কোন পথে বাংলাদেশ?

পুড়ছে নড়াইল, কাঁদছে মানবতা

কাজী মোশাররফ হোসেন :

নড়াইল, সরাইল, নানুয়া দীঘি, নাসিরনগর, পীরগঞ্জ বা রামুতে একের পর এক বাস্তুভিটায় অগ্নিসংযোগ, রাতে বা দিনে লুটপাট, ভাঙা হচ্ছে দেবতা বা দেবতাঘর। নির্মম, নৃশংসতায় অচেনা হয়ে যাচ্ছে চিরচেনা প্রতিবেশী। নারী অপমান, সর্বস্ব হরণে পিছপা হচ্ছে না এতটুকু। কে করল দোষ, কাকে ধরে মারছি, আইনশৃঙ্খলা আছে কি নেইÑসবই সাক্ষী গোপাল।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকের স্বপ্ন ছিল এটি পাকিস্তান, ভারত বা আফগানিস্তানের মতো না হয়ে সকল নাগরিকের সমান মর্যাদার এক উন্নত দেশ হয়ে উঠবে ধীরে কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে। কিন্তু দিনে দিনে তার উল্টো পথে চলায় সব আশা এমনকি শেষ আশাটুকুও গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ধরা হয় সংখ্যালঘুবান্ধব সরকার হিসেবে। অধিকাংশ সংখ্যালঘুও তা-ই মনে করে থাকেন। তবু সংখ্যালঘুদের বাড়ি, এলাকা বা ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার পরিসংখ্যান বা চিত্র ভিন্ন বার্তা বহন করে।
রামুর বৌদ্ধমন্দির ভাঙা বা এলাকা লুটপাট হয়েছিল ২০১২ সালে। সে সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ এবং অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে যে এর পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাদের হাত ছিল।

নাসিরনগরের ঘটনাও ছিল ফেসবুক বা ইউটিউব পোস্টিংকে কেন্দ্র করে লুটপাট, মন্দির ভাঙা বা নারীদের অসম্মান করা।
নানুয়া দীঘির কাণ্ড ছিল দেবতার পায়ে মুসলিম ধর্মগ্রন্থ রাখা নিয়ে। চলেছে দল বেঁধে হিন্দুপাড়া আক্রমণ, লুটপাট বা নারী নির্যাতন। পীরগঞ্জে হলো ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ। নানুয়া দীঘিতে (কুমিল্লা) যে কোরআন শরিফ রেখে এসেছিল, সে ছিল মুসলিম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায়ই কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম বলে হামলা চালানো বা তাদেরকে নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে হামলা চালানো হয়। সরাইল বা মেঘনা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে দেখা যায়, যখন মারামারি বাধে, নারী-পুরুষ সবাই মিলে রণক্ষেত্রে হাজির হয় লাঠি, বল্লম, কোঁচ, ট্যাঁটা, কাতরা, রামদাসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে নিয়েও হয়ে গেল লঙ্কাকাণ্ড। উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনায় ঝরে গেল বেশ কিছু প্রাণ, যা কাম্য ছিল না।

যশোরের একটি কলেজে এক ছাত্রের ফেসবুক পোস্টে পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটে গেল আরেক আইন অমান্যের ঘটনা। সেখানে হিন্দু অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হলো সারা শহর। হিন্দু ছাত্রের পোস্ট এবং মুসলিম ছাত্রদের প্রতিবাদে অধ্যক্ষ পুলিশের সাহায্য কামনা করলেন অথচ পুলিশের সামনে তিনি জুতার মালা পরিধান করে শহর প্রদক্ষিণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সর্বশেষ নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার সাহাপাড়ায় পোড়ানো হলো ঘরবাড়ি এবং লুট করা হলো মন্দির। টাকা-পয়সা, সহায়-সম্বল, দুধের গরুটা-ও নিয়ে যাওয়া হলো। বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে নাগরিকদের কী বিশাল অর্জন! নিজ দেশে পরবাসী। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। অথচ দুর্বলদের, হিন্দুদের, সংখ্যালঘুদের, মামু-খালুহীনদের ওপর কী নির্যাতন! মানবিক হওয়ার জায়গা থেকে মানুষ কোন দিকে সরে যাচ্ছে?

