খেলা হবে! কার সঙ্গে কার?

‘খেলা হবে’-ইদানীং রাজনীতির মঞ্চে কথাটি খুব উচ্চারিত হচ্ছে। বিশেষ করে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মঞ্চ থেকে ‘খেলা হবে’ কথাটি বারবার উচ্চারণ করা হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের উদ্দেশে। এ খেলা কার সঙ্গে কার, খেলোয়াড় কারা-জনগণের কাছে তা পরিষ্কার নয়। জনগণের কী ভূমিকা এ খেলায়, খেলাতে তারাও কোনো একটি পক্ষ কি না-সেটা কেউ পরিষ্কার করছে না। তবে মনে হচ্ছে, ‘খেলা হবে’ কথায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা-উত্তাপ বাড়তে থাকলেও জনগণের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণ বিলক্ষণ জানে, রাজনীতির খেলায় দল হিসেবে জয়ী যে-ই হোক, ক্ষমতার ফল ও সুখ যে-ই পাক, জনগণের পরিস্থিতি সেই শিল-পাটার মধ্যে পড়ে মরিচের মতো পিষ্ট হওয়া।

‘খেলা হচ্ছে’ সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। সাধারণ মানুষ খেলার দর্শক, আবার অংশগ্রহণকারীও। সেই ধারার খেলা আজও চলছে। সাধারণ নাগরিকদের অবস্থান একই অবস্থায় আছে। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল-শাসক পাল্টেছে, শাসকদের চেহারা, ভাষা, সংস্কৃতি পাল্টেছে, খেলার ধারা একই আছে। ‘খেলা হবে’ আওয়াজ শুনে সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে বের হয়ে আসে রাজনীতিবিদদের খেলা দেখতে। কিন্তু খেলার বলি হয় তারাই। আগুনে বোমায়, বন্দুকের গুলি, প্রতিপক্ষের লাঠিতে মানুষ মরে, আহত হয়, পঙ্গুত্ববরণ করে খেলা দেখতে রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষ। একটু স্বস্তির আশায়, শাসক বদলে নিজেদের ভাগ্য বদলের আশায় মানুষ জীবন দিলেও, দুর্ভোগ মেনে নিলেও তাদের স্বপ্ন, তাদের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি বলেই তারা মনে করেন। ভোগ-দখলের সুযোগ-সুবিধা যা কিছু তা সব রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আমলা, পুলিশ, যারা পর্দার আড়ালের কুশীলব তাদেরই। জনগণ কেবল দাবার ঘুঁটি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে রাজনীতির এই খেলা জমে ওঠে, বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে। বাংলাদেশে ২০২৩-এর শেষে ডিসেম্বর কিংবা ২০২৪-এর শুরুতে নির্বাচন হবেÑসবকিছু ঠিকঠাক থাকলে। যদি রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক অস্বাভাবিক কিছু না ঘটে। সেই হিসাব সামনে রেখেই ‘খেলা হবে’ ডুগডুগি বাজা শুরু হয়ে গেছে। রাজনীতির অন্দরমহলের খোঁজখবর যারা রাখেন, তারা মনে করেন, প্রকাশ্যে এই ডুগডুগি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে শোভা পেলেও পর্দার পেছনে আরো কিছু প্রবল ক্ষমতাশালী পক্ষ রয়েছে, যাদের হাতে দেশের রাজনীতির কলকাঠি নড়াচড়া করে।

রাজনীতির এই খেলার সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়ায় ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে উত্তাপ-উত্তেজনাও। যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেসব খবরের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, কেউ কেউ ইতিমধ্যেই ক্ষমতায় যাওয়ার সুখস্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যারাই ক্ষমতায় আছেন, তাদের জন্য সময়টা যেন কেমন বৈরী বৈরী মনে হচ্ছে। কোভিড-১৯-এর ক্ষত এখনো সম্পূর্ণ শুকায়নি। বিভিন্ন দেশে এখনো মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং তার সংখ্যা খুব একটা কমও নয়। মারাও যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ। কোভিডের অভিঘাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

