গল্পটি শিরোনামহীন

আমাদের সদ্য প্রয়াত আম্মা বেগম শামসুন্নাহার চৌধুরী স্মরণে

ঋতু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন প্রকৃতি ও মানুষের মনে যে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করে থাকে এই বিষয়ে কারও বিস্তর গবেষণা না থাকলেও যেকোনো স্বাভাবিক বোধসম্পন্ন মানুষ তা সহজেই অনুভব করতে পারে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ-নিউইয়র্কের আবহাওয়া দারুণ চনমনে। সপ্তাহান্তের ছুটির দিনগুলোতে যে যার মতো করে বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে কিংবা সমুদ্র সৈকতে দল বেঁধে হইচই ও আনন্দের সাথে বার বি কিও পার্টিসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার অনুষ্ঠান উদযাপনে মেতে উঠেছে।
কেউ কেউ পরিবারসহ দূর কোনো শহরে অবকাশ যাপনে বেরিয়ে পড়ছে। এই প্রানচাঞ্চল্যময় আনন্দমুখর কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় যেন নিউইয়র্কবাসীরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক মধুর প্রতিশোধ গ্রহণে মত্ত। বছরের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি সময় স্থানীয়দের এক ধরনের ঠাণ্ডা বৈরী আবহাওয়ার সাথে রীতিমতো যেন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়- অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়, আর তাই উষ্ণ আবহাওয়ায় তারা যেন হারানো দিনের বঞ্চিত আনন্দ ও সুখ সুদে আসলে পুষিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। আমি ও আমার স্ত্রীও কিছুদিন যাবৎ ভাবছিলাম নিউইয়র্কের কাছাকাছি আমিষ কাউন্টি কিংবা রোড আইল্যান্ডে অবকাশ যাপনের কথা। এমন সময় আমার স্ত্রী শারমীন চৌধুরীর ভাইপো আসিফ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান প্রদেশ থেকে ফোন করে তার ওখানে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলো ।
বেশ কিছুদিন হলো সে আজমান শহরে ব্যবসা শুরু করেছে এবং ব্যবসা মোটামুটি জমিয়ে বসেছে। বছরের বেশ কিছুটা সময় সে ব্যবসায়িক কারণে দুবাই ও আজমানে অবস্থান করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুটি অনুষঙ্গ আমার মনকে নিরুৎসাহিত করে। সেগুলো হলো বর্তমান সময়ে সেখানকার উত্তপ্ত আবহাওয়া এবং আমার আম্মাকে রেখে এতদূরে বেড়াতে যেতে মন চাইছিল না। আম্মার বয়স এখন ৮৫ বছর।
তিনি হালকা পারকিনসন্স ও ডায়াবেটিস রোগে ভুগছেন অনেক বছর ধরে। নিয়মিত চেকআপ ও সেবা শুশ্রূষায় আল্লাহর রহমতে তার রোগ নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং কোনো রকম শারীরিক ঝুঁকি নেই বলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মতামত দিয়েছেন। গত তিন মাসে আম্মাকে ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞসহ পালমোনারি, কার্ডিওলোজি ও নিওরোলজি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়েছে।
প্রত্যেকেই তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আম্মাকে মূলত দেখভালো করেন আমার ছোট আপা এবং আমরা বাকি ভাইবোন তাকে নিয়মিত সহায়তা করে থাকি। আমি মূলত আম্মার বিভিন্ন ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট থেকে শুরু করে তাকে ডাক্তারের কাছে আনা নেয়ার কাজ করি এবং প্রতিদিন অন্তত একবেলা আম্মার কাছে বসে তার গল্প শুনি। তার ছেলেবেলার গল্প,নানার বাড়ি, দাদার বাড়ির গল্প, আমাদের বেড়ে উঠার গল্প, যুদ্ধ দিনের দুর্বিষহ ভয়ংকর অনিশ্চিত জীবনযাপনের গল্পসহ নানা বিষয়ের গল্প। গল্প শেষে এক সাথে খেতে বসা নিয়মিত ঘটনা।
খাবার টেবিলে আম্মা তার কাঁপা কাঁপা হাতে বিভিন্ন খাবারের আইটেম আমার পাতে তুলে দিয়ে বলে খাও বাবা, পেট ভরে খাও। তুমি অনেক শুকিয়ে গেছ। তাকে বিনয়ের সাথে যতই বলি এই বয়সে একটু কম খাওয়াই ভালো তিনি ততই বলতেন বেশি বেশি খাবে আর বেশি বেশি হাঁটাহাঁটি করবে তাহলে শরীর ভালো থাকবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসিফের আমন্ত্রণের বিষয়ে ছোট আপাকে অবগত করার সাথে সাথেই তিনি বললেন- ‘যা ঘুরে আয়, আম্মা আল্লাহর রহমতে এখন বেশ ভালো আছেন, তা ছাড়া আল্লাহ না করুক অল্প স্বল্প সমস্যা হলে আমরা সবাই এখানে রয়েছি। তোরা নিশ্চিন্তে ঘুরে আয়’। সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে টেক্সাসের অস্টিনে অবস্থিত আমাদের বড় ছেলে রেনাদ চৌধুরীর সাথে আমাদের ইউ এ ই ভ্রমণের ব্যাপারে আলাপ করতেই সে প্রবল উৎসাহে জানতে চাইল আমরা কবে, কয়দিনের জন্য এবং কোন এয়ার লাইনে উড়াল দিতে চাই এবং প্লেনের টিকিট সে ক্রয় করার ইচ্ছে প্রকাশ করল। অতঃপর ছোট ছেলে মাহীব চৌধুরী অনলাইনে কিছুটা গবেষণা করে দেখল যে এমিরেট এয়ার লাইন্সের ফ্লাইটে ভ্রমণ করাটাই উত্তম হবে। ২৯ মে ২০১৯ প্লেনের দুটো টিকেট ক্রয় করা হলো। আমাদের ফ্লাইট নম্বর ইকে-২০৬ (EK-206)। নিউইয়র্ক জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়ার সময়সূচি ৩০ জুন ২০১৯ রাত ১০টা ২০ মিনিটে এবং দুবাই থেকে ফিরে আসার সময়সূচি ১৭ জুলাই ২০১৯। আমিরাতের আবহাওয়ার বিষয়টিকে এখন আমি তুচ্ছজ্ঞান করছি।
নিউইয়র্কে হালকা গরম পড়েছে, তবুও এসি না চালিয়ে শোবার ঘরের বিশাল দক্ষিণা জানালা খুলে দিলাম যেন প্রকৃতির বাতাস এসে লুটোপুটি খায় আমাদের ঘরে। ঘরের জানালা দরজা বন্ধ থাকলে মনে হয় একটি বিশালাকৃতির আলোকিত কবরের মাঝে বিরাজ করছি।
শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছি বটে তবে তা চার দেয়ালের মাঝেই ব্র্যাকেট বন্দী হয়ে থাকছে,আমরা যেন প্রকৃতি থেকে, পার্থিব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ আমরা এক ধরনের মৃতপ্রায় প্রাণী। জানালা দরজা খোলা থাকলে নিজেকে প্রকৃতির মতোই খোলামেলা নির্ভার মনে হয়। প্রকৃতির নির্মল বাতাস, চাঁদের আলোও যেন চায় মনুষ্যজাতি যেন তাদের নির্বিঘ্নে চলাচলের পথে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। ফুরফুরে হাওয়া এসে বুকের উপর আছড়ে পড়ছে। ভাবছি আঠার দিনের সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যতটুকু সম্ভব দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখব।
যেমন দুবাই শহরে দেখব বুর্জ খলিফা, কুরানিক পার্ক, দুবাই মল, মিউজিয়াম, জুমেরা বীচ, দিরা, বাস্তাকিয়া-আজমান শহরে আজমান সমুদ্র সৈকত, আল দ্বার পুরাতত্ত্ব সাইট। শারজাহ শহরে শারজাহ আর্ট ও মেরিটাইম মিউজিয়াম, আল নুর দ্বীপ, শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়াম। আবুধাবীতে শেখ জায়েদ মসজিদ, নৌকা ভ্রমণ ইত্যাদি।
ছোট আপার সাথে পরামর্শ করে আম্মার জন্য দুবাই থেকে একটি স্বর্ণের আংটি আনার পরিকল্পনা করি। ছোট আপার কাছ থেকে আম্মার অনামিকা আঙ্গুলের মাপ নিলাম।
আম্মাকে মজা করে জিজ্ঞেস করলাম ‘আম্মা আপনি কি অনামিকা আঙ্গুলের আংটি পছন্দ করেন নাকি মধ্যমা আঙ্গুলের?’ আম্মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন তোমরাই আমার অলংকার বাবা, এই বয়সে ওসবের দরকার নেই। ‘সহি সালামতে আরব দেশ ঘুরে আবার আমার কাছে চলে এসো তাতেই আমার আনন্দ’।
ধীরে ধীরে আমাদের যাত্রার দিন ঘনিয়ে আসতে লাগল। আসিফকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে যে আমরা পারতপক্ষে বাইরের খাবার খাবো না তাই সে ঘরে রান্নার জন্য চুলা থেকে শুরু করে ফ্রিজ পর্যন্ত ক্রয় করে ফেলল। ওখানে সচ্ছল ও আরামদায়কভাবে বসবাসের জন্য সব আয়োজনই আসিফ সম্পন্ন করে ফেলেছে কেবল চলাচলের জন্য গাড়ি ছাড়া কারণ সে এখনও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়নি। সেই সমস্যারও সমাধান হয়ে গেল। আমি গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম যে আমেরিকার বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সে আরব আমিরাতে সীমিত সময়ের জন্য গাড়ি চালানো যায় এবং মজার বিষয় হলো ওখানেও আমেরিকার মত লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ। আমি আসিফকে বললাম রেন্ট এ কার থেকে দুই সপ্তাহের জন্য আমার লাইসেন্সের বিপরীতে একটি গাড়ি ভাড়া করে রাখতে।
২৭ জুন ২০১৯ দুপুরে খাবারের পর শরীর বেশ ক্লান্ত লাগছিল। দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস আমার তেমন একটা নেই কিন্তু সেদিন দুপুরে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম এবং বিকেল বেলা ধড়ফড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।
সাথে সাথে ছোট আপাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম আম্মা কেমন আছেন? ছোট আপা বেশ সপ্রতিভ কণ্ঠে হেসে হেসে বললেন আম্মা বেশ ভালো আছেন- এই যে লিভিং রুমে আরাম করে বসে মজা করে চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে কুট কুট করে খাচ্ছেন। কথা শেষে বেশ খানিক সময় চুপচাপ ভাবছিলাম আমার ভেতরে এত অস্থিরতা কাজ করছে কেন!
কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল নিউইয়র্ক ছেড়ে আমার কোথাও যাওয়া এই মুহূর্তে ঠিক হবে না। একটা দুঃস্বপ্ন-কিছুটা আবছা ধরনের, কোনো কিছুই স্পষ্ট নয় তবুও কেমন যেন মন খারাপ করা দুঃস্বপ্ন। এ দিকে দুবাই যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।
আমার স্ত্রী শারমীন খুব নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে ভ্রমণ পরিকল্পনার একটি চমৎকার ছক ইতোমধ্যে একে ফেলেছে। আর মাত্র দুই দিন বাদেই আমাদের ফ্লাইট। আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে শারমীন জিজ্ঞেস করল এত চুপচাপ কেন?
কোনো কিছু নিয়ে মন খারাপ? আমি কোনো ভনিতা না করেই বললাম দুবাই যেতে মন চাইছে না। আমাকে অবাক করে দিয়ে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সে বলল- টিকিট ক্যান্সেল করে দাও, আমারও কেন জানি মন চাইছে না।
এই মুহূর্তে আম্মার (শাশুড়ি) কাছে থাকাটাই শ্রেয় বলে মনে হয়। তার কথা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলেও স্বস্তি পেলাম। এত উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সব আয়োজন শেষ করেও সে আমার ইচ্ছের সাথে বিনা বাক্যে বা প্রশ্নে সহমত পোষণ করল।
অবশ্য জীবন চলার পথে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শারমীন বরাবরই তার সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। আমি তাকে বললাম আম্মা শারীরিকভাবে এখন ভালোই আছেন, আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা এখনই বাতিল না করে আরও দুই এক দিন অপেক্ষা করি। আমাদের উড়ালসূচির এক দিন আগে অর্থাৎ ২৯ জুন সকালে আমার ছোট ছেলেকে বললাম এমিরেটস এয়ার লাইন্সের সাথে যোগাযোগ করে দেখতে যে এখন আমাদের ভ্রমণ যাত্রা বাতিল করলে কত টাকা জরিমানা দিতে হবে। মাহীব বিস্তারিত তথ্য নিয়ে জানালো যে ৬০০ আমেরিকান ডলারের মতো জরিমানা দিতে হবে। আমি বিরস বদনে আমার স্ত্রীকে বিষয়টি অবগত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার রসাত্মক ধবল ধোলাইয়ের শিকার হলাম। সে বলল- এই তো গত ৬ আগস্টই খবরের কাগজে পড়লাম আমিরাতের শাসকের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা নিয়ে তার স্ত্রী নাকি জার্মানি হয়ে লন্ডন পালিয়ে গেছে আর তুমি ৬০০ ডলারের জন্য বিরস বদনে তাকিয়ে আছ!
তার কৌতুক ভরা বাঁকা কথায় আমি তাৎক্ষণিক ৬০০ ডলার গচ্চা দিয়ে টিকিট বাতিল করে সোজা আম্মার কাছে গেলাম এবং আম্মাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে বড় আপা, ছোট আপা ও দুলাভাইসহ নিকটস্থ গ্রোসারি শপে গেলাম আম্মার পছন্দের শাকসবজি ও ফলমুল কেনার জন্য। আম্মা তার কোনো পছন্দের কথাই বললেন না কেবল চুপচাপ হুইল চেয়ারে বসে থাকলেন। উনার কথাও আগের মতো স্পষ্ট নেই, অনেকটা ফিসফিস করে কথা বলে ও আকারে ইঙ্গিতে ভাব প্রকাশের চেষ্টা করছিলেন। ছোট আপা জানালেন যে গত ৫ আগস্ট রাতে আব্বাকে স্বপ্নে দেখার পর থেকে আম্মা অনেকটা নীরব হয়ে গেছেন।
ভ্রমন পরিকল্পনার চিন্তা মাথা থেকে সরে যাওয়ার পর আম্মার কাছেই অধিকাংশ সময় অবস্থান করি। তাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে বিকেল বেলায় তার অ্যাপার্মেন্ট কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে অবস্থিত পার্কে ঘোরাফেরা করি, রাতের খাবার শেষে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বিদায় নেয়ার প্রাক্কালে তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দরুদ পড়ে ফু দিয়ে দেন।
৩ জুলাই সকালে আম্মার রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে উঠানামা করতে থাকে, হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১৪২ এ দাঁড়ায়। আমি ও ছোট আপা তাৎক্ষণিক বাসার সন্নিকটে অবস্থিত নর্থ উইল আর্জেন্ট কেয়ারে নিয়ে যাই। সেখানকার লেডি ডাক্তার খুব দ্রুত প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বললেন তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে।
তিনি দুটি হাসপাতালের কথা বললেন যে দুটি হাসপাতালের সাথে তিনি এফিলিয়েটেড।
একটি হচ্ছে ৩০০ কমিউনিটি ড্রাইভ, ম্যানহেসেট নিউইয়র্কে অবস্থিত নর্থশোর ইউনিভার্সিটি হসপিটাল এবং আরেকটি হচ্ছে আমাদের আবাসস্থলের নিকটে অবস্থিত লং আইল্যান্ড জুইস হাসপাতাল ফরেস্ট হিল, যেটা প্রথমটির একটি শাখা হাসপাতাল এবং এই হাসপাতালে আম্মাকে নিয়ে ইতিপূর্বে চার-পাঁচবার গিয়েছি। ছোট আপা বললেন এবার বড় হাসপাতালেই আম্মাকে নিয়ে যেতে চাই। আমাদের সিদ্ধান্ত পেয়ে মহিলা ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিসে (EMS) ফোন করলেন এবং মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সসহ একদল অভিজ্ঞ মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট এসে আম্মাকে নর্থশোর ইউনিভার্সিটি হসপিটালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেল।
ছোট আপা দৌড়ে বাসায় গেল আম্মার হেলথ ইন্স্যুরেন্স কার্ড আনার জন্য। তিনি ফিরে আসার পূর্বেই আম্মাকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুল্যান্সে করে সোজা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ।
অ্যাম্বুলেন্সে আম্মার সঙ্গে গেলেন আমার সেজো ভাবী। আমি ছোট আপা, দুলাভাই গাড়িতে করে অ্যাম্বুলেন্সের পিছু পিছু হাসপাতালে পৌঁছলাম সকাল সাড়ে ৯টায়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে আম্মার ইউরিন ইনফেকশন ধরা পড়ল। জরুরি বিভাগে তার শরীরে ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইডের সঙ্গে এন্টি বায়োটিক সরবরাহ শুরু করে তাকে হাসপাতালের অষ্টম তলায় এম-৮১৩ নম্বর কেবিনে স্থানান্তরিত করা হলো। সারাদিন ছোট আপা আম্মার পাশে বসে তার সেবা শুশ্রূষা ও সঙ্গতা দিলেন। রাতে আমি হাসপাতালে গেলাম আম্মার পাশে থাকার জন্য। এখানে সাধারণত দিনরাত রোগীর পাশে তার আত্মীয়স্বজনদের সেবা প্রদান বা তাদের পাশে উপস্থিত থাকার বিষয়টি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ৩ জুলাই রাতে আম্মা হালকা ঘুমে ঢলে পড়লেন। ডাক্তার এসে আম্মাকে দেখে গেলেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করে গেলেন। সেই অনুযায়ী নার্সরা সময়সূচি অনুযায়ী আইভি ফ্লুয়িড, এন্টি বায়োটিক প্রয়োগ করতে লাগলেন। পাশাপাশি শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য দিনে তিনবার ব্লাড থিনার ইঞ্জেকশন দিতে লাগলেন। দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে থাকলে নাকি রোগীদের শরীরে রক্তজমাট বেঁধে যায় এবং তাতে বেডসোর (Bed sore) হয়ে যায় অর্থাৎ শরীরের চামড়ায় এক ধরনের লালচে ফোসকা পড়ে আর সেটা প্রতিরোধেই এই ইঞ্জেকশন প্রদান, সেই সাথে চলছে ব্লাড প্রেশার ও সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেস্টা। প্রতিদিন ভোরে সিরিঞ্জকে সিরিঞ্জ রক্ত নেয়া হচ্ছে আম্মার শরীর থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে। আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েই ডিউটি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন কেন এত রক্ত নেয়া হচ্ছে আম্মার শরীর থেকে? নার্স পরম বিনয়ের সাথে উত্তর দেয় এটা রোগীর প্রয়োজনেই ডাক্তারের নির্দেশে নেয়া হচ্ছে। আমি প্রতি রাতেই আম্মার কাছে থেকে এটা সেটা নিয়ে গল্প করার চেষ্টা করি, আম্মা মাঝে মধ্যে হাসে আর ফিসফিস করে হাতের ইশারায় প্রতিউত্তর দেয়। লাল টুকটুকে মুখে আম্মার হালকা মিস্টি হাসিটুকু নিসঃন্দেহে যেকোনো জগৎখ্যাত অংকন শিল্পীর মূল্যবান উপাদান হতে পারত। ৬ জুলাই রাতে আম্মা বেশ কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন।
সারারাত নির্ঘুম কাটান।
হাতের ইশারায় আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে যা বলার চেষ্টা করেন তার একটা মানে দাঁড়ায় এই রকম যে আব্বা গত রাতে তার সাথে ভীষণ রাগ করে চলে গেছেন এবং বলে গেছেন তিনি আর ফিরবেন না, যদি প্রয়োজন হয় তবে যেন আম্মা তার কাছে যান। আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন প্রায় পাঁচ বছর হলো অথচ আম্মা বলছেন তিনি গত রাতে রাগ করে চলে গেছেন। আমার চোখ ভার হয়ে আসে, লোনা জল ভিড় করে চোখের কোনে।
রাত্রির নীরবতা ও আবছা অন্ধকারে তা আড়াল করে আম্মার দিকে ঝুঁকে পড়ি। আম্মা পরম মমতায় আমার মাথায় কাঁপা কাঁপা ডান হাতটি রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বলে ফু দিতে থাকেন। আব্বা আম্মার পারস্পারিক বোঝাপাড়া, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কাহিনী যেকোনো রোমান্টিক রূপ কথাকেও হার মানাবে বলে আমার বিশ্বাস। স্বল্প পরিসরে তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়, তবে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে এখানে।
