চরম অন্ধকারে বিএনপির ভবিষ্যৎ

আমীর খসরু : দেশের এই সময়ের বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির হালফিল অবস্থান নিয়ে একটি চকিত জরিপ পরিচালনা করে একটি জাতীয় সাপ্তাহিক। বিএনপির নবীন-প্রবীণ রাজনীতিকেরা ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়। দেখা যায়, শতকরা ৫৩ জনই তারেক রহমানের ওপর সন্তুষ্ট নয়। তাদের মতে, তারেক রহমানের কারণেই দলটির এই বিপর্যয়। এরা তারেকের হাতে দলের নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়াকে ভালোভাবে নেননি। তাদের মতে, দলে কাউন্সিল করে একজন সিনিয়র নেতাকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিলে দল আরও উজ্জীবিত থাকত। গত নির্বাচনে ড. কামালকে ভাড়া করে আনা নিয়েও অনেকে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ ভাগই বলেছেন, গত নির্বাচনে বিএনপি যদি ঠিকমতো অংশ নিত, তাহলে দলের এই ভয়াবহ বিপর্যয় হতো না। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় আসনে একটা সম্মানজনক অবস্থা থাকত। নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিল করেও নির্বাচন না করার যে সিদ্ধান্ত এটা ড. কামালের নয় বলে জানিয়েছেন অনেক প্রবীণ নেতা। তারেক রহমানের খবরদারি এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচনে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় বলে একাংশ অভিমত ব্যক্ত করেন।

প্রবীণ নেতাদের বেশির ভাগের মতে নির্বাচনের সময়টি ছিল বিএনপির একটি সুবর্ণ সময়। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও চাপ সৃষ্টি করে তখনই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যেত। সরকারি মহেলর সাথে সমঝোতা করে অন্তত ১০০টি আসনে বিএনপি জিতে আসতে পারত। কিন্তু বিরোধী আসনে বসব না, সরাসরি ক্ষমতা চাই, তারেক রহমানের এমন মনোভাবের জন্য আমও গেছে, ছালাও গেছে। আজ খালেদা জিয়ার মুক্তি ও দলের ভবিষ্যৎ সবই নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় নেতৃত্বদানকারী একটি অংশ মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন, অন্তত আরও ১০-১৫ বছর বিএনপি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। তাদের মতে, দলকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে হলে তারেক রহমানকে দলের নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে।

বিএনপির প্রবীণ নেতাদের মতামতও গ্রহণ করা হয়েছে। তারা দল নিয়ে খুবই হতাশ। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়েও। তাদেরই একাংশ বললেন, নির্বাচনের সময় এটা অনেক সহজ ছিল। কিন্তু দল সে সময় ভুল নেতৃত্বের কারণে ব্যর্থ হয়েছে। এখন তো বল সরকারের কোর্টে। বারগেইনিং করার মতো কোনো ইস্যু নেই। আইনগত দিক থেকেও কোনো পথ খোলা নেই। একটি সুবর্ণ সময় হারিয়েছে দল।

সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টা শতভাগ সরকারের হাতে, আইনি লড়াইয়ে মুক্তির সম্ভাবনা মোটেই নেই। সরকারের সাথে এখন সমঝোতায় গেলে সব রকমের ছাড় দিয়েই যেতে হবে। নির্বাচনের সময় যেসব ইস্যু ছিল, তা এখন আর নেই। এদিকে বিএনপির অস্তিত্বই মহা সংকটে। মহাসচিব বা যুগ্ম মহাসচিবের মাঝেমধ্যে প্রেসের সাথে কথাবার্তা বা কোনো ছোটখাটো আলোচনা সভায় ভাষণ দেওয়া ছাড়া দলের কোনো কার্যক্রম নেই। এমন অচলাবস্থা বিএনপির জন্ম থেকে সামরিক আমলেও হয়নি। তারেক রহমানকে দিয়ে যে হবে না, তা মোটামুটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এখন যেটা দরকার, তা হচ্ছে পরিবর্তিত সময়ের সাথে তাল রেখে নতুনদের দিয়ে দলকে সাজানো। এখনকার টিম দিয়ে আগামী ১০ বছর দল চলবে বলে মনে হয় না।

