ঘুরছে শনি উড়ছে টাকা

ফের জঙ্গি : আরেকটি স্যাংশন গুঞ্জন

বিশেষ প্রতিনিধি : হলিউড স্টাইলে পুলিশকে ঘুষি ও চোখে স্প্রে ছুড়ে পুরান ঢাকার কোলাহলমুখর আদালত চত্বর থেকে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অন্যতম গরম খবর। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় নিউজ ভ্যালু পাওয়ার মতোই ঘটনা। ছিনিয়ে নেওয়া জঙ্গি শামীম ও সোহেল আলোচিত জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক মার্কিন নাগরিক ফয়সল আরেফিন দীপন এবং ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। জঙ্গি নেতা বরখাস্ত মেজর জিয়া এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড বলে দাবি পুলিশের। রেড অ্যালার্ট জারি, ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা, ৫ পুলিশ বরখাস্তসহ এ নিয়ে তোলপাড়।
পশ্চিমা শক্তির সমর্থন আদায়, মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি আড়াল, র‌্যাবকে আবার যৌক্তিকভাবে ক্রসফায়ারে নামানোসহ মোক্ষম কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার আবার জঙ্গি নাটক সাজাবে- এমন একটি শঙ্কাজনক আভাসের মধ্যেই এ ঘটনা। এটি বিভিন্ন শক্তিকে মাঠে উসকে দিয়ে আবার নিয়ন্ত্রণের নামে নানা প্রাণসংহারী কাজের ফন্দি বলে প্রচারও আছে। এর সুফল-কুফল কার ঘরে যাবে অপেক্ষা করে দেখার বিষয়। ফার্স্ট রাউন্ডে দৃশ্যত সরকারই এর সুবিধাভোগী। জঙ্গি খোঁজাখুঁজি, তল্লাশি, মামলা, ধরপাকড়ে নতুন করে ফাঁপরে ফেলেছে বিরোধী দলকে। র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নেমে গেছে সারা দেশে। র‌্যাবের উপযোগিতা নতুন করে সামনে আনা হয়েছে। সামনে আবার কিছু ক্রসফায়ার করা লাগতে পারে। এতে আরো কাহিল করা যাবে বিরোধী দলকে। এ মিশন ঠিকভাবে এগিয়ে নিতে না পারলে হিতে বিপরীত হয়ে চরম মাশুল দিতে হবে সরকারকে। এবার আর কেবল র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তা নয়, গোটা সরকারই পড়ে যেতে পারে স্যাংশন ধাঁচের বিপদে।
সরকারের একতরফা খেলার সুযোগ কমে এসেছে। বিরোধী দলও কম যাচ্ছে না। বিশেষ করে, ফরেন কানেকশন তথা কূটমিশনে তারাও এগোচ্ছে সরকারের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে। ক্ষেত্রবিশেষে এগিয়েও থাকছে। করোনা মহামারির পর বিশ্বব্যাপী চলমান স্নায়ুযুদ্ধের জেরে কে এখন কার বন্ধু, কার শত্রু, তা ঝাপসা হয়ে গেছে। বিশ্ব কূটনীতির এ বাঁকবদল দেশে দেশে রাজনীতির ধরন বদলে দিচ্ছে। নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশে বিশ্ব রাজনীতি ও স্নায়ুচাপের তাপ-চাপ ক্ষেত্রবিশেষে তুলনামূলক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণরেখায় বিদেশি কূটনীতিকদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। তা থেকে যে যার মতো বেনিফিশিয়ারি হওয়ার চেষ্টা করছে। এ জার্নিতে হালে পানি দেখছে বিএনপি।
নির্বাচন প্রশ্নে বিদেশি কিছু কূটনীতিকের যাবতীয় কথাবার্তা ও তৎপরতা আপনাআপনি বিএনপির পক্ষে চলে যায়। সরকার এতে বিরক্তি প্রকাশের পর থেকে কয়েক কূটনীতিক মুখ আরো বেশি খুলছেন। যারা সচরাচর দম ধরে থাকেন, না পারতে কথা বলেন না, তারাও কথার ঝাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ কাজে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বরাবরই এগিয়ে। কদিন আগে ‘কথা কম কাজ বেশি’ বৈশিষ্ট্যের দেশ জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকিও রীতিমতো কূটনৈতিক বোমা ফাটিয়ে বসেছেন। আগামীতে বাংলাদেশে যেন আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা না হয়, সেই তাগিদ দিয়েছেন জাপানের রাষ্ট্রদূত। কোনো দেশে রাতে ভোট হয়, এমন কথা তিনি জীবনেও শোনেননি বলে মন্তব্য করে বিএনপিসহ বিরোধী মতের রাজনীতির পিঠ চাপড়ে দেওয়ার মতো কাজ করে দিয়েছেন। এর মাঝেই বিএনপির নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন কানাডার হাইকমিশনার লিলি নিকোলাস।
