গলাকাটা এক নীলকর সাহেবের গল্প

বৈচিত্র্যময় কৈশর ৭

ড. এবিএম এনায়েত হোসেন :

শৈশব পেরিয়ে দূরন্ত কৈশরের শুরুতে মানুষ তার চারপাশের প্রকৃতি-পরিবেশ এবং নিত্যদিনের খেলার সাথীদের সাথে গড়ে তোলে একটা নিবিড় সম্পর্ক। ক্রমশ বৃদ্ধি পায় তার কৌতূহল। জানা-অজানার অন্তহীন সাগরে ভেসে চলে কৈশর মন ও মগজ। একদিকে সামাজিক ও পারিবারিক বাধা-নিষেধ, অন্যদিকে ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতা। ভালো ও মন্দের পার্থক্যগুলো ক্রমশঃই স্পষ্ট হতে থাকে। তথাপি পাড়া-পড়শিদের আঙ্গিনা কিংবা বাগানে বেড়ে ওঠা আম-জাম, পেয়ার ও জামরুল কিংবা ডাব-নারিকেল গাছ থেকে ফল-ফলাদি পেড়ে খাওয়ার অদম্য আকর্ষণ যেনো কিছুতেই প্রশমিত হতে চায় না! খেলার সাথীদের কাউকে কাউকে এবং বয়স্ক চাষা-ভুষা লোকদেরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিলাম যে, নলডাঙ্গা বিলের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত সুউচ্চ মিনারটি আসলে একটি নীলকুঠি! অবিভক্ত বাংলার ইংরেজ নীলকর সাহেবদের বাংলার চাষীদেরকে দিয়ে জোরপূর্বক নীলচাষ করানো, নীল চাষের জন্য গরিব চাষীদেরকে দাঁদন দেয়া এবং তা পরিশোধ না করতে পারার কারণে ধান-পাট জন্মানো উর্বর উঁচু জমিগুলোতে নীল উদ্ভিদ আবাদ করতে বাধ্য করা এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর অবর্ণনীয় দৈহিক নির্যাতনের চিত্র দীনবন্ধু মিত্রের (১৮৫৯ খ্রি.) বিখ্যাত উপন্যাস ‘নীলদর্পণ’ এর প্রামাণ্য দলিল।

উপরে আলোচিত নীলকুঠিটি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় অবস্থিত রাধানগর গ্রামে আজও অটুট অবস্থায় বিরাজমান। কুঠি বাড়িটি সবুজ-শ্যামল গাছপালা পরিবেষ্টিত এবং রানি রাশমণির কাছারি বাড়ি মকিমপুর থেকে পূর্বে বিস্তৃত প্রশস্ত গ্রাম্য পথের এক প্রান্তে অবস্থিত। বর্ষাকালে যখন মধুমতি নদীর ঘোলা পানি প্রবল বেগে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হতে থাকে, তখন নলডাঙ্গা বিলের চারপাশ্বর্স্থ সব গ্রামেরই নিম্নাঞ্চলগুলো পানিতে ডুবে যায়। ইতনা গ্রামের দৈনিক বাজার মধুমতির তীরে অবস্থানের কারণে এ সময় প্রায়শই বাজারের স্থায়ী দোকানঘরগুলো জলনিমগ্ন হয়ে পড়ে। কাঁচা বাজার ও মাছ বাজার বসার মত কিছুটা উঁচু জায়গাতেও পানি ওঠে। ফলে গ্রামবাসীদেরকে নৌকা করে আশে-পাশের অপেক্ষাকৃত উঁচু টিলায় আয়োজিত সাপ্তাহিক হাটের শ^রণাপন্না হতে হয়। একবার বর্ষায় এরূপ পরিস্থিতিতে হাট বসলো আমাদের ইতনা গ্রামের পূর্ব সীমানায় নমশূদ্র সম্প্রদায়ের এক চাতালে।

