কেমন আছি আমরা?

লেখার কথা ছিল- ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির অতীত ও বর্তমান নিয়ে। মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সামনে থেকে দশম শ্রেণীর একজন ছাত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেল! কেউ টের পেলো না। শুধু তাই নয়, মেয়েটি বলেছে সেই গাড়িতে তার মতো আরো মেয়েদেরকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছে!
সে তো কৌশলে পালিয়ে বাঁচে। অন্য মেয়েদের ভাগ্যে কি ঘটেছে, তা আমরা জানি না! এ খবর জানার পর লেখায় মন বসছিল না! গত কয়েক দিনে আমার অনেক বিষয় থেকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বিশেষ করে বরগুনায় প্রকাশ্য খুন করার দৃশ্য ভিডিওতে দেখে। আমার ঘুম হয়নি দেড় দিন। অনেক খবরই আমার কাছে আসে কেউ চিঠি পাঠান। কেউ হাতে হাতে পৌঁছে দেন, কেউ সামনাসামনি বসে শুনান। কেউ ইনবক্সে ইমুমো, হোয়াটস্ আপে এমন কিছু ডকুমেন্ট পাঠান, বা ঘটনা শুনান, মাঝে মধ্যে ওসব শুনার পর আমি আর স্বাভাবিক থাকতে পারি না। ঘুমোতে পারি না। অসুস্থ হয়ে যাই। আমি কিছু পুলিশ অফিসারের নিকট এমন সব অপরাধের বিবরণ শুনেছি, যা কোনোভাবেই হিসাবে মেলে না। মানুষ যে কত নৃশংস প্রতারক, মিথ্যেবাদী হতে পারে তা সাধারণের ভাবনার বাইরে।
গত মাসে ২২ জনকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে সারা দেশে! আমরা প্রথম শুনতাম একটি সাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন, প্রগতিশীল ছাত্রদের কোপাতো, রগ কাটতো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর ভাষাবিজ্ঞানী লেখক, কবি, ডক্টর হুমায়ুন আজাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। কয়ক বছর আগে যখন ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপারাধে অভিযুক্তদের নিয়ে আন্দোলন চলছিল, তখন বিশ্বের অধিক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্লগার হত্যার ঘটনার মধ্যে দিয়ে কুপিয়ে খুন করার বিষয়টি আবার সামনে আসে। এখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে না পরলে হয় এই কুপিয়ে খুন করার মতো নৃশংসতা। বিচারহীনতা ও বিচারের নামে দীর্ঘ কাল ক্ষেপণ অপরাধীদের আরো বেপরোয়া করে তুলে।
আপনারা কেউ এভাবে ভেবে দেখেছেন, স্কুল-কলেজ থেকে আসা-যাওয়ার সময় সারা দেশে প্রতিদিন কতজন কিশোরীও যুবতী ধর্ষণ হয়? তারচেয়েও ভয়বহ বিষয় হলো, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারই বিষয়টি চেপে যায়! এ দেশে বেকারের সংখ্যা কত? কতজন ঢাকার চাকরি নিতে এসে ভুয়া বিজ্ঞপনের ফাঁদে পরে কত যুবক না খেয়ে আবার ঢাকা ছাড়ে! কত নারী ঢাকায় চাকরির জন্য এসে ধর্ষিতা হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে? স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে স্থানীয় বখাটেদের হাতে জিম্মি তা কি আমরা জানি না? কি শহর কি গ্রাম প্রতিটি অলিগলি এখন সুনাগরিকদের জন্য বিপজ্জনক। আগেও যে খুব ভালো ছিল তা-ও কিন্তু নয়। একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক, মিনার মাহমুদের কথা মনে পড়ছে। যিনি ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অনেক বিষয়ের সাক্ষী। কেন ব্যক্তি জীবনে সফলতার চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে থেকেও ছয়, পাতার ডায়েরি লিখে আত্মহত্যা করেছিলেন! তিনি বোকার মতো বউয়ের উপর রাগ করে নয়, অথবা পাওনাদারের ভয়ে নয়, অথবা ব্যর্থ জীবনযাপনের