আমাদের জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি যখনই অবেলায় আমাদের ক্ষুধা লাগত তখন আম্মা তার বালিশের নিচ থেকে বিভিন্ন ধরনের মজাদার বিস্কুট বের করে দিতেন। আমরা ভাইবোনরা ভাবতাম হয়তো আম্মা আমাদের অসময়ের এবং বিনা নোটিশের ক্ষুধা নিবারণের জন্যই এই জরুরি ব্যবস্থার আয়োজন করে রাখতেন। সময়ের আবর্তে আম্মার বালিশের নিচের সেই বিস্কুট রহস্য পরে উন্মোচিত হলে আমরা আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়ি। আম্মা তার বাবার বাড়ি ছেড়ে আসেন ১৩-১৪ বছর বয়সে। আম্মাকে বিদায় দেয়ার সময় নানা আব্বার হাত ধরে একটি অনুরোধ করেছিলেন এই বলে যে ‘বাবা আমার আদরের মেয়েটির ভোর রাতে ক্ষুধা লাগে আর তাই আমি তার বালিশের নিচে বিস্কুট বা ছোট ছোট মুড়ির মোয়া রেখে দিতাম।
তুমি এই বিষয়ে একটু খেয়াল রেখ’। সেই থেকে আব্বা তার মৃত্যু অবধি আম্মার বালিশের নিচে মজাদার বিস্কুট রেখে এসেছেন’।
৮ জুলাই বিকেল বেলা নর্থশোর ইউনিভার্সিটি হসপিটালের ডাক্তার জানালেন যে আম্মা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং আমরা চাইলে তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে বাসায় নিয়ে যেতে পারি। এই সুখবরটি ছোট আপা হাসপাতাল থেকে ফোন করে আমাকে অবগত করে বলেন রাতে তোকে আর এখানে আসতে হবে না বরং তুই আমার অ্যাপার্মেন্টে চলে আয়। আমার সমস্ত স্বত্তা জুড়ে যেন এক অনাবিল আনন্দের ঢেউ খেলে গেল।
পরম করুণাময়ের কাছে শুকরিয়া আদায় করে আমার বাসা থেকে এক ব্লক দূরে আপার অ্যাপার্মেন্টে গিয়ে আম্মার আগমনের অপেক্ষায় রইলাম। আম্মা এলেন, তাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে দিলাম।
অন্য ভাইবোনেরাও একে একে আম্মার পাশে এসে দাঁড়ালো। পুরো পরিবেশ যেন এক মহামিলন মেলায় পরিণত হলো।
১০ জুলাই রাতে আম্মা আবার কিছুটা অসুস্থবোধ করতে লাগলেন। মধ্যরাতে আম্মা বমি করেন এবং রক্তচাপ কিছুটা উঠানামা করতে থাকে। আমরা তাকে ওরাল স্যালাইন খাওয়ানোর পর রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং বমি বন্ধ হয়। তিনি বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে থাকেন। সকালবেলা ছোট আপা ফোন করে জানান যে আম্মা মনে হয় ব্যথা অনুভব করছেন। আমি আর্জেন্ট কেয়ার সেন্টারে ফোন করে ডাক্তারের সাথে আলাপ করি এবং মাত্র দুই দিন পূর্বে সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার ঘটনারও বিশদ বর্ণনা দেই। তিনি আম্মাকে পুনরায় হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন এবং তাৎক্ষণিক আমি ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিসে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে অনুরোধ করি।
মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা অ্যাম্বুলেন্সসহ আম্মার অ্যাপার্মেন্টে চলে আসেন এবং নিকটস্থ ফরেস্ট হিল জুইশ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। এই হাসপাতালে ইতিপূর্বে আম্মাকে নিয়ে চার/পাঁচবার এসেছি এবং প্রতিবারই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের কেবল একবার পাঁচ দিনের মত থাকতে হয়েছিল। প্রতিবার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা বলেছেন বয়সজনিত কারণে এই অসুস্থতা এবং জটিল কোনো শারীরিক সমস্যা আম্মার নেই। এবারও আমরা প্রত্যাশা করেছি সন্ধ্যার আগেই আম্মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবো যেহেতু দুই দিন আগেই নর্থশোর ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল থেকে তাকে সুস্থ মানুষ হিসেবে রিলিজ করেছে।
আম্মাকে জরুরি বিভাগে নেয়ার সাথে সাথেই যথারীতি আইভি ফ্লুইড ও অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া শুরু হলো, পাশাপাশি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে লাগল। ২০-২৫ মিনিট পর ডা. লেকার নামক চিকিৎসক আমার সাথে কথা বলতে এলেন। তিনি প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন রোগিনী আমার কি হন। আমি বললাম তিনি আমার মা। পরে জিজ্ঞেস করলেন তোমার কি আর কোনো নিকটাত্মীয় এখানে আছেন? আমি বললাম হ্যাঁ আমার বোন আছেন। ডা. লেকার বললেন তাকে কি একটু ডাকা যাবে আমি তোমাদের দুজনের সাথেই কথা বলতে চাই। চিকিৎসকের কথা বলার ঢঙ এবং চিন্তিত আচরণে আমার একটু খটকা লাগল।
বুকের ভেতরটা এক অজানা শংকায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল। আগেই বলেছি এই হাসপাতালে আম্মাকে নিয়ে আমি ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার এসেছি কিন্তু এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে আমি ছোট আপাকে ডাকলাম। ডা. লেকার খুব শান্ত গলায় বিনয়ের সাথে জানালেন যে আম্মার শারীরিক অবস্থা বেশ কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে আছে এবং যদি কোনো কারণে তাঁর হার্ট অচল হয়ে যায় তবে কি আমরা তাকে সিপিআর-(C.P.R- Cardiopulmonary Resuscitation) এর মাধ্যমে হার্ট সচল রাখার পদ্ধতি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক কি না এবং তাকে ভেন্টিলেশনে নেয়ার প্রয়োজন পড়লে আমরা তাতে রাজি কি না? শান্ত সৌম্য চেহারার ডাক্তারের মুখে এমন নিষ্ঠুর কথাবার্তা বড্ড বেমানান ঠেকছিল যদিও সে পেশাদার চিকিৎসকের ভ‚মিকা যথাযথভাবে পালন করত এই কথাগুলো বলে যাচ্ছিল কিন্তু মায়ের প্রতি আমার আবেগ সেই বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
সে আরও কিছু বলার চেষ্টা করার পূর্বেই আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম ‘আমার মাকে বাঁচানোর জন্য যা কিছু করা দরকার তোমরা তাই কর আমাদের কোনো আপত্তি নেই কিন্তু আমার মা যেন বেঁচে থাকেন’। ডাক্তারের কথা শুনে আমার ছোট আপা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। প্রথমে একজন আম্মার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত করে বলেন যে তার মেজেন্টেরিক স্কিমিয়া (Mesenteric ischemia) হয়েছে এবং তা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এমন অবস্থায় তাদের হাতে দুটি অপশন খোলা আছে। এক তার ব্যথাহীন শান্তিময় অবস্থানের ব্যবস্থা করত তার মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করা এবং আরেকটি হচ্ছে অপারেশন করা যদিও সেই অপারেশনের সফল হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা মাত্র ১০ ভাগ। কারণ হিসেবে তার বয়স এবং হঠাৎ করে হার্ট, কিডনির দুর্বল অবস্থা, ব্লাড প্রেশার ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অস্বাভাবিক উঠানামার বিষয়টি উল্লেখ করেন। আমি অস্থির ভাবে তাদের বলি যে আমার মায়ের হার্ট,কিডনি, ফুসফুস বরাবর সুস্থ ও সবল ছিল এমনকি দুই দিন আগেও তোমাদের প্রধান হাসপাতাল থেকে সুস্থ বলে ছাড়পত্র দিয়েছে।
