কেন এই আত্মহত্যা?

লাশকাটা ঘরে পড়ে ছিল কলেজপড়ুয়া মেয়েটির মৃতদেহ। মর্গের বাইরে অপেক্ষায় আহত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে স্কুলশিক্ষক বাবা, যিনি অনেক স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন ঢাকায়- ভালো লেখাপড়া করে মেয়ে তার বড় চাকরি করবে। কিন্তু মেয়ে কেন অভিমান করে নিজেই নিজের জীবন দিয়ে দিল, তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মাস ফুরানোর আগের টাকা পাঠাতেন। মেয়ের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা ছিল তার। বাড়ির সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তবু কেন এই আত্মহত্যা?
‘আমার ছোট্ট বাচ্চাটার হিম্মতের দাম দিই আমি, দুর্গন্ধময় এই দুনিয়াদারিতে অনেকেরই দম আটকায়, কিন্তু মৃত্যু কামনা করা এবং সেই মতো রাস্তা ধরে এগোনো কত সাহসের আমি জানি। আত্মহত্যার জয়গান গাইছি না। জন্মের মতো মৃত্যুও স্বাভাবিক, এমনকি তা নিজ হাত দিয়ে হলেও- এটুকু বলতে চাই। আত্মহনন পরাজিতের লক্ষণ না, বরং অনেকেই আপস করতে পারে না বলেই চলে যেতে চায়। আমি যখন বাচ্চাটাকে শেখাতে চাইতাম কম্প্রোমাইজ করা, ডিপ্লোম্যাসি করা ওর ভালো লাগত না। আবার স্বভাবগতই মানুষের চরিত্র যেমন থাকে ভালো-মন্দের মেলানো, তারও ছিল, কিন্তু নিজের সেসব কন্ট্রাডিকশন সে হজম করতে পারত না। প্যারাডক্স স্বাভাবিক জানে তার মাথা, কিন্তু মন মানতে দেয় না সেটা। আমি তাকে অনেকটাই বুঝতাম বলে নিশ্চিত বলতে পারি তার আত্মহত্যা পরাজিতের আত্মহত্যা নয়, আপসহীন মানুষের ক্ষোভ আর অভিমান মিলে সিস্টেমের কাছে সারেন্ডার।’
মেয়েকে হারানোর দুঃখে নিজেকে এভাবেই সান্ত্বনা দেন কবি রহিমা আফরোজ মুন্নী। কতই আর বয়স হয়েছিল? বিশ। এই স্বপ্নের পথে হাঁটার শুরুতেই নিজেকে নিঃশেষ করে দিল তার মেয়ে চিত্রশিল্পী আফরিদা তানজিম মাহি। যে মেয়েটি স্বপ্নের ঘুরি ওড়াত নিজ আকাশে, হাঁটত স্বপ্নের পথে তার কি দরকার ছিল এত তাড়াতাড়ি নিজেকে নিঃশেষ করার? ছবি আঁকত মাহি। চলছিল তার প্রদর্শনী। এরই মাঝে কি এমন হয়ে গেল নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মতো?
মায়ের তো মন মানে না। বাবা নির্বাক।
এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় আমাদের অনেক বাবা-মাকেই। সন্তান কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে। বড় অসহায় বাবা-মা।
কেন এমন হয়? দশ মাস গর্ভধারণের পর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর একটি সন্তানকে তিলে তিলে বড় করে তুলতে হয় বাবা-মা কে। সেই তিল তিল করে বড় করে তোলার সময়টুকু শুধু বাবা-মা-ই জানেন কেমন করে তাদের পার করতে হয়। নির্ঘুম রাত। আর প্রতিমুহূর্তের চিন্তা-দুশ্চিন্তা। একজন মা,তিনি কর্মজীবী-ই হোন কিংবা গৃহিণী সন্তানের পেছনে তার শ্রম দিতে হয় অবর্ণনীয়। সন্তানের বসতে শেখা থেকে শুরু করে হাঁটা,আধো আধো বুলি…
স্কুল ব্যাগে যখন স্কুলের দিকে যাত্রা তখন তো বাবা-মায়ের খুশির অন্ত থাকে না। ছোট্ট সোনা বড় হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে তারা সন্তানকে পড়াশোনা করান। চেষ্টা করেন সর্বচ্চটুকু দিয়ে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে। সেই সন্তান যদি বড় অসময়ে চলে যায়। অভিমান, কেমনে কাটে দিন সেই মায়ের?
লাশকাটা ঘরে পড়ে ছিল কলেজপড়ুয়া মেয়েটির মৃতদেহ। মর্গের বাইরে অপেক্ষায় আহত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে স্কুলশিক্ষক বাবা, যিনি অনেক স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন ঢাকায়, ভালো লেখাপড়া করে মেয়ে তার বড় চাকরি করবে। কিন্তু মেয়ে কেন অভিমান করে নিজেই নিজের জীবন দিয়ে দিলেন, তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না? মাস ফুরানোর আগেই টাকা পাঠাতেন। মেয়ের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা ছিল তার। বাড়ির সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তবু কেন এই আত্মহত্যা?
কেবল বাবা নন; লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসা পুলিশও খুঁজে পাচ্ছিল না কেন মেয়েটি আত্মহত্যা করল? তবে মেয়েটির কাপড়ে গোঁজা একটি চিরকুট আবিস্কার করেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হারুন-অর-রশিদ। মেয়েটি লিখেছে তার আত্মহত্যার কারণ।
চিকিৎসক হারুন বললেন, ‘মেয়েটি ইডেন কলেজে পড়ত। থাকত আজিমপুরের একটি মেসে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছেলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এক সময় ছেলেটি হঠাৎ তাকে ছেড়ে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। চিঠির ভাষ্য এ রকম- যে মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমিক নতুন করে সম্পর্ক করেছে, সেই মেয়ের যা আছে, তা সবই আছে তার। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল। হিসাব করে দেখলে অর্থ ছাড়া আর কোনো কিছুতে তার কমতি নেই। মানুষের জীবনটা কি কেবলই স্বার্থের জন্য? পৃথিবী যদি স্বার্থের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে এমন জীবন তার দরকার নেই।
ইডেন কলেজের এই ছাত্রীর মতো আরও অনেকের আত্মহত্যা চিন্তিত করে চিকিৎসক হারুন-অর-রশিদের মনোজগৎকে। কেন এই আত্মহত্যা? তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যা? আবেগের বশবর্তী হয়ে আত্মহত্যা? কেন? কেন? চিকিৎসক হারুনের ভাষ্যমতে, ‘মানুষ কেন আত্মহত্যা করে তার উৎস সঠিকভাবে আজও আমি খুঁজে পাইনি। প্রায়ই আমি আমার ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করি, বলো তো, মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? একটি মানুষ যখন প্রতারিত হয়, যখন তার আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু ঘটে, তখন নিজের ওপর অভিমান থেকে সে আত্মহত্যা করে।
দেড় বছর আগে কামরাঙ্গীরচর থেকে একটা ছেলের মৃতদেহ আসে। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার বাবা দিনমজুর। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তার কাজ শেষে বাবা বাসায় ফেরেন। এসে বাজার করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে ছেলে তার কাছে ২০ টাকা চাইল, ফুচকা খাবে বলে। বাবা তাকে বলেন, ২০ টাকা তাকে দিলে তো বাজার হবে না। ছেলেটাকে টাকা না দিয়ে বাবা চলে যান বাজারে। বাজার করতে করতে তার মনে হলো, ‘ছেলেকে তার টাকা দেওয়া উচিত ছিল। এমন কথা ভেবে বাজার কিছুটা কম করে। ২০ টাকা বাঁচালেন। সেই ২০ টাকা ফিরিয়ে এনে বাসায় এসে দেখলেন, ছেলে তার অভিমান করে ঘরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা এমন আত্মহত্যার বিষয়ে বলেন, ‘আবেগময় মুহূর্তে অর্থাৎ যে বিষয়টা আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে সমাধান হতে পারত, তা না করে অনেকে আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়; যা মোটেও ঠিক নয়। সন্তানদের এমন অবস্থায় যেন পড়তে না হয় সেজন্য বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে প্রথম থেকেই। বন্ধু হয়ে সন্তানের মনের খবর নিতে হবে। আমাদের তরুণীদের আত্মহত্যার প্রবণতা যে কারণে বেশি তা হলো অবৈধ গর্ভধারণ। হয়তো সেই নারী ভাবছেন, বিষয়টি যদি মানুষ জেনে ফেলে, তাকে মানুষ কী ভাববে? এ ভাবনা থেকে হয়তো আত্মহত্যা করে। অথচ সে আত্মহত্যা না করলেও পারত। সে যদি ভুল করেই থাকে, তা সংশোধনের উপায় ছিল। যদি প্রতারিত হয়ে থাকে, এরও প্রতিকার ছিল। কিন্তু একটা সময় একটা বয়স মানুষকে হয়তো এত সুযোগ দেয় না। যে কারণে অনেক সময় মানুষ আত্মহত্যা করে, যা মোটেও কাম্য নয়। ভীষণ কষ্ট দেয়।’