গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনের ভূমিকা

এস এম মোজাম্মেল হক :

রাজনীতির সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যারা রাজনীতি করেন, ধরে নেওয়া হয় তারা প্রকৃত গণতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক। অর্থাৎ নিজেরা গণতন্ত্রচর্চায় অভ্যস্ত এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যদি ভুল লোক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মূল্যবোধের পরিপন্থীরূপে ভুল নেতার স্বার্থরক্ষায় ভুল পথ অনুসরণে বাধ্য হয়। এই কারণে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত চরিত্র, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, ন্যায়বোধ, জনআকাক্সক্ষা পূরণে কমিটমেন্ট ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া খুবই জরুরি। তবে নেতা এবং অনুসারী উভয়েই ভালো মূল্যবোধসম্পন্ন হলে তো কথাই নেই, কিন্তু খারাপ হলে তার কুফল পুরো জনগোষ্ঠীকে ভোগ করতে হয়।

যার বাস্তব চিত্র প্রায়ই লক্ষ করা যায়, যদিও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা পর্যালোচনার পর্যায়ে উঠে আসে না। নেতা বলতে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি বোঝালেও নেতার নৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ শব্দটিও অন্তর্নিহিত বিষয়। তাই হঠাৎ নেতা হওয়ার সুযোগ নেই, বরং দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিই নেতা হওয়ার যোগ্য। এর বিপরীতে অঢেল অর্থবিত্তের জোরে পদ বাগিয়ে হঠাৎ নেতা বনে যাওয়া ব্যক্তির নিকট থেকে নেতার গুণাবলি আশা করা যায় না। বরং সবকিছু তিনি অর্থের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে থাকেন, যার কুপ্রভাব এ দেশের মানুষও স্বল্প পরিসরে উপলব্ধি করেছে বৈকি!

নির্বাচন কোনো নেতা বা দলের জনমত যাচাইয়ের একটি অন্যতম পদ্ধতি। অপরপক্ষে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণও তাদের গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট মেয়াদে নেতা নির্বাচনের সুযোগ লাভ করে থাকেন। বোদ্ধা জনগণ কোনোভাবেই এ সুযোগকে হাতছাড়া করতে চান না। যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডিং ফাদাররা হাউস, সিনেট এবং প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ও নির্বাচনপদ্ধতি এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান জনমতকে উপেক্ষা করার সুযোগ না পায়। এখানে সময়কে যেহেতু অতিমূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং কর্মজীবী মানুষ যাতে সময়ের অপচয় ব্যতিরেকে ভোট প্রদান করে নিজেকে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, সেই বিবেচনা থেকে ভোটদান-পদ্ধতিকে খুবই সহজ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের মেয়াদপূর্তির মাঝামাঝি সময়ে হাউস ও সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে ক্ষমতাসীন দল জনআকাক্সক্ষা পূরণে সদা সচেষ্ট থাকে এবং বিরোধী দলও জনগণের পক্ষে সোচ্চার থাকে।

ফলে সরকারি উদ্যোগ জনগণের দুর্দশা লাঘব ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তা সত্ত্বেও বিরোধী দল সরকারের দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমালোচনার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করে ভোটারদের তাদের পক্ষে টানার চেষ্টা করে থাকে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির এটাই সৌন্দর্য। রেজিস্টার্ড ভোটার ব্যতীত নিরপেক্ষ ভোটাররা উভয় দলের গৃহীত ও ঘোষিত জনকল্যাণের বিষয়সমূহ মূল্যায়ন-পূর্বক ভোটদানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে উপনীত হন। কোভিড চলাকালীন বর্তমান প্রশাসন জব হারানো ও স্বল্প আয়ের লোকজনের দুর্দশা লাঘবে স্টিমুলাস চেকের মাধ্যমে প্রত্যেকের হিসাব নম্বরে অর্থ পৌঁছে দেয় এবং বিভিন্নভাবে জরুরি খাদ্য সহায়তার মাধ্যমেও প্রচুর খাদ্যসামগ্রী নিরন্ন লোকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। ফলে দরিদ্র মানুষেরা সেই সংকটময় সময়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন। পক্ষান্তরে লকডাউনের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের সাহায্যেও প্রচুর অর্থ প্রদান করা হয়।

