খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম যেন ধ্বংসস্তুপ

স্পোর্টস রিপোর্ট : খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি এখন হয়ে গেছে এই ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেটের ভেনু। প্রায় তিন বছর হতে চলল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নেই এখানে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কি করে হবে, এই ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ হওয়াই তো এখন দুঃসাধ্য। ড্রেসিং রুম, প্রেসিডেন্ট বক্স, গ্যালারি আবু নাসের স্টেডিয়ামের সব জায়গাতেই যেন ধ্বংসস্তূপ। ২০১৬ সালের এপ্রিলের ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেডিয়ামটি এখনও তার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। গত আড়াই বছরের বেশি সময়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আর বিসিবি সংস্কারে শুধু আশ্বাসের বাণীই শুনিয়ে গেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো মাস খানেক আগে খুলনা থেকে ইলেকট্রোনিক স্কোর বোর্ডের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। কবে নাগাদ সংস্কার হবে, কবে নাগাদ আবারও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পাবে খুলনা এর উত্তর নেই সংশ্লিষ্ট কোন মহলে। মাসখানেক আগে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে মেয়েদের একটি সিরিজ হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেটিও বাতিল করে বিসিবি। খুলনার সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীরা মনে করছেন, খুলনার ক্রীড়া সংগঠকদের সাংগাঠনিক দুর্বলতার কারণেই আবু নাসের স্টেডিয়ামের এই বেহাল দশা।

শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের এতটাই বেহাল দশা যে, গত তিন মওসুম এখানে জাতীয় ক্রিকেট লিগ চলছে বাঁশ দিয়ে সাইড স্ক্রিন তৈরি করে। আর তার পাশেই পড়ে আছে অকেজো ট্রাইভিশন সাইডস্ক্রিন। বাঁশ দিয়ে কাপড় দিয়ে সাইড স্ক্রিন তৈরি করার কারণে প্রায়ই ব্যাটসম্যানদের সমস্যা হচ্ছে। সর্বশেষ খুলনা-রংপুর ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে সাইড স্ক্রিনের পাশ দিয়ে একজন হাঁটাহাঁটি করায় মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে সে সময় ব্যাট করা খুলনার ব্যাটসম্যান এনামুল হক বিজয়ের। বেশ কয়েকবার এ ধরনের বিঘœ হওয়ার পর বিজয় আউট হয়ে যান। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই এ ধরনের বিঘœ হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

জাতীয় লিগ ক্রিকেট চলাকালে প্রতিটি টিমকেই বাড়তি বড় ফ্যান দিতে হচ্ছে। কারণ ড্রেসিং রুমের সবগুলো এসি কাজ করে না। শুধু ড্রেসিং রুম নয়, প্যাভিলিয়ান ভবনের প্রতিটি রুমের এসিই নষ্ট। প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ কাভার করতে আসা সাংবাদিকদেরও তাই যেখানে সেখানে বসে কাজ করতে হয়।

একই দশা সবকটি হসপিটালিটি বক্সের। কাঁচ ভাঙা, চেয়ার ভাঙা, মেঝে আর দেয়ালের অবস্থা যাচ্ছেতাই। উল্টো প্রান্তে মিডিয়া সেন্টার, প্রেসবক্স ও মিডিয়া ডাইনিংয়ের অবস্থাও একই। ঝড়ের পরে নষ্ট হয়ে গেছে অনেকগুলো ফ্লাড লাইটও।

২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের সন্ধ্যায় এক কালবৈশাখী ঝড়ে এ অবস্থা হয় স্টেডিয়ামটির। আর গত আড়াই বছরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নষ্ট হয়েছে আরও অনেক কিছু। এখন স্টেডিয়ামটির যে অবস্থ, তাতে আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। কিন্তু এত বছরেও সে উদ্যোগ কেন হলো না?

খুলনার মানুষ ক্রিকেট পাগল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হলেই দেখা যায় এখানে ক্রিকেট উন্মাদনা। শুধু কি তাই, এখন যে জাতীয় ক্রিকেট লিগ চলছে সেখানেও দর্শক সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। দৌলতপুর থেকে খুলনা-রংপুরের ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন চার বন্ধু। তাদেরই একজন চৌধুরী ফারুক অভিযোগ করে বলেন, আমাদের খেলার নেতারা যারা আছেন (ক্রীড়া সংগঠক), স্টেডিয়াম ঠিক করতে পারছেন না কেন তারা। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, হয় তাদের যোগ্যতার অভাব অথবা তারা চান না এখানে খেলা হোক। খুলনার বয়সভিত্তিক দলের এক ক্রিকেটার আক্ষেপ করে বলেন, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। এখানে বড় খেলা হলে, এখানকার ক্রিকেটারও সেটা থেকে অনুপ্রেরণা পেত। বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির ন্যাশনাল ম্যানেজার সৈয়দ আব্দুল বাতেনের কাছেও এর কোন উত্তর নেই। তিনি জানান, আমরা কয়েক দফা স্টেডিয়ামটি সংস্কারের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে চিঠি দিয়েছি। তারা একাধিকবার পরিদর্শনও করেছে। তবে ওই পর্যন্তই। তবে আবারও তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, শিগগিরই নতুন করে কাজের কিছু প্রকল্প পাস হওয়ার কথা রয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রকল্প পরিচালক মো. আওলাদ হোসেন রিসিভ করেননি। এই মাঠে সবশেষ টেস্ট হয়েছিল ২০১৫ সালে, পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছিল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সবশেষ হয়েছে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশ সিরিজের চারটি টি-২০ই হয়েছিল এখানে। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক নানা প্রতিযোগিতা, সবই হচ্ছে এখানে।

দেশের সবথেকে লাকি ভেনুখ্যাত আবু নাসের স্টেডিয়াম। এখানে এ যাবৎ অনুষ্ঠিত সবগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ক্রিকেটেও সব থেকে বেশি অবদান খুলনা বিভাগের। ক্রিকেটার তৈরির কারখানা এই খুলনা বিভাগ। সবচেয়ে বেশি তারকা ক্রিকেটার এই বিভাগ থেকেই খেলছেন চলতি সময়ের জাতীয় দলে। এই শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামেই বাংলাদেশ তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচ খেলেছিল। এখানেই আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৬০ রানের ব্যবধানে ওয়ানডে জয়, আছে তামিম-ইমরুলের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে প্রথম উইকেটের সবচেয়ে বড় জুটি (ওপেনিং জুটি, আছে আবুল হাসান রাজুর সেই ঐতিহাসিক টেস্ট সেঞ্চুরি)। অথচ এত এত রেকর্ডের সাক্ষী টাইগারদের লাকি ভেনুর দিকে কোনো নজরই নেই বিসিবির। ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রশ্ন আদৌ আর কোন সংস্কার হবে কি এখানে? আদৌ আর কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হবে এখানে? না কি খুলনার আবু নাসের স্টেডিয়াম হতে যাচ্ছে আরেকটি বগুড়ার শহিদ চান্দু স্টেডিয়াম?