জন্য নয়; তার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা সাংবাদিক মিনার মাহমুদকে সুখী করতে পারেনি। মার্কিন প্রবাসী হয়েও, তিনি দুঃখে, শোকে, ক্ষোভে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেলে গলায় ফাঁস নিয়ে মরলেন। আর এটা কি করে সম্ভব যে, একজন মানুষকে কয়েকজন কলা গাছে কোপ দেয়ার মতো কুপিয়ে যাচ্ছে দিন দুপুরে! তাও আবার পাহারাদার রেখে। তারা আততায়ী ছিল না, গুলি করে দৌড়ে পালিয়েও যায়নি! কুপিয়ে বীরদর্পে ধীরে সুস্থেই চলে গেছে। কে দেবে এই খুনির বিরুদ্ধে সাক্ষী? যারা দিনের আলোয়, খুন করে! আদালত সাক্ষী ছাড়া সাজা দিতে পারবে তো! আর পুলিশি তদন্ত তার কি হবে? প্রভাশালীদের বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্টে কি কি হতে পারে আমরা সকলে অবগত। বারাবার কি দেশের প্রধানমন্ত্রী কে নির্দেশ দিতে হবে খুনি, ধর্ষক ও অপরাধীকে ধরার জন্য? তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আদালত, বিচার ব্যাবস্থার প্রতি মানুষ শত ভাগ আস্থা হারিয়ে ফেলবে না! শুনেছি থানা থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরেই এ নির্মম খুনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য, থানার গেট থেকে মাত্র ৮/১০ গজ দূরে ছুরি চাকু নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে আমি নিজের চোখেই দেখেছিলাম একবার! অল্পের জন্য জানে বেঁচে গিয়েছিলেন আক্রান্ত ব্যক্তি। তবে গুরুত্বর আহত হয়েছিল। আক্রমণকারী তখন সরকারি দলে ছিলেন। শুনেছি থানা কর্মকর্তা সেই ক্রিমিনালকে গ্রেপ্তার করবে তো দূরের কথা, চা সিগারেট খাইয়ে, বলেছিলেন, ভাই এটা আপনাদের কাজ! ওই লোকটা মার্ডার হয়ে গেলে আমাদের চাকরি নিয়ে টানাটানি লাগত। থানার গেটের সামনে কেউ কারো উপরে স্ট্যাব করে? এই ছিল আইনের শাসন! এ-ও শুনেছি সে থানা, রাজনৈতিক নেতাদের মর্জিতে চলতে বাধ্য থাকত! এবং সেই সুযোগ সন্ধানী আক্রমণকারীরা দল পাল্টে এখনো আবার সরকারি দলেই ঢুকে গেছে। এবং একজন সুযোগ সন্ধানীর যা কাজ, তা করে চলছেন আগের মতোই বুক ফুলিয়ে। সুযোগ সন্ধানীরা সব সময়ই সুযোগ খুঁজে। জোট বেঁধে বিরোধী দলের টিকিটে জয়ী হয়ে সংসদে গিয়ে কেউ কেউ বলে, আমি তো আওয়ামী লীগেই আছি!
আমরা আরো কুপিয়ে মারার হত্যা দেখেছি। বিশ্বজিৎ হত্যা তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তাকে যখন কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছিল, সে বারবার বলেছিল, ‘আমি হিন্দু!’ অর্থাৎ যারা কোপাচ্ছে তাদের বোঝাতে চেয়েছে আমি তোমাদেরই লোক! তোমাদেরকেই ভোট দেই। এ দেশে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা আছে হিন্দু মানেই আওয়ামী লীগ। যদিও কথাটা সব সময় সত্য নয়। তা হলে হেফাজতের আমিরের সাথে আওয়ামী লীগের এত দহরম-মহরম হয় কি করে? যদিও পুঁজিবাদী দল ও মৌলবাদী শক্তি যতই ঝগড়া করুক বেলা শেষে উভয়ের পরস্পরের বন্ধুত হয়ে যায় শাসকদের। তা জাতীয় হোক বা আন্তর্জাতিক। মৌলবাদ ও পুঁজিওয়ালারা সরকারের সাথে প্রথমে যুদ্ধে লিপ্ত হয় পরাজিত হলে সুবিধা আদায় করে নিয়ে পোষা বিড়াল হয়ে যায়। ইতিহাস তো এমনটাই বলে। ‘আমি হিন্দু’ বলেও বাঁচতে পারেনি বিশ্বজিৎ। খুনিরা খুনের নেশায় মত্ত ছিল! বিশ্বজিৎ খুন হয়, খুনের বিচারও হয়েছে। অনেকেই সে বিচারকে দায়সারা গোছের কিছু বলে মনে করে। কেন না, বিশ্বজিৎকে যারা খুন করেছিল, তারা কেউ কেউ আদালত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মুক্ত!
