কেমন আছেন সেক্টর কমান্ডার সিআর দত্ত?

কেমন আছেন সেক্টর কমান্ডার সি.আর.দত্ত, বীরউত্তম জানতে গিয়েছিলাম শনিবার ২১শে সেপ্টম্বর ২০১৯, তার সুযোগ্য পুত্র চিরঞ্জীব দত্ত রাজার নিউইয়র্কের লং-আইল্যান্ডের বাসায়। বাড়ি তো নয়, জমিদার বাড়ি। দন্ত চিকিৎসক রাজা থাকতো বে-সাইডে। বাবার জন্যেই লং-আইল্যান্ডে যাওয়া। দোর-গোড়ায় রাজা আমাদের রিসিভ করে। আমাদের মানে, সাথে, রতন তালুকদার, জন্মভূমি সম্পাদক। এমনিতে যাওয়া, তাকে নিয়ে লিখবো তেমন কোন প্ল্যান ছিলোনা। ঠিকানায় লেখা দিতে হবে, আজ হঠাৎ মনে হলো, সি.আর.দত্তকে নিয়ে লিখিনা না কেন?
জেনারেল সি.আর.দত্তকে নিয়ে বড় পরিসরে বিশদ লেখার ইচ্ছে আছে, কারণ তার সাথে আমার বহু স্মৃতি বিজড়িত। আজ আপাতত: শুধু এবারকার ভিজিট নিয়ে লিখছি। তাকে চিনি সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, ডাকতাম ‘কাকু’ বলে। ঘরে ঢুকেই দেখি তিনি একটি চেয়ারে বসে আছেন। পা-ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। তিনি খুব হাসলেন, অমায়িক হাসি, মাথায় হাত বুলালেন। বললাম, বলেন তো আমি কে? কয়েক সেকেন্ড চিন্তায় পড়ে গেলেন? আবার বললাম, বলেন কাকু, আমি কে? এবার স্পষ্ট উত্তর, ‘শিতাংশু’। অবাক হলাম। খুশিও। খুশি রাজা-তুলি। এবার রতন জিজ্ঞাসা করলো, একই প্রশ্ন, তিনি সঠিক উত্তর দিলেন।

নিউইয়র্ক: সিআর দত্তের সাথে লেখক শিতাংশু গুহ ও রতন তালুকদার। 

সুতরাং, সবকিছু ভুলে গেছেন তা নয়, মাঝে-মধ্যে ভুলে যান, আবার মনে হয়। ৯৪ বছর বয়সে এটাই বা কম কি? এমনিতে শারীরিকভাবে তিনি চমৎকার আছেন। অল্পস্বল্প হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। ডায়াবেটিস, বা ইত্যাকার রোগ বর্ডার লাইনে। খাওয়া-দাওয়া নিয়মিত এবং পরিমিত। সবই খান, পুত্রবধূ ‘তুলি’ নিজে এসব তদারকি করেন। সার্বক্ষণিক একজন লোক আছে, কিন্তু রাজা-তুলি বাবার সেবা নিজেরাই করতে পছন্দ করেন। বাবা-মা’র সেবা করার সৌভাগ্য সবার হয়না, সেদিক থেকে সি.আর.দত্তের পুত্রকন্যারা ভাগ্যবান।

অনেকদিন দেখিনা, যাই যাই করেও যাওয়া হয়না, তবে যা ভেবেছিলাম, তা থেকে তিনি বেশ ভালো আছেন। দেখে আরো ভালো লেগেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, মুক্তিযুদ্ধ মনে আছে? হাসলেন, এবং বললেন, ‘আছেনা?’। আপনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন? মনে করতে পারলেন না। ১৯৬৫ সালে তার বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ এবং কুমিল্লায় তাকে নিয়ে শোভাযাত্রার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। বললেন, ভুলে গেছেন। রাজা জানালো, নিকট অতীত থেকেও সুদূর অতীত নাকি তাঁর বেশি মনে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো এ বিষয়টি ভালো বুঝবেন। তবে তার লম্বা-চওড়া সুঠাম দেহসৌষ্ঠব অটুট আছে।

নিউইয়র্ক: সিআর দত্তের সাথে সন্তান চিরঞ্জীব দত্ত ও বউমা তুলি। 

রতন তালুকদার এরই ফাঁকে ফাঁকে তার একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টা করেছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কিছু জানতে চেয়েছে। সাপ্তাহিক জন্মভূমির সাথে তিনি পরিচিত, পরিচিত ঠিকানার সাথেও। কারণ রাজা নিয়মিত পত্রিকা দু’টি বাবার জন্যে নিয়ে আসে। পত্রিকা তিনি উল্টান, দেখেন, কতটা পড়েন বোঝা মুশকিল। তবে তিনি সজ্ঞান ও সচেতন। বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে এবং প্রধানমন্ত্রী আসছেন জানালে তিনি হাসলেন। আমাদের সাথে বসে তিনি টিফিন করলেন, আমাদের মত সবই খেলেন। বারবার তিনি আমাদের খেতে তাগদা দিতেও ভুল করেননি।

লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন, তবে সাহায্য লাগে। রতন ও আমি তাকে দু’পাশে ধরে তার রুমে নিয়ে যাই। শিশুর মত জিজ্ঞাসা করেন, একটু ঘুমাই? অনেকক্ষণ ছিলাম, দু ঘন্টার বেশি, প্রায় পুরো সময়টা তিনি আমাদের সাথে ছিলেন। তুলি জানালো, মানুষজন এলে তিনি ভালো ফিল করেন। মানুষের সাথে মিশে, মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে যিনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। পরিচিত জন দেখে তিনি খুশি হবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমরাও খুশি হয়েছি। বিদায়কালে রাজা বললো, তোমাদের দেখে বাবা চিনতে পেরেছে, খুবই পজিটিভ। কাকু-কে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, সিলেটের কথা মনে আছে? হবিগঞ্জ?

সি.আর.দত্ত, আমার জানামতে একজন সাধারণ মানুষের মত জীবন-যাপন করেছেন। বিআরটিসি, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ঐ সময়টায় শুধু তার আমলেই লাভজনক ছিলো। পাকিস্তানের হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দেশের স্বাধীনতার জন্যে লড়েছেন। জেনারেল জিয়ার উত্থান-পতন স্বচক্ষে দেখেছেন। এরশাদের উত্থান দেখেছেন। তিনি সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় অনেক অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ, হত্যা, ষড়যন্ত্র হয়েছে। জাতি কখনো তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ শুনেনি। জিয়া বা এরশাদ তাকে সিনিয়র অফিসার হিসাবে স্যালুট দিয়েছেন, কিন্তু দূরে সরিয়ে রেখেছেন। বিডিআরের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় ইত্তেফাক তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বিষোদ্গার করেছে।
ঢাকার মাটিতে তিনি গুলি খেয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ‘ওএসডি’ হয়েছেন। সরকার বা সেনাবাহিনী থেকে, মেজর জেনারেল হয়েও এক টুকরো জমি নেননি। ডিওএইচএস জমিটি স্বল্পমূল্যে এক বন্ধুর থেকে স্ত্রীর পীড়াপিড়িতে কিনেছেন। দুঃখের বিষয় তার স্ত্রী, আমাদের ‘কাকিমা’ তার আগেই চলে গেছেন। জাতি জানলে লজ্জা পাবে, মেজর-জেনারেল হিসাবে রিটায়ার করলেও তিনি পেনশন পান, ‘কর্নেল’ হিসাবে! এই হিসাবটা ঠিক মেলেনা? টাকার হয়তো তাঁর প্রয়োজন নেই, কিন্তু এমনটা হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন, তখন জেনারেল সি.আর.দত্তের মত দেশপ্রেমিক মানুষের অভাব বড়ই অনুভূত হচ্ছে।
-নিউ ইয়র্ক।