তোমরা সেই রিপোর্টগুলো দেখ। জবাবে সেই চিকিৎসক জানান যে তারা পুরনো রিপোর্ট সবগুলো দেখেছে এবং সেখানে এমন কিছু পাওয়া যায়নি। আমি বারবার তাদের প্রশ্ন করি যে হঠাৎ এমন কি হলো যে আমার মা আজ জীবন মৃত্যুর মুখোমুখি!!। চিকিৎসক জানালেন এমনটি হতে পারে। আমি ফোনে আমার বড় ভাইকে পরিস্থিতি জানালাম এবং বড় ভাই মতামত দিলেন যে আমরা একটা চান্স নিতে চাই অপারেশনের মাধ্যমে। তিনি বললেন ডাক্তারদের সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে এবং তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে আসছেন বলে ফোন রেখে দেন। আমি ডাক্তারকে বললাম যে আমরা অপারেশন করাতে চাই এবং উপরে খোদা ও নিচে তোমাদের সেফ হ্যান্ডের উপর ভরসা রেখে একটি সুযোগ নিতে চাই। আমার কথা শুনে ছোট আপা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন যেখানে অস্ত্রপাচারের সফলতার সম্ভাবনা মাত্র ১০ ভাগ সেখানে আম্মাকে শেষ মুহূর্তে কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না, তা ছাড়া অস্ত্রপাচারের সময় অপারেশন টেবিলেও আম্মা মারা যেতে পারেন বলে ডাক্তাররা আশংকা প্রকাশ করছেন, সেখানে আম্মার শরীর কাঁটা ছেঁড়া করা ঠিক হবে না। ডাক্তাররা আমাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন- কোনো অসুবিধা নেই, তোমরা আরও সময় নিয়ে ভাব এবং সিদ্বান্ত নাও- আমরা অপেক্ষমাণ রইলাম তোমাদের সিদ্বান্তের জন্য।
এই জীবনে বহু চ্যালেঞ্জিং কাজে সিদ্ধান্ত নিয়েছি দ্রুতগতিতে, অনেক বিরূপ ও বৈরী পরিবেশ-পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপণ বা দ্বিধা করিনি কখনও কিন্তু আজকের মত কঠিন ও দুর্বোধ্য সময় মনে হয় আমার জীবনে কখনও আসেনি। গর্ভধারিণী মায়ের জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যে কি দুর্বিষহ কঠিন কাজ তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে।
ইতোমধ্যে ছোট আপা বড় ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলে ভাইয়ের আগের মতামতে পরিবর্তন আনেন অর্থাৎ বড় ভাই বলেছিলেন শেষ চেষ্টা ও সুযোগটুকু তিনিও নিতে চান আম্মার জীবন রক্ষায়-কিন্তু এখন তিনি ছোট আপার যুক্তিতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। আমি পুনরায় ডাক্তারদের সাথে পরামর্শে লিপ্ত হই আম্মার পাকস্থলীতে অস্ত্রপাচারের ব্যাপারে। তাদের কথাবার্তায় বোঝা গেল তারাও যেন পরোক্ষভাবে চাইছে অস্ত্রপাচারে না গিয়ে আম্মাকে সর্বোচ্চ প্রশান্তি নিয়ে চিরনিদ্রাযাপনের সুযোগ দেয়ার পক্ষে। অবশেষে তাই মেনে নিলাম অর্থাৎ অস্ত্রপাচারের সুযোগ না নিয়ে আম্মাকে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে সঁপে দিলাম আল্লাহর অলৌকিক করুণা লাভের আশায়। কিছুক্ষণ পর প্যালিয়াটিভ (Palliative) মেডিসিনের ডাক্তার হার্নান্দাজ এসে আমাদের সান্ত¦না দিয়ে পরোক্ষভাবে বোঝাতে চাইলেন যে এই সিদ্ধান্তটিই সঠিক হয়েছে।
অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা যদি অনুমতি দাও তবে তোমাদের মাকে হসপিস (Hospice unit) ইউনিটে স্থানান্তর করতে পারি যেখানে তার জীবিতকালীন অবস্থায় সর্বোচ্চ কমফোর্ট নিশ্চিত করা হবে বিশেষ সেবাদানের মাধ্যমে এবং হাসপাতাল সেবাকর্মীদের পাশাপাশি সোশ্যাল ওয়ার্কাররাও বিশেষ সেবা প্রদান করবে। সেই সাথে তিনি পরামর্শ দিলেন যে হসপিস ইউনিটে সকল নিকট আত্মীয়রা যেন এসে আম্মার সাথে আনন্দময় সুখের কথাবার্তা বলেন।
আম্মা সব কিছু শুনতে পাবেন এবং বুঝতে পারবেন যদিও তিনি কিছু বলতে পারবেন না। তাতে শেষ সময়ে ভালো অনুভূতি নিয়ে তিনি সবার মাঝ থেকে বিদায় নিতে পারবেন। বিনয়ী ডা. হার্নান্দাজের বিনম্র শব্দ চয়নগুলোও আমার অস্থিরতাকে বিন্দুমাত্র স্বস্তি দিতে পারেনি। আমি শুধু ভাবছিলাম কি এমন ঘটে গেল, কেমন করে ঘটে গেল যার প্রতিকার বিশ্বের এক নম্বর দেশের অতি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান দিতে পারছে না। আমি ডা. হার্নান্দাজকে জিজ্ঞেস করলাম এই ব্যবস্থায় আমার মা আনুমানিক কতদিন বেঁচে থাকতে পারেন? উত্তরে তিনি বলেন মে বি তিন দিন, এক সপ্তাহ, এক মাস, কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমি অস্থিরভাবে আবার জিজ্ঞেস করলাম এর মাঝে কি কোনো মিরাকেল ঘটতে পারে!! তিনি সান্ত¦না সূচক হাসি দিয়ে বললেন মিরাকেল তো যেকোনো সময় যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে।
১১ জুলাই সন্ধ্যায় আম্মাকে হাসপাতালের চার তলায় হসপিস ইউনিটের ৪১৫ নম্বর কেবিনে স্থানান্তর করা হলো। ছোট আপা আম্মার শিয়রে বসে পবিত্র কুরআন থেকে তেলওয়াত করতে শুরু করেন।
রাত্রি ১০টায় সকলকে বিদায় জানিয়ে আমি আম্মার পাশে বসে থাকলাম। আম্মা শব্দ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। মাঝে মধ্যে শরীর ঝাঁকুনি দিলে বুঝতে পারি তিনি ব্যথা অনুভব করছেন তখন সঙ্গে সঙ্গে নার্স এসে ব্যথানাশক ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করছিল। প্রথম রাতে আম্মার ডিউটি নার্স ছিল চীনা বংশোদ্ভূত মেয়ে অলিভিয়া কিম। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম আমার মা কি এই অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারেন? তোমার এই হসপিস ইউনিটে কাজের অভিজ্ঞতায় কি এমন কিছু দেখেছ? আমি তার কাছ থেকে একটু পজিটিভ উত্তর আশা করছিলাম, আমি চাইছিলাম সত্যি না হোক অন্তত মিথ্যে করে হলেও একটু আশার বাণী যেন সে শোনায়, কিন্তু সুকঠিন পেশাদারিত্ব বজায় রেখে অত্যন্ত নম্রস্বরে বিনয়ের সাথে অলিভিয়া বলল- ‘নট রিয়েলি’। আমি পরক্ষণেই জানতে চাইলাম তাহলে কি আমার মা এভাবেই শুয়ে থাকবেন,আর কি কোনো কিছুই করার নেই? সে বলল এভাবেই অপেক্ষা করতে হবে তার প্রশান্তিময় বিদায় পর্যন্ত।
মনে মনে শুধু বললাম ‘উফফ অলিভিয়া এমন হৃদয় বিদারক উচ্চারণ করতে কি তোমার হৃদয় একটুও কাঁপলো না’!! আমাকে অপেক্ষা করতে হবে আমার মায়ের চির বিদায়ের মুহূর্তটির জন্য! অপেক্ষা বাঁ প্রতীক্ষা শব্দটির সাথে বাস্তবিকভাবেই আমি বহুল পরিচিত। স্কুল-কলেজের পরীক্ষার ফলাফলের জন্য নির্ভারভাবে প্রতীক্ষা করেছি, চাকরির নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলের জন্য প্রতীক্ষায় থেকে তার অবসান কামনা করেছি এবং সেই প্রতীক্ষারও অবসান ঘটেছে, প্রশিক্ষণকালীন দানবীয় কষ্টের দিনগুলোতে প্রতীক্ষায় থেকেছি এই সীমাহীন কষ্টের অবসান হোক নয়তো প্রয়োজনে মর্যাদাশীল চাকরি ছেড়ে পাড়ার মোড়ে পান বিড়ির দোকান খুলে বসব তবুও প্রতীক্ষার অবসান হোক। সেই কষ্টকর প্রতীক্ষারও অবসান ঘটেছে কিন্তু আজ কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি আমার এই প্রতীক্ষার যেন শেষ না হয়, এই প্রতীক্ষা যেন অনন্তকাল ধরে চলে- অন্তত আমার মৃত্যু পর্যন্ত এই প্রতীক্ষার প্রহর প্রলম্বিত হোক, তবুও আমার মা বেঁচে থাক। এভাবে বিছানায় পড়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকুক, মাঝে মধ্যে ব্যথায় শরীর কুঁকড়ে গেলে ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োগ করা হবে তবুও তিনি বেঁচে থাকুক। খাবার টেবিলে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে মাছ/মাংসের বড় টুকরোটা আমার পাতে আর তুলে না দিতে পারুক ক্ষতি নেই, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দরুদ পড়ে ফু না দিতে পারলেও ক্ষতি নেই- তবুও বেঁচে থাকুক মা আমার।
রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফুটে উঠল চার দিকে। আরেকটি নতুন দিনের শুরু হলো। এমনি করে নতুন ভোর আসুক বারবার আম্মার জীবনে সেটাই চোখ বুঝে প্রার্থনা করছিলাম পরম করুণাময়ের কাছে। এমন সময় আম্মার সেবায় নিবেদিত পিসিএ (PCA-Personal Care Associate) কৃষ্ণাঙ্গ নারী জেনাভু এসে বলল ‘গুড মর্নিং’। আমিও গুড মর্নিং বলে জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছ? ভালো আছি- তোমাকে ধন্যবাদ। অতঃপর আম্মার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল উনি তোমার কি হোন? তোমাকে সারারাত বসে থাকতে দেখেছি তার পাশে। এমন চমৎকার, বিরল ও অভাবনীয় দৃশ্য আমি আগে কখনও দেখিনি। আমি তাকে জানালাম বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটি আমার মা-আমার গর্ভধারিণী। আমাদের দেশে অসুস্থ আপনজনদের পাশে থেকে তাদের নিকটাত্মীয়রা এভাবেই সঙ্গ দেয়। জেনাভু জিজ্ঞেস করল আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। তাকে বললাম বাংলাদেশ। উত্তরে সে বলল বাহ, বাংলাদেশের মানুষ বেশ চমৎকার! আমি মাথা নেড়ে তার কথায় সায় দিলাম।
১২ জুলাই সকালে ভাইবোনেরা আম্মাকে দেখতে গেলেন। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহর থেকে আমাদের ভাগ্নে ইঞ্জিনিয়ার রাজীব গত ৫ আগস্ট রাতে বাসে চড়ে সকালে সরাসরি তার নানীকে দেখতে হাসপাতালে এসে হাজির হয়। গত বছর রাজীব তার নতুন বাড়ি উদ্বোধনের জন্য আম্মাকে নিমন্ত্রণ করে কানাডা নিয়ে গিয়েছিলেন।
এখন থেকে ঠিক এক বছর আগে আম্মা তার নাতি রাজীবের বাড়ি উদ্বোধনের পরে বাড়ির পেছনের বাগানে একটি গোলাপের চারা রোপণ করেন। সেই গাছে এখন গোলাপ ফোটে। রাজীবের স্মৃতিকে সেইসব তরতাজা মধুর ঘটনাগুলো ভীষণভাবে নাড়া দিচ্ছিল। আম্মা তখনও শব্দ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিলেন। চোখ বন্ধ করে। তিনি এক রকম ঘোরের মধ্যে দিয়ে যেন মৃত্যুর শীতলতা স্পর্শ করতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ছোট আপা আমাকে বাসায় ফিরে একটু ঘুমুতে বলেন কেননা রাতে আবার আম্মার কাছে থাকতে হবে। সকাল ১০টায় বাসায় ফিরে আসি। নিজের শরীরটাকেও তখন মনে হচ্ছিল এক মস্ত বড় বোঝা-সঠিকভাবে বয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল যেন। সারাক্ষন ভাবছিলাম যে মানুষটিকে দুই দিন আগে হাসপাতালের ডাক্তাররা সুস্থ করে বাসায় ফেরার ছাড়পত্র দিলো সেই মানুষটির শারীরিক অবস্থা আজ এই পর্যায়ে কিভাবে চলে গেল। এলোমেলো বিক্ষিপ্ত ভাবনায় মন ছেয়ে যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দেখি ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন কিংবা রোগী মারা গেছেন। আমেরিকার ডাক্তাররাও মানুষ, তারা কোনো দৈব শক্তি বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী কেউ নন, তাদেরও ভুল হতে পারে এবং মাঝে মধ্যে যে ভুল হয় না তা নয়। আমি বুঝতে পারছিলাম যে এখানকার ডাক্তার বাঁ চিকিৎসা পদ্ধতির বিষয়ে আমার ঈমান অনেকটা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে যদিও সেটা মূলত অন্ধ আবেগের কারণে যা কোনো যুক্তি মানতে চাচ্ছিল না। সারাক্ষণ ভাবছিলাম আম্মার বিষয়টা ক্রস চেক করা যায় কিভাবে। হাসপাতালের ডাক্তারদের বহুভাবে প্রবল প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছি আমি ও আমার ছোট আপা নুরুন চৌধুরী লাকি। তারা অত্যন্ত ধর্য সহকারে আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে বটে তবে তাদের মোদ্দা কথা হলো এই মুহূর্তে তাদের প্রস্তাবিত ও গৃহীত ব্যবস্থার বিকল্প অন্য কিছু নেই যদি না অলৌকিক কিছু ঘটে। আমার মনে তবুও ডাক্তারদের বক্তব্যের বিষয়ে আরও সুনিশ্চিত হওয়ার ক্ষুধাটি রয়েই যায়।
সারারাত জেগে সকালে বাসায় ফিরে আর ঘুম আসে না। বিকেল বেলায় মনে পড়ে ডা. মাসুদ ভাই, শামীম ভাই, মুজিব ভাই ও হাবিব ভাইয়ের কথা। উনারা প্রত্যেকেই নিউইয়র্কের নামিদামি হাসপাতালগুলোতে প্রতিষ্ঠিত ও প্রথিতযশা চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।
স্বল্পদিনের পরিচয় কিন্তু তাদের উদারতা ও আন্তরিকতা দেখে মনে হয়েছে যেন আমরা একে অপরকে বহুযুগ ধরে চিনি।এই প্রবাসে এইসব গুণী ও পরোপোকারী মানুষদের সান্নিধ্য আমার জীবনে একটি চমৎকার প্রাপ্তি।
আমি ফোনে ডা. শামীমকে পাই। তিনি নিউইয়র্কের বেলভু হাসপাতালে কর্মরত আছেন। চমৎকার পরোপকারী মানুষ। আমি তাকে আম্মার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ননা করে আমার আশংকার কথা ব্যক্ত করি। তিনি সবকিছু শুনে বলেন এই ব্যাপারে উনি বিশেষজ্ঞ নন তবে ডাক্তার মুজিবের সাথে কথা বলে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি আমাকে জানাবেন। সারাদিন এ দিক সে দিক ছোটোছুটির পর রাত ১০টায় আমি ১০২-০১, ৬৬ নং রোড ফরেস্ট হিল নিউইয়র্ক-১১৩৭৫ এ অবস্থিত হাসপাতালের ৪১৫ নম্বর কক্ষে আম্মার কাছে যাই। তিনি তখনও আগের মতোই হালকা শব্দ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। রাতের গভীরতার সাথে সাথে চার দিকের পরিবেশ অনেকটা নীরব হতে লাগল। ঘরটির বড় কাচের জানালা দিয়ে আশপাশের ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। ইহুদি অধ্যুষিত এই এলাকাটি শহরের মধ্যে বেশ সাজানো, গোছানো, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি একটি স্থান। বাইরের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আম্মার দিকে তাকাই। ঘরে শুধু আমি আর আমার গর্ভধারিণী মা। তিনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। আজ ডিউটি নার্স হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন অলিভিয়া কিম। সে এসে আমাকে জানালো যে ডাক্তার আম্মার জন্য ব্যথানাশক ইঞ্জেকশনের ডোজ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললাম যা কিছু প্রয়োজন তোমরা কর কেবল একটি বিষয় নিশ্চিত কর যেন আমার মা সম্পূর্ণ ব্যথাবিহীন আরামদায়ক অবস্থায় থাকেন। অলিভিয়া মাথা নেড়ে বলল- আমরা সেটাই করছি।
কিছুক্ষণ পরপর আমার তন্দ্রার মতো লাগতে থাকে তাই বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করি।
