খুনমিংয়ে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা

একসঙ্গে অনেক দেশের পতাকা। দেখতে দেখতে চোখ যেন হয়রান। হঠাৎই চোখে পড়ল সবুজ ভূমিতে লাল সূর্য; লাল-সবুজের প্রিয় পতাকা মুহূর্তেই কাছে টেনে নিলো। মনে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত ভালোলাগা। বলছি খুনমিং মেলার কথা। চীনের একটি বিখ্যাত বাণিজ্যিক মেলা ‘খুনমিং মেলা’। পুরো নাম ‘সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া কমোডিটি এক্সপো অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফেয়ার’। এটি ছিল ২৬তম মেলা। প্রথমেই বলে রাখি চীনারা যখন কিছু করে তখন সেটা রাজসূয় যজ্ঞকেও হার মানায়। বিশাল আয়োজন। শত শত প্যাভিলিয়ন ও স্টল। প্রথমে রয়েছে বিভিন্ন দেশের পরিচিতিমূলক প্যাভিলিয়ন।
বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন একেবারে প্রথমেই। কিন্তু ভেতরে পণ্য তেমন কিছু নেই। তবে দেশের পরিচিতি রয়েছে। কান্তজী মন্দিরের বিশাল ছবি রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সাফল্যের সম্ভাবনা কম নয়। বাংলাদেশের মতো ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ দেশ আর কটা আছে বিশ্বে? কিন্তু আমাদের এই সম্ভাবনাকে কি আমরা কাজে লাগাতে পারছি? কক্সবাজারের, কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকতের কতটা প্রচার হচ্ছে বহির্বিশ্বে? বাংলাদেশে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে মহাস্থানগড়, উয়ারী বটেশ্বরের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, সে-কথা বিশ্বে কতজন জানে? আমাদের পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ যে অগণিত বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষমতা রাখে সে বিষয়েই বা প্রচার চালাতে কতটা উদগ্রীব বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনসুলেট? এ কথায় পরে আসছি। আগে খুনমিং মেলায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের কথা বলি।
বিশাল কনভেনশন সেন্টারে মেলা চলছিল। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের স্টলের মধ্যে বাংলাদেশি স্টলগুলো খুঁজে পেতে একটু বেগ পেতে হলো। কারণ পাকিস্তান ও ভারতের স্টলগুলোর জৌলুশ ছিল অনেক বেশি। যাহোক বাংলাদেশের দশ বারোটি স্টল খুঁজে পেলাম। কিন্তু এ কী অবস্থা। দেখে মনে হচ্ছিল বঙ্গবাজার থেকে সস্তায় যা কিছু জোটানো গেছে সেসব কোনো রকমে জড়ো করেই স্টলগুলো দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা। কিন্তু তাদের তৈরি শিল্পসামগ্রীর চেয়ে রদ্দিমার্কা টি-শার্ট আর কাপড়-চোপড়ই ছিল বেশি। যেসব কাপড় ছিল সেগুলোও মানসম্পন্ন না। অনেক কাপড়ই রঙ ওঠা, সুতো বের হওয়া, এমনকি দুয়েক জায়গায় ফুটো হয়ে যাওয়া কাপড়গুলোর সাইজও বেশ বেঢপ। এর চেয়ে অনেক আকর্ষণীয় পণ্য পাওয়া যায় ‘জয়িতা’র দোকানে এবং বেইলি রোডে মহিলা সংস্থার মেলায়। অনেক উদ্যোক্তা আফসোস করছিলেন যে তাদের পণ্য মোটেই ভালো বিক্রি হচ্ছে না। তাদের প্রতি সহানুভূতি জাগলেও মনে মনে ভাবতে বাধ্য হচ্ছিলাম পণ্য মান সম্পর্কে সচেতন না হতে পারলে এই দুর্দশা এড়ানোর কোনো পথ নেই। পাশাপাশি ভারত,পাকিস্তানের স্টলগুলো দেখেও তো ওরা শিখতে পারেন যে, কিভাবে আকর্ষণীয় করে স্টল সাজাতে হয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য পণ্যকে চটকদার করতে হয়। কারণ বিক্রির পূর্বশর্ত হলো ডিসপ্লে বা উপস্থাপন। পণ্যের ফিনিশিং নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। বিশেষ করে বিদেশে পণ্য নিয়ে আসতে হলে এসব বিষয়ে জ্ঞান থাকাটা খুবই জরুরি। নিম্নমানের পণ্য নিয়ে এসে দেশের বদনাম ছাড়া আর কিছুই অর্জন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জন্য চীনে বেশ কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা রয়েছে। অনেকগুলো পণ্যের ওপর কোনো ট্যাক্স নেই। বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, কুঁচা, ইলিশ মাছ ইত্যাদির বেশ চাহিদা রয়েছে চীনে। আর বাংলাদেশের শাড়ি (ড্রেস ম্যাটেরিয়াল হিসেবে), সালোয়ার কামিজ, ফতুয়া ইত্যাদিও ঠিক মতো বিপণন করতে পারলে যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যদি এ দিকে উদ্যোগী হতেন তাহলে ভালো হতো।