পুড়িয়ে মারা হয়েছে নুসরাত জাহান রাফি নামের এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে দিনের বেলায়ই। খুনিদের মধ্যে কম বয়সী নারীরাও ছিল যারা খুনে সরাসরি অংশ নিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো,খুনিরা খুন করে পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিয়ে তারপর স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ফিরে গেছে। কেউ আবার ঘটনাস্থলের আশপাশেই ছিল। এমনকি সেই খুনিদের কেউ কেউ উল্টো মিছিল, মিটিং করেছে! আমি নিশ্চিত কোনো প্রফেশনাল কিলারও কাউকে পুড়িয়ে খুন করে পরীক্ষার হলে বসে থাকতে পারবে না! এরা কি করে তা পারল? কে তাদের এমন সাহস জুগিয়েছে? কত বড় পাষণ্ড হলে এবং কতটুকু নিশ্চয়তা পেলে এমন খুনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব অপেশাদারের পক্ষে?অপরাধবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জাতির সামনে তুলে ধরলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকতাম। যে সমাজে একজন নারীকে পুড়িয়ে মারা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর একজন তরুণকে প্রকাশ্য কুপিয়ে খুন করা হয় স্ত্রীর সামনে দিনের আলোয় সড়কের ওপর। নকল করতে না দেয়ায় পাবনায় কলেজের এক শিক্ষককে কলেজ গেটেই চর থাপ্পড় লাথি দেয়া হয়। আবার অপারধীকে এতই ভয় যে তাকে আসামি করে মামলা করতেও সাহস পায় না কলেজ কমিটি! সে সমাজে যে বহু রকম অপরাধ সংঘটিত হয় তা বুঝতে, অপরাধবিজ্ঞানী হতে হয় না, সমাজবিজ্ঞানী হওয়ারও প্রয়োজন নেই। কেন এমনটা ঘটে চলছে তা নিয়ে ভাবতে হবে এখনই, এবং থামাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী যদি নুসরাত রাফির খুনের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে না বলতেন, তবে তাকে ‘খারাপ মেয়ে’ বলে চালিয়ে দেয়া হতো, এমন কথা আমরা জাতীয় সংসদেও শুনেছি। পত্রিকায়ও পড়েছি। কি আজব নির্মম ও ভয়ঙ্কর সমাজে বাস করছি ‘খারাপ মেয়ে’ হলে আগুনে পোড়া যাবে! সেই আশঙ্কা সঠিক হয়ে হতে যাচ্ছে, রিফাত খুন হওয়ার পর। ‘খারাপ মেয়ের’ স্বামী হলে সে স্বামীকে যেন খুন করা অন্যায় নয়! রিফাতের খুনের চেয়ে এখন রিফাতের স্ত্রীর ‘চরিত্র’ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে! এ আলোচনা উসকে দেয়ার জন্য সংবাদমাধ্যমও আংশিক দায়ী; তা রিফাতের খুনিদের গ্রেপ্তারে দাবিতে করা মানববন্ধন থেকে একজন বক্তা মন্তব্য করেছেন। তিনি সংবাদ কর্মী ও সাংবাদিকদের এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ জানান। গত সপ্তাহের কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনায় অনেক মানুষ হতভম্ভ হয়ে গেছে। তা হলো মাকে খুন করে মেয়েকে ধর্ষণ! অন্যটি, আরো ভয়াবহ, হত্যা করার পর নিহত নারীকে ধর্ষণ! একবার খবরের কাগজে পড়ে ছিলাম পাকিস্তানের এক ব্যক্তি কবর দেয়া মৃত নারীর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হতো! পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এসব ঘটনার সবগুলোই মানবিক যে মানুষের কল্পনার বাইরে।