১৩ জুলাই সকাল ৮টায় আমি ডা. শামীমকে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা প্রেরণ করে গতকালের আলোচনার অগ্রগতি জানতে চাই। তিনি সাথে সাথে ফোন করে বলেন যে ডা. মুজিব আজ সকালে একটি বিশেষ কাজে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশ্যে ফ্লাই করেছেন কাজেই আমি বেলা ১১টায় আমাদের আরেকজন ঘনিষ্ঠ মানুষ ডা. টিংকু ভাইয়ের সাথে আপনিসহ টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা করব। টিংকু ভাই ম্যানহাটান সার্জিক্যাল হাসপাতালে কর্মরত। উনার সাথে বিস্তারিত আলোচনা করলে উনি সঠিক দিকনির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। ডা. শামীম আমাকে বললেন আমি যেন ওই সময় আমার ফোনটা ফ্রি রাখি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ডা. শামীম চেষ্টা করেও ওই সময় আমার ফোনে সংযোগ করতে পারেননি। দুপুর ১২টায় উনি আমাকে ফোনে পেয়ে বললেন যে ডা. টিংকুকে লাইনে এনে তিনি অনেকবার চেষ্টা করেছেন আমার সাথে সংযোগ করার জন্য কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। এখন ডা. টিংকু অপারেশন থিয়েটারে এবং বের হবেন বিকেল ৪টায়, তখন তিনি আবার চেষ্টা করবেন আমার সাথে যোগাযোগের। পাশাপাশি তিনি পরামর্শ দিলেন এনেস্থিওলজিস্ট ডা. মাসুদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য যার সাথে অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরিচয় ও সখ্যতা রয়েছে এবং তিনিও ডা. মাসুদকে বিষয়টি অবগত করবেন বলে আমাকে আশ্বাস দিলেন। আমি ডা. মাসুদকে ফোনে খুদে বার্তা প্রেরন করার কিছুক্ষণের মধ্যেই উনি আমাকে ফোন করলেন। আমার কাছে বিস্তারিত ঘটনা শোনার পর উনি বললেন আপনি এই মুহূর্তে আমার বন্ধু ডা. হাবিবকে ফোন করুন।
খালাম্মার এই অসুস্থতাজনিত বিষয়ে হি ইজ দা রাইট পার্সন টু ডিটারমিন দা নেক্সট কোর্স অব একশন। ডা. হাবিব যদি মনে করেন যে খালাম্মার সার্ভাইভেলের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র সুযোগ আছে তবে খালাম্মাকে যেই হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়বে আমরা সেই হাসপাতালে নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তাকে সুস্থ করার জন্য। আপনি মন শক্ত রাখুন এবং এক্ষুণি ডা. হাবিবকে বিস্তারিত জানান।
ডা. মাসুদের কথাগুলো যেন আমার বিগত কয়েকদিনের নির্ঘুম রাত্রির ক্লান্তিনাশক টনিকের মত কাজ করল, তার আন্তরিক ও সহযোগিতামূলক কথাগুলো বেশ ভালো লাগলো।
এখানে ডাক্তারদেরকে ছুটির দিনেও বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়,কাজেই তাদের সরাসরি ফোন করাটা আমার কাছে সমুচিত মনে হয় না কখনও আর তাই আমি ডা. হাবিবকেও প্রথমে খুদে বার্তা প্রেরণ করে জিজ্ঞেস করি যে আমরা কি এখন ফোনে জরুরি একটি বিষয়ে কথা বলতে পারি? ডা. হাবিব সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করলেন। কয়েক সেকেন্ড পরস্পর পরস্পরের সাথে কুশল বিনিময় করে আম্মার ব্যাপারে তাকে বিস্তারিত অবগত করি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আম্মাকে আইসিইউ তে নেয়া হয়েছে কি না? উত্তরে না বলতেই তিনি বলেন যে এই ধরনের রোগীকে তো সাধারণত আইসিইউ তে রাখার কথা। তার কথা শুনে আমার মনে হতাশার মাঝেও কিছুটা আশার আলো যেন জ্বলে উঠল অর্থাৎ আমার ভেতরে যে শংকা ও সংশয় কাজ করছিল আম্মার চিকিৎসা নিয়ে তা যেন সত্যি মনে হতে লাগল। পরক্ষণেই উনি বললেন যে আপনার বর্ণনার উপর ভিত্তি করে অবশ্য কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আপনি কি আমাকে খালাম্মার রিপোর্টগুলো ই-মেইলে পাঠাতে পারবেন? আগামী ১ ঘণ্টার মধ্যে পাঠাতে পারলে ভালো হয় কেননা তারপর আমি একজনের জানাজায় অংশগ্রহণ করব। আমি তাকে জানালাম যে আমি এখন বাসায় আছি তবে এই মুহূর্তে আবার হাসপাতালে যাচ্ছি রিপোর্টগুলো আপনার কাছে প্রেরণের জন্য এবং তা ১ ঘণ্টার আগেই হবে ইনশা আল্লাহ। তার সাথে কথা শেষে আমি দৌড়ে গাড়ির কাছে গেলাম। গাড়ি স্টার্ট দেয়ার পূর্বেই ছোট আপাকে ফোন করে বললাম ফ্রন্ট ডেস্কের নার্সিং সুপারভাইজার যেন ডিউটি ডাক্তারের সাথে কথা বলে আম্মার সব রিপোর্টগুলো আপনার কাছে হস্তান্তর করে এবং এই কাজটি খুব দ্রুততার সাথে করতে হবে এবং তা হতে হবে আমি হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই। ছোট আপা জিজ্ঞেস করল তুই কি একটুও ঘুমোবি না? ঘুম বা বিশ্রাম এখন খুবই তুচ্ছ ব্যাপার বলে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। হাসপাতালে পৌঁছেই দেখি আমার সেজ ভাবী মিনারা চৌধুরী সমস্ত রিপোর্ট সমেত একটি ফাইল নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ফাইল খুলেতো আমার আক্কেল গুড়ুম। মোট ৪১ পৃষ্ঠার রিপোর্ট। আমি এখন কোনটা রেখে কোনটা পাঠাব ডা. হাবিবের কাছে। ডিউটি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম পাকস্থলীর সিটি স্ক্যান রিপোর্ট কোনটি? উত্তরে সে জানায় ‘এটার উত্তর দেয়ার জন্য আমি সঠিক ব্যক্তি নই, এই ব্যাপারে তুমি ডিউটি ডাক্তারের সাথে কথা বলতে পার’। ডিউটি ডাক্তারের খোঁজ করে জানা যায় তার নাম ডা. পার্ত এবং তিনি এখন রাউন্ডে আছেন। সময় দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে, এক একটি মুহূর্ত তখন অতি মূল্যবান। আমি কালক্ষেপণ না করে অনেকটা আন্দাজের উপর চার পাতার দুইটি রিপোর্ট ডা. হাবিবকে ই-মেইল করি। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরে ডা. হাবিব ফোন করে জানায় যে রিপোর্টগুলো তিনি দেখতে চাচ্ছেন সেই রিপোর্টগুলো আমি পাঠাতে পারিনি। আমার অজ্ঞতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন যে যিনি আমার আম্মার দেখভালের জন্য মূল দায়িত্বে আছেন সেই ডাক্তারকে তার ফোন নম্বর দিয়ে যেন অনুরোধ করি তাকে ফোন করার জন্য। আমি হাসপাতালের ফোনের মাধ্যমে ডা. গুইসেলা হার্নান্দাজের সাথে যোগাযোগ করে ডা. হাবিবের ফোন নম্বর দিয়ে তাকে অনুরোধ করি যেন আগামী ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে তাকে ফোন করেন এবং ফোন করার কারণ হিসেবে তাকে বললাম যে ডা. হাবিব আমার মায়ের শারীরিক সমস্যা এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। ডা. হার্নান্দাজ সানন্দে তার ফোন নম্বর লিখে নিলেন এবং আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি এক্ষুণি ডা. হাবিবের সাথে কথা বলবেন। আমি তাৎক্ষণিক ডা. হাবিবকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে অনুরোধ করি তিনি যেন ডা. হার্নান্দাজের ফোন রিসিভ করেন।
মিনিট ১৫ পরে ডা. হাবিব ফোন করে আমাকে জানান যে ডা. হার্নান্দাজের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে বুঝতে পারলাম হাসপাতালের চিকিৎসকরা সঠিক পথেই আছেন।