করোনার এই বৈশ্বিক ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই শুরু হয়ে গেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ দুটি দেশের মধ্যে চললেও তার প্রতিকূল প্রভাবে বিশ্বে জ্বালানি ও খাদ্যশস্যের ভয়ংকর সংকট শুরু হয়েছে। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি। স্থানীয় মুদ্রার মান অবনয়ন ডলারের বিপরীতে; সবকিছু মিলে জনগণের জীবনযাত্রায় গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, মধ্যবিত্ত জীবনে নাভিশ্বাস তুলছে। ধনী-দরিদ্র মিলেমিশে একাকার। সব দেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মানুষের চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে দেশে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। চাল-ডাল-তেল, লবণ-চিনি-পেঁয়াজ, ডিম-মাছ-মাংস, শাক-সবজি-সবই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। বাজার পরিস্থিতি মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে। অসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

এ রকম পরিস্থিতি যখন কোনো সমাজে বিরাজ করে, তখন সেই সমাজকে খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীন যারা থাকেন, তাদের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে দেখা যায়। বিরোধী দলের রাজনীতির পালে একটু হাওয়া লাগতেও শুরু হয়। তাদের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে লোকসমাগমও বাড়তে পারে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কেননা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। যদিও বাংলাদেশ সরকারকে গণমানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে। ন্যায্য মূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলার জন্য প্রয়াস নিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভবিষ্যতের পরিস্থিতি নিয়ে বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন। দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মানুষকে আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখার জন্য বলে যাচ্ছেন। ন্যায্য মূল্যে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে এক কোটি মানুষকে টিসিবির কার্ড বিতরণ করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। ৫০ লাখ দরিদ্র মানুষকে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়ার জন্যও কার্ড দেওয়া হয়েছে।

তবু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, উত্তাপ, উত্তেজনা লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ‘খেলা হবে’র আওয়াজ এই শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। বলা হচ্ছে, রাজনীতির মাঠে ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপির শক্তির মহড়ায় জনমনে উদ্বেগ’ দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের জেলা-বিভাগসমূহে বড় দুই দলেরই সভা-সমাবেশ হচ্ছে। সেসব সমাবেশ ঘিরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-উভয় দলকেই। বিএনপির সব সমাবেশের আগেই সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকতে দেখা যাচ্ছে। বিএনপি এ জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করে বলছে, ‘এসব সরকারের অগণতান্ত্রিক অপচেষ্টা। বিএনপির প্রতি অভূতপূর্ব গণসমর্থন দেখে সরকার ভয় পেয়ে এই ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ পাল্টাপাল্টি হুমকিও উচ্চারিত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ-বিএনপির পাল্টাপাল্টি শক্তির মহড়া যে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, তার প্রমাণ সংবাদপত্রেও প্রকাশ পাচ্ছে। ঠিকানা তার ২ নভেম্বর সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যার শিরোনাম ‘আ.লীগ-বিএনপির শক্তির মহড়ায় জনমনে উদ্বেগ’। রিপোর্টে বলা হচ্ছে : ‘দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান দুই বড় দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি উভয়েই চাচ্ছে ব্যাপক শোডাউনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও জনসমর্থন প্রমাণ করতে। এরই অংশ হিসেবে সরকারবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে চলেছে বিএনপি, যা শেষ হবে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে আরো বড় কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার চিন্তা রয়েছে দলটির। আবার আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে মোকাবিলার কৌশল নিয়েছে। তারাও বিভাগীয় শহর ও রাজধানী ঢাকাকে টার্গেট করে আগামী দুই মাসের কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে।’

দেখা যাচ্ছে, আগামী দুই মাস, নভেম্বর-ডিসেম্বর, রাজপথে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক মহড়া দেখা যাবে তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে। দেশের সবচেয়ে বড় দুই দলের শক্তি দেখানোর এই খেলায় মানুষ সংগতভাবেই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত এবং গভীরভাবে শঙ্কিত। তাদের মনে ‘কী হয়, কী হয়’ ভাবনা। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এটা হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা, বাংলাদেশের মানুষ ঘর পোড়া। তারা আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। জনগণের নামে রাজনীতি হয়, অথচ রাজনৈতিক দলসমূহের সব কর্মসূচির ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় মানুষকে। জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। আর ‘নেপোর দই খাওয়ার’ মতো মানুষের দুর্ভোগের ফল খেয়ে যেতে দেখা যায় রাজনীতিবিদদের। সাধারণ মানুষের সেটাই প্রচলিত ধারণা, যা একেবারে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই রাজনীতির খেলার আওয়াজ কানে গেলেই বাংলাদেশের মানুষের মনে কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। এবারের খেলায় যেন মানুষের বিপদ না বাড়ে! এবারের খেলার ফল মানুষের কপালে যেন কিছুটা হলেও জোটে।