ক্ষোভে ফুঁসছেন কোটি প্রবাসী

স্বদেশে বিমানবন্দরে হয়রানি, লাগেজ পেতে বিলম্ব : বিদেশে দূতাবাস-কনস্যুলেটে অবহেলা : দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই

ঠিকানা রিপোর্ট : বছরের পর বছর ধরে স্বদেশে বিমাবন্দরে হয়রানি, লাগেজ ভেঙে ফেলাসহ পেতে বিলম্ব, বিদেশে দূতাবাস ও কনস্যুলেটে প্রবাসীদের অবহেলাসহ নানা কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন প্রবাসীরা। বছরের পর বছর ধরে এসব নিয়ে অভিযোগ করলেও কোনো সুরাহা না হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কোটি প্রবাসী ক্ষোভে ফুঁসছেন। তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে প্রবাসী রেমিট্যান্সে। বহু প্রবাসী জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন না। ফলে বাংলাদেশে প্রবাসী রেমিট্যান্সে ধস নেমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার টাকা পাচার হওয়ায় প্রবাসীদের একপ্রকার উৎকণ্ঠা ছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাংলাদেশের রিজার্ভ হঠাৎ কমে যাওয়া এবং অতিসম্প্রতি বৈধপথে ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর আহ্বান জানানোর পর প্রবাসীদের মনে অজানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বহু প্রবাসীর ধারণা, বাংলাদেশের বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া মানেই টাকা পাচার হচ্ছে অনবরত, যা সরকার ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশে হঠাৎ করেই কমে গেছে প্রবাসী রেমিট্যান্স। এক লাফে বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ থেকে ৩৮ বিলিয়নে। ফলে অর্থনীতির চালিকাশক্তি ৩১টি দেশ থেকে আসা প্রবাসী আয়ে ধস নামায় সরকার অনেকটা বেকায়দায় পড়েছে।
তবে সরকারের এ আহ্বানকে ভালোভাবে নিচ্ছে না প্রবাসীরা। গত চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের ক্ষোভের এক প্রকার বিস্ফোরণ ঘটেছে। বাংলাদেশে যত রেমিট্যান্স যায়, তার সিংহভাগই পাঠান মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকরা। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমিকরা। দেশের প্রতি এসব শ্রমিকের অগাধ বিশ্বাস ও দেশপ্রেম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়েও সরকারের অবহেলায় তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ নয়, রেমিট্যান্স পাঠানো কমিয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীরা জনমত সংগঠিত করছেন। তারা দাবি তুলেছেন, বছরের পর বছর ধরে স্বদেশে বিমাবন্দরে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। বিদেশে দূতাবাস-কনস্যুলেটে অবহেলা করা যাবে না। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সময় ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সৌদি প্রবাসী যুবকেরা, যারা শ্রমিক হিসাবে সেখানে গিয়েছেন তাদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, প্রবাসে তারা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। এরপর যখন নিজের দেশে ফেরেন তখন বিমাবন্দরে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কর্মকর্তারা। তাদের লাগেজ পেতে দুই তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়। লাগেজ পাবার পর তা খুলে হয়রানি করা হয়। লাগেজ নেয়ার জন্য পাওয়া যায় না ট্রলি।
দুবাই প্রবাসী আবীর হোসেন ফেসবুক লাইভে বলেন, সরকার প্রবাসীদের বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এতদিন পরে কেন? বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে, এজন্য? কিন্তু আমরা যে স্বদেশের বিমাবন্দরে হয়রানি হচ্ছি, কনস্যুলেটে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গেলে আমাদের অবহেলা করা হয়, সেগুলোর প্রতিকারের জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে? তিনি বলেন, যতদিন প্রবাসীদের প্রাপ্ত মর্যাদা না দেওয়া হবে ততদিন আমরা দেশে টাকা পাঠাবো না। জরুরি প্রয়োজনে পরিবারের জন্য যেটুকু অর্থ প্রয়োজন, সেটুকুই পাঠাবো।
সৌদি প্রবাসী শরীফুল ইসলাম ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, দেশের টাকা পাচার করে দুর্নীতিবাজরা টাকার পাহাড় গড়েছেন। বাজারে চালের কেজি ৮২ টাকা। আগামী ৬ মাসে হয়তো ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ডলারের মান এখন ১১২ টাকা। অতএব, এই মুহূর্তে দেশে টাকা পাঠানো নিরাপদ নয় বলে মন্তব্য করেন ওই প্রবাসী।
