ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যপট বদল

বিএনপিকে কূটব্যবসায়ী ডোনেশন : বিরক্ত সরকার

ফাইল ছবি

বিশেষ প্রতিনিধি : আওয়ামী লীগকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির সমাবেশগুলোতে উপচে পড়া জনসমাগম, দলটির নেতাদের গলা চড়া হয়ে ওঠা, পুলিশের দিকে বিএনপির কর্মীদের তেড়ে যাওয়া, সরকারের মাইম্যান সিইসি কাজী হাবিবুল আওয়ালের নীতিবান হয়ে ওঠার প্র্যাকটিস, বোঝাপড়ার বিরোধী দল জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের আক্রমণাত্মক বোলসহ কদিনের পরিস্থিতি।
এসবের প্রতিটিই সরকারের হিসাব তথা ধারণার বাইরে। ভাঁজ দিয়ে চলা সরকারের মাইম্যান বিএনপির নেতারাও আওয়ামী লীগকে একটু-আধটু পিঠ দেখাতে শুরু করেছেন। সরকারের সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী-শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী নেতারাও সম্প্রতি নিরপেক্ষতার জ্ঞানী কথা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনার পাশাপাশি সুশীল সাজছেন। সুবিধাভোগী আমলাদের কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে সরকারের বিরুদ্ধে চরম বাজে মন্তব্য করছেন। নামধামসহ তাদের কয়েকজনের কোড-আনকোড বক্তব্য পৌঁছে গেছে সরকারের শীর্ষ মহলে। এই তালিকারই একজন তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মো. মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, তার অপরাধ হলো তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি এবং লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ। এর বাইরেও অনেক নেপথ্য কারণ রয়েছে, যা কেউ কেউ আঁচ করলেও মুখ ফুটে বলছেন না। এই তালিকায় আছেন আরো ছয়জন। যেকোনো মুহূর্তে তাদেরও মকবুলের পরিণতি অপেক্ষা করছে। এর বাইরে প্রশাসনেরও বেশ কয়েকজনের মতিগতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তথ্যসচিব মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর রেশ কাটতে না কাটতেই ১৮ অক্টোবর মঙ্গলবার পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। তাদের মধ্যে দুজন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা এবং একজন ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অবসরে পাঠানো তিন পুলিশ কর্মকর্তা হলেন মুহাম্মদ শহীদুল্ল্যাহ চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন মিঞা ও মির্জা আবদুল্লাহেল বাকী। এ নিয়ে প্রশাসনের বড়কর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গোটা আবহটি সরকারের জন্য কেবল বিব্রতকরই নয়, এসবের মাঝে অন্য বার্তাও পাচ্ছে সরকার। তা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কাজ বাড়িয়ে দিতে যাচ্ছে সরকার। যার মূল উদ্দেশ্য ফিল্ড টেস্ট করা।
বিএনপির মহাসমাবেশের পাল্টা জবাব হিসেবে আওয়ামী লীগও বিভিন্ন কর্মসূচি রাখছে। আর ভার্চুয়ালে না থেকে অ্যাকচুয়ালে মাঠে নামবেন প্রধানমন্ত্রীও। আওয়ামী লীগের বড় শোডাউনটি হবে ২৯ অক্টোবর দলের ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে। সম্মেলনটি কেবল ঢাকার নয়, জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা দেবে। বিএনপির সমাবেশগুলোতে এত জনসমাগমের রহস্য জানার চেষ্টা হচ্ছে সরকারি একাধিক মহলে। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের কিছু কিছু সরকারের জন্য অ্যালার্মিং। বিশেষ করে, কয়েকটি দূতাবাস থেকে বিএনপিকে বিশেষ সহায়তা ও সরকার-সমর্থক ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের বিএনপিকে ডোনেশন দেওয়ার তথ্য। এর মাঝেই আবার সিইসি হাবিবুল আওয়ালের গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার মধ্যেও ভিন্ন বার্তা। তার কমিশন কার্যালয়ে বসেই বড়পর্দায় গাইবান্ধায় ভোট চুরির ফুটেজ সিসি ক্যামেরায় দেখা সরকারকে বিব্রত করেছে। সরকারের তা জানার বাইরে। নির্বাচন চলাকালে ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে সিইসি কার সঙ্গে টেলিফোনে ইংরেজিতে কথা বলেছিলেন? কথা বলা শেষ করেই সিইসি নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্তে চলে যান। প্রশ্নটি ঘুরছে সরকার ও দলের অভ্যন্তরে। দল থেকে বলা হচ্ছে, তিনি বেশি করে ফেলেছেন, এমনটি না করলেও পারতেন।
