কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি পাকিস্তান

এস আকবর জায়দি
গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৬৯ সালের মার্চে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। তিনি আরেক দফা সামরিক আইন জারি করেন। ‘দ্য স্ট্রাগল ফর পাকিস্তান : আ মুসলিম হোমল্যান্ড অ্যান্ড গ্লোবাল পলিটিকস’ শিরোনামের গ্রন্থে আয়েশা জালাল ইয়াহিয়াকে পাঁড় মাতাল ও হালকা স্বভাবের ব্যক্তি আখ্যায়িত করেছেন; যৌনতায় চরম আসক্তি ছিল তাঁর। অনেকেই তাঁকে মনে রেখেছে ‘নিশিকালীন’ কর্মকা-ের জন্য। বিষয়টি তখন ‘টক অব দ্য নেশন’ ছিল। ‘জেনারেল রানি’ [আকলিম আক্তার, ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে নিবিড় সংশ্লিষ্টতা ছিলবিস] তাঁর নিশিকালীন ‘এলিট গসিপ’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
এখনো যে মানুষ ইয়াহিয়াকে স্মরণ করে তার কারণ সম্ভবত দুটি অবিস্মরণীয় ঘটনা, যা তাঁর আমলে ঘটেছিল। এক ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং দুই এর জেরে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা ও পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ নামে আবির্ভাব। দুইঘটনায়ই তিনি নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন। অবশ্য তিনি একাই সক্রিয় ছিলেন না, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও শেখ মুজিবুর রহমানেরও বড় ভূমিকা ছিল।
সামরিক একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ‘উন্নয়নের দশক’-এর পুঁজিবাদী কর্মকা- অসংখ্য স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছিল। সেসবের কারণে ষাটের দশকের শেষ দিকে আঞ্চলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে। এসবের ফলেই পাকিস্তানের প্রথম গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পশ্চিম পাকিস্তানে বেলুচ ও পাখতুন জাতীয়তাবাদীরা এক ইউনিট ব্যবস্থার বিলোপ চাইছিল, আর জুলফিকার আলী ভুট্টো ছাত্র, শ্রমিক ও উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশকে আইয়ুবের বিরুদ্ধে পরিচালিত করেছিলেন। তাসখন্দ চুক্তির পর আইয়ুবের পক্ষে ভিড়ে যান তিনি। এর পরও কিছু বুদ্ধিজীবী ভুট্টোকে সামরিকতন্ত্রবিরোধী কণ্ঠস্বর মনে করেন।
পূর্ব পাকিস্তানে মওলানা ভাসানী কৃষকদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তবে ১৯৬৬ সালে গণতন্ত্র ও অধিকতর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ছয় দফা কর্মসূচি এবং ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণে আইয়ুবের বিদায়ের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তানি/বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব। পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছেপূর্বাঞ্চলে এই মত প্রবলতর হচ্ছিল। তার পরও ওই সময় পর্যন্ত তিনি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় পাকিস্তানের পক্ষেই ছিলেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১১ বছরের টানা সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ক্যারিসমেটিক ও পপুলিস্ট নেতাদের আহ্বানে ১৯৭০ সালের অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন ইয়াহিয়া খান। এক ইউনিটের ধারণা থেকে সরে দাঁড়িয়ে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশকে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬২ আসন দিলেন তিনি।
আইয়ুবের কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার সময়ই সামরিক আইন জারি করেছিলেন ইয়াহিয়া। সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাকাঙ্ক্ী নেতাদের প্রভাবিত করতে ব্যস্ত ছিল। ইয়াহিয়ার ওই সিদ্ধান্তের বিশ্লেষক ইতিহাসবিদরা বলেন, তিনি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। গোয়েন্দারা বলেছিল, কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, একটি ঝুলন্ত সংসদ হবে। ফলে প্রকৃত ক্ষমতা সামরিকতন্ত্র-আমলাতন্ত্রের হাতেই থাকবে।
পূর্ব পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে জাতীয় নির্বাচন দুই মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়। ডিসেম্বরের ৭ তারিখে ভোটের দিন ধার্য করা হয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হয় পূর্বাঞ্চলে। দুই লাখ মানুষ নিহত হয় (মতান্তরে ১০ লাখবিস)। এই ঘূর্ণিঝড়ই নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়, বলা চলে পাকিস্তানের ভাগ্যও। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় পাঞ্জাবি-মুহাজির অধ্যুষিত সামরিক-আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের ভূমিকা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে মর্মাহত করে। পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগের এই দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকরা বলতে শুরু করেন, দেখো, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের কাছে পাকিস্তানি বাঙালিরা কতটা অপাঙক্তেয়