সরকারের এহেন সহযোগিতার ফলে মানুষের হাতে প্রচুর অর্থের সমাগম ঘটে। পক্ষান্তরে কোভিডের কারণে সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয় এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে পৃথিবীব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে অর্থের প্রাচুর্য ও পণ্য ঘাটতির কারণে পণ্যের বাজারমূল্য অনেক বেড়ে যায়, যা ইনফ্লাশন হিসেবে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা বিরোধী পক্ষ সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে প্রচার করলেও কোভিড চলাকালীন সরকারের পক্ষ থেকে উল্লিখিত সহযোগিতা করা না হলে বহু লোকের অর্ধাহার, অনাহার ও বিনা চিকিৎসায় স্বাস্থ্যহানিসহ জীবননাশের আশঙ্কা ছিল, যা প্রশংসার যোগ্য হলেও বিরোধীরা প্রশংসা করতে অপারগ।

যেকোনো জাতির অগ্রগতির জন্য জাতীয় ঐক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ ২০ জানুয়ারির প্রলয়ংকরী কাণ্ডের ফলে জাতীয় ঐক্য যেমন বিনষ্ট হয়েছে, একই সঙ্গে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ লোকের বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা বিশ্বে আমেরিকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও নির্বাচন-ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ বিবেচিত হলেও ক্ষমতালিপ্সু একদল উগ্রপন্থীর নিকট থেকে বারবার মিথ্যা দাবি নিজ দেশসহ সারা দুনিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, যা সত্যিই অনাকাক্সিক্ষত। তবে আশার কথা, এখানকার ক্ষমতার কাঠামোতে ভারসাম্য থাকায় জনমনে ধীরে ধীরে আস্থার পরিবেশ ফিরে আসতে শুরু করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, অবকাঠামোর উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট পরিমাণ শিক্ষা ঋণ বাতিল ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ফলে দ্রব্যমূল্য অচিরেই কমতে শুরু করবে বলে অর্থনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞদের ধারণা। জ্বালানি তেল ও গ্যাসোলিনের মূল্য বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্টের সৌদি সফরের ফলে তা কমতে শুরু করলেও হঠাৎ ওপেকের সিদ্ধান্তে ডিসেম্বরের শুরু থেকে দৈনিক দুই মিলিয়ন ব্যারেল উত্তোলন কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণায় পুনরায় তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ কারণে হোয়াইট হাউস থেকে ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত উত্তোলন এবং গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। উত্তোলন বাড়ানোর ফলে গ্যাসের মূল্য কমে ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারে নেমে এলে উত্তোলনকারীদের যাতে ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয়, তা নিশ্চিতের জন্য সরকারিভাবে গ্যাস ক্রয় করে রিজার্ভের ব্যয়িত অংশ পূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে গ্যাসের দামে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। গ্যাসের দাম কমলে পরিবহন ব্যয় কমার কারণে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামেও সহসাই তার প্রভাব লক্ষ করা যাবে।

গর্ভপাতের বিষয়টিও নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি অগ্নিগর্ভ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে বেশির ভাগ নারীর পক্ষেই ডেমোক্র্যাট দলের অবস্থান, যা নারী ভোটারদের মন জয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। শিক্ষাঋণ মওকুফের ফলে উপকারভোগী প্রায় ৪০ মিলিয়ন শিক্ষিত ও শিক্ষানবিশ তরুণ ভোটার তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারাও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সবকিছু ছাপিয়ে জনস্বার্থে বিগত কয়েক মাসে অনেক বিল পাস হওয়ায় তার সুফলপ্রাপ্ত গণমানুষের নিকট থেকে ইতিবাচক সাড়া পাবে বলেই নীল দলের তরফ থেকে ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক। জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক।