চট্টগ্রামের চিঠি

শামসুদ্দিন হারুন

সুপ্রিয় সুহৃদ
অনেক অনেক শুভেচ্ছা। বিশ্বজুড়ে অতিমারীসহ নানান বৈপরীত্য, সমস্যা, সংকট সত্ত্বেও চট্টগ্রামের মানুষ যে যেখানেই থাকেন না কেন নিশ্চয় আপনারা ভালো আছেন। আর ভালো তো থাকবেনই, কারণ বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের মানুষের জন্য যেন রয়েছে সৃষ্টিকর্তার বিশেষ রহমত। এ জন্যই চট্টগ্রামের মানুষ নানান সমস্যা, সংকট, ঝঞ্ঝার মধ্যেও আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে জানেন। প্রবীণেরা তাই সগর্বে উচ্চারণ করে থাকেন : চাটগাঁইয়া পোয়া, ম্যাডিত পইল্লে লোয়া (চট্টগ্রামের ছেলে, মাটিতে পড়েই হয়ে যায় লোহা)।
তো বন্ধুরা আসুন জেনে নিই চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু খবরাখবর :
মাটিতে পড়লেই যেখানকার মানুষ লোহা হয়ে যান, সেই চট্টগ্রামে পুরোনো জাহাজ থেকে লোহা কাটার যে শিল্প রয়েছে, তাতে চলছে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। যত্রতত্র জাহাজভাঙা ও লোহা কেটে বের করার ব্যাপারে সরকারের পরিবেশ অধিদফতরের রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু বিধিমালা ও রয়েছে কিছু বিধিনিষেধ। কারণ, এই পুরোনো জাহাজভাঙার কাজটি যত্রতত্র করা হলে তা ভয়ংকর পরিবেশ বিপর্যয় ঘটায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও একশ্রেণির জাহাজভাঙার ব্যবসায়ী তা অগ্রাহ্য করে যেখানে-সেখানে জাহাজ কাটার কাজ করেন। এর ফলে সমুদ্র, সমুদ্রসৈকত ও সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর তা রুখতেই চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বিনা অনুমতিতে অবৈধভাবে পুরোনো জাহাজ কাটার দায়ে এক জাহাজ মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত।
৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরের দিকে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে চালানো এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গৌতম বাড়ই। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে জাহাজ মালিকের এক প্রতিনিধিসহ তিনজনকে আটক করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বরিশালের মো. ইউসুফ হোসেনের মালিকানাধীন ‘এমভি গোলাম রহমান’ নামের জাহাজটিকে ভাঙার সময় ঘটনাস্থল থেকে জাহাজ মালিকের প্রতিনিধি ও দুজন ক্রেন চালককে আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন জাহাজ প্রতিনিধি মো. এনায়েত (৫০), ক্রেন চালক আবুল কালাম (২৭) ও সহকারী ক্রেন চালক মো. রায়হান (২৪)।
চলুন এরপর দেখে নিই এই করোনাকালে কেমন আছেন চট্টগ্রামের মানুষ। দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্র বলছে, চট্টগ্রামে ফের কমেছে কোভিড-১৯-এর নমুনা পরীক্ষা। এর ফলে নতুন করে আক্রান্তরা থেকে যাচ্ছেন নজরদারির বাইরে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে করোনায় মারা গেছেন আরও ৬ জন। নতুন করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও শতাধিক। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১৮ হাজার। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ছয়টি ল্যাবে ও কক্সবাজার ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার জন্য আগ্রহীদের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেকটাই কমেছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে ভয়াবহ গ্যাস দুর্ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চট্টগ্রামে গ্যাসলাইন ও গ্যাস রাইজারের পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্বয়ংক্রিয় এ পরীক্ষায় গ্যাসলাইনে কোনো লিকেজ থাকলে মেশিনই বলে দেবে লিকেজ কোথায় আছে। চট্টগ্রামে প্রায় দেড় লাখ গ্যাস রাইজার এবং শহরের অলিগলিতে বিস্তৃত কয়েক হাজার কিলোমিটার গ্যাসলাইন। একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানির সাথে গ্যাসলাইনের লিকেজ পরীক্ষার চুক্তি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সফল হলে এই কার্যক্রম দেশের অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানিও শুরু করবে।
নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের সাথে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের পর পুরো দেশের গ্যাসলাইন এবং রাইজার পরীক্ষার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ছয়টি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাথে জরুরি বৈঠকে বসেন।
পেট্রোবাংলার পদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, দেশে গ্যাস ব্যবহার শুরু হয়েছে ৪০ বছর আগে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ওই সময় স্থাপন করা লাইন এবং রাইজার রয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে বহু লাইনে মরিচা ধরেছে, লিকেজ এসেছে। পুরোনো রাইজারের রেগুলেটর ও ভাল্ব নষ্ট হয়েছে। কিন্তু একটি করে রাইজার পরীক্ষা করা, লিকেজ উদ্ধার এবং মেরামত করা কঠিন ব্যাপার। আবার লাইনের লিকেজ চিহ্নিত করাও কঠিন। এই কঠিন কাজটি সহজে করার জন্য পেট্রোবাংলা একটি পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ করেছে। শুরুতে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে (কেজিডিসিএল) এই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হচ্ছে। মোবাইল গ্যাস লিকেজ ডিটেক্টর নামের একটি মেশিনের সাহায্যে শহরের অলিগলিতে স্থাপিত গ্যাসলাইনের লিকেজ অনুসন্ধানের কাজে হাত দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক জিকম নামের কোম্পানির সাথে ইতিমধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, জিকম কোম্পানি বিশেষায়িত গাড়িতে স্থাপিত একটি মেশিন দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের সব লাইনের লিকেজ অনুসন্ধান করবে। একই সাথে রাইজার পরীক্ষাও সম্পন্ন করা হবে। বিশেষায়িত গাড়িটি একটি রাস্তা দিয়ে চলার সময় দুই পাশের অন্তত ৬০ ফুটের মধ্যে গ্যাসের লাইনের যত লিকেজ আছে সব চিহ্নিত করবে। সব কটি লিকেজের তথ্য মেশিনের মনিটরে ধরা পড়বে। এই লিকেজ সাথে সাথে মেরামতেরও ব্যবস্থা করা হবে।
বন্ধুরা, আমরা অনেকেই জানি, চট্টগ্রামের হালদা নদী হচ্ছে রুই ও কার্পজাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র। কিন্তু হালদাকে মাছের জন্য নিরাপদ রাখতে পদে পদে বেগ পেতে হচ্ছে। বালু উত্তোলনসহ নানাভাবে এই নদীটির পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটানোর চেষ্টা চলে। তাই চট্টগ্রামের হালদা নদীতে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত ১০টি নৌকা ধ্বংস করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ছাড়া হালদায় মাছ ধরার জন্য পেতে রাখা এক হাজার মিটার জালও জব্দ করা হয়। এ সময় মো. জাফর নামের এক নৌকার মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
হালদার মা-মাছ ও বিলুপ্তপ্রায় ডলফিন রক্ষার্থে হালদা নদীর সত্তারঘাট ব্রিজ থেকে গড়দুয়ারা নয়াহাট পর্যন্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন। ইউএনও জানান, উপজেলা প্রশাসনের বারবার অভিযানের ফলে মা-মাছ শিকার, ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে বালু উত্তোলন প্রায় বন্ধ হলেও কিছু অসাধু ব্যক্তি সুযোগ বুঝে অবৈধভাবে মা-মাছ শিকার ও বালু উত্তোলন করেই যাচ্ছে। তাই এবার বালু উত্তোলনের ১০টি নৌকা বালুসহ হালদার মাঝে নিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। নৌকার অভাবে তারা বালু উত্তোলনে কিছুটা হলেও দমে যাবে।
দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির দায়ে ১০ আড়তদারকে প্রায় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে চালানো হয় এই অভিযান। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিরিন আক্তার ও উমর ফারুক এই অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও ক্রয় ভাউচার না রেখে নিজেদের ইচ্ছামতো মূল্যবৃদ্ধির দায়ে মেসার্স বরকত ভাণ্ডারকে ১০ হাজার টাকা, মেসার্স গোপাল বাণিজ্য ভাণ্ডারকে ১০ হাজার টাকা, মেসার্স হাজী মহিউদ্দিন সওদাগরকে ১০ হাজার টাকা, মেসার্স সেকান্দার অ্যান্ড সন্সকে ১০ হাজার টাকা, মোহাম্মাদীয়া বাণিজ্যালয়কে ১০ হাজার টাকা, মোহাম্মদ জালাল উদ্দীনকে ১০ হাজার টাকা, গ্রামীণ বাণিজ্যালয়কে ৫ হাজার টাকা, আরাফাত ট্রেডার্সকে ৫ হাজার টাকা, মেসার্স বাগদারিক করপোরেশনকে ৫ হাজার টাকা ও শাহাদাত ট্রেডার্সকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক জানান, বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় খাতুনগঞ্জ বাজারে পেঁয়াজের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, আড়তদাররা ব্যবসায়িক কাগজপত্র নিজেদের কাছে না রেখে আমদানিকারকের ফোনকলে দাম নির্ধারণ করে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন এবং অতিরিক্ত মুনাফা করতে কেজিপ্রতি প্রায় ২০ টাকা লাভ করছেন। পেঁয়াজের পাইকারি বাজারে এ অভিযানের পর খাতুনগঞ্জের ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা তাদের আড়ত বন্ধ করে দেন। পরে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের হুস্তক্ষেপে ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আবার তারা আড়তে পেঁয়াজ বিকিকিনি শুরু করেছেন। তবে বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁজ প্রতিদিনই বাড়ছে। ২৫ টাকা কেজির পেঁয়াজের দাম মঙ্গলবার আরও বেড়ে গিয়ে হয়েছে প্রতি কেজি ৬০-৬৫ টাকা।
এবার আপনাদের বলছি হাতির জন্য ভালোবাসার একটি সত্যিকারের গল্প। পাহাড়বেষ্টিত ভৌগোলিক গঠনের কারণে একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা বেশ দুরূহ ছিল। তিন দশক আগেও পাহাড়ে প্রশাসনিক কাজে হাতি ব্যবহার করতেন জেলা প্রশাসকেরা। ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি জেলা ঘোষণার পর থেকেই জেলা প্রশাসকেরা প্রশাসনিক কাজে হাতি ব্যবহার করতেন। হাতির পিঠে চড়ে প্রশাসকেরা সরকারি কাজে যেতেন। ১৯৯০ সালে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের ব্যবহৃত সর্বশেষ হাতির নাম ছিল ‘ফুলকলি’। এ সময় অন্য একটি বুনো হাতির আক্রমণে ‘ফুলকলি’ মারা যায়। পরে হাতির স্মৃতি সংরক্ষণে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গোলাবাড়ি এলাকায় ফুলকলিকে সমাধিস্থ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণের অভাবে ‘ফুলকলি’র সমাধিস্থান প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। তবে দীর্ঘদিন পরে ‘ফুলকলি’র সমাধিস্থানটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে হাতির অভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে খাগড়াছড়ির তৎকালীন জেলা প্রশাসক খোরশেদ আনসার খান ‘ফুলকলি’র পিঠে চড়ে প্রত্যন্ত এলাকায় যেতেন। ফুলকলির (হাতি) মৃত্যুর পর তিনি পরম মমতায় এটিকে সমাধিস্থ করেন। সেই ফুলকলির স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ‘ফুলকলির সমাধিসৌধ’ গড়ে তোলা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নিজস্ব অর্থায়নে আগামী নভেম্বরের মধ্যে এটির নির্মাণকাজ শেষ হবে। এরপর এটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করা হবে। গত ২ সেপ্টেম্বর ফুলকলি সমাধিসৌধের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা।
সুপ্রিয় পাঠক বন্ধুরা, আজ এ পর্যন্তই। যে যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, থাকুন নিরাপদে।
শামসুদ্দিন হারুন