আমাদের ডিঙি নৌকাখানায় চড়ে কয়েকজন মুরব্বির সাথে আমিও গেলাম এ অস্থায়ী হাটে। উদ্দেশ্য মিষ্টি ও নরম ‘ধলসুন্দর’ জাতের আখ খরিদ করা। তবে এ নৌকা যাত্রায় আমার লাভ হলো দুটো। প্রথমত আমি ‘বুড়ো ঠাকুরের বটতলা’-কে বেশ কাছ থেকেই দেখতে পেলাম। আর দ্বিতীয়টি হলো নীলকুঠিকে অনেকটা নিকট দূরত্ব থেকে দেখা। প্রথমটি সম্পূর্ণরূপে ফসলি মাঠের মধ্যে অবস্থিত ছোট একটা উঁচু ঢিবি বিশেষ। এখানে নাকি পূর্ণিমা-অমাবশ্যার রাতে কেউ কেউ কালীর সাধনা করে। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য হলো আবু সরদার। পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার রাতে এ গাছতলায় অনেকেই ভোগ চড়ায়। আবু ভাই তার আবলুস কাঠের মত রঙধারী সুঠাম দেহে, এখানে এসে খালি গায়ে কী সব মন্ত্র-তন্ত্র যপ করে থাকে। বানোয়াট গল্প কী না, জানি না! আবু সরদার কিন্তু আমাদের কাছ অনেকবার তার কালী সাধনার কথা বলে অতিন্দ্রীয় শক্তিধর হিসেবে নিজেকে জাহির করেছে। তার হাতের বাজু এবং কোমরে বিশেষ তাবিজ-কবজ পরতে দেখেছি।
যা হোক, নীলকুঠির গল্প করতে অবশ্য অবশ্যই মকিমপুরের কাছারি বাড়ির কথা বলতে হয়। কারণ, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এতদাঞ্চলে ইংরেজ সাহেবদের থাকার মত কোন বাড়িঘর ছিল না। রাধানগরের নীলকুঠি আর মকিমপুরের কাছারি বাড়ির দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। মাঝপথে একটা ছোট্ট টিলার উপর রাধানগরের সাপ্তাহিক হাট বসে।
পরের বছর ভরা বর্ষা মৌসুমে যখন আমাদের দৈনিক বাজার বসা বন্ধ হয়ে গেল, তখন আবার আমাদের ডিঙি নৌকায় চড়ে একদিন অন্যান্যদের সাথে রাধানগরের হাটে গেলাম। উদ্দেশ্য নীলকুঠির সঠিক অবস্থান ও দূরত্ব সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়া, আর হাট থেকে গজা, মুড়কি, মটকা ও চানাচুর কেনা। কুঠিবাড়িটিকে সামনা-সামনি দেখার কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। কিন্তু প্রকাশ্যে কাউকেই কিছু বললাম না!

বর্ষার শেষে শীতকালে একদিন তিনজন সাথী মিলে চললাম নীলকুঠি অভিযানে। সঙ্গে চুন্চালে (চঞ্চল মোল্লা) আর বাবুল সরদার। আমাদের বাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত পুকুর পাড়ের সাথে লাগোয়া পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রশস্থ হালট (আসলে এটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের প্রস্তাবিত এবং অবাস্তবায়িত পাকা রাস্তা!)। এ হালট ধরে পূর্বদিকে হাঁটতে থাকলে এক-দু’মাইল পরেই রাস্তাটি বিচ্ছিন্ন। কারণ, এখান দিয়েই বর্ষাকালে মধুমতি নদীর ঘোলা পানির স্রোত বয়ে চলে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। শীতকালে এ পথ সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। আমরা বিল পার হয়ে আবার ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের উঁচু রাস্তা ধরে রানি রাশমণির কাছারি বাড়ির কাছে পৌঁছলাম। একটু এগিয়ে দেখি সুরমা অষ্টালিকা, দীর্ঘায়তনের দীঘিতে টলটলে স্বচ্ছ পানি, সুদৃশ্য প্রবেশপথ ও দেহলীজ (বহির্মহল)। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হবার ফলে আগের আমলের সেই জৌলুস আর আজ অবশিষ্ট নেই। ফুল বাগানের পরিচর্যায় দু-একজন মালি আর একজন উর্দিপরা আর্দালিকে তদারকি করতে দেখলাম। আমরা কাছারি বাড়ি দেখে বেরিয়ে এসে প্রশস্থ একটা রাস্তা ধরে হেঁটে রাধানগর গ্রামে পৌঁছলাম।

