কে হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি?

নূরুল ইসলাম : কে হচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি! কে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে! বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। আগামী ২৩ এপ্রিল বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে আর রাষ্ট্রপতি থাকার সুযোগ নেই তার। ফলে ১০ বছর পর নতুন রাষ্ট্রপতি পাচ্ছে দেশ। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস আগে অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে ১৯৯১ সালের পর আর কখনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের প্রয়োজন হয়নি। বরাবরই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়ে আসছেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি হবেন আওয়ামী লীগের- এটা নিশ্চিত। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে কে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন, সেটাই আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রপতির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তাই অনেকেই পদটিকে ‘আলংকারিক’ হিসেবে আখ্যা দেন। তবে রাজনৈতিক সংকট কিংবা নির্বাচনের সময়ে রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করছেন, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকট সমাধান, রাজনৈতিক দলগুলোকে চূড়ান্ত সমন্বয় করা ও নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে- কে বসছেন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে। আওয়ামী লীগের ভেতরের খবর হচ্ছে, কয়েক মাস ধরে ডজনের বেশি ব্যক্তির নাম আলোচনায় ছিল। এখন তালিকা সংক্ষিপ্ত হয়ে চার-পাঁচজনে নেমে এসেছে। তাদের মধ্যে শীর্ষে আছে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও বিচারপতি খায়রুল হকের মধ্যে যে কেউ বসতে পারেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে।
মাস দুয়েক আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের নামও আলোচনায় ছিল। আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও বিদগ্ধ নেতা আমির হোসেন আমু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নামও উচ্চারিত হয়েছে। এখন সেই আলোচনা অনেকটা কমে গেছে। ওবায়দুল কাদেরকে নিয়েও কিছুদিন আলোচনা ছিল। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর সেই আলোচনা আর নেই। সম্প্রতি ওবায়দুল কাদের নিজেই বলেছেন, তিনি এখনো রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য নন।
রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা- এই দুজনের সঙ্গেই কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তার। সেদিক থেকে তার নাম এগিয়ে রাখছেন অনেকেই। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত ছিল, তখন একাধিক প্রণোদনা ও আর্থিক সহযোগিতার ঘোষণা এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই কঠিন অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সঠিক পরামর্শ ও পরিকল্পনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করেন মসিউর। ড. মসিউর রহমান ২০০৯ সাল থেকে তিন মেয়াদে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী, বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে ইআরডি সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ড. মসিউর রহমান ১৯৭২-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব ছিলেন। জোট সরকারের সময় ২০০১ সালে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থ উপদেষ্টার পাশাপাশি ড. মসিউর আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদেরও সদস্য।
এদিকে খ্যাতিমান অধ্যাপক নাইয়ারা সুলতানার কন্যা উচ্চ আদালতের আইনজীবী শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি পদের জন্য আলোচনায় বেশ এগিয়ে আছেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংরক্ষিত সংসদ সদস্য হন এবং একই সঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শিরীন। ২০১৩ সালে স্পিকার আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে ৩০ এপ্রিল তিনি জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকারের দায়িত্ব পান। সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী ও অত্যন্ত মেধাবী শিরীন শারমিন যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পিএইচডি করেন। একজন কমনওয়েলথ স্কলার তিনি। বয়সে অত্যন্ত তরুণ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য এগিয়ে আছেন। তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এত তরুণ কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে এখনো মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ। জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিক দলগুলোর পছন্দের প্রার্থী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।
দলীয় সূত্র জানায়, আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে রাষ্ট্রপতি করার ব্যাপারে দলের একটা অংশ তৎপর আছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে আনিসুল হক আইনজ্ঞ, পারিবারিকভাবে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠ।
আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা ঠিক করবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তারা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি পদে চমক দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের টানা তিন মেয়াদে শেখ হাসিনা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সংসদ এবং সব ক্ষেত্রেই নারীর ক্ষমতায়নে চমক দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে একজন নারী রাষ্ট্রপতি করার কথা বিভিন্ন সময় বলেছেন। সে হিসেবে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আলোচনায় আছেন। এমনটা হলে দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, সংসদের উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতাÑসবাই হবেন নারী। এই ভাবনাকে আওয়ামী লীগের কেউ কেউ বলছেন ‘চমকপ্রদ’। তাদের মতে, দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের দায়িত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। নারী রাষ্ট্রপতি দিয়ে আরেকটি রেকর্ড করবেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে নানা সময়ে যুক্ত ছিলেন, আওয়ামী লীগের এমন দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্ভাবনার ক্রম করা হলে এখনো মসিউর রহমানের নাম শীর্ষে আছে। এমনকি রাষ্ট্রপতি পদে তাকে বিবেচনার পর গণমাধ্যমে বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে তার উপস্থিতি চোখে পড়ে না।
নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে কে আসতে পারেন, এ বিষয়ে কাজ করছেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি করা হবে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।