এ বিতর্কের মাঝে আবার ঘি ঢেলেছেন জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদের। গাইবান্ধা উপনির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ায় সিইসিকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে জিএম কাদের জানিয়েছেন, সিইসির সঙ্গে কথা হয়েছে তার। তিনি ফোনে সিইসিকে নির্বাচনটি বন্ধ করে দিতে বলেছিলেন। কাজী হাবিবুল আওয়াল তাহলে কার অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য গাইবান্ধায় টেস্ট কেস হিসেবে উপনির্বাচন স্থগিত করলেন। বর্তমানে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জেরবার জাপা। জিএম কাদের তার ভাবি ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরাতে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। এর পাল্টা হিসেবে রওশনও বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকে জি এম কাদেরকে সরাতে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। রওশনপন্থী দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করলেও রওশন তা অস্বীকার করেছেন। চিঠি দুটির বিষয়ে সংসদ সচিবালয় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নিজ দলের গৃহবিবাদ সামলাতেই যেখানে জিএম কাদের গলদঘর্ম হচ্ছেন, সেখানে কোন শক্তিবলে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, সেটাও এক অজানা রহস্য। অন্যদিকে সিইসির ব্যাপারে ডা. জাফরুল্লাহ আগাম মন্তব্য করেছিলেন কেন? এসব নানা প্রশ্ন এখন রাজনীতির অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎই বলে দেবে। এর আগে ইসিতে কমিশনার আনিছের সঙ্গে বৈঠকে ডিসি-এসপিদের অমার্জনীয় আচরণও ইঙ্গিতবহ।
একদিকে বিরোধী দলের আস্ফালন, আরেকদিকে নানামুখী ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান। কঠিন এ সময়টাতে ঢাকার কর্মসূচি শেষ করে এখন প্রতিটি বিভাগের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। চট্টগ্রামের পর ময়মনসিংহের সমাবেশেও ব্যাপক উপস্থিতিতে বিএনপির নেতারা উল্লসিত। এই উৎফুল্লতার মধ্যেই আবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি হামলা, ধরপাকড়, মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার এবং জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে ২০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ওই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে দলটি। সরকারের জন্য এটি মন্দ খবর। রাজনীতিতে এবং প্রশাসনের কোথাও কোথাও বন্ধুহীন হয়ে পড়ার সুযোগটা বিএনপি নিচ্ছে, তা উপলব্ধি করে এখন মাঠে নামছে। তাদের এ সময়ের মূল প্রচারণা বিএনপি কোনোভাবে ক্ষমতায় এলে দেশে কচুকাটা শুরু হবে। একাত্তরের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর আদলে সারা দেশে হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ হবে। এতে হতাহত হবে অগুনতি। দেশ ছেড়ে পালাতে হবে হাজার হাজার মানুষকে। মানুষকে তা বিশ্বাস করানোর বিশেষ অ্যাজেন্ডা নিয়েছে সরকার।
বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনাকে বিএনপির ষড়যন্ত্রের অংশ বলে প্রচারণা জোরদার। রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের ট্রাফিক বক্সে হামলা-ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের কেউ রিকশাচালক নয়; পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে মর্মে বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে সরকারের আরেক স্পেশাল মাইম্যান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে দিয়ে। সামনের দিনগুলোতে দুই পক্ষে এমন পাল্টাপাল্টি আরো তৎপরতার লক্ষণ স্পষ্ট।