তার পালস রেট, রক্তচাপ, শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তার চিরপ্রস্থানের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সার্জারি অপশন আশানুরূপ ফল দিতে পারবে না বরং রোগীর কষ্ট হবে এমনকি অপারেশন চলাকালীন সময়েও রোগী কলাপ্স করতে পারেন। তার বলা কথাগুলো এবং হাসপাতালের চিকিৎসকদের কথা আমি ১১ জুলাই থেকে যৌক্তিক বলে মেনে নিলেও আবেগ ও মায়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে একটা কিছু চমকের প্রত্যাশা করছিলাম মনে প্রানে যা এই পৃথিবীর যেকোনো সন্তানই মায়ের জন্য কামনা করবে।
১৩ জুলাই রাত ১০টায় বাসায় ফিরে আসি রাতের খাবার ও ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে আবার হাসপাতালে আম্মার কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। রাজীবকে হাসপাতালে রেখে আমরা ভাই বোনেরা বাসায় ফিরে আসার সময় রাজীব আমাকে বলল মামা তুমি আজ রাতে না এসে বাসায় বিশ্রাম কর, আজ রাতে আমিই নানীর পাশে থাকব কিংবা যদি আসতেই চাও তাহলে রাত ১টা ২টায এসো-ততক্ষণে তুমি একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। আমি বাসায় ফিরে সামান্য কিছু খেয়ে অস্থিরভাবে পায়চারী করছিলাম। শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করছি কিন্তু বিছানায় গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। রাত ১১টায় আমি গাড়ি চালিয়ে আবার হাসপাতাল কমপ্লেক্সের কাছে যাই এবং প্রায় ১০ মিনিটের মত ঘোরাঘুরির পর গাড়ির পার্কিং পাই।
এমন সময় আমার খুব কাছের মানুষ, বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষী মঞ্জু ভাই ফোন করলেন। তার সাথে কথা বলতে বলতেই আম্মার কেবিনে পৌঁছুলাম। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে আমি আম্মার পাশে এসে দাঁড়াই।
রাজীব কিছুটা অভিমানের সুরে বলল মামা তুমি এখন কেন এসেছ, তোমাকে না বললাম না আসতে কিংবা বিশ্রাম নিয়ে আরও পরে আসতে!! আম্মার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভীষন শান্ত সৌম্যভাবে ঘুমিয়ে আছেন আমার মা, শ্বাস-প্রশ্বাস আগের মতো দ্রুত ও শব্দময় নয়। রাজীব আমাকে জোড় করতে লাগল আমি যেন বাসায় ফিরে যাই এবং সকাল বেলায় ফিরে আসি। আমি ছোট আপাকে ফোন করে রাজীবের কথা জানালে তিনি বলেন তুই থাক বরং রাজীবকে বাসায় পাঠিয়ে দে। কথা শেষে আমি রাজীবকে বাসায় যাওয়ার কথা বলে আম্মার দিকে তাকিয়ে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যাই। আম্মা একেবারে স্থির হয়ে শুয়ে আছেন। পৃথিবীর সমস্ত মায়ার আবেশ যেন তার মুখের উপর ভর করেছে।
আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনার জন্য তার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ি। আমি হাত দিয়ে তার নাকের কাছে শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচল টের পাওয়ার চেষ্টা করি। আমার ভেতরটা অদ্ভুত রকমের মোচড় দিয়ে ওঠে। সেদিন রাতে ডিউটি নার্স ছিল বিয়াংকা নামের এক তরুণী। আমি রাজীবকে বললাম নার্সকে ডাকতে। তখন রাত ১১টা ৪৫ মিনিট। বিয়াংকা এসে আম্মার নাড়ি পরীক্ষা করে বলেন ‘Sorry, She is no more’. তার কথাটা শুনে আমি আম্মার ডান হাতটা চেপে ধরি, আমি তাকে বলি যে আমার মায়ের শরীর এখনও গরম, উনি বেঁচে আছেন। বিয়াংকা দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে পুনরায় বলে এই কিছুক্ষণ আগে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমি ডিউটি ডাক্তারকে আসতে বলছি।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান যে সত্যি আম্মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমি নিশ্চুপ, নিস্তব্দতায় আম্মার হাত ধরে বসে থাকি। অদ্ভুত এক মমত্ববোধ নিয়ে জন্ম নেয়া মানুষটি আজ নিঃশব্দে নীরবে অনন্তের পথের যাত্রী হয়ে গেল, বেঁচে থাকতে যার কারও প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল না কোনো চাহিদা। আমি হালকা স্বরে আম্মা আম্মা বলে ডাকলাম। হঠাৎ দেখি আম্মার বিছানাটা একটু নড়ে উঠল। আমি সাথে সাথে বিয়াংকাকে ডেকে বিষয়টি জানাতে সে দৌড়ে এসে আবার আম্মার নাড়ি পরীক্ষা করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ নাড়িতে হাত রেখে বিয়াংকার ভুরু ও কপালের চামড়া কুঁচকে গেল। তাকেও বেশ বিভ্রান্ত মনে হচ্ছিল। আমার হঠাৎ মনে পড়ল সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝে মধ্যে বিভিন্ন খবরে দেখা যায় যে ডাক্তারের ঘোষিত মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানোর সময় সে জেগে উঠেছে কিংবা কবরস্থ করার সময়ও জেগে উঠেছে অর্থাৎ সত্যিকার অর্থে ওই মানুষটি হয়তো মারা যায়নি কিন্তু তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। এই সমস্ত অদ্ভুত চিন্তাগুলো খুব দ্রুত মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। বিয়াংকার অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন তার হাতের অনুভূতির ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছিল না আর তাই স্টেথিস্কোপ কানে লাগিয়ে পুনরায় পরীক্ষা শুরু করেন। আমি আম্মার ডান হাত ধরে তার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে থাকি। বিয়াংকার কপালে একধরনের চিন্তার বলিরেখা দেখে নিভু নিভু আশার প্রদীপ আমার সমস্ত স্বত্তায় প্রজ্বলিত হয়ে পুনরায় দপ করে নিভে গেল যখন বিয়াংকা জানালো আম্মা সত্যি সত্যি তার অনন্তলোকে যাত্রার প্রস্তুতি শেষ করেছেন।
আম্মার নিথর নিস্তব্দ সদা হাস্যোজ্জ্বল ফর্সা মুখটির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে আমি সুদূর শৈশবে ফিরে গেলাম। স্কুলের পোশাক পরিয়ে মাথার চুল আচরে দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন ‘মন দিয়ে ক্লাস করবে তাহলে তোমার জন্য তোমার প্রিয় পোলাও, গরুর মাংসের ভুনা আর ডিমের দো-পেয়াজা রান্না করে রাখব’। ক্লাসে কি আর মন বসে!
নাকের কাছে আম্মার সুস্বাদু খাবারের গন্ধ ভাসতে থাকে সারাক্ষণ। ক্লাসে বসে কেবল ভাবি কখন দপ্তরি কাকা ঢং ঢং করে ছুটির ঘণ্টা বাজাবে আর আমি এক ছুটে বাড়ি গিয়ে আম্মার নিজ হাতে রান্না করা পোলাও মাংস খাবো!
আজ ১৩ জুলাই ২০১৯ সাল রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে সবচেয়ে বড় স্কুলের সবচেয়ে শক্তিশালী দপ্তরি যেন অন্য রকম ছুটির ঘণ্টা বাজালো, যে ঘণ্টা শুনে মা আমার পৃথিবী নামক এই স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য এক জগতে। আচ্ছা আম্মা কি ওপারে আমার জন্য পোলাও, গরুর মাংস ভুনা আর ডিমের দো-পেয়াজা রান্না করে অপেক্ষা করবেন! কখন বাজবে আমার ছুটির ঘণ্টা! আমি সেই শৈশবের মতো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এই স্কুল থেকে এক ছুটে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলব- আম্মা ক্ষুধা পেয়েছে !!!
-নিউ ইয়র্ক।