পরস্পরের এ ডিপ্লোম্যাসির লাগাম টানার চেষ্টায় লবিং বাণিজ্য ফের জোরদার। দেশের চলমান অভাব, সংকটের মাঝেও সরকার ও বিরোধী দল থেকে প্রচুর টাকা উড়ছে এই খাতে। বিএনপি বিভিন্ন সোর্সে প্রচুর টাকা পাচ্ছে বলে নিশ্চিত সরকার। দেশের কিছু বিজনেস হাউস এবং বিদেশি একটি দূতাবাসসহ কয়েকটি মাধ্যমে বিএনপির সাম্প্রতিক কালেকশন সরকারকে ঘাবড়ে দিয়েছে। কিন্তু কিছু করতে পারছে না। সেই সুযোগ আর নেই। কারণ একই কাজ সরকারও করছে। লবিংয়ের পেছনে ঢালছে প্রচুর টাকা। কিন্তু অকুলান হয়ে যাচ্ছে কোথাও কোথাও। যুক্তরাষ্ট্রে পিআর এবং লবিস্ট পেমেন্টে গোলমাল বেধেছে। সেখানে বাংলাদেশের হয়ে লবিস্টের কাজ করছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন কাজ ভাগ করে দেওয়া আছে তাদের। সার্ভিস এবং লেনদেন নিয়ে কয়েকটির সঙ্গে বড় রকমের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং একটিকে বাইপাস করে আরেকটিকে কাজে লাগানো নিয়েও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ আরো কয়েকটি দেশেও এ ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে সরকার। এর সুযোগ নিচ্ছে বিএনপিসহ ভিন্নমতের কয়েকটি দল। বিভিন্ন দূতাবাস ও দাতা সংস্থায় যোগাযোগ বাড়িয়েছে তারা। ফলও পাচ্ছে। এ কারণে বিএনপি বেশ ফুরফুরে। তার ওপর ১০ ডিসেম্বর সামনে রেখে বাড়তি উত্তেজনা। সেদিন ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশ কর্মসূচি। দিনটি শনিবার। এই শনির মাঝেই ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর তারিখেই আচমকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসে বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‍্যাবের ওপর। যাদের অস্ত্র-প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় লজিস্টিক যুক্তরাষ্ট্রেরই দেওয়া। ওই স্যাংশন বিএনপিসহ বাংলাদেশের কয়েকটি মহলকে উল্লসিত করে তোলে। সরকার থেকে বলা হয়েছে, এর পেছনে লবিংয়ে টাকার বস্তা ঢালা হয়েছে। অস্থিরতা-নৈরাজ্যসহ নানা অঘটনে সামনে এ ধরনের আরো কোনো নিষেধাজ্ঞার গুঞ্জন ঘুরছে। সরকারের জন্য এর মাঝে একটি শনির বার্তা। আবার বিএনপিও আক্ষরিক অর্থে চক্কর খাচ্ছে শনিতেই। শাহজালাল-শাহপরানসহ বহু আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটে তারা চেয়েছিল ২০ নভেম্বর রোববার গণসমাবেশটি করতে। কিন্তু পারেনি শনিবার মুক্ত হতে। কিন্তু সেদিনই শুরু হবে এইচএসসি পরীক্ষা। তাই এগিয়ে আনতে হয়েছে ১৯ নভেম্বর শনিতেই। এর আগে ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম, ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ, ২২ অক্টোবর খুলনা, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুরে গণসমাবেশ করেছে দলটি। প্রতিটিই হয়েছে শনিবারে। সিলেটের পর ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে গণসমাবেশ করবে বিএনপি। দিনপঞ্জিতে সেই তিনটি তারিখও শনিবার। স্যাংশন আরোপের বার্ষিকী আগামী ১০ ডিসেম্বরও শনিবার। সেই শনিতে ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি বিএনপির। বসে নেই ক্ষমতাসীনরাও। সেরের ওপর সোয়া সের আরোপের আয়োজনে কমতি নেই সরকারেরও। ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিশ্ববাস্তবতা দুই দলের এই অতিখেলায় আরো কোনো শনি ডেকে আনে কি না, সেই শঙ্কা অনেকের মাঝে।