পীরগঞ্জে জেলেপাড়ায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল একজন সৈকত মন্ডল (মুসলমান)। ওখানকার এসপি ছিলেন হিন্দু ভদ্রলোক। নড়াইল জেলার তিনটি মাত্র থানা। বিকেলে বা সন্ধ্যায় পুলিশ মোতায়েনের পরও ঘটনা ঘটল। এসপি সাহেবরা এসপি হিসেবেও ব্যর্থ হলেন, হিন্দু এসপি হিসেবেও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলেন।
ইসলামে ছবিকে অনেকভাবে নিষিদ্ধ করা আছে প্রয়োজন ব্যতিরেকে। যে ইমেজগুলো নিয়ে রামুর ঘটনা, নাসিরনগরের ঘটনা বা নড়াইলের ঘটনা, সেগুলো অনেক গতিশীল সব অর্থেই, আবার তা ছাপানো কপিও নয়। এর ওপর যে ধরনের উন্মত্ততা দেখানো হলো বা একজনের অন্যায়ে পাড়ার সবাইকে শাস্তি দেওয়া হলো, তার কোনো আইন কোরআন বা হাদিসে আছে কি? থাকলে মাওলানা সাহেবরা দেখাবেন। এগুলো সন্ত্রাস বা ফেতনা। সন্ত্রাস হলে, ফেতনা বা আতঙ্ক সৃষ্টি হলে তার বিচার ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী কি চাইবে সংখ্যালঘুরা? ইসলামে কঠোর আইন আছে, তাইতো চাওয়া উচিত।
ইসলামি শিক্ষা বা আইন বা সভ্য সামাজিক আইনে এই সন্ত্রাস দমন করা যাচ্ছে না বা করা হচ্ছে না। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতার নামে, ধর্মীয় আদর্শের শিক্ষাবঞ্চিত করছি আমরা আমাদের শিক্ষাক্রম থেকে। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর একটি গল্প দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাঠ্য ছিল। যার সংক্ষেপ রূপ হলো :

এক বৃদ্ধা নবীর পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। নবী দেখলেন, একদিন পথে কাঁটা বিছানো নেই। তিনি খোঁজ নিতে গেলেন বুড়িমা সুস্থ আছেন কি না।
খলিফা ওমরের খাল খনন করে পানির সুব্যবস্থা বা তাঁর শাসনব্যবস্থার অনেক দিক আছে অনুসরণ করার মতো বা মূর্তির নাক ভেঙে ফেলার জন্য তার বিচার করে তিনি যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধি মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের এক অকাট্য দলিল।

মহামতী বুদ্ধ মানুষের জীবনযাপনের জন্য অনেক নিয়ম দিয়ে গেছেন। এগুলো না জানা অসাম্প্রদায়িকতা কি না বা মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না তার জন্য পাঠ্যবহির্ভূত রাখার চেয়ে জেনে মেনে চলব কি না বা জানার চেষ্টা করাই তো উচিত।
মহারাজা রামের স্ত্রী সীতাকে দুরাত্মা রাবণ অপহরণ করেছিল, যা তার আপন ভ্রাতা বিভীষণ সহ্য করতে না পেরে রামের সঙ্গে যুদ্ধ করে সীতা দেবীকে উদ্ধার করেছিলেন।

একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য সাক্ষী এবং বিচার অপরিহার্য। মুসলিম যারা তারা জানে, মানুষের বিচার হবে শেষ বিচারের দিনে। একজন ফেরেশতা ভালো কাজের হিসাব রাখেন, অন্যজন মন্দ কাজের এবং শেষ বিচারের দিন তা হিসাব করেই বিচার হবে।
তেমনি বাংলাদেশের সরকারে যে-ই থাকুক না কেন, দুষ্ট লোকদের হিসাব বা কার্যকলাপ তাদের কাছে থাকবে না বা রাখার চেষ্টা করবে না, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকারকে অবশ্যই দুষ্ট লোকদের আচরণগুলো নজরে রাখতে হবে।

ক্লাস এইট থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ আচরণগুলো শিক্ষা দিতে হবে। চুরি করা, পরের সম্পত্তি নষ্ট করা, নারী নির্যাতন করা, অপরের খোদাকে গালি দেওয়া, ভেঙে ফেলা সবই রাষ্ট্রদ্রোহ এবং এদের জন্য সরকারি চাকরি, প্রতিনিধি হওয়ার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিতে হবে।
২০১২ সাল থেকে আজ ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকার অবশ্যই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

বিএনপির ছয়টি আসন বাদে ৩৪৪টি আসনই এক অর্থে সরকারের। এর পরও যদি সরকার ব্যর্থ হয়, তবে ফেতনা সৃষ্টিকারীদের জন্য ইসলামি আইনই চালু করা উচিত এবং যারা হিন্দু পাড়া-মহল্লায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, লুট করেছে, নারী নির্যাতন করেছে, তাদের ইসলামি আইনের আওতায় শিরñেদের আইন পাস করা উচিত।
পৃথিবীর সকল মানুষ সুখী হোক।

(মতামত সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। এর জন্য সম্পাদক দায়ী থাকবেন না)