আবার এক স্কুলে ছাত্রীদের ধর্ষণ করে তা ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করে; ছাত্রীদের নিয়মিত ধর্ষণ তো করতোই আবার ছাত্রীর মায়েদেরকেও, মেয়ের ধর্ষনের ভিডিও দেখিয়ে, ধর্ষিতাদের মাকেও ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ! এ তো সিনেমার কাহিনীও হার মানছে যে! কাউন্সিলং প্রয়োজন, মেয়েদের, মেয়েদের মায়েদেরও। কেউ ধর্ষণ করলে সে ভিডিও ছড়িয়ে দিলেই মানসম্মান শেষ! এমন চরম পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে নারীরাই বের হয়ে আসতে পারছে না! কোনো মানবিক মানুষ, সভ্য মানুষ এসব খবর পড়ে, শুনে, সুস্থ থাকতে পারে না। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে! আমি যখন থেকে সাবালক হয়েছি, তখন থেকে সব সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এমন দাবি করতেই শুনেছি। অথচ এই দেশে ১৯/২০ বছর আগে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাগ্নে ছিনতাই করতে গিয়ে একপথচারীকে খুন করেছিল। সে মামলা ১৯ বছর ধরে হিমাগারে ছিল। ভাবা যায়, এ দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাগিনা ছিল একজন ছিনাতাইকারী!
এ দেশ সেই দেশ, যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা ফাটালেও আইনশৃঙ্খলা অবস্থা ঠিকই থাকে! প্রধান বিরোধীদলীয়, নেত্রীর ওপর উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা, গুলি চললে, লাশ পরলে, মানুষের দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে রাস্তায় পরে থাকলেও, ১০ ট্রাক অস্ত্র চালান ধরা পড়লেও আইনশৃঙ্খলা অবস্থা নাকি ভালোই থাকে! অন্য দিকে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আগে একজন মন্ত্রীর দায়িত্বহীন কথা বলতে শুনতাম। যদিও তিনি অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তখন। এখন আবার রেল দুর্ঘটনা নিয়ে একই রকম উচ্চারণ শোনা যাচ্ছে রেলমন্ত্রীর মুখে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কথা বলায় আরো সংযত ও দায়িত্ববান হওয়া উচিত। এটা কি তারা এ বয়সে শিখতে পাঠশালায় যাবেন? এখন তো তাদেরই অভিজ্ঞতা বিনিময় করে তরুণদের রাজনৈতিক পাঠ দেয়ার কথা। তিনি দায় নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না। অহেতুক নিজের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে। যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেই স্লিপারের অবস্থা আগেও পত্রিকায় এসেছিল। তাই এটা, দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ডের আওতায় পরে কি না তা ভাবনার বিষয়।
ফেসবুক, ইউটিউব নাকি নিয়ন্ত্রণ করা হবে! তা-ও আবার লেখা, পোস্ট বাংলাদেশি স্ট্যান্ডার্ডে হতে হবে! এমন কিম্ভূতকিমিকার চিন্তা কিভাবে আসে যখন সরকার সব কিছুতে ডিজিটালাইজেশন করতে চাইছে। জাতিসংঘ সনদ ও বাংলাদেশের সংবিধান বিরুদ্ধ এ কথা। চিন্তার স্বাধীনতা মানুষের জন্ম অধিকার। চিন্তা ভাবনায় কোন অঞ্চলের মানুষের, জাতির মার্জিন দেয়া সম্ভব? এসব কথা তো পরাধীন নাগরিকদের ওপর বহিরাগত শাসকেরা চাপিয়ে দেয়, দিতে চায়। বাংলাদেশ এখন স্বাধীন হয়ে গেছে। তখন যদি পাকিস্তানি স্ট্যান্ডার্ডে ভাবতো আমাদের পূর্বপুরুষেরা, তবে আর দেশটা স্বাধীন হতো না। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে মানুষের ভাবনাকে কোন ছাঁচে ফেলার চিন্তা করানো বোকামিই নয়, অজ্ঞতাও। তিনি একজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ হয়ে এমন কথা কিভাবে বললেন, তা আমার ছোট মস্তিষ্কে ঢুকছে না! যদি বাংলাদেশি স্ট্যান্ডার্ডও ধরি, তবে ১৯৫২, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সামনে এসে যায়। ১৯৯০ ও চলে আসবে। এ দেশের চিন্তার ও আন্দোলনের ইতিহাসের স্ট্যান্ডার্ড বলে, কারো কথায় বাঙালি চলবে না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালির স্ট্যান্ডার্ড অনেক ওপরে। কিন্তু বাঙালিকে বারবার ঠকানো হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন চীন সফর শুরু করবেন তার আগে হঠাৎ মার্কিনিদের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে রাখাইনকে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন সুগভীর ষড়যন্ত্রের আভাস। প্রকৃত পক্ষে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ ঠেলে দেয়া তো ভয়ঙ্কর যড়যন্ত্রই। বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে, তেমনি চীনের সাথেও রয়েছে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক। চীন সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে আমেরিকার এমন আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বক্তব্যে স্পট বুঝা যায় বাংলাদেশের সাথে চীনের সুসম্পর্কে মার্কিন সরকার সন্তুষ্ট নয়। ঢাকার সাথে বেইজিংয়ের সুসম্পর্ক ইদানীং যত না দিল্লিকে ভাবাচ্ছে তার চেয়ে বেশি মাথা ব্যথা হয়ে গেছে মনে হয় ওয়াশিংটনের! মিয়ানমারের সাথে সরাসরি ঝামেলা মানে চায়নার সাথেও ঝামেলায় জড়িয়ে পরা। এ কথা একজন শিশুও জানে। অবশ্য চীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও বিলিয়নারের সংখ্যা বেড়েই চলছে! আমি চীনতে শুনেছি, কোনো কোনো শহরে নাকি প্রতি সপ্তাহে একজন করে বিলিয়নার হচ্ছে! তাই তারা দেখবে ব্যবসা ও বাজার যেটা দরকার তা তারা করবে। এশিয়ায় মার্কিন সৈন্যের ঘাটির সংখ্যা কত? এবং তা কেন? দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিনিরা যুদ্ধ চলমান রেখেছে তালেবানদের সাথে আফগানিস্তানে। এরা সেই তালেবান, যারা মার্কিনি ও সৌদি আরবের অর্থে, অস্ত্রে বলিয়ান হয়ে দৈতে রূপ নেয়। এই তালেবানী দৈত দিয়ে, আফগানিস্তান থেকে রুশদের তাড়ায় মার্কিনিরা। কাবুলে এখন একটি মধ্যেযুগীয় সমাজ ব্যবস্থায় আটকে গেছে। এমনই ভয়াবহ সমাজব্যবস্থা যে, আফগান ক্রিকেট টিমকে ভারতের দেরাদুনে ক্রিকেট অনুশীলন করতে হয়। নিজ দেশে তারা ক্রিকেট খেলতেও ভয় পায়! বাংলাদেশে কেউ বলেনি যে রাখাইনকে বাংলাদেশের সাথে সংযুক্ত করে দাও। বাংলাদেশ আগ্রাসী শক্তি নয়। বাংলাদেশ অন্য যেকোনো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা করে। রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের, বাংলাদেশের নয়। এটা অনেকটাই বাংলাদেশের ঘাড়ে পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের অনুরোধে রোহিঙ্গাদের জায়গা দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে মাদক ব্যবসা ও অপারধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন কি এ কারণে বাংলাদেশ জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার সম্ভবনাও রয়েছে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকই রোহিঙ্গা পুনর্বাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন। পাহাড়, বন কেটে উজাড় করে ফেলায়, পরিবেশ হুমকির মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবেও মিয়ানমারের সাথে ঢাকার খারাপ সম্পর্ক ছিল না। প্রথমে ইয়াবা নামের মাদক চোরাচালান, তারপর লাখলাখ রোহিঙ্গা ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটতে থাকে। একজন জামায়াত নেতা ও এলডিপি নেতা মিয়ানমার ঘুরে আসার পর, মুক্তিযোদ্ধা হয়েও এলডিপি নেতা অলি আহমেদের আচানক জামায়াত প্রীতি বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তারপর আবার মার্কিনিদের উপযাচক হয়ে, বাংলাদেশের সাথে উখিয়াকে যোগ করার প্রস্তাব আরো ভাবিয়ে তোলে বৈকি। আসলেই কি তারা উখিয়াকে বাংলাদেশের সাথে সংযুক্ত করতে চায়? নাকি শেষ পর্যন্ত বলে বসবে, বাংলাদেশেই রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী জায়গা দাও! সাম্রাজ্যবাদীরা খুব চালাক হয়, তারা, বলে এক করে কিন্তু আরেক। অনেকটা জামালপুরের অঞ্চলিক প্রবাদের মত, ‘নটি মাগীর ভাইল, রান্দে মোরগ কয় ডাইল!’ সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদীরা যখন নারী ও নারীবাদ নিয়েও কথা বলে তখন, আমি উদ্বিগ্ন হই। শেষে না আবার বেশ্যাবাজার খুলে বসে! কেন না, পুঁজিবাদ সব সময় ব্যবসার মওকা খুঁজে। বাজেটে নারীদের ব্যবহৃত প্যাডের দাম বাড়ানো কিসের আলামত? নদী মাতৃক বাংলাদেশের রেলস্টেশনে হাফলিটার পানির মূল্য কত! পুঁজিবাদ মানে চরম শোষণ, ভোগও আছে, তবে প্রেম নেই। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রেম- ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এমন কি ঘৃণাও পুঁজি পাওয়া না পাওয়া ও অর্থের পরিমাণের সাথে উঠানামা করে। সে হিসেবে সম্পর্ক গড়ে ও ভাঙে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অধিকাংশ মানুষ সম্পর্ক স্থাপন করে প্রয়োজনের তাগিদ থেকে, তাই পুঁজিবাদী সমাজে, প্রেম-ভালোবাসায় মায়া-মমতা, স্নেহ -শ্রদ্ধায় মস্তবড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে।

প্রবাসীরা, এ দেশে বিনিয়োগ করতে চায়, কিন্তু তাদের বিনিয়োগ সঠিক জায়গায় হয় না। বা তারা চাইলেও সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে পারে না। আমি একবার সিলেটে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও মাছ চাষিদের একটি মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলাম। একজন জেলা সাংবাদিক অবাক করা বিষয় তুলে ধরলেন, তা হলো, সিলেটের প্রবাসীরা অলাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে। যেমন তারা বাড়ি করেন, তাতে তারা তো থাকেই না, ভাড়াটিয়াও পান না। বরং আরো একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ দিতে হয় বাড়িঘর দেখাশোনার জন্য। আবার প্রবাসীদের অভিযোগ কাকে টাকা দেবো, দু-এক বছর লাভ দেখিয়ে পরে, পুরো টাকাই মেরে দেয়। তারপর ঝগড়া, বিবাদ মামলা-মোকদ্দমা! চীনে থাকা একজন বাংলাদেশি কোটিপতি ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় হয়েছিল আমার, যার মালয়েশিয়াতেও ব্যবসা আছে। তার আপন ভাগিনা ও ভাতিজা মিলে কোটি কেটি টাকা মেরে দিয়ে দেশে চলে এসেছে। এবং তারা তাদের মামা ও চাচাকে বলেছে, তিনি দেশে এসে টাকা দাবি করলে খুন করে ফেলবে! যেহতু তার স্ত্রী বাংলাদেশি নয় তাই ভয়ে সন্তান ও স্ত্রীকে কখনোই দেশে আনবেন না! আমি আরো একজনকে চিনতাম যিনি দীর্ঘদিনের মার্কিন প্রবাসী। দেশে এসেছিলেন, বিনিয়োগ করতে। ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগও করে ছিলেন ৯৪/৯৫ সালে। তারপর চাঁদা দিতে দিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তিধরদের সহযোগিতায় সব দাবি ছেড়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করে মূল টাকা ফেরত নিয়ে আবার আমেরিকায় ফিরে গেছেন। তার ধারলাই ছিল না, ব্যবসা করতে গেলে এত চাঁদা দিতে হবে। কেউ তাকে স্বাগত পর্যন্ত জানায়নি। অথচ তিনি দেশকে ভালোবেসে তার পরিশ্রমের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করতে এসেছিলেন। আরেক জন তো টাকা থাকতেও ব্যবসায় নামেন না! বাংলাদেশ ব্যাংকে নামে বেনামে টাকা রেখে কেবল সুদ গ্রহণ করেন। অথচ তিনি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সাহস পাচ্ছেন না।
এ দেশ পুঁজিবাদী হলেও পুঁজি উৎপন্ন হচ্ছে না। লুটপাট করে কিছু মানুষ রাতারাতি ধনী হয়ে উঠছে। এটাকে পুঁজির বলে কি অর্থনীতির ভাষায়? আমার তো তা মনে হয় না। বাণিজ্য ও অর্থনীতির ছাত্র-শিক্ষকরাই ভালো বলতে পারবেন। এই যে লুটে নেয়া অর্থ, যার অধিকাংশই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। খবরে প্রকাশ সুইচ ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ গচ্ছিত রাখার পরিমাণ বেড়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে বাঙালিদের বেগম পাড়া বাড়ছে। অথচ বিদেশ থেকেই বাঙালি সাহেব বেগমদের দেশে এসে বিনিয়োগ করার কথা ছিলো। এক দিকে দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে অন্য দিকে প্রবাসীদের বিনিয়োগ আসছে না। দেশের মানুষের জন্য অলিগলি অনিরাপদ হয়ে উঠলে, কিভাবে উৎপাদন বাড়বে, পুঁজি বাড়বে বা আসবে বিনিয়োগ? প্রকৃত শিক্ষার বিকাশ তো সম্ভব ই নয়। পুঁজিবাদ ছড়াতে গেলেও তো আইনের শাসন জরুরি। মজুর, কৃষক, ব্যবসায়ী, ছাত্র-শিক্ষক লেখক-বুদ্ধিজীবীদের যদি ভীতিকর পরিবেশের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয় তা হলে আয় রোজগার, পড়া -লেখা জ্ঞান চর্চা ও চিন্তার সুষ্ঠু বিকাশ কি করে সম্ভব?
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীদের ছাড় দেয়া বন্ধ করতে হবে এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ব্যতীত আর কোনো পথ খোলা নেই। কঠোর আইন করলেই অপরাধ কমে যাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। ইউরোপীয় অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই। অথচ তাদের কিছু কিছু দেশের কয়েদখানা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে কয়েদির অভাবে। আবার এ উপ-মহাদেশে জেলখানার আয়তন ও সংখ্যা বাড়াতে হচ্ছে কঠোর আইন থাকার পরও। মইনুল ফখরুদ্দীনের শাসনের আমলে যখন সেনাবাহিনীর ভয়ে অনেকেই দেশ ছাড়া, পলাতক; তখনও একটি উপজেলায় মানুষ খুন করে ফুটবল খেলেছে খুনিরা! উন্নত, মানবিক চিন্তা, বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠক্রম, সুশিক্ষা, সুশাসন ছাড়া মানবিক রাষ্ট্র গঠন করা অসম্ভব।
এত কিছুর পরও আমরা আশাবাদী থাকতে চাই। আমরা স্বপ্ন দেখতে চাই, সমাজের মানুষেরা বর্বরতা, পাষণ্ডতা পরিহার করেছে। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ৭১ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল সে স্বপ্নকে ঘিরেই।
লেখক : কবি ও মুক্তচিন্তক। [email protected]