কৌশলে এগিয়ে আওয়ামী লীগ

রাজনীতি ডেস্ক : নির্বাচনী রাজনীতিতে অনেকটা এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপি সংসদে না থাকায় নানা কৌশলে প্রতিকূল যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে দলটি। নির্বাচনী প্রচার, দল গোছানো, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দূরীকরণের কাজ পুরোদমে চলছে। এ ছাড়া এজেন্ট প্রশিক্ষণ এবং ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রার্র্থী মনোনয়নের জন্য জরিপ, সাংগঠনিক সফরে কেন্দ্রীয় নেতাদের পর্যবেক্ষণ এবং নানা সূত্রে খোঁজখবর নিচ্ছে দলটি। অন্য দিকে শাসক দলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে জেলে থাকায় স্বভাবতই ক্ষমতাসীনদের সক্ষমতার স্কোর আরও বেড়েছে।
এ দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে পালিত আন্দোলন কর্মসূচিকেও কার্যত আমলে নিচ্ছে না শাসক দল। তারা বলছেন, যেখানে এটা আইনি বিষয় এবং সাজাপ্রাপ্ত কারও মুক্তি হতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায়ই। সেটা না করে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে আদালত অবজ্ঞা করা, অবমাননা করা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতার প্রকাশ। তারা বলছেন, রাজপথের কর্মসূচিতে সফল না হলেও দল ও দলের নিবন্ধন রক্ষা করতে হলে বিএনপিকে নির্বাচনে আসতেই হবে। তাই বিএনপির নেতাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা এটাও বলছেন, কেউ নির্বাচনে আসুক বা না আসুক সংবিধানসম্মতভাবে যথাসময়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বলেন, রাজপথে যেকোনো কর্মসূচি পালন করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি নিতে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাবে না বলে মনে করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ততক্ষণ হয়তো পুলিশ তাদের ছাড় দেবে। তবে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর, এ নিয়ে আওয়ামী লীগের কিছু বলার নেই। তারা মনে করেন, গণতান্ত্রিকভাবে আর আন্দোলন করার ক্ষমতা বা সামর্থ্য বিএনপির এখন আর নেই। কেননা দলটির চেয়ারপারসনের মুক্তির নামে এখন পর্যন্ত যেসব কর্মসূচি বিএনপি পালন করেছে, তাতে সাধারণ মানুষ তেমন সাড়া দেয়নি। এ ছাড়া বিএনপির গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করার সুযোগ তো আওয়ামী লীগের থাকছেই। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ বেশি ঐক্যবদ্ধ, সংগঠিত এবং শক্তিশালী। বিপরীতে বিএনপি এর সব কটি স্কোরে অনেক পিছিয়ে। তাই তাদের কোনো আন্দোলন কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত হালে পানি পাবে না।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ফেনীতে স্পষ্টভাবে বলেছেন, নির্বাচনের আগে সংলাপের কোনো প্রয়োজন হবে না। আমরা জানি, বিএনপি নির্বাচনে আসবেই। তাদের চেয়ারপারসন নির্বাচন করতে না পারলে তার দল তো আছে। তারা করবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বলেন, তাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজার পর বিএনপি বেশ কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু এর একটিও সফল নয়। কোথাও জনগণ অংশ নেয়নি। আর তা পালনও হচ্ছে শুধু ঢাকায়। দেশের অন্যান্য স্থানে কোনো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না বললেই চলে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় এ নেতা বলেন, বিএনপির অনশন কর্মসূচি তারা মাত্র তিন ঘণ্টায় শেষ করেছে। এর একটাই কারণ দীর্ঘ সময় ধরে অনশন করার প্রতিশ্রুতি (কমিটমেন্ট) এবং সামর্থ্য কোনোটাই বিএনপির নেতাদের নেই। কৃষিমন্ত্রী বলেন, তিনি বিএনপিকে দুর্বল ভাবতে চান না। কিন্তু তারা কর্মসূচি পালনে সফলতা দেখাতে পারেনি। তিনি বলেন, কর্মসূচি বলি আর আন্দোলনই বলি, তারা যদি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা বা সন্ত্রাস করলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। জনগণের নিরাপত্তা এবং জানমালের সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। কাজেই এ ক্ষেত্রেও যে ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় সরকার সেটাই করবে।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক আবুল মকসুদ দুই দলের মধ্যেই সংকট দেখছেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সরকার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবেÑ সেটাই স্বাভাবিক। বিএনপির প্রতি সরকারের আচরণকে আমি তাই বলব। কিন্তু বিএনপিরও উচিত পাল্টা কৌশল বের করে তা সামাল দেয়া। বিএনপির আইনি প্রক্রিয়ায়ই দলীয় চেয়ারপারসনকে মুক্ত করার জোরালো চেষ্টা থাকতে হবে এবং নির্বাচনী কর্মকা- বা কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া উচিত। আমি মনে করি, গণতান্ত্রিক দেশে কাউকে যেমন কোণঠাসা করা কাম্য নয়, তেমনি রাজপথে সবারই শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে আইন-আদালত রাজপথে টেনে না আনাই উৎকৃষ্ট গণতান্ত্রিক চর্চা।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, একটি স্বচ্ছ এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে দোষী প্রমাণিত হয়ে সাজা পেয়েছেন। রায়ে সন্তুষ্ট না হলে বিএনপির উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেটা না করে তারা রাজপথে কর্মসূচি পালন করছেন। যেটা আদালত অবমাননা, আইনের প্রতি অবজ্ঞা। তিনি বলেন, একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে মুক্ত করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ায়ই এগোতে হবে। কিন্তু বিএনপি সেটা না করে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের নামে রাজপথে যা করছে সেটা প্রমাণ করে দলটি দুর্নীতির পক্ষই নিচ্ছে। একজন দুর্নীতিবাজের পক্ষ নিয়ে এসব করে বিএনপি আসলে দুর্নীতিবাজদের দল হিসেবেই নিজেদের প্রমাণ করছে। হানিফ বলেন, রাজপথে যেকোনো কর্মসূচি পালনের জন্য যে কাউকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনুমতি নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে জনগণের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর মনে না করলে তারা অনুমতি দিতে পারে। আবার যদি মনে করে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে অথবা কোনো কিছুর অবনতি হতে পারে সে ক্ষেত্রে অনুমতি না-ও দিতে পারে। কাজেই বিএনপির কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগের কিছু বলার নেই, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিষয়। যা বলার তারাই বলবে।