তারেকের নেতৃত্ব ব্যর্থ, অসন্তুষ্ট দলীয় নেতারা : খালেদা জিয়া কারাদণ্ড নিয়ে জেলে যাওয়ার পর তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। তিন মামলার যাবজ্জীবন ও ১৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড নিয়ে তিনি লন্ডনে পালিয়ে আছেন। সেখান থেকে স্কাইপেযোগে দলকে পরিচালিত করছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তও তিনি অমান্য করে নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে দিচ্ছেন। নানাভাবে দলের নেতারা আজ কোণঠাসা ও অবহেলিত।

দলের একমাত্র ইস্যু ছিল দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি। এই ইস্যুটি গত নির্বাচনের সময় জোরালো হয়েছিল। তখন দল ভর করেছিল ড. কামালের ওপর। কামাল এবং তার সারিন্দারা ঠিকই জানতেন, খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে তাদের নেতৃত্ব পুরোটাই জিরো হয়ে যাবে। যে জন্য তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে তেমন আন্দোলন গড়ে তোলেননি। তারেক রহমান ভেবেছিলেন, অঢেল অর্থ ঢেলে সব কিনে নিয়ে ২০০১ সালের মতো তারা মসনদ দখল করে নেবেন। কিন্তু কোটি কোটি টাকা রাস্তাঘাটে পাওয়া গেলেও তাদের সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

তারেক রহমান দলীয় প্রধান হওয়ায় স্থায়ী কমিটির প্রবীণ নেতারা খুবই অখুশি। তাদের কোনো মতামতই আজ আর প্রাধান্য পাচ্ছে না। এদিকে তারেক প্রায়ই বলছেন, বুড়োদের দলের মূল নেতৃত্বে রাখা হবে না। দলকে সাজানো হবে আগামী ১০ বছর মাথায় রেখে। এতে প্রবীণ নেতারা তারেকের ওপর ভীষণ নাখোশ। তারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন তারেকের জন্যই ব্যর্থ হয়েছে। দলের কাউন্সিল করে নতুন নেতা নির্বাচন ছাড়া দলকে চাঙা করা যাবে না।

খালেদার মুক্তি ও দলের হালফিল : জরিপে স্পষ্ট হয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনা বলতে গেলে একেবারেই শূন্য। দলের হালফিল অবস্থাও একেবারে তলানিতে। ৬৩ ভাগই মনে করেন, বিএনপিকে নতুনভাবে সাজাতে হলে তারেক রহমানকে দলের মূল নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাখা হলে দলের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকবে।

একজন প্রবীণ নেতা বলেছেন, দলকে জিয়া পরিবার থেকে বের করে আনলে দল ভেঙে যেতে পারে। এ অবস্থায় দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে নতুনভাবে সাজানোর জন্য দরকার বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি মুক্ত হলে মোটামুটি প্রাণ ফিরে পাবে।

এই নেতার মতে, সরকার ব্রিটিশ সরকারের সাথে বন্দিবিনিময় চুক্তি সই হলে তারেক রহমানকেও হয়তো দেশে ফিরে আসতে হবে। এসব চিন্তা করে এখন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের পদ থেকে তাকে সরানো দরকার।
আরেকজন নেতা বলেছেন, দলের সাথে জামায়াতকে রেখেই আজ দলের বারোটা বেজেছে। জামায়াতকে সঙ্গে না রাখলে দল নতুনভাবে দাঁড়াতে পারত। এই নেতার মতে, তারেক রহমানের লন্ডনে বিশাল খরচের বেশির ভাগ যোগদান দেয় জামায়াত ও পাকিস্তানি গোয়েন্দারা। যে কারণে বিএনপি জামায়াতের কাছে জিম্মি হয়ে আছে।

একজন স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য বলেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো সুযোগ বিএনপির হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার মতে একটা সময় আসবে, যখন শেখ হাসিনার দল ও সরকার আর হয়তো থাকবে না। তখন নতুন দলের আবির্ভাব হতে পারে। বিএনপি তখন মুসলিম লীগের মতো হয়ে যেতে পারে। তৃণমূলে যারা আছেন, তারা তখন নতুন ¯্রােতের সাথে বিলীন হয়ে যাবেন। ১০-১৫ বছর যাবৎ খালেদা জিয়া তো আর সচল থাকবে না। তারেক রহমানও ইন্দিরা গান্ধীর নাতি রাহুল গান্ধীর মতো হয়তো এক আসনে তখন টেনেটুনে জিতে আসবেন। চিরদিন সময়মতো আর একরকম থাকে না। যেদিন যাচ্ছে, সেদিন আর কখনো ফিরে আসবে না।