হাট বসার ফাঁকা টিলাটা পার হয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে একটা পায়ে চলা পথ। দু-একজন গ্রামবাসী পথচারীকেও আমাদের বিপরীত দিকে চলতে দেখলাম। কিছুটা পথ পেরিয়ে একজন মাঝবয়সী পথচারীকে জিজ্ঞেস করলাম
-যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কী আমাদেরকে একটু বলতে পারবেন, নীরকুঠিটা এখান থেকে আর কত দূরে? কোন্ পথেই বা গেলে সেখানটায় পৌঁছাতে পারবো?
-এহান খাহি আরো ৫০-৬০ গজ হাঁটি গেলেই নীলকুঠিটা দেখতি পাবেন নে। যে পথে হাঁটতিছেন, এই পথেই সোজা হাঁটি যান। নীলকুঠি দেখতি হলি এই রাস্তা হতি ডান মুহি এটা চেকন হাঁটা পথ ধরি মাঠের দিহি কিছুডা যাতি হবে নে!
পথচারী সম্ভবত একজন কৃষক। আমাদেরকে তার হাত উঁচিয়ে দিক নির্দেশনাও দিল। পথচারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সেই কাক্সিক্ষত নীলকুঠির দিকে বাঁক খাওয়া পথ ও সোজা পথের সংযোগস্থলে এসে পৌঁছলাম। এখান থেকেই নীলকুঠির সুউচ্চ মিনার বা চূঁড়াটা নজরে পড়ল। মনে মনে চরম উত্তেজনা নিয়ে আমরা তিনজন তরুণ যেনো অনেকটা দুঃসাহসী অভিযানকে স্বার্থক করার আশা নিয়ে নীলকুঠিটার সন্নিকটে এসে পৌঁছলাম! কুঠির মধ্যে স্বল্পপরিসর খোলা জায়গা। এর নির্মাণশৈলী অনেকটা প্রাচীনকালের মঠ বা মন্দিরের মতই। পাতলা লাল রঙের ইট আর চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা। উল্লেখ্য যে, নীলকুঠি নির্মাণকালে, অর্থাৎ আঠারো শতকের প্রথম দিকে তখনও ইট-সিমেন্টের ব্যবহার শুরু হয়নি! তাছাড়া পাঠকদেরকে একটু জানিয়ে রাখি যে, দীনবন্ধু মিত্র রচিত এবং বেশ আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাট্যকর্ম ‘নীলদর্পণ’ প্রকাশিত হয় ১৮৫৮-৫৯ সালে। বাংলার খেটে খাওয়া দরিদ্র চাষাভুষা লোকদের ওপর নীলকর সাহেবদের বর্বর-অমানুষিক অত্যাচার করার মূলে ছিল সে সময়কার ‘নীল সোনা’ নামে পরিচিত প্রাকৃতিক রঙ নিষ্কাশন ও উৎপাদন। কারণ, তখনও নীল রঙের রাসায়নিক উপাদানসমূহ ল্যাবরেটরিতে আবিস্কৃত হয়নি! সুতরাং, নীল জিনস্ ও ডেনিম-এর রঞ্জিত করার কোনো বিকল্প ছিল না। এজন্যই প্রাকৃতিক উৎস, অর্থাৎ গাছপালা থেকে আহরিত এ নীল রঞ্জক ছিল এ মহার্ঘ বস্তু। অনেকটা এক সময়কার আমাদের দেশে উৎপাদিত সোনালী আঁশ, তথা পাটের মত! আর নীল উদ্ভিদ কেবলমাত্র পৃথিবীর ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলসমূহেই জন্মায়। উদাহরণ স্বরূপ, অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক নীলের উৎস ছিল Indigofera tinctoria উদ্ভিদ।

ইউরোপীয় দেশসমূহ প্রাকৃতিক নীল (Indigo) রঙ আহরণের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক উৎপাদনের জন্য নীল চাষ প্রবর্তন করে। প্রধান আবাদকারী দেশগুলোর মধ্যে তৎকালীন ঔপনিবেশিক অঞ্চল, তথা-ভারতবর্ষ, দক্ষিণ আমেরিকা, হেইতি ও জ্যামাইকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। যা হোক, প্রাকৃতিক নীল রঙের ব্যবসায় ধ্বস নামে ১৮৯৭ সালের দিকে। যখন BASF (Badische Aniline and Soda Fabric Eng. Baden Aniline and Soda Factory) রাসায়নিক উপায়ে নীল রঙ উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। এক যুগের মধ্যেই প্রাকৃতিক নীল রঙের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। যদিও অধূনাকালে ভারতবর্ষ, জাপান ও আমেরিকায় স্বল্প পরিমাণে প্রাকৃতিক নীল রঙ আহরণ করা হচ্ছে।

