খুন ও গুমের মামলা : ৮ বছর পর হঠাৎ উপস্থিত জালাল

কিশোরগঞ্জ : আট বছর আগে অপহরণের পর খুনের অভিযোগে দায়ের করা মামলার বিচার কার্যক্রম যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠিক তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হলেন ‘গুম হওয়া’ জালাল উদ্দিন। ১৫ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ ঘটনা ঘটে। মাদক খাইয়ে ও ইনজেকশন দিয়ে দীর্ঘ ৮ বছর জালাল উদ্দিনকে অপ্রকৃতিস্থ করে রাখা হয়েছিল- আইনজীবীর এমন বক্তব্য শুনে নড়েচড়ে বসেন বিচারক মোহাম্মদ আবদুর রহমান। নির্দেশ দেন মামলাটি নি¤œ আদালতে পাঠানোর। আদেশে বিচারক জালাল উদ্দিনের জবানবন্দি গ্রহণসহ নতুন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করতে বলেন। একই সঙ্গে হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন তিনি।
এ মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে রিমান্ড ও হাজত খেটে জামিনে থাকা আজহারুল ইসলাম, মো হীরা মিয়া ও রুহুল আমিন রঙ্গুরের ১৫ জানুয়ারি আদালতে হাজিরার নির্ধারিত তারিখ ছিল। ৮ বছর পর আসামিদের হাজিরার দিনে আইনজীবীর মাধ্যমে জালাল উদ্দিনের আদালতে হাজিরের ঘটনায় জীবন ফিরে পান অভিযুক্ত এই তিন আসামি। বদলে যায় মামলার গতি-প্রকৃতি ও ধারা। আর এ ঘটনা হয়ে ওঠে ‘টক অব দ্য কোর্ট’, ‘টক অব দ্য কিশোরগঞ্জ’। এ নিয়ে এখন চলছে মুখরোচক নানা গুঞ্জন এবং আলোচনা-সমালোচনা। এখন বেরিয়ে আসছে মামলার নেপথ্য কাহিনী।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের লাকুহাটি গ্রামের ললিতা বেগম ২০০৯ সালের ১০ জুলাই তার স্বামী মো জালাল উদ্দিনকে অপহরণের পর খুন করে লাশ গুমের অভিযোগ এনে ২০১০ সালের ৩১ মার্চ হোসেনপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় পার্শ্ববর্তী ভাটি গাংগাটিয়া ও সৈয়দপুর গ্রামের শংকর সূত্রধর, মো আসাদ মল্লিক, রুহুল আমিন রঙ্গু, হিরা মিয়া ও আজহারুল ইসলামকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও অনুসন্ধানকালে অপহƒত জালাল উদ্দিনকে না পেয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ভয়ে প্রধান আসামি শংকর সূত্রধর বাড়ি-ঘর ও সহায়-সম্পত্তি ফেলে ভারতে পালিয়ে যান। অন্য আসামিদের মধ্যে আসাদ মল্লিক আজও ফেরারী জীবন কাটাচ্ছেন। তিন আসামি আজহারুল ইসলাম, হিরা মিয়া ও রুহুল আমিন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে রিমান্ড ও হাজত খেটে জামিনে রয়েছেন।
জালাল উদ্দিনের খোঁজ নিতে রোববার দুপুরে তার বাড়ি উত্তর লাকুহাটি গেলে স্ত্রী ও মামলার বাদী ললিতা বেগমের সঙ্গে দেখা। জালাল উদ্দিনের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, সে খুবই অসুস্থ। অন্যদের সহযোগিতায় বাড়ির পেছনের ফসলের মাঠের দিকে গেছেন। আপনারা দাঁড়ান, আমি তাকে নিয়ে আসছি। এ সময় তার পিছু নিয়ে ফসলের মাঠে গিয়ে দেখা গেল দূরে অন্য দু’জন কৃষকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে জালাল উদ্দিন কথা বলছেন। ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও স্ত্রী ললিতা বেগম জালাল উদ্দিনের কাছে গিয়ে কিছু একটা বলতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। হঠাৎ জালাল উদ্দিন স্ত্রী ললিতা বেগমের কাঁধে মাথা রেখে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে খুব সাবধানে ধরে বাড়িতে আনা হলে ঘরে ঢুকেই বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ে স্ত্রীকে মাথায় পানি ঢালতে বলেন।
এ সময় জালালের স্ত্রী ললিতা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী ভাঙ্গারির ব্যবসা করতেন। সংসারের অভাব-অনটন ঘোচাতে বিদেশ যেতে পাশের গ্রামের আদম ব্যবসায়ী শংকর সূত্রধর ও আসাদ মল্লিককে ধারদেনা ও সুদ করে তিন লাখ টাকা দেয়। তারা কয়েক বার তারে (জালাল উদ্দিন) ঢাহা নিয়া ফিরত আনে। এক পর্যায়ে বিদেশ পাঠানোর কথা কইয়্যা তারে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। এর পর বেশ কিছু দিন ফরও তার খোঁজ ফাইতেছিলাম না। শেষ পর্যন্ত এই দুই আদম ব্যাফারি ও তিন দালালরে আসামি কইর্যা থানায় মামলা দেই।’
ললিতাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে পার্শ্ববর্তী সৈয়দপুর গ্রামে এ মামলার অন্য তিন অভিযুক্তের বাড়ি গেলে সেখানে এক হƒদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আজহার, হীরা ও রঙ্গু নামের তিন আসামি এক সঙ্গে বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমরা হাজত খাটছি, রিমান্ড খাইছি, ফলাইয়্যা বেড়াইছি, আমার সংসার তছনছ অইয়্যা গ্যাছে। আমরার বাচ্চা-কাচ্চাদের লেহা-পড়ার সুযোগ নষ্ট অইছে ওই মিছা মামলায়। অহন, মরা জালাল ফিইর্যা আইছে। হে হারাদিন সুস্থ চলাফেরা করে, আবার সাংবাদিক দেহলে গুরুতর অসুস্থ অইয়্যা ফরার ভান করে। কিন্তু আমরা যা আরাইছি, তা ফিরত দিব কে?’
জানতে চাইলে আসামি পক্ষের আইনজীবী মো মিজানুর রহমান বলেন, অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে তৃতীয় পক্ষের মদদে এ মামলা রুজু করা হয়। এ ঘটনায় আসামিদের আর্থিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে, যা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়।