সৌদি প্রবাসী আল-আমিন বেপারী ফেসবুকে পোস্ট করা এক ভিডিওতে বলেন, সরকার বৈধ পথে টাকা পাঠানোর কথা বলছেন। কিন্তু আমরা নিজের টাকা লস কেন করবো? তিনি বলেন, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সময় লাগে বেশী। পরিবারের সদস্যদের ব্যাংকে গিয়ে বসে থাকতে হয়। অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থায় টাকা পাঠালে তা মুহূর্তে বাসায় পৌঁছে যায়। রেটও বেশী পাওয়া যায়। তিনি প্রবাদ টেনে বলেন, ‘পাগলকে নাও (নৌকা) ডোবানোর কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন না। কারণ সরকার যখন বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে বলেন, তখন প্রবাসের মাটিতে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দেন। যারা বিদেশে শ্রমিক, তারা এত কিছু বোঝেন না। তাই সরকারের উচিত বৈধপথে টাকা পাঠালে প্রণোদনা আড়াই থেকে পাঁচ শতাংশে উন্নীত করা। তাতে রেমিট্যান্স বাড়বে। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও থেমে যাবে।
সৌদি প্রবাসী জাকির খন্দকার বলেন, দেশ শ্রীলঙ্কা হোক, তবুও বৈধপথে টাকা পাঠাবো না। কারণ দেশে প্রবাসীদের সম্মান নেই। যতদিন সম্মান না পাবো ততদিন বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাবেন না বলে ঘোষণা দেন এই প্রবাসী।
সৌদি প্রবাসী আবুল হাসান বলেন, দেশ সচল করতে প্রবাসীদের বৈধপথে টাকা পাঠানোর চেয়ে বেশী জরুরি সুইস ব্যাংকে টাকা রাখা বন্ধ করা। সেগুলো ফেরত আনলেই দেশ সচল হয়ে যাবে।
সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার না করে সাধারণের মত বিমানবন্দর ব্যবহার করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশের সম্পদ। বিদেশে তারা অনেক কষ্ট করেন। কিন্তু বিমানবন্দরে তাদের ছোটখাটো বিষয়ে হয়রানি করা হয়। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে তাদের লাগেজ পেতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগ্য মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। খোদ মন্ত্রী যখন এসব কথা বলেন তখন প্রবাসীদের অভিযোগ কতটুকু সত্যি এবং এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না, তা অনেকটা অনুমান করা যায়।
মালয়েশিয়া প্রবাসী তরুণ সাইদুল অরণ্য এক ভিডিওতে বলেন, মুখে মুখে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স যোদ্ধ বলা হয়। এসব বলে কী লাভ? বিদেশে যাবার আগে দেশে ট্রেনিং সেন্টারে আমাদের হয়রানি করা হয়। বিদেশ যেতে যেখানে এক লাখ টাকা লাগার কতা, সেখানে নানান ফাঁদে ফেলে তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়। আমাদের এসব হয়রানি বন্ধ হলে আমরাও বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাবো।
কাতার প্রবাসী তরুণ হাবিব রহমান বলেন, প্রবাসীরা হুন্ডিতে আর টাকা পাঠাবে না, যদি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে বলেন, বিমাবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি করা হবে না এবং প্রবাসীরা যথেষ্ট সম্মান পাবেন, তাহলে আমরা বৈধপথে টাকা পাঠাবো।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ক্ষোভ বিমাবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও হয়রানি নিয়ে। কিন্তু এর বাইরেও আমেরিকা ও ইউরোপে বসবাস করছেন লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। তারা পরিবারের প্রয়োজনের বাইরেও দেশের ব্যাংকে টাকা রাখছেন। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, টাকার অস্বাভাবিক দর পতনের কারণে তাদের মনেও নানান শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এমন শঙ্কা দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনেও নানান ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে যখন বৈধপথে টাকা পাঠাতে কম রেট পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব একটি ব্যাংক ১ ডলারে যখন ১০৩ টাকা দিচ্ছে, তখন অন্যান্য মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলো ১০৮ থেকে ১১০ টাকা দিচ্ছে। তাহলে প্রবাসীরা কেন ব্যাংকের মাধ্যমে ডলার পাঠিয়ে লোকসান গুনবেন?
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক ছাড়াও বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেগুলো অবৈধ নয়। শুধু হুন্ডির মাধ্যমে ডলার পাঠালে রাষ্ট্র কোনো সুবিধা পায় না। বরং রাষ্ট্রের টাকা দেশের বাইরে চলে যায়। এ ব্যাপারে প্রবাসীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন ওই ব্যাংক কর্মকর্তারা।
প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সাথে বিভিন্ন অহেতুক আচরণ করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তাদেরকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনিয়মকে নিয়ম বলে শেখানো হয়। দেশের মাটি ত্যাগ এবং আগমন করতেই নানান হয়রানির শিকার হতে হয়। হুটহাট ভাড়া বৃদ্ধি করে দেয়া হয়, ঠুনকো অভিযোগে তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে রাখা, তাদের রেখেই বিমান ছেড়ে দেয়াসহ নানাভাবে হয়রানি নিয়মিত ঘটনা।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও দেশে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ন্যুনতম কোনো মর্যাদা দেয়া হয় না। এমনকি বিদেশে কোনো প্রবাসী মারা গেলে সরকারিভাবে তার লাশটা পর্যন্ত দেশের মাটিতে আনার ব্যবস্থা করা হয় না। এ ছাড়া তো নানান অবহেলা রয়েছেই। এমনকী বিদেশে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে কনস্যুলার সেবাকে ব্যয়বহুল করে রাখা হয়েছে। দেশে পাসপোর্ট নিতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। কিন্তু বিদেশে একজন প্রবাসীদের তিন থেকে চার গুণ ফি পরিশোধ করতে হয়। রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসাবে তাদের সমান অধিকার, এমনকী কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশী সুবিধা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের কোনো চিন্তাভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বড় হতাশার জায়গা হলো, প্রতিনিয়ত প্রবাসীদের লাগেজসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাগ চুরি হয় বাংলাদেশের বিমানবন্দর থেকে। একজন প্রবাসীর প্রবাস জীবনের কষ্টের মালামাল যদি দেশে এসে এমন নিরাপত্তাবেষ্টনী থেকে চুরি হয়ে যায় তার কষ্ট ভুক্তভোগীই বোঝেন। সারা জীবনের কষ্টে উপার্জিত মহামূল্যবান জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা দেশের মাটিতে পা দিতেই শেষ হয়ে যায়, যা ভাবতেও গায়ে শিহরণ জাগে। এ যেন একটা কৃত্রিম মহামারী। এমন নিরাপত্তাসম্পন্ন স্থানে প্রতিনিয়তই হচ্ছে চুরি, ছিনতাই। ভেঙে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রবাসীর সারা জীবনের স্বপ্ন। অথচ প্রশাসন নির্বিকার, চুপচাপ।
বিমানবন্দরকে প্রকৃত নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করা এখন সময়ের দাবি। আর কোনো প্রবাসীর কষ্টে উপার্জিত মহামূল্যবান জিনিসপত্র দেশের মাটিতে এসে হারিয়ে না যাক এটাও প্রবাসীদের একাধিক দাবির মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়াও লাখ লাখ প্রবাসীর জন্য প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন জনবান্ধব নিয়মকানুন করতে হবে। যে নিয়মকানুন করলে প্রবাসীরা প্রকৃত অর্থে লাভবান হবেন, অর্থাৎ তাদের স্বার্থ রক্ষার বিভিন্ন নিয়মকানুন করতে হবে। অযথা নিয়মের নামে অনিয়ম দিয়ে তাদেরকে নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানি বন্ধ করতে হবে। আর এসব সমাধান করে প্রশমন করতে হবে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ।