চট্টগ্রামের চিঠি

শামসুদ্দিন হারুন : শুভেচ্ছা অফুরান। চট্টগ্রামের চিঠি নিয়ে আমি এসেছি প্রবাসে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ঠিকানার সকল পাঠক পাঠিকা, শুভার্থী সজ্জনদের জন্যে। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিতই আমি আসবো আপনাদের কাছে প্রিয় চট্টগ্রামকে নিয়ে, ইনশাল্লাহ। জানবো এবং জানাবো চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার কথা। আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ ঠিকানা গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এম শাহীন ভাই। অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে আমি দেখি অসাধারণ এই ভালো মানুষটিকে। তাঁর অনুরোধেই আবার আপনাদের কাছে, ঠিকানার কাছে আসা।
কেমন আছেন সুপ্রিয় সুহৃদ, বন্ধুরা? আমি এবং আমরা ভালো নেই। কি করে ভালো থাকি বলুন, আমাদের প্রিয় চট্টগ্রাম, বন্দর মহানগর চট্টগ্রাম যে ভালো নেই। গেলো কয়েক দিনের তুমুল বর্ষণে নাকাল চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের মানুষ। বৃষ্টির উপচেপড়া পানিতে চট্টগ্রাম মহানগর কতোবার যে ডুবেছে, ভেসেছে কতোবার… তা শুধু চট্টগ্রামের মানুষই জানেন। চট্টগ্রাম মহানগর, শহরতলী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। এর ফলে এসব এলাকার মানুষের কষ্ট দুর্ভোগের আর সীমা ছিল না। চট্টগ্রামের বাইরে যারা আছেন, আছেন দেশে বিদেশে, তারাও কিছুটা জানেন চট্টগ্রামের এ দুর্ভাগ্যের কথা… জানেন প্রবাসী চট্টগ্রামের মানুষও। আগের মতোই এখনো ডোবে আর ভাসে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই চেষ্টা করছেন জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর দুঃসহ কষ্ট ও ক্ষতি লাঘবের। কিন্তু দিনে দিনে পুঞ্জিভূত এই সমস্যার সমাধানতো আর অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়। তাই আবারও বর্ষণ, আবারও ডুবছে বন্দর মহানগর… এটাই যেন নিয়তি। অপরদিকে চট্টগ্রামের অনেক রাস্তা ঘাটই এখন বেহাল। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে পোর্ট কানেক্টিং রোড, আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোড, হালিশহরসহ সংলগ্ন এলাকার রাস্তার অবস্থা একেবারেই দুঃসহ। সড়ক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, মেরামত ইত্যাদি কাজে দীর্ঘসূত্রতা এসব এলাকার মানুষের জীবন-যাপনকে দুর্বিসহ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় লাটে তুলে দিয়েছে। এসব এলাকার লাগাতার জলাবদ্ধতা ভয়ংকর এক অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেছেন, বন্দরের সাথে সরাসরি সংযুক্ত চট্টগ্রামের লাইফলাইন খ্যাত পোর্ট কানেক্টিং রোড নিয়ে প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে। এটিকে চলাচলের উপযোগী করে তোলা জরুরি প্রয়োজন। সেই চেষ্টাই চলছে।
এ ছাড়াও লাগাতার বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর ১২৭ কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন। সড়কজুড়ে সৃষ্ট খানাখন্দে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ঘটছে ঘটনা-দুর্ঘটনাও। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সড়কগুলো সাময়িক মেরামত শুরু করলেও নানা কারণে তা বিলম্বিত হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ সড়কই বিধ্বস্ত রূপ নেওয়ার প্রধান কারণ হলো, নগরীতে যেসব সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সেবা সংস্থা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাব। চট্টগ্রামসহ সারাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে মোটেও কোনো ভালো খবর নেই। চলছে দ্বিতীয় মাত্রার সংক্রমণ ধারা। আক্রান্তের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছেই। কিন্তু তবুও মানুষের মধ্যে সচেতনতা, সাবধানতা এখন যেন অনেকটাই অনুপস্থিত। চট্টগ্রামের ৬টি ল্যাব ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাবের নমুনা পরীক্ষায় গত ৩১ আগস্ট সোমবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজারের বেশি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এ অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ৩০০ জন। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জানান, কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সংক্রমণের যে চিত্র সরকারি সূত্রে প্রচার করা হয়ে থাকে, বাস্তব চিত্র তার ভিন্ন। সংক্রমণ নিয়ে আগে যে ভয়, ভীতি ও আতঙ্ক কাজ করেছে, বর্তমানে তা যেনো অনেকটাই নেই। ফলে নমুনা পরীক্ষার হারও গেছে কমে। আর এ কারণে কোভিড-১৯ সংক্রমণ, মৃত্যু, সুস্থতা এসবের সত্যিকারের সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ বলছে, করোনা সংক্রমণ নিয়ে চরম কোনো পরিস্থিতি বাংলাদেশে এখনো আসেনি। তবে ল্যানসেটের প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, করোনা এবং ডেঙ্গু এই দ্বিমুখী পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশজুড়ে লাগামহীনভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। অবশ্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক মানুষকে শুনিয়েছেন আশার কথা। তিনি বলেছেন, শিগগিরই করোনাভাইরাস প্রতিরোধক ভ্যাকসিন আসছে এবং এই ভ্যাকসিন এলে সামনের দিনগুলোতে আর মাস্কই পড়তে হবে না। নানা কারণে বহুল আলোচিত স্বাস্থ্য মন্ত্রীর এই আশ্বাসবাণীতে শঙ্কিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ কতোটা আশায় বুক বেঁধেছেন, সে খবর অবশ্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই-আসাদগঞ্জের ঐতিহ্যময় সেই দিন যেন এখন আর নেই। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, ‘মোকাম’ পরিস্থিতির বিকেন্দ্রীকরণ ও রূপান্তরসহ নানা কারণে বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই-আসাদগঞ্জের রমরমা পরিস্থিতির এখন অনেকটাই আর নেই। তার ওপর করোনা পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বিশ্বমন্দায় খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই-আসাদগঞ্জের ব্যবসায়-বাণিজ্যে এখন ভয়ংকর মন্দা অবস্থা। এখন নেই এই বাণিজ্যিক এলাকার সেই ব্যস্ত অবস্থা। ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি বাজারের বেচাকেনা বর্তমানে নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই-আসাদগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাঁরা এখন এক জটিল সময় অতিক্রম করছেন। এ অবস্থায় তাঁরা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন দায়-দেনা ও ব্যাংক লোন নিয়ে।
এদিকে এই দুঃসময়ের মধ্যেই বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে কয়েকবারই তলিয়ে গিয়েছিল চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ-আসাদগঞ্জ এলাকা। দোকানপাট, গুদামসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জোয়ারের পানি ঢুকে যাওয়ায় এবং জলাবদ্ধতার কারণে এই বাণিজ্যিক এলাকার ব্যবসায়-বাণিজ্য কয়েক দিন প্রায় অচলই ছিল। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব পড়েছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে। বেচাকেনা ও লেনদেন কমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে চলছে মন্দাভাব। তার প্রভাব পড়েছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ-আসাদগঞ্জের ব্যবসা বাণিজ্যেও।
আরেকটি মন খারাপ করা খবর হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর স্বামীর সামনেই স্ত্রীকে গণধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম মহানগরীতে। পৈশাচিক এ ঘটনাটি ঘটে গত ২৯ আগস্ট রাতে মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায়। পরে পুলিশ অপহৃত স্বামী-স্ত্রীকে উদ্ধার এবং চার ধর্ষককে গ্রেফতার করে। স্বামী-স্ত্রী দুজন চাকরিজীবী। কাজ শেষে রাতে একসাথে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তাদের তুলে নিয়ে যায় নির্জন এলাকায়। সেখানে স্বামীর সামনে তার স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে ৫ দুর্বৃত্ত। আমরা আশা করবো অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি যেন হয়।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফের বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে চতুর্থবারের মতো একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গত ৩১ আগস্ট দুপুরে র‌্যাবের একটি দল তাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (টেকনাফ-৩) আদালতে হাজির করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খায়রুল ইসলাম অধিকতর তথ্যের স্বার্থে প্রদীপের আরও একদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তামান্না ফারাহ একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রদীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় র‌্যাব। এর আগে গত ২৮ আগস্ট একই আদালতে প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক (বরখাস্ত) লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতের তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। উল্লেখ্য গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।
সুপ্রিয় বন্ধু স্বজন, আজ এ পর্যন্তই। আবার দেখা হবে আগামী সপ্তাহে। স্বদেশে প্রবাসে ভালো থাকুন সবাই, থাকুন নিরাপদে। ভালো থেকো প্রিয় বাংলাদেশ।
কবি, লেখক, সাংবাদিক।