ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন ট্রাম্প

আনুশে হোসেন

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিকে বেশ লাভজনক একটি শহর হিসেবে মনে হবে। ‘ওয়েলথ অব ইন্টিলিজেন্স’ বা বৌদ্ধিক সম্পদ বলতে আমরা যা বুঝি, তার সবচেয়ে বেশি সমাবেশ দেখা যায় এই শহরে। ওয়াশিংটন ডিসির মধ্যে এমন এক আকর্ষণ আছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল গভর্মেন্টের চাকরিজীবী থেকে শুরু করে বিপুলসংখ্যক নীতিনির্ধারক থিংক ট্যাংকের সবচেয়ে প্রিয় স্থানে পরিণত করেছে।

এই গভীর আকর্ষণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে চৌকস ও উজ্জ্বল মেধাসম্পন্ন মানুষেরা এখানে বসবাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর জায়গা করে নিয়েছে এই শহরেই। বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে শুরু করে অসংখ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের কারণে এখানে জড়ো হন বিশ্বের মেধাবী মানুষেরা।

ট্রাম্পের প্রশাসনের বিভিন্ন অস্থিরতার ভেতরে এখনো হয়তো মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরা ভিড় করছেন আমেরিকার রাজধানীতে। তবে এসব মেধাবী প্রার্থী হোয়াইট হাউসে কাজ করতে আগের মতো উৎসাহী নন। তারা বরং দিন দিন এর প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে কর্মিসংখ্যা গত সপ্তাহে যেভাবে অকস্মাৎ কমে গেল, আর যেই গতিতে হোয়াইট হাউজে পদত্যাগ আর বরখাস্তের ঘটনা ঘটে চলেছে, সেই গতি অব্যাহত থাকলে খুব তাড়াতাড়ি এমন একটি সময় আসতে পারে, যখন হোয়াইট হাউজে কাজ করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঘটনাটা যেন হারাধনের ১০টি ছেলের মতো, যারা হারিয়ে যেতে থাকে একে একে।

বস্তুত, ওয়াশিংটনের সমীহযোগ্য একটি থিংক ট্যাংক সম্প্রতি হোয়াইট হাউজের কর্মী-বিপর্যয়ের হারের ওপর এমন কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে যা আঁতকে ওঠার মতো।

ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার এক বছর ৫০ দিনের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন বরখাস্ত করেছে কিংবা এই প্রশাসন থেকে পদত্যাগ করেছেন ডজনের বেশি গুরুত্বপূর্ণ কর্মী। এর মধ্যে রয়েছে চারজন কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর, একজন এফবিআই ডিরেক্টর, একজন প্রেস সেক্রেটারি, একজন চিফ অফ স্টাফ এবং একজন সেক্রেটারি অব স্টেট তথা পররাষ্ট্র মন্ত্রী। এই মার্চে ব্রুকিং ইনস্টিটিউশন হিসাব করে বলেছে যে, প্রেসিডেন্ট পদে অফিসিয়াল কাজ শুরুর পরে হোয়াইট হাউজের শীর্ষপর্যায়ের ৪২ শতাংশ কর্মী সরে গেছেন।

এটা ওবামা কিংবা জর্জ ডাব্লিউ বুশ প্রশাসনের প্রথম দুই বছরের কর্মীপরিবর্তন পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি। তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ট্রাম্পের শীর্ষপর্যায়ের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠপর্যায়ের ৩৪ শতাংশ কর্মী হয় পদত্যাগ করেছেন অথবা তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। আর এটা ঘটেছে ট্রাম্প জমানার প্রথম বছরেই।

আসলে কী ঘটে যখন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী ও উজ্জ্বল মানুষগুলো ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন? এটা পরিষ্কার যে, তারা নিজেদের আবিষ্কার করেন বসের সঙ্গে তীব্র বিরোধপূর্ণ একটি দমবন্ধ পরিবেশের মধ্যে। তারা তখন নিজেরাই সেই অস্বস্তিকর জায়গা থেকে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
‘নতুন একটি মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো হচ্ছে যে, হোয়াইট হাউজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।’

গত ৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মর্মে টুইট করে আরো বলেন, ‘ভুল কর্মীরা সবসময়ই এরকমভাবে চলে যায়, আবার ফিরে আসে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি নিষ্ঠার সঙ্গে আলোচনা করি। আমার প্রশাসনে এখনো এমন অনেক লোক রয়েছে, যাদের আমি তাড়াতে চাই (আমি সবসময়ই পরিশুদ্ধতার সন্ধান করি)। সুতরাং হোয়াইট হাউজে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। এখানে কেবল আছে এক মহান কর্মশক্তি।’

আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘বিশৃঙ্খলা’কে ট্রাম্প অভিহিত করছেন ‘শক্তি’ হিসেবে। মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প যখন এই টুইট করে হোয়াইট হাউজের শক্তির ফিরিস্তি গাইছেন, সেই সময়ও একদল কর্মী ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে বের হয়ে যান। ট্রাম্পের কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর এবং তার পরিবারের অন্যতম বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হোপ হিকস থেকে শুরু করে ইকোনমিক উপদেষ্টা গ্যারি কন এবং অবশ্যই বলতে হবে সদ্য-সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কথাযারা টুইট করে ধসিয়েছেন ট্রাম্পের ভাবমূর্তি।

ট্রাম্প বলতেই পারেন, ‘হোয়াইট হাউজে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন সবাই।’ কিন্তু কারো না কারোর চোখে ভুল ধরা পড়তেও পারে এই বিবৃতি থেকে। আমেরিকানদের পাশাপাশি বিশ্ব পর্যবেক্ষণ এই কথাই বলছে যে, ট্রাম্প এমনই এক উৎপীড়ক বসের মতো আচরণ করেন যিনি প্রতিনিয়ত নিন্দামন্দ ও সম্মানহানি করেন তার করিৎকর্মা কর্মীদের। কেবল তাই নয়, সেসব কর্মীকে অপদস্থ করেন জনসম্মুখে। সুতরাং এমন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে কাজ করতে ইচ্ছুক মেধাবী কর্মীর সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাবে- এটাই স্বাভাবিক।

সত্যি কথা বলতে, ওয়াশিংটনের এমন বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত পরিবেশ খুব নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমেরিকায় যে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই বার্তাই ছড়িয়ে পড়ছে ট্রাম্প প্রশাসনের এসব কর্মকাণ্ডে।

ট্রাম্প এমন একজন আত্মমুগ্ধ নেতা যিনি ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, তার সব বিষয়ই কেবল নিজের। ‘আমি এ কথা আপনাদের বলতে চাই, কেবল একটি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটা হলো, কী ধরনের নীতি হতে যাচ্ছে আমার নিজের ইচ্ছেটাই হলো সেসব নিয়ে বিবেচনা করার একমাত্র বিষয়।’ এ ধরনের কথা ট্রাম্প সদম্ভে বলেছেন তার প্রিয় ফক্স নিউজকে।

আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, ট্রাম্প নিজেকেই কেবল বিবেচনা করেছেন ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ’ হিসেবে। এরই মধ্যে ক্যাপিটল হিলে এই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, এর পর কে পালাবেন ট্রাম্পে প্রশাসন থেকে? ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর এইচ আর ম্যাকমাস্টার এবং হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ জন এফ কেলি ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, তারা সরে যেতে চান।

বাহ্যত মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে একটি রিভলভিং দরজা আছে, যার ঘূর্ণি সহসা থামছে না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : অদ্বয় দত্ত

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