অব্যাহত রাখলেন। ড. মুশাররফসহ বিএনপি নেতারা আমাকে নিয়ে গেলেন পাকিস্তান দূতাবাসে ডিনারের এক বিশেষ আয়োজনে। ।এই সব মিথষ্ক্রিয়ায় একটা জিনিস পরিষ্কার হ’ল আমার কাছে যে আন্তর্জাতিক মহল আমার ভূমিকা ও জামাতের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে।
এরশাদের নাটকীয় নিষ্ক্রমণের পর জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত তিন জোটের বিদায়ী বৈঠকে নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি থেকে আঁচ করতে পেরেছিলাম যে বড় দু দল তিনজোটের রূপরেখা মানলেও “মৗলবাদ ও স্বৈরাচারকে” প্রশ্রয় না দেয়ার শর্ত মানতে অগ্রহী নন। সে বৈঠকে পাঁচ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আওয়ামি লীগের পক্ষ্যে উপস্থিত ছিলেন গুরুত্বহীন কয়েক নেতাকে নিয়ে ড. কামাল হেসেন। সাতদলের পক্ষে মেজর জেনারেল মজিদউল হক ও আমি। আওয়ামি লীগের পক্ষে ড. কামাল কথা বললেন। সাতদলের মুখপাত্র মজিদ উল হক আমার ঘাড়ে বন্দুক চাপিয়ে পাশ কাটালেন। আমরা সব হরিদাশ পাল্ কে কী বরলাম তাতে কী আসে যায়? আমি বুঝলাম নূর হোসেন -ডা. মিলন ও দীর্ঘ আট বছরের সংগ্রামের শহীদ জাফর ,জয়নাল , দিপালীশাহা , রউফুন বাসসুনিয়া, দেলোয়ার সেলিম গং বৃথাই প্রাণ দিলেন। আমি তাই কম কথায় ইতি টানতে উচ্চারণ করলাম কবি রবার্ট ফ্রস্টের সেই বিখ্যাত চার লাইন-The woods are lovely dark and deep/But I have promises to keep/ And miles to go before I sleep/And miles to go before I sleep-গভীর এ অরণ্য, ঘন আধার তার কতই না সুন্দর /কিন্তু ঘুমুবার আগে আমাকে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে , মাইলের পর মাইল/ কারণ আমাকে যে কথা রাখতেই হবে”। সম্প্রতি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও কবি রবার্ট ফ্রস্টের শরণাপন্ন হয়েছেন। কিন্তু কেউই সেদিন কথা রাখেনি। এক পক্ষের বিতর্কিত সর্বোচ্চ নেতা তো সম্প্রতি বলেই দিয়েছেন , “জামাত আছে তো সব আছে, নির্বাচনে জেতার জন্যে জামাতকে পাওয়াই যথেষ্ট ; আর কোন জোট থাকলো কি না থাকলো তাতে কিছুই যায় আসেনা।” । অন্যদিকে স্বৈরাচারের বুড়ো শালিক সিগনাল মোড়ে দাড়িয়ে ঘন ঘন লাল-সবুজ বাতি জ্বালানো নিভানোর পুরনো খেলা অব্যাহত রেখেছে।
ক্যালিফোর্নিয়া।