আমরা নীলকুঠির প্রবেশপথের সামনে একটা বড় লোহার জং ধরা কড়াই ও একটা লোহার নাহোড় অযত্নে পড়ে থাকতে দেখলাম। বুঝতে পারলাম যে, এ কড়াইতে করেই নীল গাছের কাটা টুকরোগুলোকে জ্বাল দেয়া হতো। নিদর্শনটি জাতীয় যাদুঘরেই যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণযোগ্য। কিন্তু স্বাধীন দেশে কাজটি এতদিন কেউ করেনি দেখে জার্নালিস্টরাও কেন বিষয়টি মিডিয়াতে তুলে ধরেনি, তা বোধগম্য হলো না! কিছুটা মন খারাপ নিয়েই আমরা পুরনো নীলকুঠিটা দেখে ফেরা পথ ধরলাম।

ফেরার পথে একজন বর্ষীয়াণ বৃদ্ধ লোকের সাথে দেখা হলো। পরণে একটা সাদা ধুতি কাপড়, আর গায়ে একটা ফতুয়া। তিনিও রাধানগরের দিকে প্রসারিত কিছুটা চওড়া মেঠোপথ ধরে বাড়ি ফিরছিলেন। আমাদের তিনজনের মধ্যে বাবুল সরদারই সবচাইতে অধিক চটপটে স্বভাবের। কথাও একটু বেশি বলে থাকে। অপরিচিত মুরব্বি গোছের লোক হলেও বাবুল তাঁর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আলাপ শুরু করতে দেরি করলো না। পথচারীকে দেখেই আমরা আঁচ করেছিলাম যে, তিনি একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। বাবুল সরদার আলাপ শুরু করতে বললো

-আদাব কাকু! আপনার বাড়ি মনে হয় রাধানগর!
-আদাব বাবাজিরা! আমার বাড়ি রাধানগর নারে বাবা! মকিমপুরে।
বৃদ্ধ লোকটি সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিলো।
-তা এদিহি কোহানে আইছিলেন, কাকু?
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বর্ষীয়াণ লোকটি জানালো যে, সে এসেছিল রাধানগরে, তার মেয়েকে দেখতে। এখন বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে।
ভদ্রলোক তিন-তিনজন অপরিচিত তরুণকে নীলকুঠির দিক থেকে ফিরে আসতে দেখে অনুমান করেই প্রশ্ন রাখলো
-তা বাবারা, তুমরা বুঝি কুঠিবাড়ি, দেখতি আইছিলে?
আমরা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে হ্যাঁ উত্তর দিলাম।
বৃদ্ধ লোকটি কিছুটা হতাশার সুরেই বললো
-নীলকুঠির সে পুরনো জৌলুস আর আজকাল নাই।
আমরা সায় দিয়ে বললাম
-ঠিকই কইছেন কাকা! দেখলাম কুঠির দেয়ালের অনেক জায়গাতেই ইটে নোনা ধরে খইয়ে গেছে। আশপাশটাও জঙ্গলে ভরা। লোহার কড়াইডাতেও জং ধরিছে!
-আচ্ছা কাকু! আপনার নামডাই তো আমরা এতক্ষণ জানতি পারি নাই!
বাবুল কিছুটা অধৈর্য্য হয়েই মন্তব্য করলো।
-আমার নাম জনদিন নস্কর। আমার বাপ-দাদারা মকিমপুর কাছারি বাড়িতে পাহারাদারি করিছে।
-তাহলি তো আপনি নীলকর সাহেবগের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন!
-নাগো বাবারা! সেসব গল্পতো ঠাকুর্দা-পরঠাকুদাদের আমলের কথা। ঠাকুর্দার চেহারাডা ভালো করি আমার মনেও নাই! কারণ, আমার তহন সবে জন্ম হইছে মাত্র! কিন্তু বাবা গদাধর নস্করের মুহি এট্টা গল্প মাঝেমধ্যে শুনতি পাইছি। এ কাহিনী রাধানগর ও এর আশপাশের সব গেরামেই চালু আছে বহুকাল অবধি।
আমরা তিনজনই উৎসুক হয়ে বৃদ্ধের মুখের দিকে বিস্ময় ও আগ্রহ নিয়ে তাকালাম।
আমি গল্পটা শোনার জন্য জনার্দন বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম
-আচ্ছা কাকাবাবু! এ গল্পটা কী গলাকাটা নীলকর সাহেবের ঘোড়া দাবড়ানির সাথে যুক্ত?
-হ, ঠিকই কইছো। ইংরেজ আমলে মকিমপুর কাছারি বাড়ি থেহে ঘোড়া দাবড়িয়ে রোজই নীলকর সাহেব (কী যেন নাম ছেলো!) যাওয়া-আসা করতো। কোমরে থাকতো একটা বন্দুক আর চাবুক। নীলকুঠির আশপাশের উর্বর ও উঁচু জমিগুলোতে ধান-পাটের বদলি জোর করি নীলগাছ লাগাতি বাধ্য করা এবং দাদন নেয়া চাষীদেরকে নির্বিচারে চাবুক মারার বিরুদ্ধে স্থানীয় চাষীদের মনে চাপা ক্ষোভ বাড়েই চলছিল। এর সাথে যোগ দেয় কয়েকজন ডাকাত। তারা একদিন নীলকর সাহেবরে ঘোড়াসহ চারদিক থাহি ঘিরে ফেলায়। এই রাধানগরেরই হাটতলায় বটগাছের নীচ দিয়ে যাবার সময়ে। সাহেব তার বন্দুক ব্যবহার করিছিল কীনা, তা জানি না! তবে ডাকাত সর্দার তার ভুজালিডা দিয়া নীলকর সাহেবের গলা থাহি মুন্ডুডা কাটি ফেলায় দেয়! ঘোড়াডা ঐ অবস্থাতেই, অর্থাৎ মুন্ডুহীন সাহেবের দেহডারে লয়েই মকিমপুর কাছারি বাড়ির আস্তাবলে ফিরা যায়!