চীনে অনেক বাঙালি ও দক্ষিণ এশীয় আছে। তাদের কাছে দক্ষিণ এশীয় খাদ্যসামগ্রী যেমন হলুদ, ধনিয়া, মুড়ি, চিঁড়া, চানাচুর, মসুর ডাল, পোলাওয়ের চাল, সুজি, গোলাপ জল, আচার ইত্যাদির খুব চাহিদা রয়েছে। এসব সামগ্রী অনলাইনে কিনতে পাওয়া যায় বিভিন্ন ভারতীয় ও পাকিস্তানি ব্যবসায়ীর দোকানের সুবাদে। এগুলোর দাম অত্যন্ত বেশি কিন্তু স্বাদ বাংলাদেশের সামগ্রীর মতো ভালো নয়। বাংলাদেশি সামগ্রী যদি অনলাইনে কেনার ব্যবস্থা থাকত তাহলে আমাদের দেশি পণ্যই বেশি বিক্রি হতো সন্দেহ নেই। শাড়ি, পাঞ্জাবি, মেহেদি, টিপ, চুড়ি ইত্যাদিও অনলাইনে বেশ বিক্রি হয়। এগুলো সবই ভারতীয় ও পাকিস্তানি সামগ্রী। বাংলাদেশি সামগ্রী অনলাইনে বিক্রির কোনো উদ্যোগ সেখানে নেই।
বাংলাদেশের বিসিকের উদ্যোগে যদি ‘খুনমিং মেলা’ এবং চীনের অন্যান্য মেলায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রির জন্য স্টল থাকে তাহলে এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান গড়ে নিতে পারে। চীনে দেখেছি ওয়ালমার্ট, ক্যারিফোর, হুয়ালিয়নের মতো বড় বড় সুপার শপের আলাদা কর্নার রয়েছে আমদানিকৃত পণ্য বিক্রির জন্য। সেখানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য বিক্রি হয়, যার মধ্যে খাদ্যসামগ্রীই বেশি। সেখানে অনেক খুঁজেও বাংলাদেশের কোনো পণ্য পাইনি। বাংলাদেশি পণ্য এখানে ভালো অবস্থান গড়তে পারত অনায়াসে। কারণ আমাদের দেশের খাদ্যসামগ্রী অনেক সুস্বাদু। বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কি নতুন বাজার খোঁজার উদ্যোগ নিতে পারে না?
খুনমিং মেলায় আরও দেখলাম বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্যাভিলিয়নে সে দেশের পর্যটন শিল্পকে প্রসারিত করার নানা উদ্যোগ। মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড তাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফলাও করে প্রচার করছে। তারা তাদের পর্যটকদের জন্য নানা রকম আকর্ষণ রেখেছে। এই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি সুন্দর। আমাদের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, শ্রীমঙ্গল, মাধবকুণ্ড, কুয়াকাটা সৌন্দর্যে যেকোনো মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে। কক্সবাজারের মতো সমুদ্র সৈকত আর কোথায় আছে? সুন্দরবন তো বিশ্বে অনন্য। আমাদের প্রতত্নতাত্ত্বিক সম্পদও তো কম নেই। দরকার শুধু বিশ্বে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পদের প্রচার। আরও দরকার পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা। সরকারি ব্যাপক উদ্যোগ ও পরিকল্পনা ছাড়া এগুলো সম্ভব নয়। বেসরকারি উদ্যোগও দরকার সমপরিমাণে।
খুনমিং মেলার চত্বরে বসে এসবই ভাবছিলাম। স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার লাল-সবুজ পতাকা সগৌরবে উড়ছে। বাংলাদেশের পণ্য জয় করছে বিশ্ববাজার। সোনার বাংলার রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে। স্বপ্নগুলো কি নিতান্তই আকাশ-কুসুম? আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের যোগ্যতা, সম্পদ কোনোটাই তো কম নেই। দরকার শুধু যথাযথ পরিকল্পনা ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও শিক্ষক।