পাকিস্তানের গণতন্ত্রায়ণপ্রক্রিয়ার বিশ্লেষকরা বলেন, পাকিস্তানে নির্বাচন না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পাঞ্জাবি-মুহাজির ও তাদের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক সহযোগীদের ভয়। তাদের ভয় ছিল, সর্বজনীন নির্বাচন হলে পূর্ব পাকিস্তান বরাবরই বেশি আসন পাবে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল এ আশঙ্কার বিষয়টিকে নিশ্চিত করল। পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়লাভ করল। ফলে পাকিস্তানের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল তারা। ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি ১৩৮ আসনের মধ্যে ৮১টিতে জয় পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হলো। তারা মূলত সিন্ধু ও পাঞ্জাবের আসনগুলো পেয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রধান দুই দলের কেউই দেশের অন্য অংশে একটি আসনও পেল না। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কার্যত পাকিস্তান দ্বিধাবিভক্ত হলো।
পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চে। এর আগে অর্থাৎ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর এবং অপারেশন শুরুর আগের অল্প সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু রাজনীতিক দেখিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা কতটা দুর্বিনীত। তাঁদের ইগো আর সামরিক নেতৃত্বের অকর্মণ্যতা ও সদিচ্ছার অভাব সমার্থক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাজনৈতিক সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করে সমাধানের উপায় খুঁজতে যাননি তাঁরা।
পাকিস্তানের ঐক্য টিকে থাকত, পাকিস্তান বেঁচে যেত, যদি ওই স্বল্পকাল ব্যাপ্তিতে পাঞ্জাবি-মুহাজির সামরিক-আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিত। কিন্তু এই ফল বোধ হয় তাদের চিন্তার বাইরে চলে গিয়েছিল, তাদের একান্ত স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। উপরন্তু একজন জনপ্রিয় গণতন্ত্রপন্থী নেতা ওই গণরায় মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এই আচরণ তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল।
ফলাফল ঘোষণার পরই দুজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা যায় কি না, সে বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বাহ্যত ভুট্টো এতে রাজিও ছিলেন। ইয়াহিয়া ঢাকায় যান, মুজিবের সঙ্গে আলোচনার সময় তাঁকে ‘পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ উল্লেখ করেন। ঢাকা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে তিনি লারকানায় যান ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করতে। ভুট্টো তাঁকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নিয়ন্ত্রণ তথা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ মুজিবের হাতে তুলে না দেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ঢাকায় যান; কিন্তু তাঁদের আলোচনা ব্যর্থ হয়।
সুজা নওয়াজ তাঁর ‘ক্রস সোর্ডস’ (ক্রস সোর্ডস : পাকিস্তান, ইটস আর্মি, অ্যান্ড দ্য ওয়ারস উইদিনবিস) গ্রন্থে লিখেছেন, অনেক ঊর্ধ্বতন জেনারেল ভুট্টোকে সমর্থন দিতে ইচ্ছুক ছিলেন। বিষয়টি খুবই স্পষ্ট, পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয়ী নেতা ও জেনারেলরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। ফলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। ভুট্টো মন্তব্য করেন, আ মেজরিটি অ্যালোন ডাজ নট কাউন্ট, অর্থাৎ শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ণায়ক বিষয় হতে পারে না (কী পরিহাস ১৯৮৮ সালে এই বাণীই তাঁর মেয়েকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে)। এমন আরো অনেক মন্তব্য তিনি করেছেন।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) অধিবেশন ডাকেন ইয়াহিয়া। ভুট্টো হুমকি দেন, পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি ঢাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর পা ভেঙে দেওয়া হবে (টাঙ্গে তোর দুঙ্গাঠ্যাং গুঁড়ো করে দেব। তাঁর এ মন্তব্যও বিখ্যাত)। একবার তিনি এমন কথা বলেছিলেন যে একজন সাংবাদিক খবরের শিরোনাম করেছিলেন ‘উধার তুম, ইধার হাম’।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার পৌনঃপুনিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এবং আলোচনা ভেঙে পড়ায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে। ইয়াহিয়া ও ভুট্টোদুজনই তখন ঢাকায়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে কী হয়েছে সে ব্যাপারে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর লোকজন ও ইতিহাসবিদরা অনেক কিছু লিখেছেন। ভারত ও বাংলাদেশের প-িত ব্যক্তিরাও অনেক লিখেছেন। ভাষ্যে তফাত থাকতে পারে। কেননা ক্ষয়ক্ষতি, গণহত্যা, ধর্ষণ প্রভৃতি বিষয়ে হিসাবে-বিবরণে তফাত থাকেই। তবে লেখকদের মধ্যে, বিশেষ করে পাকিস্তানি লেখকদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভয়ংকর সব কা- ঘটিয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন লন্ডন সানডে টাইমসে প্রকাশিত পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত ও সরল‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা)। পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটানো হচ্ছিল তা বিশ্ববাসীর নজরে আসে ওই লেখার মাধ্যমে।
