গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা

মুহম্মদ শামসুল হক :

পুঁথি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে বীজ বপিত হয়েছিল, কালের অগ্রযাত্রায় তা ডালপালা বিস্তার করে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে। বিশেষত, ১৯১৩ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্বপরিমণ্ডলে বিশেষ মর্যাদার আসন দখল করে নিয়েছে। শাহ মুহম্মদ সগীর, মহাকবি আলাওল, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেন, বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, প্রমথ চৌধুরী, অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, চলমান বিশ্বকোষ হিসেবে খ্যাত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলা সাহিত্যে উষ্ণ রসের প্রস্রবণ সৈয়দ মুজতবা আলী, আবুল মনসুর আহমদ, বরেণ্য কবি গোলাম মোস্তফা, অমিত্রাক্ষর ছন্দের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত, হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীর অমর অবদানে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার টইটম্বুর।

মূলত বাংলার অগণিত ক্ষণজন্মা কবি-সাহিত্যিক-ঔপন্যাসিক-নাট্যকার-প্রাবন্ধিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। আর বায়ান্নর ভাষাশহীদগণ বুকের তাজা রক্তের ঢল বইয়ে দিয়ে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা দান করায় জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত দেশগুলো এখন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। যাহোক, যুগের অগ্রযাত্রা মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মনোজগতে পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ছাপ ফেলে।

ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যুৎপত্তি, বিবর্তন ও বিকাশের ক্ষেত্রে যেসব মনীষী অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তারা প্রাতঃস্মরণীয় হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিতান্ত হাতে গোনা কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক-নাট্যকার-ঔপন্যাসিকের জন্ম ও মৃত্যু দিবস বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হচ্ছে। সিংহভাগ লেখক-সাহিত্যিকই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছেন। উনিশ শতকের সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও বিস্মৃতপ্রায়দের তালিকাভুক্ত। সাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচিত সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের এই প্রয়াস।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

অনন্যসাধারণ প্রতিভাধর সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর একই বছর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন বঙ্কিমচন্দ্র। দীর্ঘ ৩৩ বছর একই পদে অসামান্য দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৯১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সাহিত্যচর্চায় বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে খড়ি ছাত্রাবস্থায় এবং পাশ্চাত্য ভাবাদর্শে বাংলা উপন্যাস রচনার পথিকৃৎ হিসেবে তার বিরল কৃতিত্ব সর্বমহলের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। ১৮৬৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রকাশিত প্রথম বাংলা উপন্যাস ‘দুর্গেশ নন্দিনী’ বাংলা কথাসাহিত্যে নবদিগন্তের উন্মোচন করে। তার কালোত্তীর্ণ উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, রাধারাণী, চন্দ্রশেখর, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী ও সিতারাম। প্রবন্ধ সাহিত্যেও বঙ্কিমচন্দ্র আকাশআড়ালকরা কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কমলাকান্তের দপ্তর, লোকরহস্য, কৃষ্ণচরিত ইত্যাদি। ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনলীলার ইতি ঘটে।

বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লেখকের রচনার শিল্পগুণ শীর্ষক প্রবন্ধের অংশবিশেষ নিচে উপস্থাপন করে আমরা গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা সাঙ্গ করছি। বস্তুত, রচনাশিল্প প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘অর্থব্যক্তি ও প্রাঞ্জলতা’ এ দুটি পাঠের সমন্বিত রূপ রচনার শিল্পগুণ প্রবন্ধটি বঙ্কিম রচনাবলি থেকে সংগৃহীত। লেখকের ভাষায় রচনার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অর্থব্যক্তি ও প্রাঞ্জলতা। আর অর্থব্যক্তির বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। তবে দু-একটা সংকেত আছে, “যাহা বলিবার প্রয়োজন, রচনায় তাহা যদি প্রকাশ করিতে না পারিলে, তবে রচনা বৃথা হইল।

যে কথাটিতে তোমার কাজ হইবে, সেই কথাটি ব্যবহার করিবে। যেমন আদালত হইতে যে সকল আজ্ঞা সকলের জানিবার জন্য প্রচারিত হয়, তাহাকে ইশতিহার বলে। ইহার আর একটি নাম বিজ্ঞাপন। তবে বিজ্ঞাপনের অনেক অর্থ হইয়া উঠিয়াছে। গ্রন্থকর্তা গ্রন্থ লিখিয়া গ্রন্থের পরিচয়ের জন্য প্রথম যে ভূমিকা লেখেন তাহার নাম বিজ্ঞাপন। দোকানদার আপনার জিনিস বিক্রয়ের জন্য খবর কাগজ বা অন্যত্র যে খবর লেখে তাহার নাম বিজ্ঞাপন। সভা কি রাজকর্মচারীর রিপোর্টের নাম বিজ্ঞাপন। এমতাবস্থায় ইশতিহারের ব্যবহারই সুবিধেজনক।

জাতি শব্দ নানার্থ। হিন্দু সমাজের জাতি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কৈবর্ত ইত্যাদি। দেশবিশেষের মানুষÑইংরেজ জাতি, ফরাসি জাতি, চীন জাতি ইত্যাদি; মনুষ্য বংশÑআর্য জাতি, সেমীয় জাতি, তুরানি জাতি ইত্যাদি; নানা জাতি পক্ষী, কুক্কুরের জাতি ইত্যাদি। রচনায় জাতি শব্দ ব্যবহার করিলে তাহার পরিভাষা করিয়া অর্থ বুঝাইয়া দিতে হইবে। প্রাঞ্জলতা রচনার বড় গুণ। যেমন আগুনের নাম : অগ্নি, হুতাশন, হুতভূক, অনল, বায়ুসখা ইত্যাদি। তাই হুতভূক সাহায্যে বাষ্পীয় যন্ত্র সঞ্চালিত হয় না লিখে অগ্নির সাহায্যে বাষ্পীয় যান চলে লিখিলে সকলেই বুঝিবে। আবার মীনক্ষোভাকুল কুবলয় বলিলে বোঝা কষ্টকর। অথচ মাছের তাড়নে যে পদ্ম কাঁপিতেছে বলিলে বোঝা সহজ। আবার ‘এবম্বিধ বিবিধ প্রকার ভয়াবহ ব্যাপারে বশীভূত হইয়া, যখন সূর্যদেব পূর্বগগনে অধিষ্ঠান করিয়া পৃথিবীতে স্বীয় কিরণমালা প্রেরণ করিলেন, তখন আমি, গেন স্থান পরিত্যাগ করিলাম।’ এরূপ না বলিয়া বলা চাই : ‘এইরূপ অনেক বিষয়ে ভয় পাইয়া, যখন সূর্য উঠিল তখন আমি সে স্থান হইতে চলিয়া গেলাম।’

জটিল বাক্য ভাঙ্গিয়া ছোট ছোট সরল বাক্য সাজাইবে। যেমন : ‘দিন দিন পল্লীগ্রামে সকলের যেরূপ শোচনীয় অবস্থা দাঁড়াইতেছে, তাহাতে অল্পকাল মধ্যে অনেক পল্লীগ্রাম যে জলহীন হইবে এবং তদ্ধেতুক যে যে কৃষিকার্যের বিশেষ ব্যাঘাত ঘটিবে, এরূপ অনুমান করিয়াও অনেক দেশহিতৈষী ব্যক্তি তাহার প্রতিবিধানে যত্ন করেন না, দেখিয়া আমরা বড় দুঃখিত হইয়াছি।’

বাক্যটি এভাবে লিখিলে বোঝা সহজ হইবে : ‘দিন দিন পল্লীগ্রামে সকলের শোচনীয় অবস্থা দাঁড়াইতেছে। যেরূপ শোচনীয় অবস্থায় দাঁড়াইতেছে, তাহাতে অল্পকাল মধ্যে অনেক পল্লীগ্রাম জলহীন হইবে। পল্লীগ্রামসকল জলহীন হইলে কৃষিকার্যের বিশেষ ব্যাঘাত ঘটিবে। অনেক দেশহিতৈষী ব্যক্তি ইহা অনুমান করিয়াছেন। কিন্তু অনুমান করিয়াও তাহারা ইহার প্রতিবিধানের যত্ন করেন না। ইহা দেখিয়া আমরা বড় দুঃখিত হইয়াছি।’ তদ্রƒপ ‘ঊণ বর্ষায় দুনো শীত’ বাক্যটিকে বুঝিয়ে বলা যায় : যে যে বৎসর কম বর্ষা হইবে সেই সেই বৎসর বেশি শীত হইয়াছে দেখা গিয়াছে। অতএব, বৃষ্টি কম হলে শীত বেশি হবে।”
[ঈষৎ পরিবর্তিত ও সংক্ষেপিত]

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।