-হ্যাঁ জনার্দন কাকা! আমরাও নীলকুঠি দেখতে আসার আগে লোকজনের মুখে এমনটাই শুনেছিলাম। আপনার কাছ থেকে বিষয়টা সম্পর্কে এখন আরো খোলসা করে জানা গেল! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আমি ভদ্রভাবে কথাগুলো বললাম। কিন্তু মনের মধ্যে তখনও অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশ্য আমার প্রশ্নের পূর্বেই আমাদের সঙ্গী বাবুল সরদার জিজ্ঞেস করে বসলো
-আচ্ছা কাকাবাবু! লোকমুখে আমরা শুনেছি যে, পূর্ণিমা-অমাবশ্যার কোন কোন রাইতে নাকি সেই গলাকাটা সাহেবকে এ পথে ঘোড়া দাবড়াইয়ে যাতি দ্যাহে- কিংবা ঘোড়ার পায়ের টগ-বগানি আওয়াজ শুনতি পায়! এ কথা কী সত্যি?
-তুমি তো বাবা এট্টা মজার কথা জিগাইছো। তোমাগের মতন আমরাও এ কথা কেবল মুহি মুহি শুনতি পাইছি। আমার জেবনে এমন কেউকেই পাই নাই, যে কইছে যে সে গলাকাটা সাহেবরে ঘোড়া দাবড়াইতি দেহিছে!
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিচার করতে চাইলে এ গল্পের অনেক ছোট-বড় প্রশ্নই জবাবহীন হবে! একমাত্র রূপকথার গল্প বলেই একে চালিয়ে দেয়া যায়।
যা হোক, কথায় কথায় আমরা প্রায় মকিমপুর কাছারি বাড়ির কাছে এসে পড়লাম। তখন পড়ন্ত বিকেল। জনার্দন বাবু আমাদেরকে বললেন
-এইবার বাবারা তোমরা তোমাগের পথে যাও। আমার বাড়ির পথ হাতের ডাইন দিহি। আমি সে পথেই চললাম। তোমাগের সাথে কথা কইতে ভালো লাগলো!
আমরা নস্কর বাবুকে আদাব-নমস্কার জানিয়ে দ্রুত পায়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা ধরে আমাদের গ্রামের দিকে ছুটলাম। বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেলে আবার বাবার কাছ থেকে নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে!
শৈশবে যে নীলকুঠির চুঁড়াটা কেবলমাত্র দেখেছিলাম আমাদের পুকুরের পাড়ের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে দাঁড়িয়ে, তা আজ স্বচক্ষে সার্বিকরূপে দেখতে পেলাম কৈশরে এসে। নীলকুঠি অভিযান শেষে তরুণ মনে জমা হলো কিছু বিস্ময়, বাস্তবতা আর একটা লোকায়ত কল্প-কাহিনী!