বিটলসের জর্জ হ্যারিসন যখন বাংলাদেশের পক্ষে একটি কনসার্টের আয়োজন করছিলেন তখন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বিশ্বশক্তি চোখ বুজে ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছিল তা তারা দেখতে পাচ্ছিল না। গ্যারি বাসের গ্রন্থ ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’-এ বলা হয়েছে, রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার হত্যা-নিপীড়ন-নির্যাতন ঠেকাতে কিছুই করেননি; সজ্ঞানেই তাঁরা কিছু করেননি। বইটি অংশত আর্চার ব্লাডের একটি টেলিগ্রামের ভিত্তিতে রচিত। ব্লাড তখন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে সে ব্যাপারে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। চীনও তখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কথা বলা থেকে দূরে থেকেছে।
পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চলেছে মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছিল মুক্তিবাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিচালনায়। মুক্তিবাহিনীর হাতে বেশ কিছু বিহারির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ঘটনাপরম্পরায় নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে ভারত। এর জেরে (পশ্চিম) পাকিস্তান ভারতে হামলা চালাতে শুরু করে ৩ ডিসেম্বর। ১৪ বা ১৫ ডিসেম্বর সরকার পশ্চিম পাকিস্তানিদের বলে যে তারা যুদ্ধে জিততে যাচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ এ কে ‘টাইগার’ নিয়াজি ঢাকায় জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সেনাদের কাছে (যৌথ বাহিনীর কাছেবিস) আত্মসমর্পণ করেন। পূর্ব পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে শুধু আরেকটি বিভাজনের ঘটনাই ঘটেনি, জিন্নাহর ‘দ্বিজাতি তত্ত¦’র কবরও রচিত হয়।
সুজা নওয়াজের মতে, এর জন্য দায়ী দুর্নীতিপরায়ণ একটি সেনাবাহিনীর ‘সুখ-কল্পনা’। ‘প্রাপ্তির সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত’ এবং ‘অজ্ঞতা ও সুরার মহিমায় আচ্ছন্ন’ একটি সেনাবাহিনী পাকিস্তানের এই বিপর্যয়ের কারণ। তবে এ কথাও ঠিক, ঘটনাবলির অন্তত তিনটি স্পষ্ট ধাপ ১৬ ডিসেম্বরের পরিণতি ডেকে এনেছিল।
ভোটারদের ইচ্ছাকে আমলে না নিয়ে ভুট্টো ও তাঁর সামরিক সমর্থকরা একটি সংকট সৃষ্টি করেছিল। সামরিক বাহিনী এর সুরাহার একটি উপায়ই জানত, সেভাবেই তারা সংকট মোচন করতে গিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণি গণতন্ত্র ও গণরায়কে মেনে নিতে অনিচ্ছুক ছিল। পাকিস্তানি রাজনীতিকরা সাংবিধানিক ব্যর্থতার জন্য দায়ী হলেও পূর্ব পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ-ধ্বংসযজ্ঞের জন্য শুধু সেনাবাহিনী দায়ী।
দুঃখজনক হলেও সত্য, পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর বিধ্বংসী কর্মকা-ের প্রতিবাদকারী, বিরোধিতাকারী পশ্চিম পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এই নীরবতার কারণে তাঁরাও হত্যাযজ্ঞের সহযোগী। ১৯৭১ সালের শেষ কয়েক মাসে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশে পরিণত হওয়ায় সহযোগিতা করেছে; কিন্তু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত যে অবস্থা বিরাজ করছিল, তার জন্য তারা দায়ী নয়। বহিঃশক্তি শুধু ভেতরের অসন্তোষকে পুঁজি করতে পারে, অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। ভারত ঠিক সেটাই করেছিল।
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নেওয়া এখনো বাকিই রয়ে গেছে। পূর্বাংশের বিচ্ছিন্নতার ফলে খ-িত পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরেছিল বটে; কিন্তু ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের ঘটনাবলি আঞ্চলিকতা-প্রাদেশিকতাকে মোকাবেলা করার নামে চাপা পড়া কেন্দ্রীকরণের বিষয়টিকেই ফিরিয়ে আনল। পাকিস্তানের ভাঙনের জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার করার, শায়েস্তা করার উদ্যোগ বলতে গেলে নেওয়াই হয়নি।
লেখক : রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ। করাচির ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট ও নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন
সূত্র : দ্য ডন অনলাইন (পাকিস্তান)
ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক